বিভাগ: সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য এবং ভূ-রাজনৈতিক রণকৌশল

PMবাংলাদেশের নৌবাহিনীতে ‘জয়যাত্রা’ ও ‘নবযাত্রা’ নামে দুটি ডুবোজাহাজ বা সাবমেরিন যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে সাবমেরিনের মালিক ৪১টি দেশের অন্যতম। এর ফলে সামুদ্রিক জলসীমার প্রতিরক্ষায় আমাদের সামর্থ্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশের রণকৌশলগত অবস্থান নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
সত্য বটে, ভৌগোলিক বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে খুব ছোট একটি দেশ। কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রথম ১০টি দেশের অন্যতম। দ্বিতীয়ত; এটা কেবল সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ক্ষুদ্র তবে তার অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিগত এবং সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা বর্তমান বিশ্ব সভ্যতার দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। তৃতীয়ত; বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্বের প্রধান প্রধান সামরিক শক্তিধর দেশগুলো, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থের সাথে জড়িত। ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের একটি মাত্র দিক উন্মুক্তÑ দক্ষিণ দিক। দক্ষিণে, আমাদের সমুদ্রসীমার বাইরে ভারত মহাসাগরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে যে অকথিত প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাতে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর।
ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। তেমনি চীনের সাথে আমাদের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক সর্বোপরি দক্ষিণে সমুদ্র পৌঁছানোর লক্ষ্যে চীনের কুনমিং থেকে সড়ক ও রেলপথে চট্টগ্রাম বন্দর তথা বাংলাদেশের সংযুক্তির যে বহুজাতিক প্রচেষ্টা এবং সম্ভাবনা রয়েছে, তার গুরুত্বও অপরিসীম। এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কে ইরান, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের প্রস্তাবিত সংযুক্তি যেমন অর্থনৈতিক বিবেচনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করবে, তেমনি কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানি চীনের অর্থনীতির জন্য সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের ব্যাপারে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ইতোমধ্যেই উপ-আঞ্চলিক সমঝোতা রয়েছে।
বিকাশশীল দেশ হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতি এবং মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা এখন আর কল্পনা বা অনুমানের বিষয় নয়। মিয়ানমার ও ভারতের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ এক বিশাল সমুদ্র অঞ্চলের মালিকানা লাভ করেছে। এই সমুদ্রে যেমন রয়েছে বিপুল মৎস্যসম্পদ তেমনি সমুদ্রের তলদেশে অনাবিষ্কৃত বিপুল খনিজসম্পদ। এই সমুদ্রসম্পদের সংরক্ষণ এবং এর অর্থনৈতিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্লু-ইকোনমি। ব্লু-ইকোনমিÑ বর্তমান শতাব্দীর মধ্যভাগেই বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর সারিতে উঠে আসতে অসামান্য অবদান রাখবে।
উল্লিখিত সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বৃদ্ধি না করতে পারলে, সব সময়ই আমাদের এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
আর এই শান্তিটুকু নিশ্চিত করতে হলেও আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সামর্থ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথাÑ ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ অতএব, আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর এবং বৃহৎ শক্তির বন্ধুত্ব যেমন চাই, তেমনি চাই পরস্পরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব। একটা কথা অত্যন্ত পরিষ্কার, বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তি নয়। কোনো আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারেরও নীতি নেই বাংলাদেশের। বরং আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রেখে সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থে আমরা প্রতিবেশী ভারত, চীন, মিয়ানমার এবং পাশ্চাত্যের যে কোনো দেশের সাথে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। আমরা আমাদের দেশের সীমান্তকে দুর্ভেদ্য শান্তির সীমান্ত হিসেবে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সঙ্গে এটাও নিঃসন্দেহ যে, বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির দাবার ঘুঁটি হবে না এবং তাদের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ পূরণের হাতিয়ারে পরিণত হবে না।
আমাদের দেশের অন্ধ আওয়ামী লীগ-বিরোধী এবং পাকিস্তানের স্বার্থের নিশানবরদার কোনো কোনো শক্তি সরকারের এই প্রতিরক্ষানীতির বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। যখনই বাংলাদেশ সরকার ভারত ও চীনসহ কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, তখনই ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব’ বিপন্ন বলে চেঁচামেচি শুরু করে। এরা বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় বেশি আগ্রহী।
কাউকে আক্রমণ করা বা আধিপত্য স্থাপনের জন্য নয়; বাংলাদেশ তার নিজের ভূখ-, সমুদ্রসীমা এবং আকাশসীমা রক্ষার ন্যায্য অধিকার অবশ্যই সংরক্ষণ করবে। আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি হচ্ছে, যে কোনো মূল্যে আমরা আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমর্থ হতে চাই। আমরা কাউকে আক্রমণ করব না। কিন্তু আমাদের কেউ আক্রমণ করলে তার সমুচিত জবাব যেন আমরা দিতে পারি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে কথাটিই জোর দিয়ে বলেছেন।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*