বিভাগ: সাফল্য

বাস্তবায়নের পথে পদ্মাসেতু

11-6-2018 5-47-23 PMড. ইঞ্জিনিয়ার মাসুদা সিদ্দিক রোজী: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালে প্রথম পদ্মাসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। শুরুতে বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু নির্মাণ করতে আগ্রহ দেখায়। ২০১১ সালে এই প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে ২০১২ সালে জুলাই মাসে দুর্নীতির অভিযোগ এনে এই ঋণ চুক্তি বাতিল করে। এরপর বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ও ব্যবস্থাপনায় পদ্মাসেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয়। এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৪ সালে ৭ ডিসেম্বর পদ্মাসেতুর কাজ শুরু হয়। বিশ্বব্যাংককে এক প্রকার চ্যালেঞ্জ করে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর সেতুর কাজ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মাসেতু মূলত দোতলা বিশিষ্ট। এর ওপরে তলায় থাকবে চার-লেনের সড়ক পথ এবং নিচতলায় থাকবে একটি একক রেলপথ। এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার লাইন পরিবহনের সুবিধা এই সেতুতে রাখা হয়েছে। পদ্মাসেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিমি এবং প্রস্থ ৯.৪ ফুট। মূল নদীর মধ্যে ১৫০ মিটার পরপর ৪২টি পিলার ৪১টি স্প্যানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ হবে এই সেতু। ৪২টি পিলার প্রতিটি পিলারে ৬টি করে মোট ২৫২টি পাইল থাকবে। পদ্মা নদীর পানির স্তর থেকে ৫০ ফুট উপরে বসবে প্রতিটি স্প্যান। পদ্মাসেতুর রং হবে সোনালি। তবে রাতে সেতুটি জ্বলবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার আদলে লাল ও সবুজ বাতি। আমাজনের পর পদ্মা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন নদী। তাই পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজটি অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের।

এই প্রকল্পের কাজ চার ভাগে ভাগ করা হয়েছেÑ
১. মূল সেতু নির্মাণ;
২. নদী শাসন;
৩. দুই পাড়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ;
৪. টোল প্লাজা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ।
পদ্মায় মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং নদী শাসনে কাজ করছে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। পদ্মাসেতুর দুই প্রান্তে রেললাইন নির্মাণে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান ক্যানোরেলের নেতৃত্বে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। আর পুরো প্রকল্পের কাজ তদারকির দায়িত্বে রয়েছে কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পদ্মাসেতু বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যোগাযোগ নিশ্চিত করবে। মোংলা সমুদ্রবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সাথে রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগর চট্টগ্রামের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে বাড়বে কর্মসংস্থান। প্রতিবছর মোট দেশজ জিডিপি উৎপাদন বাড়বে ১.২৬ শতাংশ হারে। অনেক বিতর্ক ও বাধা পেরিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ও ব্যবস্থাপনায় পদ্মাসেতু নির্মাণ বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরবে।
এই সেতু নির্মাণে অর্থনীতিতে নিয়ে আসবে অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প পদ্মাসেতু নির্মাণের মধ্যদিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটা একটা বড় ধরনের দূরদর্শিতা এবং সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে পদ্মাসেতু এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ। প্রায় ৫৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। যে করেই হোক নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছু সময় বেশি লাগিয়ে হলেও বহুল আলোচিত এই সেতুর কাজ শেষ করতে চায় সরকার।

পদ্মাসেতুর নির্মাণ খরচ বাড়ার কারণÑ
১. রোড সেতুর সাথে রেলসেতু সংযোগ হওয়া;
২. নদী শাসন;
৩. দুই পাড়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ;
৪. ডিজাইনের পরিবর্তন (পাইলের সংখ্যা ও গভীরতা বেড়ে যাওয়া);
৫. নদী শাসন ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য জমি ক্রয়;
৬. সেতু নির্মাণ তলদেশে জটিলতার কারণে ১৪টি পিলার স্থাপন করা যাচ্ছিল না। এ সমস্যা নিরসনে ব্রিটিশ একটি কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডিজাইনের কিছুটা পরিবর্তন করার পর পাইলের সংখ্যা বাড়িয়ে কাজ পুনরায় শুরু করা হয়। সেজন্য কিছু সময় বেশি লেগেছে। সেতুর মূল নকশা অনুযায়ী প্রথমে একতলা সড়ক সেতু করার কথা ছিল আর খরচ ছিল ১০ হাজার কোটি। পরে রেল যোগাযোগের কথা বুঝতে পেরে এটাকে রেল ও সড়ক উভয় বিবেচনায় সমন্বিত নকশা তৈরি করা হয়। একতলা সেতু হয়ে যায় দোতলা। সাথে নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এরিয়াÑ সব খরচ মিলে সেটি এখন ৩০ হাজার কোটি দাঁড়িয়েছে। শুধু সড়কের সেতু করলে ৭০ থেকে ৮০ টন ওজন নিতে পারবেÑ এ রকম ব্রিজ করলে যথেষ্ট ছিল। যেহেতু রেল যুক্ত করা হয়েছে, তাই একে আরও বেশি ভার বহন করতে হচ্ছে। ফলে পাইলগুলো আরও বেশি গভীরে ঢোকাতে হচ্ছে। লোড নেওয়ার ক্ষমতা বাড়িয়ে ২ হাজার ৪০০ টন করতে হয়েছে।

পদ্মাসেতু নির্মাণের সুবিধাসমূহ
১. দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর সাথে দূরত্ব কমাবে ১০০ থেকে ১৫০ কিমি পর্যন্ত। ফলে সময় বাঁচবে প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা।
২. এই সেতুকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ মিলিয়ন/১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান হবে। সরাসরি উপকৃত হবে ৩০ মিলিয়ন বা ৩ কোটি মানুষ।
৪. এডিবি’র হিসাব অনুযায়ী জাতীয় ও আঞ্চলিকভাবে বিনিয়োগ অনেক গুণ বাড়বে। শিল্প অবকাঠামো খাতে অভাবনীয় প্রভাব ফেলবে।
৫. ঋরহধহপরধষ ওহপষঁংরড়হ-এর আওতায় আসবে কোটি মানুষ।
৬. যেহেতু পদ্মাসেতুর সাথে পায়রা বন্দরের সংযোগ রয়েছে। তাই রেলে বা সড়কে খুব সহজে দ্রুত ঢাকাসহ সারাদেশে পণ্য সরবরাহ করা যাবে। মানি সার্কুলেশন যত বেশি হয় জিডিপি তত বাড়ে। যখন লেনদেনের গতি বাড়ে তখন সেটির প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়ে। রেল সংযোগের ফলে পরিবহন খরচ অনেক কমে আসবে।
৭. দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলা সরাসরি যোগাযোগ বরাবরই বিচ্ছিন্ন ছিল। এই সেতুর সাথে সরাসরি বরিশাল জোনে রেল সংযোগ প্রতিস্থাপন হওয়ায় রেলে পণ্য বহন করলে খরচ অনেক কমে যাবে।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘ নদী পদ্মা, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশকে উত্তর-পূর্ব অংশ থেকে পৃথক করবে এই পদ্মা। এই নদীর ওপর সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলার মানুষের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। সেই সাথে পদ্মাসেতু জাতীয় অর্থনীতিতে নিয়ে আসবে অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন। বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে উন্নয়নের রোল মডেল। এই মডেলের রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনা, যার একক সাহসিকতা ও দূরদর্শিতায় আজ আমাদের বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার একটি স্থান হয়েছে। বিশ্ব আজ বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*