বিভাগ: প্রতিবেদন

ভোটারদের চাপে বিরোধীদলীয় এমপিরা শপথ নিয়েছেন

PM

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্য রাজনৈতিক দল ভাঙা কিংবা তাদের এমপিদের শপথ নিতে সরকারের চাপ সৃষ্টির বিএনপির অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, বিরোধী দলগুলোর (বিএনপিসহ) যেসব এমপি শপথ নিয়েছেন তারা স্বেচ্ছায় ও ভোটারদের চাপে শপথ নিয়েছেন। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই, থাকার প্রশ্নই ওঠে না। আর অনেক প্রস্তাব এলেও আওয়ামী লীগ বিশেষ করে আমি (শেখ হাসিনা) কোনো দল ভাঙা বা অন্য কিছু করার নীতিতে বিশ্বাস করি না। অন্য দল ভাঙতে যাব কেন? যার যার দল সেই করুক। আওয়ামী লীগের অনেক লোকবল ও জনসমর্থন রয়েছে, অন্যের ভার নিতে যাব কেন? দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য আওয়ামী লীগ একাই যথেষ্ট। বাস্তবতা হচ্ছে, ক্ষমতা ছাড়া তারা (বিএনপি) রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারে না। কারণ, বাংলার মাটিতে তাদের কোনো শিকড় নেই।
গত ২৬ এপ্রিল বিকেলে গণভবনে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে গত ১০ বছরে পুরো দেশকে বদলে দেওয়ার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ার মতো ক্ষমতায় থাকতে আমরা কোনো এলিট-শ্রেণি তৈরি করিনি। আমরা তৃণমূল পর্যায় থেকে সারাদেশের মানুষের উন্নয়ন করেছি, দেশকেই বদলে দিয়েছি। গোটা বিশ্বও এখন বাংলাদেশকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের ঝুঁকি থেকে বাংলাদেশ এখনও পুরোপুরি মুক্ত নয় উল্লেখ করে এ-ব্যাপারে দেশবাসীর মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এ-বিষয়ে সরকার যথেষ্ট সজাগ ও সতর্ক রয়েছে। এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হলি আর্টিজানের পর থেকে আমরা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি বলেই আমাদের দেশে কেউ সুযোগ নিতে পারছে না।
কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন অনুযায়ী প্যারোলে মুক্তি পেতে আবেদন করতে হয়। খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে কোনো আবেদন করা হয়নি। তাই প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আর রাজনৈতিক কারণে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়নি, তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কোনো মামলাও দেয়নি। দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাতের কারণে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। টানা ১০ বছর মামলা চলার পর আদালতের রায়ে তার সাজা হয়েছে। বর্তমান সরকারের এ ব্যাপারে কোনো ইচ্ছে থাকলে মামলা নিষ্পত্তি হতে ১০ বছর লাগত না। আমরা আদালতের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ কিংবা চাপ দেইনি। আর বিএনপি এমপিদের শপথ নিতে আমরা চাপ দিতে যাব কেন? শপথ নেওয়া এমপিরাই তো বলেছেন, এলাকার ভোটারদের চাপে তারা শপথ নিয়েছেন এবং সংসদে গিয়ে তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলবেন।
তার সাম্প্রতিক ব্রুনাই সফর নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলন ডাকা হলেও প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের সর্বশেষ রাজনীতি, অর্থনীতি, রোহিঙ্গা ইস্যু, সাংগঠনিক বিষয় ছাড়াও সাংবাদিকদের বিভিন্ন ইস্যুতে করা প্রশ্নের স্বভাবসুলভ হাসিতে বিস্তারিত উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে এ-সময় মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন এমপি, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি এবং মৎস্য ও পশুসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু এমপি উপস্থিত ছিলেন। দেশের গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক ছাড়াও সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় সহযোগী সংগঠনের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম।

বিএনপি এমপিদের শপথ নিতে সরকারের কোনো চাপ নেই
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলগুলোর যেসব এমপি শপথ নিয়েছেন, তারা স্বেচ্ছায় শপথ নিয়েছেন। বিএনপির এমপিদের শপথ নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই। আর আমরা চাপ দিতে যাব কেন? তারা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। জনগণের চাপ আছে তাদের ওপর। আর বিএনপি একটা রাজনৈতিক দল। অন্য কোনো দল থেকে তাদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্যারোলের জন্য আবেদন করতে হয়। কিন্তু তারা যেহেতু এখনও আবেদন করেনি, তাই সে-ব্যাপারে কীভাবে বলি? আর আমরা খালেদা জিয়াকে কিন্তু গ্রেফতার করিনি। খালেদা জিয়া কোর্টের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত। মামলাটা আওয়ামী লীগ সরকারও করেনি। মামলাটি চলছে ১০ বছর ধরে। কিন্তু সরকার আদালতকে প্রভাবিত করেনি।
এ প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো দল ভাঙা বা অন্য কিছু করার নীতিতে আমি এবং আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে না। অনেক প্রস্তাব পাই। কিন্তু অন্য দলকে ভাঙতে যাব কেন? আওয়ামী লীগে যথেষ্ট লোকবল রয়েছে, অন্যের ভার কেন নিতে যাব? আওয়ামী লীগ একাই একশো। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে দেশ ও জাতির উন্নতি হয়, অন্য কোনো সরকারের আমলে দেশ ও মানুষের কোনো উন্নয়ন হয়নি। দেশের কিছু মানুষ তো রয়েছেই তারা সবসময় নিরানন্দে থাকেন। দেশের কোনো কিছুই তাদের চোখে পড়ে না। বাংলাদেশ যখনই খুব ভালো অবস্থায় থাকে তখনই আঘাত আসে। আমরা দেশের প্রবৃদ্ধি ৮ ভাগের ওপর নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। দেশ যখন দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত হবে তখন ষড়যন্ত্রও বেড়ে উঠবে। এটা আমরা জানি।

পরবর্তী নেতৃত্ব ঠিক করবে দল
আগামী কাউন্সিল এবং দলের নেতৃত্ব প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, অবসর নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কে আসবেন, এটা দলই সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে আমি কাউকে নির্ধারণ করে দিতে পারি না। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দেশের জনগণ ও দলই ঠিক করবে কে হবেন তাদের পরবর্তী নেতা। আর দেশের মধ্যে একমাত্র আওয়ামী লীগই পরিপূর্ণভাবে গঠনতন্ত্র মেনেই দলকে পরিচালনা করে। আমি ইচ্ছে করলেই সব কিছু করতে পারি না, যা অন্য দলগুলোতে হয় এবং করে।
প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ একটি রাজনীতিক দল, জনমানুষের দল। দলের একটি গঠনতন্ত্র রয়েছে, সে অনুযায়ীই দল পরিচালিত হয়। আগে প্রতিবছরই সম্মেলন হতো। কিন্তু এখন তা সম্ভব হয় না। কারণ, খরচাপাতিসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। জাতীয় সম্মেলনের আগে দেশজুড়ে তৃণমূলে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সম্মেলন হবে। এরই মধ্যে ৮টি টিম করে দিয়েছি, তারা কাজ শুরু করে দিয়েছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকেও ডিজিটালাইজড করতে কাজ করছি। এরই মধ্যে টিমও তৈরি করে দিয়েছি। দলের সবই ডিজিটালাইজড করে দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশের কমিটিগুলো একটি অ্যাপে নিয়ে আসা হবে। প্রয়োজনে গোপালগঞ্জে বসেই সব দেখতে পারব। এই কাজটি হলে সবই এক জায়গায় বসে এক ক্লিকেই সব জানা সম্ভব হবে।
রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া প্রসঙ্গে চারবারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবসর তো নিতেই হবে। এরপরে দলের নেতৃত্বে কে আসবেন কিংবা নেতা কে হবেনÑ সেটা বেছে নেবে দেশের জনগণ এবং আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, ক্ষমতায় এলে যে দেশের উন্নয়ন করা যায় সেটি আওয়ামী লীগ করে দেখিয়েছে। বাংলাদেশকে একটি সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে এসেছি। এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে নেয়।

বিশ্বের অনেক নামি-দামি পত্রিকাও বন্ধ হয়ে গেছে
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ছাপা পত্রিকার সামনে প্রযুক্তি যে বাস্তবতা দাঁড় করিয়েছে সেটা সংশ্লিষ্টদের মানতেই হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল বাংলাদেশে নয়, প্রযুক্তি সারাবিশ্বের মানুষের জন্য নানা সুযোগ সৃষ্টি করেছে, আধুনিকতার জায়গায় নিয়ে গেছে। সেজন্য এক ধরনের ধারাবাহিকতায় চলতে থাকলে হবে না। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
তিনি বলেন, সারাবিশ্বে অনেক নামি-দামি পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক পত্রিকা কেবল অনলাইন ভার্সনে চলে এসেছে। কাগজে ছাপা বন্ধ হয়ে গেছে তাদের, সোজা কথা অনলাইনে চলে এসেছে। এখন কাগজের ব্যবহার হয় না। এটা প্রযুক্তির প্রভাব। প্রযুক্তি এবং আধুনিকাতর প্রভাবে এভাবে বিবর্তন আসতে থাকবে। তাই বিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। এখনও অনেক চ্যানেল চাইছে। তথ্যমন্ত্রীর (ড. হাছান মাহমুদ এমপি) সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বললাম যত চাইছে, দিয়ে দিতে। কিছু না হোক, কিছু লোকের তো চাকরি হবে, কর্মসংস্থান হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সবকিছু ডিজিটালাইজড করে দিয়েছি, নিজস্ব স্যাটেলাইটও হয়েছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমেও টিভি চালানো যায়। তিন মাসের জন্য বিনা পয়সায় (টিভি চ্যানেল) চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু চ্যানেলগুলো সেভাবে নিচ্ছে না। অথচ বিদেশি জায়গায় অনেক টাকা দিচ্ছে। কীভাবে আমাদের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অল্প খরচে টেলিভিশন চালাতে পারে সেজন্য কথা চলছে। আর ভালো অনুষ্ঠান যারা করবে, মানুষ তাদের দেখবে। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষ, সুতরাং গ্রাহক (দর্শক) কখনও কমবে না। ওয়েজবোর্ডের ব্যাপারে সরকারের যা করণীয়, তা করেছে। বাকিটা মালিক পক্ষের, সেখান থেকে সাংবাদিকরা যা আদায় করে নিতে পারেন, সেটা তাদের ব্যাপার।
ব্রুনাইয়ে প্রথম সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজী হাসান আল-বলকিয়ার আমন্ত্রণে গত ২১ থেকে ২৩ এপ্রিল ব্রুনাই সফর করি। ব্রুনাই ১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। এর পরপরই দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৯৯৭ সালে আমার সরকারের উদ্যোগে ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন পুনঃস্থাপনের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত বিগত এক দশকে ব্রুনাইয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*