বিভাগ: আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশের দুই বন্ধু পরলোকে

সাইদ আহমেদ বাবু:

uttaঅটল বিহারী বাজপেয়ী
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারতসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। গত ১৬ আগস্ট বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে মৃত্যু হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতরতœ অটল বিহারী বাজপেয়ীর। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। ১৭ আগস্ট দিল্লির স্মৃতিস্থল শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। চোখের পানিতে অটলজিকে বিদায় জানায় লাখ লাখ মানুষ।
প্রায় চার দশকের এই সংসদ সদস্য ছিলেন ভারতের প্রথম অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী যিনি পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। প্রথম দফায় ১৩ দিন, দ্বিতীয় দফায় ১৩ মাস ও পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুরো মেয়াদ úূর্ণ করেন। প-িত জওহরলাল নেহ্রুর পর তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি পরপর দুবারের জন্য জনাদেশ পেয়ে এই পদে আসীন হন। বাজপেয়ী লোকসভায় ৯ বার নির্বাচিত হন এবং রাজ্যসভায় দুবার নির্বাচিত হন। তার ভাষণ এতটাই জোরদার ছিল, যা প্রভাবিত করেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহ্রুকেও।
আর্য সমাজের যুব শাখা আর্য কুমার সভা থেকে সমাজসেবায় অংশ নেওয়া শুরু বাজপেয়ীর। ১৯৪৪ সালে তিনি আর্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসবের মাঝে ১৯৩৯ সালে আরএসএসে যোগ দেন তিনি। ১৯৪৭ সালে পূর্ণ সময়ের আরএসএস কর্মী হন বাজপেয়ী। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন তথা রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় বাজপেয়ীর। সেই সময়ে ২৩ দিন গ্রেফতার করে রাখা হয়েছিল বাজপেয়ী ও তার দাদা প্রেমকে। পরে মুচলেখা শর্তে ছাড়া পান। ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮। নাথুরাম গডসের হাতে গান্ধীর হত্যার পর দেশজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয় আরএসএস-কে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনসংঘে যোগ দেন বাজপেয়ী। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর জনসংঘের দায়িত্ব নেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু লালকৃষ্ণ আদভানি।
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়ে গ্রেফতার হন বাজপেয়ী। ১৯৭৭ সালে ছাড়া পাওয়ার পরে জয়প্রকাশ নারায়ণের আহ্বানে কংগ্রেসবিরোধী জোট, যা জনতা পার্টি নামে পরিচিত ছিল, তাতে জনসংঘ নিয়ে বাজপেয়ী যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে জিতে জনতা পার্টি জোটের সরকার হলে প্রধানমন্ত্রী হন মোরারজি দেশাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচিত হন অটল বিহারী বাজপেয়ী। প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে হিন্দিতে ভাষণ দেন তিনি। ১৯৭৯ সালে জনতা পার্টির সরকার পড়ে গেলেও ততদিনে বাজপেয়ী নিজেকে জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন।
১৯৮০ সালে আরএসএস’র প্রচারক বাজপেয়ী দীর্ঘদিনের বন্ধু লালকৃষ্ণ আদভানি, ভৈরো সিং শেখাওয়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি তৈরি করেন। তিনি হন বিজেপির প্রথম সভাপতি।
১৯৮৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজেপি মাত্র দুটি লোকসভা আসনে জয়ী হন। তবুও সংসদে কংগ্রেসের বিরোধী নেতা বলতে সবার আগে বাজপেয়ীর নাম লোকের মুখে মুখে ঘুরত। ধীরে ধীরে অযোধ্যা ও রাম জন্মভূমি ইস্যুকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিকভাবে সারাদেশে বিজেপি ছড়িয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে জয়ের পরে বিজেপি অনেক শক্তিশালী হয়ে যায়।
১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল। দুই পরমাণু অস্ত্রধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ আরও ভয়ঙ্কর হতে পারত। হয়নি। কারণ পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে বোমা হামলার অনুমতি দেননি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী।
১৯৯৯ সালে পুনরায় লোকসভা নির্বাচন হয়। কারগিল যুদ্ধ ও পোখরানে পরমাণু নিরীক্ষণের পরের এই ভোটে বিজেপি ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৩০৩টি আসনে জেতে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে বাজপেয়ী তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সময়কাল সরকার চালানো হয়। আটের দশকে তার দুই সাংসদের দল আজ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দিল্লির মসনদে। গোটা ভারতের ২১টি রাজ্যের ক্ষমতায় বিজেপি। এমন দিনের ভবিষ্যদ্বাণী সেই কবে করে গিয়েছেন বাজপেয়ী। বলেছিলেন, ‘অন্ধেরা ছাটেগা, কমল খিলেগা।’
অটল বিহারী বাজপেয়ী, জাতীয় রাজনীতির আঙিনার সর্বাপেক্ষা শালীন, শিষ্টাচারে বিশ্বাসী, প্রজ্ঞাবান, সুবক্তার নাম। বাজপেয়ীজির উদারতা, বহুত্ববাদী মানসিকতা, কবিত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক বোধ, সাংগঠনিক দাপট এ মুহূর্তে প্রায় কিংবদন্তি।
আরএসএসের বীজমন্ত্রই সারাজীবন জপে এসেছেন বাজপেয়ী। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই হিন্দুবাদী রাষ্ট্রদর্শনকেই সার্বজনীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, নিজের ইমেজকে এতটুকুও কালিমালিপ্ত না করে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের জন্য তিনি আজীবন অবিবাহিত থাকা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কানপুরে পড়াশোনা করেছিলেন মি. বাজপেয়ী। তারপরে আইন পড়েছেন।
গুজরাট গণহত্যার পর গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রাজধর্ম পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। বলেছিলেন ভারত যদি ধর্মনিরপেক্ষ না হয়, তাহলে ভারত ভারতই নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এ উক্তি স্মরণীয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। উন্মত্ত সংঘ সেবকদের হাতে ধ্বংস হয়ে গেল বাবরি মসজিদ। দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেলে দাঙ্গা। প্রাণ গেল অসংখ্য নিরীহ মানুষের। বাবরি মসজিদের ধ্বংস করার সেদিনের কা- কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। সেই ঘটনার জন্য গোটা দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি। দশকের পর দশক ধরে তিনি বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন এক নেতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন, তার উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপসে যে তিনি রাজি নন, এই বার্তা ছড়িয়ে যায় গোটা দেশে।
২০১৫ সালে ভারত সরকার অটল বিহারী বাজপেয়ীকে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ সম্মান ভারতরতœ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৯২ সালে তিনি পদ্মবিভূষণ পান। এছাড়া ১৯৯৪ সালে লোকমান্য তিলক পুরস্কার, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কারের মতো বহু দেশি-বিদেশি সম্মাননা তিনি পেয়েছেন।
বাজপেয়ী বরাবরই এক অজাতশত্রু, ঘোর রাজনৈতিক বৈরিতা ছিল যে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে, ’৭১-এর যুদ্ধে ভারতের অভূতপূর্ব বিজয়ের পর সেই ইন্দিরাকেই সংসদে দাঁড়িয়ে ‘মা দুর্গা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরে ভারতীয় পার্লামেন্টে তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে অটল বিহারী বাজপেয়ী বলেছিলেন, দেরিতে হলেও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমাদের সামনে ইতিহাস বদলের প্রক্রিয়া চলছে। নিয়তি এই সংসদ এবং দেশকে এমন মহান কাজে রেখেছে, যেখানে আমরা শুধু মুক্তিসংগ্রামে জীবন দিচ্ছি না; বরং ইতিহাসকে একটি পরিণতির দিকে নিতে চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে নিজেদের সংগ্রামের জন্য লড়াই করা মানুষ এবং আমাদের রক্ত একসঙ্গে বইছে। এই রক্ত এমন সম্পর্ক তৈরি করবে, যা কোনোভাবে ভাঙবে না। কোনো ধরনের কূটনীতির শিকার হবে না। বিরোধী দলনেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সম্পৃক্ততাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন এ মানুষটি।
জনজীবনে শ্রী বাজপেয়ীর উত্থান, একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের মহিমাতেই তা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাকে বাংলাদেশের একজন মহান বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কফি আনান
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান আর নেই। ৮০ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এই নোবেলজয়ী। অল্প কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে সুইজারল্যান্ডে ছিলেন তিনি। কফি আনান ছিলেন সারাবিশ্বের। জীবনভর তিনি শান্তির জন্য কাজ করে গেছেন।
১৯৩৮ সালের এপ্রিলে ঘানার কুমাসির এক অভিজাত পরিবারে জন্ম কফি আনানের। বাবা ছিলেন প্রাদেশিক গভর্নর। এক যমজ বোনও ছিল তার। প্রথমে মিনেসোটার কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা। পরে জেনেভায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়েন। তারও পরে ম্যাসাচুসেটসের ম্যানেজমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা। ফরাসি, ইংরেজিসহ অনেকগুলো ভাষায় দক্ষ ছিলেন আনান। ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জে যোগ দেন তিনি, ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনে। দু-পক্ষের তিন সন্তান রয়েছে আনানের।
কফি আনান জাতিসংঘের সপ্তম মহাসচিব ছিলেন। প্রথম আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ১৯৯৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ওই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কর্মী হিসেবে জাতিসংঘে যোগ দিয়ে তিনিই প্রথম সংস্থাটির শীর্ষ পদে আসীন। অবসরের পর তিনি সিরিয়া বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করেন। তার নেতৃত্বেই আলোচনার মাধ্যমে সিরিয়ায় সাড়ে সাত বছরের গৃহযুদ্ধের ইতি টানার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়পরায়ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় জীবনভর সংগ্রাম করেছেন তিনি। যেখানেই দুর্ভোগ বা মানবিক আর্তি সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। গভীর সমবেদনা ও সমানুভূতিতে হৃদয় ছুঁয়েছেন বহু মানুষের। নিজের বদলে অন্যদের কথাই আগে ভেবেছেন তিনি, যা করেছেন তার সবকিছুই দ্যুতি ছড়িয়েছে সত্যিকারের মমতা, আন্তরিকতা আর মেধার।
বিশ্ব সংস্থাটির সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ও মানবাধিকার ইস্যুগুলো অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ২০০১ সালে আনান ও জাতিসংঘকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কারজয়ী কফি আনান মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিয়েও কাজ করছিলেন।
অনেকভাবেই কফি আনান ছিলেন জাতিসংঘ। বিভিন্ন পদমর্যাদার মধ্যদিয়ে তিনি সংস্থাটির নেতৃত্ব পর্যায়ে এসে নতুন সহস্রাব্দে তুলনাবিহীন সম্মান ও দৃঢ়তার সঙ্গে এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেনÑ এক বিবৃতিতে বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাত অবসানে কয়েক দশক ধরে প্রচেষ্টা চালানোর পর তার জীবনাবসান হলো। রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতিকে ‘মানবাধিকার সংকট’ বলল কফি আনান কমিশন। ২০০৭ সালে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক নেতাদের গ্রুপ দ্য এলডারস’র প্রতিষ্ঠা হলে এর সদস্য হন কফি আনান। ২০১৩ সালে ওই গ্রুপের চেয়ারম্যান হন তিনি।
ইরাকে মার্কিন অভিযানের সময় বিপক্ষে অবস্থান নেয় সংস্থাটি। ওই অভিযানকে ‘অবৈধ’ অভিযান বলে বর্ণনা করেছিলেন মি. আনান।
কফি আনানের ভাষায় তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ‘সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ নির্ধারণÑ দারিদ্র্য আর শিশুমৃত্যু কমাতে বিশ্বব্যাপী প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি ছিলেন বৈশ্বিক কূটনীতিক ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। সমসাময়িক বিশ্বের উজ্জ্বল এই নক্ষত্রের বিদায়ে শোক জানিয়েছেন জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, মানবাধিকার কমিশনার জায়েদ রা’দ আল হোসেনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ।
নোবেল জয়ের বছরে বাংলাদেশে এসেছিলেন, এবার রোহিঙ্গাদের দেখার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, কিন্তু… ইরাকযুদ্ধের শুরু থেকেই কফি আনান নামটি খ্যাতি পায় বিশ্বজুড়ে। যুদ্ধ বন্ধে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে দৌড়ঝাঁপসহ নানা পদক্ষেপ ছিল তার। তখন তিনি জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী।
নোবেল জয়ের বছরেই তিনি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। জাতিসংঘের কোনো প্রধান নির্বাহীর এটি ছিল তৃতীয় বাংলাদেশ সফর। কফি আনানের সফরের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আরও দুজন মহাসচিব বান কি মুন (২০০৮ ও ২০১১) এবং বর্তমান মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সফর করেছেন।
২০১৬ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের বর্বরতার মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশে তাদের প্রবেশে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছিলেন কফি আনান। তিনি অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ এবং রাখাইন রাজ্যের উপদ্রুত এলাকাগুলোতে জাতিসংঘ, মানবিক সহায়তা সংস্থা এবং গণমাধ্যমের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নিউইয়র্কে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বৈঠক করেন কফি আনানের সঙ্গে। সেখানে ২০১৬ সাল থেকে রাখাইনে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মানবিক ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রশংসা করেন ড. আনান।
৮০ বছরে জীবনাবসানে কফি আনান যে পৃথিবী হতে বিদায় নিলেন, সেই পৃথিবীতে এই গণতান্ত্রিক রীতি, সম্মেলক কাজ করার দৃষ্টান্ত, শান্তভাবে অন্যপক্ষের যুক্তি শুনবার বহু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও সমষ্টিগত অপারগতা সত্ত্বেও, বিশ্বময় সম্মেলক সক্রিয়তার লক্ষ্যটি যে অনর্থক নয়, সেই বিশ্বাস তিনি আবারও ফিরিয়ে আনলেন। এই ‘অসম্ভব’কে সম্ভব করার জন্য দরকার ছিল যথার্থ নেতৃত্বগুণ। আনানের মধ্যে তা ছিল। ২০১৩ সালে কফি আনান ‘দ্য এলডার্স’-এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এ সংগঠনটি বিশ্বের প্রবীণ রাজনীতিকদের একটি সংগঠন, যারা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। ২০০৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*