বিভাগ: অন্যান্য

বাংলাদেশ

পেট্রল পাম্প থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটতে শুরু করল আবার। রিয়াজের চোখে ভাসছে সন্ন্যাসীর দিঘির দৃশ্যাবলি। মসজিদের ঘাটলায় মুসল্লিদের অজু, জালাভিটায় দুই কৃষকের জল সেচা, বৌদ্ধবিহার, গেরুয়া চীবরের ভিক্ষু, বাবা জল্লাশাহর মাজার, বুড়ো খাদেম, ঘোষপাড়া, শুকোতে দেওয়া জাল, মন্দির, শ্মশান, দিঘির ঘাটে ছেলে-মেয়েদের ডুবসাঁতার, কোমরজলে দাঁড়িয়ে লোকটার সূর্যপ্রণাম।

Mfdস্বকৃত নোমান: বাবার মৃত্যুর প্রায় সতেরো বছর পর হঠাৎ একদিন রিয়াজের মনে পড়ে গেল সেসব বিকেলের কথা, নানাবাড়ি থেকে ফেরার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে তার বাবা প্রায়ই সন্ন্যাসীর দিঘির দিকে তর্জনির ইশারা করে বলত, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ জানালা দিয়ে মাথাটা বের করে প্রতিবারই দিঘিটার দিকে তাকাত রিয়াজ। ততক্ষণ তাকিয়ে থাকত, যতক্ষণ না দিঘিটা গাছগাছালির আড়াল হয়ে পড়ত।
তখন তো তার বয়স কম। পাঠ্যপুস্তকে পড়ছে, আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ নানা জাতি-গোষ্ঠীর বসবাস এই দেশে। আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি। এই দেশে ছয় ঋতু। শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি ইত্যাদি ইত্যাদি। সে ভাবতো, পাঠ্যপুস্তকে যে বাংলাদেশের কথা লেখা আছে সেই দেশটা বুঝি ঐ সন্ন্যাসীর দিঘির পাড়েই অবস্থিত। ক্লাস ফাইভ-সিক্সে ওঠার পরও দিঘিটাকেই সে বাংলাদেশ মনে করত। এইট-নাইনে পড়ার সময়ও কোথাও ‘বাংলাদেশ’ লেখা দেখলেই তার চোখে ভেসে উঠত সেই বিশাল দিঘি।
যখন বুঝতে শিখল বাংলাদেশের আয়তন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত এই দেশের বিস্তার, তখন তার বাবা বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারত, প্রতিবারই নানাবাড়ি থেকে ফেরার পথে বাবা কেন ঐ দিঘিটার দিকে আঙুল তুলে কথাটি বলতো।
সেসব রঙিন বিকেলের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। প্রায় কুড়ি বছর ধরে সে ঢাকায়। গ্রামে যাওয়া হয় না খুব একটা। যাবে কার কাছে? বাবা-মা তো সেই কবেই মরেছে, বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে, ভাইয়েরাও দেশ-বিদেশে চাকরি-বাকরি নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে আছে শুধু এক চাচা। তার সঙ্গেও বহুদিন যোগাযোগ নেই। ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত মানুষ সে। প্রায় দশ বছর চাকরি করে নিজে একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছে। ওটা নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত, মাসে মাসে দেশ-বিদেশ করতে হয়, গ্রামের বাড়ির কথা তেমন মনে পড়ে না। পড়লেও সেসব বিকেলের কথা পড়ে না। অসংখ্য স্মৃতির নিচে চাপা পড়ে গেছে সেসব বিকেলের স্মৃতি। মনে হয়তো পড়েছে। কিন্তু সেদিনের মতো অত তীব্রভাবে পড়েনি। স্মৃতিটা তাকে এতটা আকুল, এতটা কাতর করেনি।
সেদিন তার ইচ্ছে হলো শৈশবের সেই হারানো রঙিন বিকেলগুলো দেখতে যাবে। মনতলা স্টেশনে নেমে কাটা ধানের মাঠ পেরিয়ে দিঘিটার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। কেন বাবা দিঘিটা দেখিয়ে ঐ কথাটি বলত, বোঝার চেষ্টা করবে। সময় থাকলে গ্রামে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জেয়ারত করে আসবে। বাবার প্রতি তেমন টান ছিল না তার। পুলিশের চাকরি ছিল বাবার। বছরের বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। সংসার সামলাতো মা। বাবার মৃত্যুর পর তেমন কাঁদে-টাঁদেওনি রিয়াজ। এখনও যে বাবার স্মৃতি খুব একটা মনে পড়ে, তা নয়।
পরদিন ভোরে রওনা হয়ে গেল। ছেলেটার পরীক্ষা, কানিজা ব্যস্ত ছেলেকে নিয়ে, নইলে তাদেরও সঙ্গে নিতে পারত। ছেলেকে স্কুলে নিতে হবে, তাই ড্রাইভারকেও নিতে চায়নি। কানিজা বলল, লংড্রাইভে যাচ্ছ, ড্রাইভারকে নিয়ে যাও। আমরা সিএনজি অটোরিকশায় যাতায়াত করতে পারব।
বেলা এগারোটা নাগাদ জেলা শহরে পৌঁছে গেল রিয়াজ। ভেবেছিল গাড়িটি শহরের কোথাও রেখে শৈশবের সেই লোকাল ট্রেনে চড়ে মনতলা স্টেশনে যাবে। তার খেয়ালেই ছিল না অব্যাহত লোকসানের অজুহাতে রেলপথটি সেই কবে বন্ধ করে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। অগত্যা গাড়ি নিয়েই যেতে হলো।
জেলা শহর থেকে মনতলা এক ঘণ্টার পথ। দুপুর বারোটা নাগাদ পৌঁছে গেল। স্টেশনটি আগের মতো নেই। যাত্রী বিশ্রামাগার এবং টিকিট কাউন্টারের লাল দালানটিতে শ্যাওলা ধরেছে, প্লাটফর্মের ইটগুলোতে ঘাস গজিয়েছে। এখানে-ওখানে গোবর, নাদি। রেললাইনগুলোও জংয়ে ধরে লাল, কাঠের সিøপারগুলো চুরি হয়ে গেছে, যেগুলো আছে পচে গলে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। লোহার সাইনবোর্ডটির ‘মনতলা স্টেশন’ লেখাটি মুছে গেছে। বাংলা সিনেমা এবং বার্ষিক ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিলের কয়েকটি পোস্টার সাঁটা সেখানে। চারদিকে কেমন ভুতুড়ে শূন্যতা। স্টেশনের পেছনে শুকিয়ে যাওয়া খালটার ওপারে মনতলা বাজার। সারাক্ষণ সরগরম। কিন্তু স্টেশনের দিকে লোকজন আসে না তেমন।
সন্ন্যাসীর দিঘি যাওয়ার একটা কাঁচা রাস্তা আছে স্টেশনের উত্তরে। কাঁচা হলেও গাড়ি চলাচলের মতো। কিন্তু গাড়ি নিল না রিয়াজ। প্লাটফর্মের কাছে পার্ক করে রেখে ড্রাইভারকে নিয়ে মাঠে নামল। নাড়া মাড়িয়ে, মাটির ছোট ছোট চাঙড় গুঁড়িয়ে দুজন সন্ন্যাসীর দিঘির উদ্দেশে হাঁটে। ড্রাইভার তো মহাবিরক্ত। হবে না? মাথার ওপর চৈত্রের গনগনে সূর্য, ঘামে শার্ট-প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে। কে জানত তার স্যার এমন কা- করবে। জানলে একটা ছাতা সে অবশ্যই নিয়ে আসতো। সারাক্ষণ গাড়ির এসিতে থাকা মানুষের কি এমন কড়া রোদ সহ্য হয়?
তারা যখন সন্ন্যাসীর দিঘির পুবপাড়ের মস্ত কাঁঠাল গাছটার তলায় দাঁড়াল, একটা বাজতে তখন দশ মিনিট বাকি। রিয়াজের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে দরদর, তবে চোখেমুখে মুগ্ধতা। দিঘি এত বড় হতে পারে তার জানা ছিল না। কখনও দেখেনি। দৈর্ঘ্য-েপ্রস্তে প্রায় দেড় মাইল তো হবেই। চারদিকটা চক্কর দিতে গেলে এক ঘণ্টায় কুলোবে না। উত্তর তীরে ধানের জালাভিটা। দুই কৃষক দোলনা সেচনি দিয়ে জালাভিটায় জল সেচছে। উত্তর-পূর্ব কোণে মোল্লাপাড়া, প্রায় চল্লিশ গিরি মুসলমানের বসতি। ঐ কোণায় একটা শানবাঁধানো ঘাট। ঘাটের কাছেই প্রাচীন কালের মসজিদ। গাছগাছালির ফাঁকে গম্বুজগুলো দেখা যাচ্ছে। মসজিদের মাইকটা বেজে উঠল। আজান হাঁকা শুরু করল মুয়াজ্জিন। মুসল্লিরা অজু করতে ঘাটলায় নামছে।
কাঁঠালতলা থেকে হাঁটতে হাঁটতে তারা মসজিদের শানবাঁধানো ঘাটের কাছে এলো। ড্রাইভার নামাজি। ক্বাজা করে না এক ওয়াক্তও। ঘাটলায় নেমে অজু করে মসজিদে ঢুকে গেল সে। ধর্মকর্মে মতি নেই রিয়াজের। দুই ঈদ, শবেবরাত ও শবেকদরের রাত ছাড়া মসজিদে যাওয়া হয়ে ওঠে না। ঘাটলায় নেমে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে উত্তরের পাড় ধরে সে দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণায় গেল। ওদিকে পশ্চিমপাড়া। বৌদ্ধপাড়াও বলে কেউ কেউ। প্রায় কুড়ি গিরি বৌদ্ধের বসতি। গোটা উপজেলায় এছাড়া আর কোনো বৌদ্ধবসতি নেই। দিঘির ঐ কোণায় একটা বৌদ্ধমন্দির। দুই ভিক্ষু স্নানে এসেছে ঘাটে। খালি পা, মু-ানো মাথা, গায়ে গেরুয়া চীবর। তাদের সঙ্গে কথা বলে মন্দিরে ঢুকল সে। পুরনো মন্দির। ভেতরে গৌতম বুদ্ধের একটা পেতলের মূর্তি। বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ারে বসে এক ভিক্ষু হাতপাখার বাতাস করছে। তার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলে মন্দিরটা দেখেটেখে বেরিয়ে এলো রিয়াজ।
দিঘির পাড়ে উঠে দক্ষিণে নজর করে দেখল জমিনের মাঠে গরু-ছাগল চরছে। ছাতা মাথায় কৃষকেরা দূরদূরান্ত থেকে ফিরছে। পশ্চিম পাড় ধরে সে হাঁটা ধরল দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণার দিকে, যেখানে মস্ত একটা শিরীষগাছ। গাছটার তলায় বাবা জল্লাশাহর মাজার। শৈশবে বাবার মুখে কত শুনেছে জল্লাশাহ দরবেশের নাম। বাবা তার ভক্ত ছিল। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে জল্লাশাহর মাজারে ঘুরে যেত। জল্লাশাহ ইন্তেকাল করেছেন বহু বছর আগে, রিয়াজের জন্মেরও আগে। জীবৎকালে সারাক্ষণ ঐ শিরীষতলায় বসে থাকতেন। দূর-দূরান্ত থেকে চাল-ডাল-হাঁস-মুরগি ইত্যাদি হাদিয়া তোহফা নিয়ে ভক্ত-শিষ্যরা আসত। তার ইন্তেকালের পর ভক্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বাড়বে না? এই যে শত বছর ধরে শিরীষগাছটা বেঁচে, এটা কার কেরামতি? সন্ন্যাসীর দিঘির জল যে কখনও শুকায় না, এটাই-বা কার কেরামতি? পূর্ণিমা রাতে দিঘির বিশাল বিশাল মাছেরা যে লাফ-ঝাঁপ মেরে ডাঙায় উঠতে চায়, এটা কার ইশারা? বড় কামেল পীর জল্লাশাহ। তারা ইশারা ছাড়া এই তল্লাটে কিছুই ঘটে না।
শিরীষগাছটার নিচু শাখাগুলো লাল সুতোয় ঢাকা। ভক্ত-শিষ্যরা এলে সুতো বেঁধে যায়। তাদের বিশ্বাস, এই ইচ্ছেপূরণ গাছে সুতো বাঁধলে ইচ্ছে পূরণ হয়। জল্লাশাহর পাকা কবরটা লালসালুতে ঢাকা। সালুর ওপর লম্বা দুটো কাগজের ফুল। মাজারের বারান্দায় পাকা মেঝেতে বসে হাওয়া খাচ্ছে বুড়ো খাদেম। তার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট দিল রিয়াজ। চিকচিক করে উঠল খাদেমের মুখখানা। ইতস্তত বলল, ‘আমাকে নয়, দানবাক্সে ফেলুন।’ রিয়াজ বলল, ‘এটা আপনি রাখুন। দানবাক্সে আমি দিচ্ছি।’
ততক্ষণে নামাজ শেষ করে মাজারের শিরীষতলায় পৌঁছেছে ড্রাইভার। তাকে নিয়ে দিঘির দক্ষিণে ঘোষপাড়ার দিকে হাঁটা ধরল রিয়াজ। ঘোষপাড়া, কিন্তু বাস জেলে-মালোদের। প্রায় পঁচিশ গিরি হিন্দু জেলে-মালো, মাছ ধরাই যাদের পেশা। পাড়ার এখানে-ওখানে বড় বড় জাল শুকাতে দেওয়া। পাড়ার পেছনে মা রক্ষা কালীমন্দির। মন্দিরের বাঁয়ে ঘোষপাড়ার শ্মশান। দিঘির দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় স্নানঘাট। স্নান করতে কেউ ঘাটে যাচ্ছে, কেউ স্নান সেরে ফিরছে। একদল ছেলেমেয়ে সাঁতার কাটছে দিঘিতে। ঘাটে তিন মহিলা কাপড় কাঁচছে। গামছা কাঁধে স্নান করতে নেমেছে মাঝবয়সী দুটি লোক। কোমরজলে দাঁড়িয়ে একটা লোক জলশুদ্ধির মন্ত্র পড়ছে। এক কোষ জল নিয়ে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু, কাবেরী… এই সপ্ত পবিত্র নদীদেবীকে আহ্বান করে জলকে শুদ্ধ করে মাথায় দিয়ে তীর্থস্নানের ফল নিল। তারপর দুই হাত জোড় করে প্রাণের উৎস সূর্যকে প্রণাম করল। লোকটার সূর্যপ্রণামের দৃশ্য দেখার সময় রিয়াজের চোখ গেল উত্তর-পূর্ব কোণায় প্রাচীন মসজিদে গম্বুজের চূড়ায়। একটা লোহার পাত চকচক করছে রোদে।
এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আবার কাঁঠালতলায় ফিরে এলো তারা। কাঁঠাল গাছটার উত্তরে মুসলমানদের গোরস্তান। খাঁ-খাঁ শূন্যতা। একটা গুইসাপ দিঘি থেকে উঠে গোরস্তানের বাঁশঝাড়ে ঢুকছে। ড্রাইভারের চোখ গোরস্তানের দিকে স্থির। গোরস্তান দেখে হয়তো মরহুম বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনের কথা মনে পড়ে গেছে। চোখ দুটো কেমন উদাস।
রিয়াজের সারাশরীর ভিজে গেছে ঘামে। কাঁঠালতলায় একটা বাঁশের মাচায় বসে বাবার কথা ভাবছে সে। বাবার সেই কথাটা কানে ভাসছে, ‘ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ এত বছর পরেও বুঝে উঠতে পারছে না বাবা কেন দিঘিটা দেখিয়ে এই কথাটি বলতো।
কাটা ধানের মাঠ ধরে আবার তারা স্টেশনে পৌঁছল। মনতলা স্টেশন থেকে রিয়াজের গ্রামের বাড়ির দূরত্ব প্রায় আট মাইল। রাস্তা পাকা হয়েছে এখন, পৌঁছতে কুড়ি মিনিটের বেশি লাগবে না। চাচাকে ফোন করে বলেছে বাড়ি যাবে। বারবার ফোন দিচ্ছে চাচা। ভাতিজার জন্য বাজার থেকে গরুর মাংস নিয়েছে, ঘরের পালা মোরগ জবাই দিয়ে রোস্ট করেছে, পুকুরে জাল মেরে তেলাপিয়া মাছ তুলেছে। বারোটায় রান্নাবাড়া শেষ করে তার অপেক্ষায় বসে আছে চাচি।
খাওয়া-দাওয়া সারতে সারতে প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেল। রিয়াজ চেয়েছিল আজই ঢাকায় ফিরে যাবে। গ্রামকে সে ভালোবাসে, কিন্তু গ্রামে এসে থাকতে পারে না। সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়তে হয় টয়লেট নিয়ে। গ্রামের টয়লেটে তার পোষায় না। মনে হয় সাতবার গোসল করলেও শরীরটা পবিত্র হবে না। একবার রাজশাহীতে এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে এক রাত ছিল। রাতে পায়খানার বেগ পেলে লেট্টিনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বেগটা হাওয়া! চাচা বলল, ঘরের পেছনে বাথরুম আছে, গত বছর টাইল্স বসিয়েছি, তোর কোনো অসুবিধা হবে না, একটা রাত থেকে যা বাবা।
থেকে গেল রিয়াজ। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চাচা-চাচি আর চাচাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে গল্প করে ঘুমাতে গেল। বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে সেগুন কাঠের আলমিরাটা দেখে শৈশবটা হানা দিল অতর্কিতে। তার বাবার স্মৃতিধন্য আলমিরা। বাবা তার বইপুস্তকগুলো এটাতে রাখত। মা চাইত সংসারের টুকিটাকি জিনিসপত্র রাখতে, বাবা দিত না। বলতো, এটা বই রাখার জন্য বানিয়েছি, বই ছাড়া আর কিছু রাখা যাবে না।
আলমিরাটার উপরের তাকে কয়েকটা বই এখনও আছে। কাচের দরজাটা খুলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতবর্ষ’ বইখানা হাতে নিল রিয়াজ। ধুলো-ময়লা ঝেড়ে চুমু খেয়ে কপালে ঠেকাল। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়তে লাগল বেদনার অশ্রু। বইটাতে লেগে আছে বাবার হাতের পরশ। যেন সে বাবাকে স্পর্শ করছে। বাবার ঘ্রাণ ঝাপটা দিচ্ছে নাকে। বইটা বুকে চেপে ধরে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে দ্বিতীয়বার বাবা-মায়ের কবর জেয়ারত করল। চাচি তার জন্য পাকন, পাটিসাপটা আর নারকেলি পিঠা বানিয়েছে। কতদিন খায় না এসব পিঠা! পালা-পার্বনে রাত জেগে তার মা এসব পিঠা বানাতো। যেন মায়ের হাতের ছোঁয়া লেগে আছে পিঠাগুলাতে। সে চোখ মুছতে মুছতে খায়। তার কাঁন্না দেখে তার চাচা কাঁদে, চাচিও কাঁদে। বিদায়ের সময় চাচাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল রিয়াজ। বয়স হয়েছে চাচার, কদিন বাঁচবে ঠিক নেই। আর কি কখনও দেখা হবে? চাচিকে কদমবুচি করল। চাচি তার মাথায় মায়ার হাত বুলিয়ে দিল। তারপর গাড়িতে উঠে বসল সে। গাড়িটা যখন রাস্তার বাঁকে পৌঁছল, পেছনে তাকিয়ে দেখল তখনও হাত নাড়ছে তার চাচা-চাচি। বুকটা হু-হু করে উঠল তার। মনতলা বাজার পৌঁছা পর্যন্ত অশ্রু থামল না।
ছুটির দিন। মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা কম। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে ঝড়ের বেগ তুলল ড্রাইভার। সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল রিয়াজ। প্রায় আধাঘণ্টা ঘুমাল। আরও ঘুমাত, যদি না ড্রাইবার ডাকত। পেট্রল পাম্প থেকে তেল নিতে হবে, টাকা দরকার।
পেট্রল পাম্প থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটতে শুরু করল আবার। রিয়াজের চোখে ভাসছে সন্ন্যাসীর দিঘির দৃশ্যাবলি। মসজিদের ঘাটলায় মুসল্লিদের অজু, জালাভিটায় দুই কৃষকের জল সেচা, বৌদ্ধবিহার, গেরুয়া চীবরের ভিক্ষু, বাবা জল্লাশাহর মাজার, বুড়ো খাদেম, ঘোষপাড়া, শুকোতে দেওয়া জাল, মন্দির, শ্মশান, দিঘির ঘাটে ছেলে-মেয়েদের ডুবসাঁতার, কোমরজলে দাঁড়িয়ে লোকটার সূর্যপ্রণাম।
এই দৃশ্যাবলির ফাঁকে ফাঁকে ভেসে ওঠে বাবার মুখখানা, তার উত্তোলিত আঙুলখানা। অঙুলি নির্দেশ করে বাবা বলছে, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ কেন বলতো বাবা কথাটা? সত্যি সত্যি বলতো, না-কি তার সঙ্গে দুষ্টুমি করতো? এতটা বছর কেটে গেল, এত বড় হলো রিয়াজ, অথচ বাবার কথাটি এখনও বুঝতে পারল না। কে জানে কী রহস্য লুকিয়ে কথাটায়।
পাশের সিটে রাখা ‘ভারতবর্ষ’ বইটি হাতে নিল রিয়াজ। বাবার স্মৃতিধন্য বইটি সে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে। যতœ করে রাখবে। কালি-ময়লায় বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। একটা টিস্যু দিয়ে বইটা আরেক দফা মুছে পাতা উল্টাল। কয়েক পাতা পড়ে আবার পাতা উল্টালে ‘বিজয়া-সম্মিলন’ প্রবন্ধটির একটা জায়গায় চোখ আটকে গেল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘চিত্তকে প্রসারিত করো। যে চাষি চাষ করিয়া এতক্ষণ ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেনুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতক্ষণ ফিরাইয়া আনিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নামাজ পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো। আজ সায়াহ্নে গঙ্গার শাখা-প্রশাখা বাহিয়া ব্রহ্মপুত্রের কূল-উপকূল দিয়া একবার বাংলাদেশের পূর্বে পশ্চিমে আপন অন্তরের আলিঙ্গন বিস্তার করিয়া দাও…।’
লেখাটা পড়া শেষ করে বাইরে তাকাল রিয়াজ। রৌদ্রতাপে পুড়ছে প্রকৃতি। গাড়ি ছুটছে শাঁই শাঁই। দৃশ্যের পর দৃশ্য মুছে যাচ্ছে। তার চোখে-মুখে বিচলিত ভাব জেগে উঠল হঠাৎ। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে উঠতে লাগল। বাবার সেই কথাটির অর্থ সে খুঁজে পেয়েছে। চোখের সামনে আবার ভেসে উঠছে সন্ন্যাসীর দিঘির চারপাশের সেই দৃশ্যাবলি। কল্পচোখে সে দেখতে পায়, তর্জনীর ঈশারায় তার বাবা তাকে বলছে, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*