বিভাগ: প্রবন্ধ

বাঙালির আত্মপরিচয় : বাঙালির স্বকীয় উৎসব

4-9-2019 6-15-56 PM

বাংলা নববর্ষ

ড. নূহ-উল-আলম লেনিন: ১ বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ। বাঙালির প্রাণের উৎসব। একান্তই বাংলাদেশের বাঙালির স্বকীয় উৎসব। এই দিনে প্রিয় দেশবাসীকে এবং পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি ভাই-বোন আছেন, তাদের সবাইকে শুভেচ্ছা।
সত্য বটে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবনধারা মূলত অভিন্ন। ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগের পর থেকে অবশ্য এই অভিন্নতায় ছেদ পড়ে। দেশভাগ কেবল একটি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের অভিধাটিকেই বদলে দেয়নি, কেবল রাজনৈতিক-ভৌগোলিক বিভাজন সৃষ্টি করেনি, দেশভাগের অভিঘাত বাংলাদেশ ভূখ-ে একটি নতুন জাতিসত্তার উত্থান অনিবার্য করে তোলে।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কেবল আমাদের পরাধীনতাকেই প্রলম্বিত করেনি, তারা নতুন প্রভুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য এমনকি জীবনধারাকে পর্যন্ত বদলে দিতে চেয়েছিল। তারা পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আমাদের ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেই ক্ষান্ত ছিল না। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা তো দূরের কথা, আরবি হরফে বাংলা লেখার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ পর্যন্ত নিয়েছিল। বাংলাকে তারা হিন্দুয়ানি ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর পরিকল্পিত আঘাত হেনেছে। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করেছে। নজরুলকে ইসলামিকরণ করেছে। বাঙালি জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয়কে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ‘মুসলমান এক জাতি’, এই ধারণার ভিত্তিতে ‘পাকিস্তানি জাতি’ পরিচয়ে আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়কে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। ১ বৈশাখ নববর্ষ পালনকেও হিন্দুয়ানি বলে ব্যঙ্গ বিদ্রƒপ করেছে।
আর এ কারণেই বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দ্রোহের পতাকা উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বসভায় নিজেদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ। যে রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা, যার মর্মমূলে রয়েছে এক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাঙালির সুদীর্ঘ তিন হাজার বছরের ইতিহাসে একটি ভাষাভিত্তিক স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয় বিশে^র অন্যান্য দেশ বা অঞ্চলের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের সঙ্গে আমাদের আত্মপরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করে।
দেশ ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম প্রভৃতি অঞ্চলের বাঙালিরা ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মেনে নেয়। তারা প্রথমে ভারতীয়, তারপর বাঙালি। এমনকি অতীতের সৃষ্ট ধারণা হিন্দুত্ব ও বাঙালিত্বকে তারা অভিন্ন মনে করত। সম্ভবত এখনও পশ্চিমবঙ্গে এই ধারা অব্যাহত আছে। ভারতীয় বাঙালিরা নৃতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিকভাবে ‘বাঙালি’ হলেও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর একটা বিভাজন রেখা এই বাঙালিত্বকে খ-িত করেছে। কারণ ভারতীয় বাঙালিদের কোনো সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্রের পরিচয় নেই। তারা প্রাদেশিক এবং ভারতীয় মহাজাতি চেতনার ছত্রছায়ার আঞ্চলিক জনগোষ্ঠী।
পক্ষান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের ওপর কৃত্রিম এবং সাম্প্রদায়িক ‘জাতি পরিচয়’ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। সাময়িক হলেও বাংলাদেশের মানুষ বিশেষত বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী একটা দোলাচল ও আত্মপরিচয়ের সংকটের মধ্যে পড়েছিল। ভাষা আন্দোলন এই দোলাচল ভাঙতে এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলনের পথ চেয়ে বাঙালি মুসলমানের আত্মানুসন্ধান যেমন ক্রমশ বেগবান হয় তেমনি বাঙালির সেকুলার জাতি চেতনাও শাণিত হয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম এক মোহনায় এসে মিলে। ষাটের দশকে একদিকে বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা দাবি ও আন্দোলন যেমন বাঙালি জাতিকে রাজনৈতিকভাবে নতুন এক জাতি-রাষ্ট্রের চেতনায় উজ্জীবিত করে, তেমনি রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন, ছায়ানটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন স্বদেশীয়ানার দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা, ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ অনুষ্ঠানের শুরু প্রভৃতি বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠায় নতুন নতুন অনুষঙ্গ সংযোজিত করে।
প্রসংগত, বাংলা নববর্ষ উদযাপন নিয়ে এখানে একটু বিস্তারিত বলা যেতে পারে। সকলেই জানেন, বাংলা সন গণনার একটা ইতিহাস আছে। ‘সুবাহ বাঙ্গলায়’ ফসল ওঠার সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহের একটা যোগ রয়েছে। সম্রাট আকবরের সময় আরবি চান্দ্র মাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান এবং বাংলার ফসল চক্রের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলা সনের প্রচলন/সংস্কার করা হয়। কয়েকশ বছর যাবত এই সন গণনাই স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রচলিত আছে। চান্দ্র মাসের হিসাব এবং গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ইত্যাদিকে ভিত্তি করে পঞ্জিকা বর্ষ বা বঙ্গাব্দ চলে আসছে। পঞ্জিকা বর্ষে মাস গণনার নির্ধারিত দিনক্ষণ অনুসৃত হতো না। ফলে সৌরবর্ষ বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে বাংলা ক্যালেন্ডারের বেশ বড় ধরনের গড়মিল ছিল। তদুপরি বাংলা সন গণনায় কোনো লিপইয়ারও ছিল না। এর ফলে বর্ষ গণনায় বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটি প্রায়শ এড়িয়ে যাওয়া হতো।
আমাদের বাংলা একাডেমি এই সমস্যাটির একটি বিজ্ঞানসম্মত সমাধানের লক্ষ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে। এই কমিটিতে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প-িতদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ষাটের দশকের গোড়ার দিকেই বাংলা একাডেমির এই কমিটির সিদ্ধান্ত ও সুপারিশক্রমে বাংলা সন গণনার সংস্কার করা হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল থেকে ১ বৈশাখ নির্ধারিত হয়। বাংলা একাডেমির এই সিদ্ধান্ত ছিল শতভাগ ধর্মনিরপেক্ষ এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলা একাডেমির বর্ষ গণনার সাথে প্রচলিত পঞ্জিকার বর্ষ গণনার বেশ কিছু তারতম্য আছে।
ষাটের দশক থেকেই আমরা প্রতিবাদী চেতনা থেকে ১৪ এপ্রিল ১ বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে আসছি। স্বাধীনতার পর বাংলা নববর্ষের দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতার আগে নববর্ষ পালনে প্রতিবাদী রাজনৈতিক চেতনা কাজ করেছে বেশি। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই দিনটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন রাজধানী ঢাকার রমনার বটমূলই নয়, সারা শহরব্যাপী বিভিন্ন স্থানে সকাল এবং বিকালে গানের অনুষ্ঠান, মেলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রায় হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করে। মেয়েরা যেমন সাজসজ্জা করে, তেমনি পুরুষরা, শিশুরাও নতুন বস্ত্র পরিধান করে নববর্ষে সপরিবারে বিভিন্ন স্থানে জমায়েত হয়। কেবল ঢাকা নয়, সমগ্র বাংলাদেশের শহর-বন্দর, স্কুল-কলেজ ও গ্রামাঞ্চলে নববর্ষ উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। চারুকলা থেকে যে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রচলন হয়, বর্তমানে এই ধরনের শোভাযাত্রা ঢাকার বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। আমাদের সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও প্রভৃতি নববর্ষ উপলক্ষে বিশেষ প্রকাশনা ও বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। একটু আদিখ্যাতার মতো মনে হলেও বাঙালি মধ্যবিত্তের ঐদিন পান্তা-ইলিশ খাওয়ার বিষয়টিও বর্তমানে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। সরকারিভাবেও আয়োজন করা নানা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। বর্তমান সরকার নববর্ষ উপলক্ষে বিশেষ ভাতারও প্রচলন করেছে।
এসব কিছু মিলিয়েই নববর্ষ পালনে বাংলাদেশের বাঙালিদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা এখন বিশ্ব স্বীকৃত। পক্ষান্তরে যারা এককালে বাঙালিয়ানার প্রবর্তক এবং বাঙালিত্ব ও হিন্দুত্বকে সমার্থক করে তুলেছিলেন, সেই ভারতীয় বাঙালিরা কিন্তু নববর্ষকে তেমন একটা উৎসবের মেজাজে উদযাপন করেন না। তারা আমাদের বাংলা একাডেমির সেকুলার বছর গণনাকে মানেন না। তারা রাষ্ট্রীয়ভাবেই পুরনো পঞ্জিকা অনুসরণ করেন। পুরনো পঞ্জিকা অনুযায়ী যেমন হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ করেন, তেমনি গণেশ পূজাসহ নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করেন।
অথচ আমাদের নববর্ষে কোনো ধর্মাশ্রয়ী আচার-অনুষ্ঠান নয়। বাঙালিত্বের এমন স্বকীয় অভিপ্রকাশই আমাদের এই জাতীয় উৎসব স্বাতন্ত্র্যের মর্যাদা দান করেছে। এখানেই বাংলাদেশের বাঙালিদের শ্রেষ্ঠত্ব ও অভিনবত্ব। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম বা বাংলাদেশের বাইরের বাঙালিরা এই সর্বজনীন ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব কল্পনাও করতে পারে না।
আমাদের মতে, ভারতীয় বাঙালি ও বাংলাদেশের বাঙালির মধ্যে ভাষাগত ঐক্য, নৃতাত্ত্বিক অভিন্নতা ও মোটা দাগে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন থাকলেও বাংলাদেশের সাথে একটা বিভাজন রেখা ক্রমশ আমাদের ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়কেই তুলে ধরছে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয় হাজার বছরের পুরনো বাঙালির পরিচয়ের আধারেÑ একটি নতুন জাতিসত্তার, নতুন বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক পরিচয়কে মহিমান্বিত করছে। আমরা জাতি পরিচয়ে বাঙালি, নাগরিক পরিচয়ে বাংলাদেশি। আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ভারতীয় বাঙালিদের জাতি-রাষ্ট্রীয় পরিচয় ভারতীয়তা, রাষ্ট্রভাষা হিন্দি এবং সংস্কৃতি হিন্দি প্রভাবিত মিশ্র সংস্কৃতি।
আমাদের স্বাতন্ত্র্যের গৌরব সংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন নয়। নিঃসন্দেহে ভাষাগত নৃ-জাতিগত এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনগত ঐক্য বিশে^র সকল বাঙালিকে একটি অভিন্ন সুরের ঐক্যতানে আপন করে নেবে। তবুও আমাদের স্বাতন্ত্র্যটুকু বাঙালির ভবিষ্যৎ, বাঙালির বিশেষত্ব, বাঙালির জাতিসত্তাগত পরিচয়।
০৫.০৪.২০১৯

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*