বিভাগ: ক্রীড়া

বাকী ও শাকিল উড়াল লাল-সবুজের পতাকা

5-7-2018 7-06-57 PMআরিফ সোহেল : ১. দলীয় ইভেন্টে নয়; বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে একক ইভেন্টে। বারবার এই চিরায়ত সত্যটি উচ্চারিত হয়েছে।
২. অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড; নিদেনপক্ষে ভারতের মতো দেশ ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে যেভাবে চিন্তা করেÑ সেখানে ব্যক্তিগত ইভেন্টই হতে পারে বাংলাদেশের স্বীকৃতি অর্জনের উৎস্যমূল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা প্রমাণিত হচ্ছেÑ হয়েছে বারবার। সর্বশেষে কমনওয়েলথ গেমসেও এই সত্য প্রমাণিত করেছেন শুটার বাকী ও শাকিল। কিন্তু তারপরও একক ইভেন্টে টেকসই প্রয়োগ ও কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে কারোর মাথাব্যথা নেই। বরং ক্রিকেট ফুটবলের মতো দলীয় ইভেন্ট নিয়েই ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো মাতম-উন্মাদনা চলছেÑ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চলবে। ঘুরেফিরে মনে হয়েছে একক নৈপুণ্যের ইভেন্টেই বাংলাদেশের সম্ভাবনার দুয়ার অবারিত। কেউÑ ওই ‘দল দল’ করে মরছেও না। বরং তারা দলের ভেতরে থাকা একক কারিশমাকে যতœসহকারে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সাঁতারু মোশাররফ হোসেন, ব্রজেন দাশ, শুটার আতিক-নিনি, স্প্রিন্টার শাহ আলমের সঙ্গে হালের জুনিয়র দাবাড়– ফাহাদ, ভারোত্তোলনের সীমান্ত এবং বাকী-শাকিলরা একক নৈপুণ্যে বিশ্বকে বিস্মিত করার সুযোগ পেয়েছেনÑ পাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টে বেজে উঠেছে একক কীর্তিগাথার সুললিত সুর। কমনওয়েথল গেমসে গাজীপুরের ছেলে ২৮ বছরের আবদুল্লাহ হেল বাকী এবং খুলনার শাকিল আহমেদ আবারও প্রমাণ করেছেনÑ ক্রিকেট-ফুটবল বাদে বাংলাদেশের অর্জন একক ইভেন্ট থেকেই বেশি। এই সাহসী শুটারদ্বয়ের একজন বাকী কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে; অন্যজন শাকিল ৫০ মিটার পিস্তলে জিতেছেন রৌপ্যপদক। কমনওয়েলথে এটা বাকীর দ্বিতীয় রৌপ্যপদক অর্জনের মাইলফলক হলেও শাকিলের প্রথম। গ্লাসগোতে কমনওয়েলথ গেমসের ২০তম আসরে রৌপ্য জিতেছিলেন বাংলাদেশের সপ্রতিভ মেধাবী শুটার বাকী।
কমনওয়েলথে গল্পের শুরু বাকীকে দিয়ে। চলছে ৮ এপ্রিল ২০১৮ কমওয়েলথের ১০ মিটার রাইলের শিরোপা নির্ধারণী শেষ শটের প্রস্তুতি। উত্তেজনা পারদ তখন আকাশ ছুঁইছুঁই। টপ স্কোরার হওয়ার স্বপ্ন নয়Ñ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আবদুল্লাহ হেল বাকী। স্বর্ণ জিততে শেষ শটে প্রয়োজন ১০.১। আগের শটে ১০.২ স্কোর করা বাকী তখন ইনডোরে বাজির ঘোড়া। স্মিথ হাসিমাখা প্রাণোচ্ছ্বল মুখের বাকী তখন ছুটছিলেন দুর্দান্ত গতিতে। ধ্যান-জ্ঞানে নিমগ্ন বাকী ছুড়লেন গুলি। কিন্তু তাতে স্কোর ৯.৭। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার ড্যান স্যাম্পনের কাছে অল্পের জন্য স্বর্ণ হাতছাড়া হয়েছে বাকীর। সবমিলিয়ে স্যাম্পসনের ২৪৫, আর বাকীর ২৪৪.৭। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে কথা ফ্রেমে ভেসে উঠছিল। এই ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টেই স্বর্ণ জিতেছিলেন তরুণ আসিফ। দেশ পেয়েছিল স্বর্ণখচিত গৌরবময় সম্মাননা। স্মৃতির সুবিস্তীর্ণ আকাশে তখন ভেসে উঠছিল শুটার আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনির মুখও। কারণ ১৯৯০ সালে কমনওয়েলথ গেমসে দেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণ জয় করেছিলেন ওই শুটার জুটিই।
অলিম্পিকের পর কমনওয়েলথ গেমস বিশ্বের অন্যতম ঐহিত্যবাহী আসর। এবার ৭৭টি দেশ অংশ নিচ্ছে আসরে। সেখানে শুটার বাকীর কিংবা শাকিলের দ্বিতীয় হওয়া অহম করার মতো গৌরবের। গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমসের ২১তম আসরে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম পদকও এসেছে আবদুল্লাহ হেল বাকীর রাইফেলের গোলা থেকেই। আর এক পিস্তলে গুলিতে শাকিল উড়িয়েছে জাতীয় পতাকা।
১০ মিটার এয়ার রাইফেলের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে ৬১৬.০ স্কোর করে বাকী ফাইনালে ওঠার পর থেকেই স্পট লাইটে ছিলেন। ২৪ রাউন্ডের খেলায় বেশ কয়েকবার শীর্ষে ছিলেন আবদুল্লাহ হেল বাকী। ১৬তম রাউন্ডে থেকেই শুরু হয় ত্রিমুখী লড়াই। সেখানে শামিল হয়েছেন কখনও অস্ট্রেলিয়ান স্যাম্পসন, কখনও ভারতের রাভি কুমার। শীর্ষ নিয়ে জটিল হাড্ডাাড্ডি হচ্ছিল বাকীর সঙ্গে তাদের। ২১তম রাউন্ড শেষে ২০৪.৬ পয়েন্ট নিয়ে ছিটকে পড়েছেন ভারতের রাভি কুমার। তারপর আরও লড়াই। কিন্তু শেষ লড়াইয়ে হেরে গেলেন বাকী। মিডিয়ার মুখোমুখি বাকী বলেছেনÑ ‘স্বর্ণের একদম কাছে থেকে ফিরে এসেছি, একটা দারুণ সুযোগ ছিল। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। তারপরও আমি সন্তুষ্ট।’ তিনি আরও বলেছেনÑ ‘শুরুতে আমি কোনো চাপে ছিলাম না। শেষ শটেও আমার লিড ছিল, ১০.১ করতে পারলেও হয়তো জিতে যেতাম। তবে যা হয়নি, তা নিয়ে আর ভাবছি না।’
২০০৮ সালে ইসলামাবাদ সাফ গেমসে দলগত ইভেন্টে প্রথম অংশ নিয়েই স্বর্ণপদক জিতে বাকী দৃষ্টি কেড়েছিলেন সংগঠকদের। পরের প্রায় ৯ বছর আন্তর্জাতিক আঙিনায় অর্জনের খড়ায় পুড়ে কাঠ হয়েছিলেন বাকী। এই দীর্ঘ সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল বেজায় হতাশা। কিন্তু ভেঙে পড়েন নি। ভেতরের প্রবল ইচ্ছে; অধ্যবসায় ২০১৭ সালে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে আবার জেগে ওঠেন। বাকী-দিশার সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে স্বর্ণ জিতে নিজেকে ফিরে পেয়েছেন। আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের মিশ্র দলগত ইভেন্টে আবদুল্লাহ হেল বাকি ও সৈয়দা আতকিয়া হাসান দিশা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে স্বর্ণ এনে দিয়ে গৌরবান্বিত করেন।
কমনওয়েলথ গেমসে গোল্ডকোস্টের বেলমন্ট শুটিং সেন্টারে বাকীর পর ছেলেদের ৫০ মিটার পিস্তলে বাংলাদেশকে রুপা উপহার দিয়েছেন শুটার শাকিল আহমেদ। এর আগে ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে এই ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছিলেন তিনি। বাকীর হাত ধরে প্রথম স্বর্ণ জয়ের পর বড় মঞ্চে আরেকটি ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শুটার শাকিল।
বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পদক তুলে দেওয়া খুলনার তরুণ শাকিল ফাইনালে ২২০.৫ স্কোর করে রুপা জিতেছেন। ২২৭.২ পয়েন্ট পেয়ে গেমস রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জয় করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ড্যানিয়েল রেফাকোলি। আর এই ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতেছেন ভারতের ওমপ্রকাশ মিথারওয়াল। ওমপ্রকাশের স্কোর ২০১.১। এর আগে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে অংশ নিয়েছিলেন শাকিল। কিন্তু সেখানে খুব বেশি ভালো করতে পারেন নি। ফাইনালে উঠলেও ষষ্ঠ হয়ে প্রতিযোগিতা শেষ করেন।
শাকিল বাছাইয়ে ৫৪৫ স্কোর গড়ে চতুর্থ হয়ে ফাইনালে ওঠেন। পঞ্চম শট পর্যন্ত ৪৫.৯ স্কোর নিয়ে পঞ্চম স্থানে ছিলেন। ১২ শট পর উঠে আসেন তৃতীয় স্থানে। ১৮ শট পরও ১৬৫.৮ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানেই ছিলেন। যদিও স্বর্ণজয়ী রেফাকোলি শাকিলের চেয়ে বরাবরই এগিয়ে ছিলেন। শেষ ২ শটে আগে রেফাকোলির স্কোর ছিল ২০৮.৭, সেখানে শাকিলের ছিল ২০২.২। শেষ শটে স্বর্ণজয়ী রেফাকোলি মেরেছেন ৯.২। আর শাকিল ৮.৭ পয়েন্ট নিয়ে জিতছেন রুপা।
শাকিলকে দিয়েই পিস্তলে নবযুগের সূচনা দেখেছে বাংলাদেশ। রাইফেলের চেয়ে পিস্তলের গুলি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। এ জন্য অতীতে পিস্তলের অনুশীলন হতো কম। সাফল্যও সেভাবে ধরা দেয়নি। কিন্তু এবার ফেডারেশন ও সেনাবাহিনী অনুশীলনে কার্পণ্য করেনি। বাংলাদেশকে ১৯৯০ অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে স্বর্ণ এনে দিয়েছিলেন আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি। এরপর থেকে পিস্তল ইভেন্ট কখনও আলোচনায় ছিল না। শাকিলের হাত ধরে পিস্তলে আন্তর্জাতিক সাফল্য নতুন স্বপ্নদুয়ার উন্মোচিত করছে। কারণ এসএ গেমসেও শাকিল জিতেছিলেন স্বর্ণ। এবার জিতেছেন কমনওয়েলথ গেমসে।
কমনওয়েলথ গেমসে এবারের আসরে বাংলাদেশের ৩০ জন অ্যাথলেট ১০টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছে। তবে পদক জয়ের আশা প্রবল ছিল কেবল শুটিংয়েই। সেই শুটিং থেকেই কমনওয়েলথ গেমসের দুটি রৌপ্যপদক জিতেছেন আবদুল্লাহ হেল বাকী ও শাকিল আহমেদ। কমওনওয়েলথ গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মার্চপাস্টে জাতীয় পতাকাও ছিল এই রৌপ্যজয়ী আবদুল্লাহ হেল বাকীর হাতেই। তার পাশেই ছিলেন শুটার শাকিল। তাদের রাইফেল-পিস্তলে উড়েছে লাল-সবুজের পতাকা।
কমনওয়েলথ গেমস এবং এসএ গেমসে পদকজয়ী বাকী ও শাকিলের চোখ এখনও তাক করে আছে বড় কিছুর আশায়। এবার নিশ্চয় বাকীর রাইফেল আর শাকিলের পিস্তল অলিম্পিকেও লাল-সবুজের পতাকার মেলে ধরার বড় স্বপ্নে বিভোর।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*