বিভাগ: আন্তর্জাতিক

ব্রেক্সিট নিয়ে গৃহবিবাদে ব্রিটেন

2-6-2019 8-43-22 PMসাইদ আহমেদ বাবু: ব্রেক্সিট হলো ব্রিটিশ এক্সিটের সংক্ষেপিত রূপ। অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তথা এক্সিট বোঝাতে ব্রেক্সিট শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
১৯৭৩ সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটির সঙ্গে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে গণভোট দিয়েছিল যুক্তরাজ্যবাসী। তাতে ৬৭ শতাংশ ইইসি’র পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ওই ইইসি-ই পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউ’তে রূপ নেয়, যার সদস্য সংখ্যা এখন যুক্তরাজ্যকে নিয়ে ২৮। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত দেশ যুক্তরাজ্য। প্রত্যেকটি ভূ-খ-ের নিজস্ব ভৌগোলিক অবস্থান-ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি রয়েছে। একেক ভূ-খ-ের মানুষের চাহিদার মধ্যেও ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। ১৯৯৩ সালে ইইউ নিজস্ব মুদ্রা, নীতিমালা, নাগরিকদের জন্য সীমানামুক্ত বিচরণসহ বেশ কয়েকটি আইনে পরিবর্তন আনে। কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিক ইইউর বিধিনিষেধ মেনে চলা নিয়ে বিপক্ষে অবস্থান নিলে ২০১৬ সালের ২৩ জুন গণভোট আয়োজন করে যুক্তরাজ্য। এই অনুষ্ঠিত গণভোটে অঞ্চলভিত্তিক ভোটের ফলাফলে পার্থক্য দেখা যায়। নাগরিকরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। গণভোটে প্রায় ৫২ শতাংশ ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। ২৮ জাতির ইইউ জোটের সঙ্গে চার দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন পথে হাঁটার প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের এই গণভোটকে সংক্ষেপে বলা  হচ্ছে ‘ব্রেক্সিট’।
ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের স্বপ্ন নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে ব্রিটেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখছেন। এ নিয়ে দেশটিতে তৈরি হয় জটিলতা। অনেকে এর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ব্রিটেনে এক ধরনের গৃহবিবাদ চলছে। দেশটির বিরোধী দল এই প্রস্তাবের শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছে। প্রায় এক বছর কেটে গেলেও এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ব্রিটেন। ফলে ব্রেক্সিট ব্রিটেন ও দেশটির প্রধানমন্ত্রীর জন্য বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৯ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে একটি চুক্তির ভিত্তিতে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ব্রিটেনের এই প্রস্থান কীভাবে হবে সে-বিষয়ে দেশটির সংসদ সদস্যরা একমত হতে পারছেন না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে না চাওয়ার কারণ
ক. ভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা : ইইউ’র সদস্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা ইউরো ব্রিটেনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই তারা স্রোতের বিপরীতে অর্থাৎ ইউরোর পরিবর্তে পাউন্ড-স্টার্লিং নিয়ে আছে।
খ. স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব : ব্রিটেনের অধিকাংশ মানুষ তাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক (মুদ্রা পাউন্ড-স্টার্লিং, জাতীয় পতাকা ও ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টে প্রণীত আইনের)-এর ওপর কারও হস্তক্ষেপ চান না।
গ. জাতীয় ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য : ইইউ’র আইনকানুন সবক্ষেত্রে ব্রিটেনের সঙ্গে সমগামী নয়। তাছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ততার কারণে ব্রিটেন তার জাতীয় ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য হারাতে চায় না।
ঘ. নাগরিক স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা : ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদের নাগরিকদের স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধাকেই বড় করে দেখে। তারা চায় না ব্রিটিশ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা কোনোভাবে বিঘিœত হোক।
ঙ. শুধু ব্যবসা : ব্রিটিশরা ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করতে চায়; কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে চাওয়ার কারণ
ক. রাজনৈতিক দলের দ্বিমত : ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার ব্যাপারে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা-নেত্রী ও সদস্যরা মোটামুটি একমত এবং না থাকার বিষয়ে রক্ষণশীল দলের নেতা-নেত্রী ও সদস্যরা বিভক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার ব্যাপারে লন্ডন মহানগরীর নাগরিকরা মোটামুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বলা চলে।
খ. ইউরোপ বাদ দিয়ে ব্রিটেন নয় : ইউরোপকে বাদ দিয়ে ব্রিটেন নয়। এমনকি যে স্কটল্যান্ড গত বছর ব্রিটেন ত্যাগ করে গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীন হতে চেয়েছিল, তারাও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার পক্ষে নয়।
গ. অর্থনৈতিক স্বার্থ : ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সম্প্রতি প্রকাশ্যেই বলেছেন, লন্ডনের শক্তিশালী অর্থনীতি ইইউ ত্যাগ করার ফলে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া এই নগরীতে চাকরি হারাতে পারে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। হাউস অব কমন্স এবং হাউস অব লর্ডস। হাউস অব কমন্সের সদস্য সংখ্যা ৬৫০। যারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। সরাসরি জনগণের প্রতিনিধি। আর হাউস অব লর্ডসে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০০-র মতো। এই সদস্যরা মনোনীত হন একটি সিলেকশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে যুক্তরাজ্যের রানি তাদের মনোনীত করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার আর মাত্র দু-মাস বাকি রইলেও এখনও ব্রিটিশ সরকার ঠিক করতে পারেনি তারা কোন শর্তে বেরিয়ে আসবে। সম্প্রতি পার্লামেন্ট ভোটাভুটির পর এ প্রক্রিয়া নিয়ে আরও জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ব্রিটেনে। এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বরে ব্রেক্সিটের বিষয়ে একটি বড় অগ্রগতি হয়েছিল। ব্রিটেনের সরকার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রেক্সিটের শর্ত ঠিক করার জন্য আলোচনা শুরু করে। সেই আলোচনার পর উভয় পক্ষ একটি চুক্তির বিয়য়ে একমত হয়েছিল। তেরেসা মে বলেন, ব্রেক্সিট নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে ব্রিটেনের জনগণ আর সময় অপচয় করতে চায় না। কিন্তু দেশটির প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে-র জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল সেই চুক্তি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অনুমোদন করানো। অনুষ্ঠিত সেই ভোটাভুটিতে তেরেসা মে-র সরকারের বড় পরাজয় হয়েছিল। এরপর ২৯ জানুয়ারি দিন শেষে ৭টি সংশোধনীর ওপর ভোট হয়। অধিকাংশ সংশোধনী বাতিল হয়ে যায় ভোটের মাধ্যমে। আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে নতুন আলোচনা ও চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট না হওয়া। তেরেসা মে-র কনজারভেটিভ পার্টির ভেতরে অনেক প্রভাবশালী সদস্য রয়েছেন, যারা এর বিপক্ষে। তারা চান ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সীমান্ত সম্পূর্ণ আলাদা হতে হবে। ফলে তেরেসা মে যে চুক্তি করেছিলেন সেটি বাস্তবায়নের ক্ষীণ হয়ে গেছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়, তেরেসা মে-র প্রস্তাবটি বাতিলের পক্ষে ৪৩২ সংসদ সদস্য এবং প্রস্তাবের পক্ষে ২০২ সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভোটাভুটিতে ১১৮ এমপি বিরোধী দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মে-র চুক্তির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর মাধ্যমে এই প্রথমবার দেশটির কোনো ক্ষমতাসীন সরকার পার্লামেন্টে এত বড় ব্যবধানে পরাজয়ের মুখোমুখি হলো।
ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রশস্ত করতে তেরেসা মে-র চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যই ছিল এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠান। তেরেসা মে-র প্রস্তাবিত চুক্তিটি অধিকাংশ সংসদ সদস্যরা বাতিল করায় তার সামনে এখন দুটো পথ খোলা আছে। প্রথমত, চুক্তির নতুন খসড়া তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের সময় বাড়িয়ে নেওয়া। তা না হলে কোনো রকমের চুক্তি ছাড়াই ২৭টি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে ব্রিটেনকে। এতে বেশ বড়সড় সংকটে পড়বে দেশটির অর্থনীতি তথা সামাজিক অবস্থা। ২৯ মার্চের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল ওই চুক্তিতে।
সাধারণ ক্ষেত্রে এ ধরনের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ওপর বিশাল পরাজয়ের পর আশা করা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। তবে ভোটাভুটির পরেই তেরেসা মে আভাস দিয়েছেন, তিনি সরকার পরিচালনা অব্যাহত রাখবেন। ভোটাভুটিতে ব্যর্থ মে এখন সব দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ব্রেক্সিটের বিষয়ে করণীয় ঠিক করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ব্রিটেনের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন কোনো দলের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় পরাজয় বলে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তেরেসা মে-র এই পরাজয়ের পর ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশটি। ইতোমধ্যে বিরোধী নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।
এই চুক্তি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছরের বিতর্ক, সমঝোতার সবকিছুই ভেস্তে গেল। আর অনিশ্চিত হয়ে গেল ব্রেক্সিটের ভবিষ্যৎ। এখন সরকারকে নতুন প্রস্তাব নিয়ে হাজির হতে হবে। এই বিশাল ধকল সামাল দিয়ে তেরেসা মে সরকারে টিকে থাকতে পারবেন কি না তা নিয়েও শুরু হয়েছে তোড়জোর।
মানুষের আশার চেয়েও বড় পরাজয় এবং এই ফলাফলের মাধ্যমে তেরেসা মে-র ব্রেক্সিট চুক্তির মৃত্যু ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। ব্রেক্সিট চুক্তি প্রত্যাখ্যানের পর পার্লামেন্টের বাইরে আনন্দ মিছিল করেছে যুক্তরাজ্যের সাধারণ জনগণ। এদিকে ভোটের ফলাফলে হতাশা প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক। তিনি ব্রেক্সিট প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারকে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানান। তেরেসা মে-র দল কনজারভেটিভ পার্টির অনেক এমপি ব্রেক্সিট চুক্তিতে সমর্থন না দিলেও তারা সাধারণ নির্বাচন আয়োজনে আগ্রহী নয়। মে’র ডিইউপি জোটের অংশীদার দলগুলো ব্রেক্সিট চুক্তির বিপক্ষে ভোট দিলেও আস্থা ভোটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পাশেই থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ব্রেক্সিট চুক্তির অন্যতম বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আলোচিত ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ কীভাবে পরিশোধ করবে যুক্তরাজ্য। এছাড়া যুক্তরাজ্যে বসবাসরত জোটের অন্য দেশগুলোর প্রায় ৩২ লাখ মানুষের অবস্থান কী হবে কিংবা ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাজ্যের প্রায় ১৩ লাখ নাগরিকের ভবিষ্যৎই বা কী হবে এগুলোও চুক্তির মধ্যে ছিল। এগুলো ছাড়া নর্দান আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার সমস্যার বিষয়টি তো ছিলই। এসব বিষয়ে চুক্তিতে যেসব সমাধান দিয়েছেন তেরেসা মে, তার বেশির ভাগই সদস্যদের পছন্দ হয়নি।
ব্রেক্সিট ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিম-লে ব্রিটেনের ভাবমূর্তি ক্ষুণœœ হচ্ছে। দেশটির অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতা বলয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডুবে গেছে ব্রিটেন। ব্রেক্সিট সংকট নিরসনে হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশটিকে।
তেরেসা মে-র ব্রেক্সিট চুক্তি বাস্তবায়িত হলে আগামী ২৯ মার্চ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সাবেক উপনিবেশবাদী দেশ ব্রিটেনের। কিন্তু এই পরাজয়ের ফলে এ নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা থেকেই গেল।
চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হলে কী ঘটতে পারে সে-বিষয়ে বিবিসি জানায়, তেমন কিছু হলে রাতারাতি ইইউ-র সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটবে ব্রিটেনের। যদিও মে’র সরকার এবং আরও অনেকেই এর বিরুদ্ধে। দেশটির অধিকাংশ এমপি বলেছেন, কোনোরকম চুক্তি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা ঠিক হবে না। এ-সংক্রান্ত একটি সংশোধনীর পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। তারা চান ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্ন হতে। কিন্তু পার্লামেন্ট বর্তমান ব্রেক্সিট চুক্তি মেনে নিতে নারাজ থাকলে এবং নতুন কোনো বিকল্প পাওয়া না গেলে চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট হয়ে যাবে ব্রিটেনের। তখন আর ইইউ-র বিধিনিষেধ মানতে হবে না দেশটিকে।
তবে মেনে চলতে হবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মকানুন। আমদানি-রপ্তানির ওপর নতুন শুল্ক আরোপ হবে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে খাদ্য এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ব্রিটেনে আসতে দেরি হবে। সেজন্য ব্রিটেনের বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, যুক্তরাজ্য এখন সবদিক থেকেই চাপে রয়েছে। আমাদের উচিত তাদের বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বের এই জটিল সময়টিতে তাদের সাথে মধ্যস্ততা করা। কেননা, ব্রিটেন পরিস্থিতি ঠিকঠাক সামাল দিতে পারছে না।
আয়ারল্যান্ডের সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে ভোটাভুটি অযথার্থ ব্রেক্সিট চুক্তির আশঙ্কাকে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জার্মান ভাইস চ্যান্সেলর ও অর্থমন্ত্রী ওলাফ স্কলজ বলেন, ইউরোপের জন্য একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার দিন ছিল। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে, কঠোর কোনো চুক্তি ইইউ ও যুক্তরাজ্যের জন্য মোটেও শুভ ফল বয়ে আনবে না।
ব্রেক্সিট চুক্তিকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়া যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত এই পরিবর্তন ব্রেক্সিট ইস্যুকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে, চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট কার্যকরের কথা মাথায় রেখে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে সরকারের কেবিনেট। এজন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের জন্য ২ বিলিয়ন পাউন্ড স্টারলিং অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাতে বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। এছাড়া, ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ থেকে চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট কার্যকরের কথা মাথায় রেখে পূর্ব প্রস্তুতির জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেবে সরকার। এ-রকম একটি নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকার কিংবা পার্লামেন্ট কেউই দিতে পারছে না সঠিক সমাধান। অথচ ব্রেক্সিট ইস্যু কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ।
ইইউ ত্যাগ করে একলা চলো নীতিতে ফেরা ব্রিটেনের জন্য কতটা সহজ বা দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার মতো, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা প্রয়োজন। তেমনিভাবে ইইউ-র সঙ্গে থেকে গেলে প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হবে বা আদৌ ব্রিটেনের জন্য ভালো কিংবা স্বস্তিদায়ক হবে কি না তা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ জরুরি। সেই সঙ্গে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
না হলে দিন দিন এই সংকট বাড়বে, তবে কমবে না। সমাজের ভেতর থেকে উঠে আসা প্রথম সারির দেশটির মনোযোগ ঘুরিয়ে দিতে পারে অন্যদিকে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দীর্ঘ আলোচনার পর অনুষ্ঠিত আস্থা ভোটে তেরেসা মে-র সরকারের প্রতি সমর্থন জানান ৩২৫ সংসদ সদস্য। আর অনাস্থা জানান ৩০৬ জন। এরপর তেরেসা মে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সব সংসদ সদস্যকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটস এবং প্লেড সাইমরু নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। এখন বিকল্প পন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে যুক্তরাজ্যের সরকার।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*