বিভাগ: ইতিহাস : প্রবন্ধ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল ৬৯ বছর : সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক ইতিহাস

aaরায়হান কবির: (পূর্ব প্রকাশের পর)
* ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দল বিধি জারি করা হয়। প্রচ- ও হিং¯্র দমননীতির শিকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই সীমিত গণতান্ত্রিক সুযোগ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। দল পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ২৫ আগস্ট ঢাকায় দলের সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদসহ নেতৃবৃন্দের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৫ আগস্টের বর্ধিত সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয় দলের পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল সাপেক্ষে ১৯৭৫ সালের ৬ জুন পর্যন্ত যে কার্যনির্বাহী সংসদ ছিল সেটিই সংগঠনের কাজ চালিয়ে যাবে। ১৯৭৪ সালে গঠিত নির্বাহী সংসদের সভাপতি এএইচএম কামারুজ্জামান ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ নিহত হন। সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ তখন কারাবন্দি। এমতাবস্থায় সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
* ১৯৭৭ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে দলীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। কাউন্সিলে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্ভব হয় নি। সিদ্ধান্ত হয় আপাতত পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করে একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হবে। সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১০ দিনের মধ্যে ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়। জোহরা তাজউদ্দিন ১৫ এপ্রিল সাংগঠনিক কমিটির সদস্যগণের নাম ঘোষণা করেন।
* ১৯৭৭ সালের ৩০ মে জিয়া তার ক্ষমতাকে বৈধতার ছাপ মারার জন্য দেশব্যাপী গণভোটের আয়োজন করেন। আওয়ামী লীগ গণভোট বর্জন করে।
* ১৯৭৮ সালের ৩, ৪ ও ৫ এপ্রিল তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। আবদুল মালেক উকিলকে সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
* ১৯৭৮ সালের ২৩ নভেম্বর হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান করতে ভূমিকা রাখে ওই কাউন্সিল।
* ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই কাউন্সিলে দলে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ এবং দলকে অধিকতর শক্তিশালী ও সংহত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত হন। এই কাউন্সিলেই প্রথম গঠনতন্ত্র সংশোধন করে সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক ‘সভাপতিম-লী’ গঠিত হয়।
* ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
* ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে জিয়া নিহত। ১৫ নভেম্বর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার ব্যাপক জনসংযোগ।
* ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল।
* ১৯৮৩ সালের ১১ জানুয়ারি কুখ্যাত রাজাকার আবদুল মান্নান আহূত ‘জমিয়াতুল মোদাররেসিন’ নামক মাদ্রাসা শিক্ষকদের এক সমাবেশে জেনারেল এরশাদ ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও শহীদ মিনার সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ কটূক্তি করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জানুয়ারি ১৫টি রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১৫ দলীয় ঐক্য জোট।
* ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে মৌন মিছিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, মোজাম্মেল ও দীপালি সাহা প্রমুখ পাঁচ ছাত্র নিহত হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ১৫ দলের নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে যান। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে হরতাল পালিত হয়।
* ১৫ ফেব্রুয়ারি ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে বৈঠকরত অবস্থায় সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা, আবদুস সামাদ আজাদ, আবদুল মান্নান, ড. কামাল হোসেন, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিল, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমেদ, মো. রহমত আলী, ডা. এসএ মালেক, গোলাম আকবর চৌধুরী, সাহারা খাতুন, অধ্যাপক মানিক গোমেজ, সিপিবি-র মোহাম্মদ ফরহাদ, মঞ্জুরুল আহসান খান, একতা পার্টির সৈয়দ আলতাফ হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়–য়া ও বাসদের খালেকুজ্জামান প্রমুখ ১৫ দলের নেতাদের গ্রেফতার করে। ওই দিন সন্ধ্যা থেকে সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হয়।
সারাদেশে সৃষ্ট উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই ঐক্যবদ্ধভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালিত হয়। ১৫ দলের উদ্যোগে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিটি সর্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়। জনমতের চাপে অবশেষে ১ মার্চ ১৯৮৩ শেখ হাসিনাসহ গ্রেফতারকৃত ২৭ নেতা মুক্তি লাভ করেন।
* ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দেওয়া হয় এবং ১৪ নভেম্বর দেশে প্রকাশ্য রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। ১৯৮৩ সাল থেকেই সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনকে অভিন্ন লক্ষ্যে এবং অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ধারায় সংগঠিত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সাতদলীয় জোট দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর একটি অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর উভয় জোটের সর্বসম্মত ৫-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
* ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র মিছিলের ওপর ট্রাক চালিয়ে হত্যা করা হয় সেলিম-দেলোয়ার নামে দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে। ১ মার্চ আদমজীতে শ্রমিক নেতা তাজুলকে এবং ২৭ সেপ্টেম্বর হরতালের দিন কালীগঞ্জে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিনকে সরকারি জনদলের গু-াবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়। ১৪ অক্টোবর মানিক মিয়া এভিনিউতে ১৫ দলের উদ্যোগে স্মরণকালের বৃহত্তম মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মহসমাবেশ থেকে ১৫ দল ২১-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
* বিরোধী দলের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে একবার উপজেলা নির্বাচন তারিখ ও সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেও পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন এরশাদ। পরে সামরিক আইনের কড়াকড়ি পুনর্বহাল, রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বন্ধ ঘোষণা এবং রাজনৈতিক নেতাদের আটক রেখে ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ এরশাদ তার ১৮-দফা কর্মসূচির পক্ষে গণভোট অনুষ্ঠান করেন।
* ১৯৮৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ঘরোয়া রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
* ১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ১৫ দল ও সাত দলের মধ্যে ঐকমত্য হয়। সিদ্ধান্ত হয় সামরিক শাসন অবসানের মূল লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্য সামনে রেখে দুই জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। ১৫ দল ১৮০টি আসনে এবং সাত দল ১২০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জাতীয় পার্টিকে মোকাবিলা করবে বলে ঐকমত্য হয়। কিন্তু হঠাৎই রহস্যজনক কারণে সাত দল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। ১৫ দলের অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল, সাম্যবাদী দলও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার কথা ঘোষণা করে। ১৫ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*