ভেনেজুয়েলায় কী ঘটছে?

Posted on by 0 comment

Mfdসাইদ আহমেদ বাবু: ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে ক্যারিবীয় সাগরের তীরে একটি রাষ্ট্র। ‘একুশ শতকের সমাজতন্ত্র’র রূপকার খ্যাত প্রয়াত ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজ সেই দেশের অর্থনীতিকে বের করে এনেছিলেন পশ্চিমা কর্তৃত্ব থেকে। বলিভারিয়ান বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে অনন্য উচ্চতায় নিতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
স্থানীয় সরকারের এক সদস্য হাইদো ওর্তেগা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের সময় আন্দোলনে যেতে হতোÑ যেন বিদ্যুৎ পাই, পথঘাট ঠিক হয় কিংবা উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা হয়।’ চ্যাভেজ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের সমন্বয়ে একটি মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেন। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনেন তিনি। মার্কিন প্রতিষ্ঠানের বদলে তেল বিক্রির অর্থ জমা হতে থাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। ভেনেজুয়েলার তেল থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করেন তিনি।
সম্পদ-সমৃদ্ধ এদেশে চাভেজ সরকার ক্ষমতার আসার আগে ৬৬ শতাংশই প্রচলিত ‘দারিদ্র্যসীমা’র নিচে বসবাস ছিল। দেশের এই সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির, তার সহযোগী ছিল দেশি ধনিকরা। ১৯৯৮ সালে চাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর দেশের এই ক্ষমতা ভারসাম্যের আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। সব প্রতিকূলতার মধ্যে চাভেজের প্রথম দশকে ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো কমিউনাল কাউন্সিল, যা জনগণকে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সাংগঠনিক কাঠামো দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে চাভেজ বিদ্যমান রাষ্ট্রের সমান্তরাল রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন। দেশের সম্পদের ওপর সর্বজনের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সংস্কার শুরু করেছিলেন। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও শুরু হয়েছিল। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় এক সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন চ্যাভেজ। সামরিক বাহিনীর অস্ত্র আর আক্রমণ প্রতিহত করে কারাকাসের রাজপথে নেমে এলো গরিব নারী-পুরুষ। সারাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। উৎখাতের কয়েকদিনের মধ্যে ক্ষমতায় ফিরে তিনি ভেনেজুয়েলাকে একবিংশ শতাব্দীর সমাজবাদী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। ১৯৯৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তেল বিক্রির আয়ের মাধ্যমে লাখ লাখ ভেনেজুয়েলানকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেন চ্যাভেজ ও ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি। দেশটিতে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনেন তিনি। অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনেন শিক্ষা, চিকিৎসা আর জ্বালানি সেবায়।
এই সরকারের সঙ্গে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির বিবাদ তৈরি হয়, বিশ্বের বৃহৎ আর্থিক সংস্থা বড় ব্যবসা হারায়, যুক্তরাষ্ট্র তাই প্রথম থেকেই ‘একনায়ক’ চাভেজ-বিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকে। চাভেজ সরকার একের পর এক তাদের আক্রমণ, চক্রান্ত ও অন্তর্ঘাত মোকাবিলা করে অগ্রসর হয়েছে। গরিব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নিয়ে ক্রমান্বয়ে পাল্টা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর মধ্য দিয়েই এই চেষ্টা চলেছে।
দেশটির সাবেক প্রধান হুগো চাভেজ ২০১৩ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে নিকোলাস মাদুরো হন তার উত্তরসূরি। মাদুরো চাভেজের অনুসারী চাভেজের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। শেষে এক বছর চাভেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিপুল অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও চাভেজের শাসন শুরুর ২০ বছরের মাথায় এসে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে একবারে শেষপ্রান্তে। ২০১৫ সাল থেকে কমপক্ষে ২৭ লাখ মানুষ ভেনেজুয়েলা ছেড়ে পালিয়েছেন। যারা দেশের ভেতরে আছেন তারাও ক্ষুধার যাতনা আর স্বাস্থ্যসেবার অভাবে দিশেহারা। সে-কারণেই খোদ পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এ উদ্ধৃত সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, বিপন্ন এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সমাজতন্ত্রে আস্থা হারান নি। সংকট থাকলেও সে-জন্য চাভেজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বা মাদুরোকে দায়ী না করার মতো মানুষ রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, মাদুরোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ও অর্থনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে জুয়ান গুইদোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আনতে। তবে, সিরিয়া প্রেক্ষাপটকে উদাহরণ হিসেবে ধরে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা এত সহজ হবে না। কারণ, ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর সরকারকে সেদেশের সেনাবাহিনী ও বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রগুলো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাই ভেনেজুয়েলায় চলমান সংকটকে আগেভাগেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া বিশ্বনেতাদের এখন আশু কর্তব্য।
মিন্টপ্রেসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০১৪ সালের এক ঘটনা। সে-সময় ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ধ্বংসের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তৎপর হয় আরেক তেলসমৃদ্ধ শক্তি সৌদি আরব। আর্থিক ক্ষতি ও ঋণের বোঝা বাড়লেও কম দামে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখে তারা। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে নেমে আসে ২৮ ডলারে। তেলের দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে ভেনেজুয়েলা। শুরু হয় বাজেট কর্তন এবং অর্থনৈতিক ধস। দেখা দেয় খাবারের অভাব। ২০১৫ সালে ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঘোষণা করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ওবামা প্রশাসন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত চারবার ভেনেজুয়েলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলা যত তেল রপ্তানি করে তার মধ্যে ৪০ শতাংশ তেলই আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তেলের ওপর জারি করা এই নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন অন্যান্য দেশও ভেনেজুয়েলার তেলের দাম কমিয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, ২০১৩ সাল থেকে মাদুরোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া, চীন ও তুরস্ক। ফলে হয়তো পরিস্থিতি একই রকম থেকে যাবে।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে তার এই ঘোষণাকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশ। তবে ইরান, রাশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রকেই তার দেশের সংকটের পেছনে মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে ম্যানয়েল লোপেজ বেশ কূটনৈতিক একটি অবস্থান নিয়েছেন। মাদুরো ও গুইয়াদোর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে তা সমাধানের চেষ্টায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে রাজি হয়েছেন তিনি।
ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। খাবার ও ওষুধের মতো মৌলিক পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সেখানকার জনগণ। গুয়াইদো জোর দিয়ে বলছেন, লোকজনের সাহায্য প্রয়োজন। অন্যদিকে মাদুরো বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে দেশের ভেতরে সাহায্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে চীন। একইসঙ্গে চলমান সংকট সমাধানে ও ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায় দেশটি। সম্ভাব্য রক্তপাত এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ভেনেজুয়েলাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসও।
ভেনেজুয়েলার জনগণ দুই প্রেসিডেন্টের প্রতি নিজেদের সমর্থন ও আনুগত্য প্রকাশ করায় পুরো দেশের জনগণ এখন দ্বিধাবিভক্ত। বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে দুই প্রেসিডেন্টের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বশক্তিগুলোর দুই প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করায় রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে। আমেরিকা এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট গুয়াইডুর প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে। আমেরিকা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে ভূমিকা রাখার জন্য ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ‘একনায়ক’ আখ্যা দিয়ে অনির্বাচিত এক ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তাকে সমর্থন দিচ্ছে কানাডা, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশের সরকার। মার্কিন ও বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থ দেখতে সক্ষম এ-রকম সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মরিয়া বিশ্বদুর্বৃত্তরা। কারণ হলো ভেনেজুয়েলার সম্পদ ও দারিদ্র্য। দেখতে হবে এদেশে জনপন্থি নেতা চাভেজের চেষ্টা এবং তাতে কার ক্ষতি কার লাভ।
সম্পদ এবং দারিদ্র্য কীভাবে পাশাপাশি থাকে, তার উদাহরণ বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। ভেনেজুয়েলায় পশ্চিম গোলার্ধে প্রমাণিত তেল মজুত এদেশেই সবচেয়ে বেশি। গ্যাস সম্পদেও এদেশ অনেক সমৃদ্ধ, বিশ্বের নবম বৃহত্তম প্রমাণিত গ্যাস মজুত আছে এদেশেই, দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে এটি বৃহত্তম। কয়লা সম্পদ তুলনায় কম হলেও তার মজুতও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আছে লোহা, বক্সনাইট, সোনা, নিকেল ও হীরা। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে ভেনেজুয়েলার এই সমৃদ্ধিই তার কাল হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী এ থেকে লাভবান হয়েছে। দেশের জিডিপি, মাথাপিছু আয়, রপ্তানি বাণিজ্যÑ সবকিছুই বেশ রঙিন হয়েছে, কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য তার সুফল তৈরি হয়নি দীর্ঘকাল। বিশ্বের বহু দেশের মতো এদেশ আবারও দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি, সহিংসতা, লুণ্ঠন ও স্বৈরতন্ত্রে প্রবেশের হুমকির মধ্যে।
মাদুরো ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তিনি যদি হস্তক্ষেপ করেন তাহলে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরিণতি বরণ করতে হবে। এদিকে যে কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক অনধিকার চর্চা থেকে বিরত থাকার জন্য পশ্চিমা হুমকিদাতাদের সতর্ক করে দিয়েছে মাদুরোর মিত্র রাশিয়া। ভেনেজুয়েলার সমস্যা এখন আর তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়, এই সংকট এখন পুরো মহাদেশের শান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

Category:

Leave a Reply