বিভাগ: সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ

Uttoron Cover Aprl18 copyআর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ একটা নতুন পর্যায়ে উন্নীত হলো। আমাদের জাতির কপালে যে দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত চিহ্ন আঁকা ছিল সেটি এখন প্রায় মুছে গেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তকমাটা ছিঁড়ে বাংলাদেশ এখন ‘উন্নয়নশীল’ দেশের স্তরে উন্নীত হয়েছে। ৪৮তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতিসংঘের এই স্বীকৃতি আমাদের আনন্দ-গৌরবকে নতুন ব্যঞ্জনা দান করেছে। এই ঐতিহাসিক অনন্য অর্জনের জন্য উত্তরণ দেশবাসীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমরা একইসঙ্গে অভিনন্দন জানাই বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে, যাঁর ডায়নামিক নেতৃত্বে বাঙালি জাতি দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ সোপানে পা রাখতে সক্ষম হলো।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সাফল্যকে উৎসব-মুখরতায় উদযাপন করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জনকে বর্ণাঢ্য উৎসবে পরিণত করেছে। তবে কেউ কেউ, কোনো কোনো দল, এই আনন্দ-গৌরবে অংশগ্রহণ না করে সরকার ও আওয়ামী লীগকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছে। তারা মনে করেন, এত আদিখ্যেতার দরকার কী? অন্য দেশ তো এমন উৎসব ও হৈচৈ করছে না।
বলাবাহুল্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষ দল বা সরকারের ভালো কাজের বা সাফল্যের প্রশংসা করার কোনো নজির নেই। উল্টো বরং ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ ধরনের মনোভাবের কারণে সরকারের সাফল্যকেও ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস লক্ষ্যণীয়।
উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার বিষয়টিকে আমরা যে এত বড় করে দেখছি, তার পেছনে রয়েছে এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পান। ধ্বংস, রক্ত, সম্পদহীনতা এবং বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দেশের পুনর্গঠনকে দুরূহ করে তোলে। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু দেশকে যুদ্ধের পূর্বাবস্থায় এনে উন্নয়নের সড়কে টেনে তোলার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের সাড়ে তিন বছরে আমাদের জিডিপি-র হার ৭ শতাংশের উপরে উঠে যায়। তা সত্ত্বেও ১৯৭৪ সালের মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। বন্যাজনিত কারণে ফসলহানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য কূটনীতি এই দুর্ভিক্ষকে অনিবার্য করে তোলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় পাটের বস্তা রপ্তানির ‘অপরাধে’ বাংলাদেশকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে প্রদেয় খাদ্য না দিয়ে এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি এবং হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এতদসত্ত্বেও ১৯৭৪-এর শেষ দিকে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।
বাংলাদেশের তৎকালীন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুঁড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিসিঞ্জারের ধারণা ছিল বাংলাদেশ একটি অকার্যকর দেশ। একই কথার প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই তৎকালীন বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ দুই কর্মকর্তার গবেষণা-মন্তব্য থেকে। জাস্ট ফা’ল্যান্ড এবং পার্কিনসন্স বলেছিলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন একটা টেস্ট কেস। তাদের ধারণা ছিল বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব হলে, পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের উন্নয়নও সম্ভব হবে। এ কথার নির্গলিতার্থ হলো বাংলাদেশের উন্নয়নের আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই।
ঔপনিবেশিক আমল থেকে পরনির্ভরশীল, পশ্চাৎপদ এবং দারিদ্র্যলাঞ্ছিত বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে উন্নয়নের পথে পা বাড়ায়। আমাদের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশের উন্নয়ন-দর্শন ও স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ভিক্ষুকের জাতির কোনো সম্মান থাকে না।’ তাই বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ই দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প উপস্থাপন করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকল্পেরও সমাধি ঘটে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার ২১ বছরের দুঃশাসন বাংলাদেশকে দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে রাখে। আমাদের জাতীয় জীবন থেকে ২১ + ৭ = ২৮টি (১৯৭৫-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৮) বছর অপচয় হয়ে যায়। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তকমা এঁটে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়েই বিশ্বে মিসকিনের জাতি হিসেবে পরিচিতি অর্জন করি।
কিন্তু ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর এবং ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ দারিদ্র্যের ফাঁদ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে।
১৬ কোটি মানুষের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের একটা নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় গড়ে উঠেছে। মানবসম্পদের বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৭০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি প্রভৃতি সূচক এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ফলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের বৃত্ত ভেঙে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
এই অর্জনই বিশ্বে আমাদের নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। আর সে কারণেই আমাদের গৌরব ও আনন্দটা একটু বেশি। দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে আমরা যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, সেটি প্রমাণিত হওয়ায় আমাদের উৎসব পালন অত্যন্ত স্বাভাবিক। অন্যদিকে যারা দেশকে দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে আটকে রাখতে চায়, যারা পরনির্ভরশীলতার দর্শনে ও রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তারা বাঙালি জাতির এই সাফল্যে বেজার হবেনÑ এটাও স্বাভাবিক। তবে দেশবাসী এতে বিভ্রান্ত হবে না; বরং উন্নয়নবিরোধী ঐসব অপশক্তিকেই ধিক্কার জানাবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*