বিভাগ: ক্রীড়া

বিশ্বকাপ ফুটবলে ফরাসি সৌরভ

8-6-2018 6-52-09 PMআরিফ সোহেল : ১৯৯৮ সালের পর ২০১৮। পাক্কা ২০ বছর। ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। রাশিয়ার মস্কো শহরের লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ১৫ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনালে তারা জিতেছে ৪-২ গোলের ব্যবধানে। বিশ্বকাপে উড়েছে ফ্রান্সের সৌরভ। ওইদিনই শেষ হয়েছে ২১তম ফিফা বিশ্বকাপ আসর। শেষ হয়েছে এক মাসের মহাযজ্ঞে অংশ নেওয়া ৩২ দলের চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ।
ফাইনাল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রিজম্যান-এমবাপেরা যখন মাঠের মধ্যে আনন্দসমুদ্রে ভাসছেন, কোমর দুলিয়ে নাচছেন। তখন ক্রোয়েশিয়া শিবিরে শশ্মানের নীরবতা। মাঠের সবুজ ঘাসে মুখ লুকিয়ে হতাশার সমুদ্রে ডুবে বুদ মদ্রিচদের। দারুণ এক ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নিয়েছেন দিদিয়ে দেশমের ফ্রান্স। যেভাবে ২০ বছর আগে ফ্রান্সের প্রথম জয়ের বিশ্বকাপটা হাতে তুলে ধরেছিলেন ফুটবলার দেশম, গুরু হিসেবে এবারের ভঙ্গিটা সে-রকমই। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মুষ্টিবদ্ধ হাত নিয়েই দৌড়ে ছুটলেন তার স্বপ্ন পূরণ করা শিষ্যদের দিকে। তখন গ্যালারি সাদা-লাল-নীল পতাকা সগর্বে উড়ছে পতপত করে। কালবিলম্ব না করে দেশম চলে গেলেন ক্রোয়েশিয়া ফুটবলারদের কাছে। লুকা মদ্রিচ, রাকিতিচদের আদর করলেন প্রকৃত শিক্ষকের মতো।  ফাইনালে ৪ গোল খেলেও লড়াকু ফুটবলে নজর কেড়েছে ক্রোয়েশিয়া। আর বাজিমাত করেছেন ফ্রান্সের তিন তারকা গ্রিজম্যান, পোগবা, এমবাপে। ফাইনালে তিন তারকাই করেছেন গোল। যা মদ্রিচরা করতে পারেন নি।
গোলের হিসাব বাদ দিলে ফাইনালটি ছিল উপভোগ্য। গোল, পাল্টা গোলে উত্তাল একটা ম্যাচ। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ফাইনালে কখনও তো ৬ গোল হয়নি। ৫২ বছর পর সেটাই দেখেছে লুঝনিকি। গোলের সুগন্ধী ছড়িয়েছে ফ্রান্স।
যদিও ম্যাচের শুরুতে কোণঠাসা হতে হতে যখন এমবাপে, গ্রিজম্যানদের তুলি আটকে যাচ্ছে, উমতিতিরা দম নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, তখনই তো লুকা মদ্রিচরা আত্মঘাতী হলেন। গ্রিজম্যান এদিন সব সেটপিস নেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। পেনাল্টি পেলে সবার আগে তিনি। ৩০ গজ দূর থেকে গ্রিজম্যানের ফ্রি-কিক থেকে উড়ে আসা বলটি ক্রোয়েশিয়ার মারিয়ো মাঞ্জুকিচের মাথায় লেগেÑ গোল। আত্মঘাতী গোলটা এত অপ্রত্যাশিতভাবে হলো যে, গ্রিজম্যান আঙুল তুলে দৌড়ানোর পর ফরাসি সমর্থকরা বুঝলেন গোলটা হয়েছে। প্রতিপক্ষকে চাপিয়ে রাখা ক্রোয়েশিয়াকে ফেরালেনও পেরিসিচ। এরপরেও ফের আত্মঘাতী। সমতায় ফেরানোর গোলদাতাই খলনায়ক হয়ে গেলেন ক্রোয়েশিয়ার। গ্রিজম্যানের কর্নার নিজেদের বক্সে হাত লাগালেন পেরিসিচ। রেফারি ‘ভার’-এর দ্বারস্থ হলেন। পেনাল্টি হলো। গ্রিজম্যান ২-১ করতেই ম্যাচ শেষ। সমতায় ফিরতে মরিয়া ছিল ক্রোয়েশিয়া। রক্ষণে আর নজর দেওয়ার সময় ছিল না তাদের। আর সেখান থেকেই পরপর ২ গোল ফ্রান্সের। স্বপ্নভঙ্গ ক্রোয়েশিয়ার।
বিশ্বকাপ ফাইনালে গোলের বন্যা। ফাইনালে বেশি গোল করার ধারা বজায় রাখল ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালেও ফাইনালে ৩ গোল দিয়ে বিশ্বকাপ নিয়েছিল ফ্রান্স। এবারও ৪ গোল করে বিশ্বকাপ মাতাল ফ্রান্স।
প্রথমার্ধে হলো ৩ গোল। দ্বিতীয়ার্ধেও তাই। মোট ৬ গোলের ম্যাচ হয়ে উঠল রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারের মতোই। ফ্রান্সের দুই গোলের মাঝখানে পেরিসিচ অবশ্য সমতা ফিরিয়েছিলেন। খেলার গতির বিরুদ্ধেই ২ গোল করেছে ফ্রান্স। দ্বিতীয়ার্ধেও বারবার বিপক্ষ বক্সে হানা দিতে থাকেন মদরিচ-রাকিতিচরা। এবার ধারার বিপরীতে এমবাপে ও পোগবা গোল করেছেন। আর দুষ্টামি মার্কা এক গোল করে ব্যবধান কমিয়েছেন মাঞ্জুকিচ।
এর আগে বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলই একমাত্র দল হিসেবে ১৯৭০ সালে ৪ গোল করেছিল। যাতে গোল ছিল টিনএজার পেলেরও। এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালেও পেলের সঙ্গী হয়েছেন ১৯ বছর বয়সি এমবাপে।
আসলে স্ট্র্যাটেজিতেই টেক্কা দিয়ে গেলেন ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম। দুই দশক আগে অধিনায়ক হিসেবে জিতেছিলেন বিশ্বকাপ। এবার জিতলেন কোচ হিসেবে। মারিও জাগালো, বেকেনবাওয়ারের পর তিনি তৃতীয় জন, তিনি ফুটবলার-কোচ হিসেবে জিতলেন বিশ্বকাপ।
ক্রোয়েশিয়ার সাথে এর আগে পাঁচবারের মোকাবেলায় কখনোই হারেনি ফ্রান্স, জিতেছে তিনবার; আর ড্র দুবার। এর আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও লিলিয়ান থুরামের জোড়া গোলে ক্রোয়েতদের ২-১ গোলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট কেটেছিল ফ্রান্স। তিন কিংবা তার বেশিবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা মাত্র ষষ্ঠ দেশ ফ্রান্স। সর্বোচ্চ আটবার ফাইনালে উঠেছে জার্মানি। ব্রাজিল ও ইতালি উঠেছে ছয়বার করে, আর আর্জেন্টিনা উঠেছে পাঁচবার। ফ্রান্সের সমান তিনবার ফাইনালে উঠেছে নেদারল্যান্ডসও; কিন্তু শিরোপা জিততে পারেনি কখনোই।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*