বিভাগ: প্রতিবেদন

বিএনপি কোন পথে হাঁটছে?

4-9-2019 6-34-46 PMকুদ্দুস আফ্রাদ: ভুল রাজনীতির খেসারত দিতে গিয়ে বিলীন হয়ে গেছে একদা এদেশেরই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ। প্রায় একই পথে হেঁটে মুসলিম লীগের উত্তরসূরি বিএনপির দশাও অনেকটা একই রকম। রাজনীতি হচ্ছে বিজ্ঞান। চলার পথের সঠিক দিক-দর্শন আঁকতে হয়। অভীষ্ট লক্ষ্য ঠিক করতে হয় বিজ্ঞানের মতো ছক এঁকে। তার ব্যতিক্রম হলেই পতন! শুধুই কী পতন? বিলীনও হয়ে যেতে হয়। এ উপমহাদেশে এমন উদাহরণ অনেক। প্রসঙ্গটি এলো এ কারণেই, একাদশ জাতীয় সংসদের ভোট শেষে গেজেট প্রকাশ হয়েছে প্রায় তিন মাস হলো। দলটি থেকে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা গত তিন মাসেও শপথ নেননি। শপথ নেওয়াকে ঘিরে সরকারের সামনে ‘মুলো’ ঝুলানোর খবর বেরিয়েছে। খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার বায়না ধরা হয়েছে।
এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরে যে ৩টি দল পালাক্রমে দেশের শাসনভার পরিচালনা করেছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, আর যে দুটি দল রয়েছে তারা মূলত একই ধারার ও অভিন্ন সত্তার। একটি হচ্ছে বিএনপি, অন্যটি জাতীয় পার্টি। এ দুটি দলের অবস্থাই এখন করুণ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও আওয়ামী লীগের বিরোধিতাকারী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী এ দুটি দল পালাক্রমে ২৬ বছর শাসন করলেও দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের অর্জনের ঘর একেবারেই শূন্যের কোটায়। এই শূন্যতা পূরণ করেই জনগণের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
পক্ষান্তরে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে জায়গা করে নিতে চলেছে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও তাদের আরেক সহযোগী জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশের নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করেই পর্যবেক্ষকরা এমন মতামত দিয়েছেন। তাদের কথায়, যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে অবজ্ঞা করে যখন দেশকে পরাজিত পাকিস্তানি শক্তির ভাবধারার গড়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি জনগণ। ফলে, ’৭৫ সালের পাল্টা জবাব দেওয়া হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের জনতার অভ্যুত্থানে। আর জনতার এই অভ্যুত্থানের স্থায়ী রূপ নেয় ২০০৮ সালের ভোটে। মূলত, জনগণের চেতনাবোধের জায়গা অনুভব করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই ব্যাপক জনসমর্থনপুষ্ট দল বিএনপি ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের মতো ভুল সিদ্ধান্তের পরেও এ দলটির কাছে যাদের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া, তারা ২০১৮ সালের ভোট নিয়ে নেতৃত্ব পর্যায়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সর্বোপরি লন্ডনে বসে দলের প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতিকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। একটি আসনের জন্য একাধিক প্রার্থী বাছাই করা এবং প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ‘নয়-ছয়’ অবলম্বনের ঘটনাও দলটিকে বিপর্যয়ে নিয়ে গেছে। জাতীয় পার্টির গায়েও একই ছাপ্পা রয়েছে।
বর্তমানে বিএনপির অবস্থা তথৈবচ। না আছে নেতৃত্ব, না আছে ভবিষ্যৎ। দলটির প্রধান নেতা বেগম খালেদা জিয়া এতিমের টাকা লোপাটের মতো নিম্নস্তরের দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলে বাস করছেন। খালেদা জিয়ার অবর্তমানে যার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এ দলের নেতৃত্ব। সেই তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও রয়েছে আরও সব জঘন্যতর অভিযোগ। বেশ কয়েকটি মামলার তিনিও সাজাপ্রাপ্ত। লন্ডনে স্বেচ্ছায় ফেরার বাস করছেন। এ অবস্থায় এ-দলটি এখন চতুর্মুখী দ্বন্দ্ব-সংঘাতে কাবু। মাঠ পর্যায়ে ধীরে ধীরে দলের সাংগঠনিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে এসেছে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় হালুয়া-রুটির জন্য যারা দৌড়াদৌড়ি করতেন, লম্বা সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় তারাও সটকে পড়েছেন অনেক আগেই। দলের এই করুণ অবস্থা পার করতে হায়ার করা হয় গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনকে। ড. কামালের নেতৃত্বে গত নির্বাচনের মাসখানেক আগে গঠন করা হয় ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ নামের এক মোর্চা। মূলত, জামাতকে আড়াল করতেই নেওয়া হয়েছিল এ পদক্ষেপ। কিন্তু তাতেও পার পাওয়া যায়নি। ভোটের আগে জামাতকে দলের প্রতীকসহ ২৫ আসন ছেড়ে দিয়ে নিজেদের স্বরূপ উন্মোচন করায় ভোটের মাঠে দারুণ বিপর্যয়ে পড়ে বিএনপি। এই বিপর্যয়ের মধ্যে আবার বিপত্তি দেখা দেয় দলের প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হওয়া সংসদ সদস্যদের শপথকে ঘিরে। ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ থেকে মনোনয়ন নিয়ে যারা বিজয়ী হয়েছেন, তাদের শপথ নিতে বাধা দেওয়ার পরেও গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুই সংসদ সদস্য ইতোমধ্যে শপথ গ্রহণ করায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বিএনপি তথা ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’। নতুন প্রশ্ন সামনে, বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ কবে?
বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে লন্ডন টু গুলশান দফতরে দফায় দফায় চলছে বৈঠক। বিদেশিদের কাছ থেকেও নেওয়া হচ্ছে পরামর্শ। কঠিন এ দুঃসময়ে তৃণমূল ও কেন্দ্র মিলিয়ে শতাধিক নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। ভোটের আগে গুরুত্ব না দেওয়ায় এবার বেঁকে বসেছেন ২০-দলের জোটের পুরনো মিত্ররাও। দলের অভ্যন্তরীণ এসব সংকটের মুখে পুনর্নির্বাচনের দাবিও ফিকে হয়ে এসেছে। দিন যত গড়াচ্ছে সমসাময়িক নানা ইস্যুতে বিএনপির ঘাড়ে ভর করছে চতুর্মুখী চাপ।
বিএনপির শীর্ষনেতারা বলছেন, দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে শিগগিরই কারামুক্ত করতে আন্দোলন করার কথা বলা হলেও কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। মূলত, নেতা-কর্মীদের একাংশ এখন আর ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আবেগী খেলায় মাততে নারাজ। নেতাদের একাংশ এখনও মনে করেন, দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা দরকার। দরকার বিশ্বাসী নেতার। বিএনপির বড় দুর্বলতা হচ্ছে, নেতারা একে অপরকে বিশ্বাস করেন না। এমনকি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও তার দলের অন্য কোনো নেতাকে বিশ্বাস করেন না। যে কারণে, দুর্নীতির মামলার চূড়ান্ত রায়ের আগে জেলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে হঠাৎ করে দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নিজের সন্তানের হাতে দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান মনে করেন, ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে বিএনপি। তার কথায়Ñ সময় তো একটু লাগবেই। দলীয় বৈঠক-পরিকল্পনা সবই চলছে। আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বিএনপির সামনে। তবে কতটুকু সম্ভব তা ভব্যিষ্যৎই বলে দেবে।’
এদিকে আপাতত বিএনপির মাথায় বড় চাপ হলোÑ দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি। যিনি বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার স্বাস্থ্যের পূর্ণাঙ্গ বিষয় ইতোমধ্যে কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরে তাদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের খবর। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, বিএনপির সংসদে না যাওয়া আপাতত সঠিক সিদ্ধান্ত। তার কথায়, ‘মাস শেষে কয়েকটা পয়সা পাওয়ার জন্য শুধুই সংসদে গিয়ে লাভ কী? আদতে দেশের জন্য তো কিছু হবে না। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, সরকার যদি খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি ও নেতা-কর্মীদের মামলা তুলে না নেয়, তাহলে কোন যুক্তিতে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন?’ তবে গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরপরই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগ দিয়ে সোচ্চার হওয়ার কথা বলেছিলেন।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*