বিভাগ: সংস্কৃতি

বৈসাবি উৎসব : ফুল ভাসিয়ে শুরু জলকেলি দিয়ে শেষ

‘১২ এপ্রিল ভোরে চেঙ্গী, ফেনী ও মাইনী নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি’

54উত্তরণ ডেস্ক: রাজধানী ঢাকাসহ তিন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় নানা আচার-অনুষ্ঠান, হৈ-হুল্লোড়, র‌্যালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বর্ষবরণ উৎসব বিজু বা সাংগ্রাই বা বৈসাবি। তিন দিনের এই অনুষ্ঠান শুরু হয় জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে এবং শেষ হয় জলকেলি দিয়ে। এ উপলক্ষে ঢাকায় গত ১২ এপ্রিল সকালে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজন করে বৈসাবী উৎসবের। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু ৩টি অনুষ্ঠানের সমন্বয়ে পার্বত্য জেলাবাসীর এই উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী।
পার্বত্য জনপদ মুখরিত হয়ে উঠেছিল বৈসাবি উৎসবে। তিন দিনের এই অনুষ্ঠানে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। ১২ এপ্রিল ভোরে চেঙ্গী, ফেনী ও মাইনী নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি। পাহাড়ের কিশোর-কিশোরী ও ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কলাপাতায় করে ফুল তুলে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে নদী-খালে ভাসিয়ে পুরনো বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরের শুভ কামনায় নিজেদের পবিত্রতা কামনা করে। বর্ষবরণ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বাংলা বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনÑ এই তিন দিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব পালিত হয়। চাকমা সম্প্রদায় ১৩ এপ্রিল মূল বিজু আর পহেলা বৈশাখ বা গজ্জাপয্যা পালন করে। ওই দিন ঘরে ঘরে চলে অতিথি আপ্যায়ন। সেই সাথে সব বয়সী মানুষ নদী, খাল অথবা ঝরনায় গঙ্গা দেবীর পূজা আরাধনা করেন।
উৎসবের প্রথম দিনে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা আদিবাসীরা ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। এ উপলক্ষে সকালে পানখাইয়াপাড়ায় আয়োজন করা হয় মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা প্রতিযোগিতা। পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন। দুপুরে খাগড়াপুরে শুরু হয় ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্য উৎসব। ত্রিপুরা সম্প্রদায় হারিবৈসু, বিযুমা, বিসি কাতাল এবং মারমারা পেইংচোয়ে, আক্যে ও আদাদা এ উপলক্ষে ১৪ এপ্রিল মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই উৎসবে ঐতিহ্যবাহী জলকেলি বা পানি উৎসব করে।
এদিকে কাপ্তাই হ্রদের জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে রাঙ্গামাটিতে তিন দিনব্যাপী বৈসাবি উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে। ১২ এপ্রিল সকালে শহরের গর্জনতলী এলাকায় নানা বয়সের নারী-পুরুষকে নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলে ফুল ভাসিয়ে তাদের রীতি অনুযায়ী প্রণাম করে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। ভোর থেকেই বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ তাদের নিজস্ব পোশাকে সজ্জিত হয়ে ফুল ভাসাতে আসে কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে। ফুল ভাসানোর অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য স্মৃতি বিকাশ ত্রিপুরা। এ ছাড়া রাজবাড়ী ঘাটে ফুল বিজু পালন করা হয়। ফুল ভাসানোর পর ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বয়স্কদের মধ্যে কাপড় বিতরণ করা হয়। পরে সেখানে ত্রিপুরা সম্প্রদায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। এ ছাড়াও সকাল থেকে পাহাড়ি গৃহিণীরা নিমপাতা ও রং-বেরঙের ফুল দিয়ে ঘর সাজান। দিনভর চলে নানা আনুষ্ঠানিকতা ও অতিথি আপ্যায়ন।
১৩ এপ্রিল পালিত হয় মূল বিজু। এদিন ঘরে ঘরে পাঁচন রান্না করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন (মিশ্রিত সবজি) সবার প্রিয় খাবার। এদিকে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পহেলা বৈশাখ উৎসব পালন করার জন্য ব্যাপক আয়োজন করে। উৎসবের মধ্যে ছিল আনন্দ র‌্যালি, পান্তা উৎসব ও ডিসি অফিস প্রাঙ্গণে মেলা ইত্যাদি।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*