বিভাগ: প্রধানমন্ত্রী

বিএনপি ‘নাকে খত’ দিয়েই নির্বাচনে আসবে

55উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে আগাম নির্বাচন এবং বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, তার সরকার এমন কোনো দৈন্যদশায় পড়েনি যে আগাম নির্বাচন দিতে হবে আর আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। কোন দল নির্বাচনে এলো কি এলো না সেটি সম্পূর্ণই সেই দলটির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নির্বাচন করতে চাইলে আসবে, নইলে আসবে না। এ ব্যাপারে সরকারের কিছু করণীয় নেই। তবে গতবার বিএনপি যে ভুল করেছে আমার মনে হয় এবার তা করবে না। বিএনপি নাকে খত দিয়েই এবার নির্বাচনে আসবে।
গত ৭ ডিসেম্বর বিকেলে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে একাধিক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আগামী নির্বাচনেও তার দলের বিজয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা স্বাধীনতার সপক্ষের রাজনীতি করে, জনগণের কল্যাণে কাজ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, আমরা চাই তারাই ক্ষমতায় আসুক। কোনো যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী, দুর্নীতিবাজ, বিদেশে অর্থ পাচারকারী, জঙ্গিবাদ সৃষ্টিকারী খুনিদের দল ক্ষমতায় এলে দেশ আবারও ধ্বংস হয়ে যাবে। যারা বর্তমান উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে পারবে, দেশকে আর পেছনের দিকে টানবে না, আমরা চাই তারাই নির্বাচিত হবে। দেশের জনগণও এটাই চায়। তাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বর্তমান উন্নয়ন ও সফলতার গতিধারা অব্যাহত রাখতে দেশের জনগণ আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে। আগামীতে আমরা আরও নতুন নতুন আসনে বিজয়ী হব বলেই আমরা দৃঢ় বিশ্বাস।
প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এবার কেউ নির্বাচনে না এসে আগুনসন্ত্রাস করলে জনগণই তার জবাব দেবে। জনগণই ব্যবস্থা নেবে। সৌদি আরবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার সংক্রান্ত বিশ্বের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, দেশের মানুষই এর বিচার করবে আর দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ীও তার বিচার হওয়া উচিত। অবশ্যই তার বিচার হবে আর সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানকে দেশে ফেরত আনতেও ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একদিন না একদিন তারেক রহমানকেও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
সম্প্রতি তার কম্বোডিয়া সফর সম্পর্কে বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও প্রায় এক ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন, জিয়া পরিবারে বিদেশে অর্থ পাচার, বিএনপির সঙ্গে সংলাপ, রোহিঙ্গা ইস্যু, ফিলিস্তিন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তসহ নানা বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের সম্পাদক প্রধানদের নানা প্রশ্নের সাবলীলভাবেই উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি। এছাড়া সেখানে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, সরকারের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে গত নির্বাচনের আগে নির্বাচনে নিয়ে আসতে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে গণভবনে দাওয়াত প্রদানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, একবার তার (খালেদা জিয়া) সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আমন্ত্রণ জানিয়ে যে ঝাড়ি খেয়েছি, যে অপমানিত হয়েছি। আর তেমন ঝাড়ি খাওয়ার বা অপমানিত হওয়ার ইচ্ছে নেই। যাদের মধ্যে সামান্যতম ভদ্রতাজ্ঞানটুকু নেই, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেন কোন মুখে। আমার ওপর আপনারা এত জুলুম করেন কেন? ছেলের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হয়েও তার (খালেদা জিয়া) সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দরজায় তালা বন্ধ করে দিয়ে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পকেট গেট দিয়েও ঢুকতে দেয়নি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। তারপরও দেশের স্বার্থে আর বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেই তাদের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছিলাম।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জিয়াউর রহমানকে মেজর থেকে মেজর জেনারেল বানিয়েছেন আমার বাবা (বঙ্গবন্ধু)। বউ (খালেদা জিয়া) উনি প্রায়শই আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমাদের বাসার নিচে মোড়া পেতে বসে থাকতেন। তাকে (জিয়াউর রহমান) অনেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বলেন! অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে উনি যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন, নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়ে খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। এটাই কী তার (জিয়াউর রহমান) বহুদলীয় রাজনীতি? প্রতিদিন রাতে কার্ফু দিয়ে দেশ চালানোকে বহুদলীয় গণতন্ত্র বলে?
খালেদা জিয়ারই ক্ষমা চাওয়া উচিত : ‘শেখ হাসিনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি’Ñ সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার এমন মন্তব্য সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে কেন ক্ষমা করবে? আমি কী করেছি? বরং উনার (খালেদা জিয়া) উল্টো মাফ চাওয়া উচিত। আসলে উনি কি ক্ষমা করেছেন, না ক্ষমা চেয়েছেনÑ এ ক্ষমার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তার উচিত দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আমি কোনো অপরাধ করেছি না-কি যে আমাকে ক্ষমা করতে হবে?
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকতে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করিয়েছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, এর জন্য কী আমাকে ক্ষমা করেছেন? ওই হামলায় আমি প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ ২২ নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। এ জন্য বরং খালেদা জিয়ারই জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদার বিরুদ্ধে যে মামলা তা আমাদের সরকার দেয়নি; বরং আমার বিরুদ্ধে তো বিএনপি এক ডজন মামলা দিয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যারা মামলা দিয়েছে সেই মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনরা তো তাদেরই নিজেদের লোক। খালেদা জিয়াই ৯ জনকে ডিঙ্গিয়ে মঈন-উ আহমদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন, জাতিসংঘ থেকে এনে ফখরুদ্দীন আহমদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর করেছিলেন। তারাই তো এই মামলা করেছেন।
তিনি বলেন, এই মামলা থেকে তার (খালেদা জিয়া) পলায়নপর নীতি আপনারা তা দেখেছেন। ১৫০ বার মামলার স্ট্রে নিয়েছেন, ২২-২৩ বার মামলা বন্ধ করতে রিট করেছেন আর কোর্টে যাওয়া নিয়েও তা-ব হয়েছে। এর আগে উনি হাজিরা দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগের এমপি ছবি বিশ্বাসের গাড়ি ভাঙচুর করেছে, আগুন দিয়েছেন। এবার পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছেন। যখনই উনি বেরুচ্ছেন তখনই একটা না একটা ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এর আগে নির্বাচন ঠেকানোর নামে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। এ জন্য খালেদা জিয়ারই উচিত দেশবাসীর সামনে ক্ষমা চাওয়া।
অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা দেশকে ৩০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে : অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছরের মধ্যে ৩০ বছরই দেশের মানুষ ছিল অবহেলিত, বঞ্চিত আর এই ৩০ বছরই ছিল হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, দুর্নীতি-দুঃশাসন, বিদেশে অর্থ পাচার, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস-খুন আর ভোট কারচুপির ইতিহাস। ত্রিশটা বছর দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র আট বছরে দেশের যে উন্নয়ন করেছে তা কেউ করতে পারেনি। একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশের মানুষের জন্য কাজ করে এটা আমরা প্রমাণ করেছি।
শত ফুল ফুটতে দিন : আসন্ন নির্বাচনে সারাদেশে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থিতা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শত ফুল ফুটতে দিন, এটা রাজনৈতিক তাদের অধিকার। তবে সব থেকে যেটা ভালো ফুল সেটাই আমরা বেছে নেব। সময় হলেই সবাই তা দেখতে পারবেন আর আওয়ামী লীগ একটা বড় রাজনৈতিক দল। মনোনয়ন চাওয়া তাদের রাজনৈতিক অধিকার। নির্বাচনী হাওয়া বইয়ে যাওয়া ভালো। দেশের মানুষ গণতন্ত্রের সুবাতাস গ্রহণ করেছে, নির্বাচনী হাওয়া বয়ে যাওয়া মানেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি বড় প্রমাণ।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*