‘ভুবন মাঝি’

Posted on by 0 comment

57আবু সুফিয়ান আজাদ: ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত নাট্য চলচ্চিত্র। ছবিটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন ফাখরুল আরেফিন খান। এটি তার পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ১৯৭০ থেকে ২০১৩ সালের কিছু সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে ছবির গল্প সাজানো হয়েছে। ভুবন মাঝি চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশ সরকারের অনুদান লাভ করার পর ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ছবিটির মহরত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ছবিটির শুটিং শুরু হয়। ২০১৭ সালের ১ মার্চ ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সে চলচ্চিত্রটি উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয় এবং ৩ মার্চ সারাদেশে ১৫টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়।
চলচ্চিত্রটি একজন সাধারণ সংগ্রামী মানুষের জীবনে বিদ্রোহী হয়ে ওঠার গল্প। গল্পের শুরু ১৯৭০ সাল, শেষ ২০১৩ সাল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের অল্প কিছুদিন আগে নহির গ্রাম থেকে কুষ্টিয়া শহরে ডিগ্রি পড়তে আসে। দেশজুড়ে নির্বাচন আর স্বাধীনতার আন্দোলন তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করেনি। বরং চাচাত বোনের বান্ধবী ফরিদা বেগম আর থিয়েটার ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। অন্যদিকে নির্বাচন আর স্বাধীনতার আন্দোলনের রেশে গোটা বাংলাদেশ। প্রথম দিকে কোনো কিছুই তাকে বিচলিত না করলেও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে সে। ধীরে ধীরে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে ওঠে। পাল্টে যায় তার নিজের গল্প এক মুক্তিযোদ্ধার গল্পতে।
পরিচালক ফাখরুল আরেফিন জানান, গোটাটাই সত্যি ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ভুবন মাঝি। এমনকি চরিত্রগুলোর নামও রয়েছে অপরিবর্তিত। ভুবন মাঝি’র গল্পে রয়েছে মানবিক সবরকম অনুভূতি। বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ, এক যুগলের প্রেম, এক সংগ্রামীর বিদ্রোহ, এক দেশপ্রেমীর স্বাধীনতাবোধ ও নাট্যকর্মীর সংস্কৃতি সব চরিত্রের মিশেলে ‘ভুবন মাঝি’। ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ইতিহাস ও প্রেম, বিদ্রোহ ও মানবিকতা, স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি এসব নিয়ে গড়ে উঠেছে ভুবন মাঝির গল্প।
ছবিতে অভিনয় করেছেন কলকাতার পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের অপর্ণা ঘোষ। অপর্ণা অভিনয় করেছেন পূর্ব পাকিস্তানের সম্ভ্রান্ত ঘরের তরুণ ফরিদা চরিত্রে। আর পরমব্রতকে দেখা যায় লাল ভাবাদর্শের নহির বাউলের ভূমিকায়। আরও অভিনয় করেছেনÑ মামুনুর রশীদ, মাজনুন মিজান, নওশাবা, সুষমা সরকার, ওয়াকিল প্রমুখ। চলচ্চিত্রটিতে সবাই নিজ গুণের পরিচয় দিয়েছেন। অসাধারণ অভিনয় করে সকলকে মুগ্ধ করেছেন।
ভুবন মাঝি চলচ্চিত্রের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। এই চলচ্চিত্র দিয়ে তার সংগীত পরিচালনায় অভিষেক হয়। কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিটি সিকোয়েন্সের ভাব-গাম্ভীর্য গভীরভাবে অনুধাবন করে সংগীত সংযোজনের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
ছবিতে ৬টি গান রয়েছে, যার গীত রচনা করেছেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ও আকাশ চক্রবর্তী। এ ছাড়া দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানটিও এ ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সপ্তর্ষি, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, শিমুল ইউসুফ, বাপ্পা মজুমদার, পার্থ বড়–য়া, বুশরা শাহরিয়ার, কোনাল সালমা ও সাব্বির।
কানাডায় ষষ্ঠ টরেন্টো দক্ষিণ এশীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র বিভাগে বাংলাদেশের ৪টি ছবি প্রদর্শিত হয়। ভুবন মাঝি তন্মধ্যে একটি। অন্য ৩টি হলোÑ মাটির প্রজার দেশে, লাইভ ফ্রম ঢাকা এবং গোপন।
এ ছাড়া ২৬ মার্চের মহান স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে ২৫ মার্চে ক্যানবেরার ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড সাউন্ড আর্কাইভ অব অস্ট্রেলিয়াতে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। ম্যাক্স ইভেন্ট অস্ট্রেলিয়া ও বঙ্গজ ফিল্মস যৌথভাবে এ আয়োজন করে। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ফাখরুলের ছবিটি মুক্তির আগেই দেশজুড়ে সাড়া ফেলে। ছবিটি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে মানুষের মাঝে।
শুরুতে চলচ্চিত্রটি ১৫টি সিনেমা হলে মুক্তি পায়। পরিচালক ফাখরুল আরেফিন জানান, প্রথম দিকে ১৫টি সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দর্শক গ্রহণ করলে আরও বেশি হলে বাড়ানো হবে। কলকাতাতেও সিনেমাটি মুক্তি দেওয়ার ইচ্ছে রয়েছে তার। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তরুণরা এই সিনেমা ভালোভাবে গ্রহণ করবে। বাকিটা দর্শকের হাতে। কারণ আগে কখনও মুক্তিযুদ্ধের গল্প এভাবে দেখানো হয়নি। এটি একদমই ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মুক্তি উপলক্ষে তিনি বলেন, তার মধ্যে কোনো টেনশন কাজ করেনি, কোনো হা-হুতাশও কাজ করেনি। কারণ তিনি রুটিনমাফিক কাজ করেছেন এবং আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ।
চলচ্চিত্রটির নির্মাণ প্রসঙ্গে ফাখরুল বলেন, ’৭১-এর প্রেক্ষাপটে নির্মাণ হওয়ার কারণে সেই সময়ের চিত্র ফুটিয়ে তুলতে তার যথেষ্ট কষ্ট হয়েছে। কারণ সেই সময়কে ধারণ করে এমন স্থাপনাগুলো এখন তেমন নেই। বিনষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের কাস্টিং প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, গল্পের প্রয়োজনেই এ সিনেমার জন্য তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। পরিচালকের কাছে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কেই এই চরিত্রের জন্য উপযুক্ত মনে হয়েছে। গল্পে মুক্তিযুদ্ধের একটি পটভূমি বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি একজন বাউলকে পান। পরে তাকে নিয়ে কাজ করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এর পরে কুষ্টিয়া গিয়ে আরও ভালো করে রিসার্চ করেন। তখনই পরিচালক এই গল্পের একজন চরিত্র পান, যার নাম মতিউর রহমান। তার চরিত্রকে পরিচালক অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন এবং তাকে ঘিরেই ‘ভুবন মাঝি’র গল্পটি তৈরি।
উল্লেখ্য, ভুবন মাঝি চলচ্চিত্রটি  মুক্তির পর চলচ্চিত্রটির সংগীত পরিচালক কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য গত ৭ মার্চ এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে ছবিটি তাকে উৎসর্গ করা হয়। কালিকাপ্রসাদ ১৯৭১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর আসামের শিলচরে জন্ম করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪৭ বছর। কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য জনপ্রিয় লোকসংগীতের ব্যান্ড দল দোহার-এরও কর্ণধার,  ১৯৯৯ সালে তৈরি করা দলটি পশ্চিমবঙ্গের লোকসংগীতের অন্যতম গানের দল।
কালিকাপ্রসাদের আদিবাড়ি আসামের শিলচর হলেও বাংলাদেশের প্রতি তার ছিল অকৃত্রিম টান, ভালোবাসা। বাংলাদেশের যে কোনো অনুষ্ঠানে ডাক পেলেই ছুটে আসতেন। বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জন্মদিন কিংবা কোনো কলেজের অনুষ্ঠানেও তাকে গান গাইতে দেখা গেছে। কালিকাপ্রসাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর এমপি। বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে কলকাতার বাংলাদেশ উপদূতাবাসের প্রথম সচিব (প্রেস) মোফাকখারুল ইকবাল কালিকাপ্রসাদের মরদেহে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

Category:

Leave a Reply