বিভাগ: যুদ্ধাপরাধ

ভয়ঙ্কর খুনি সাকা ও মুজাহিদকে মৃত্যু পরোয়ানা শোনানো হয়েছে

06উত্তরণ প্রতিবেদন: মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দ-প্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। দুই আসামির আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ১ অক্টোবর এ পরোয়ানা জারি করেন। সেদিন দুপুরেই ট্রাইব্যুনালের বিশেষ বার্তাবাহক লাল খামে করে মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কিছুক্ষণ পরই কারা কর্মকর্তারা গিয়ে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যু পরোয়ানা রাতে নিয়ে যাওয়া হয় কাশিমপুর কারাগারে। নিয়ম অনুযায়ী সেখানে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয় সাকা চৌধুরী নামে পরিচিত এই আসামিকে।  দুজনকেই জানানো হয় পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে ১৫ দিনের মধ্যে তারা সুপ্রিমকোর্টের অপিল বিভাগে রায় রিভিউর জন্য আবেদন করতে পারবেন। আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন বলেন, মৃত্যু পরোয়ানা হাতে পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ম অনুযায়ী তাদের পড়ে শোনানো হয়েছে।
মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ থেকে। সেই রাতেই রায়ের কপি পাঠানো হয় ট্রাইব্যুনালে। ১ অক্টোবর রায় দুটি ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি মৃত্যু পরোয়ানা প্রস্তুত করে তাতে স্বাক্ষর করেন।
ফাঁসির দ-প্রাপ্ত সাবেক মন্ত্রী ও জামাত নেতা মুজাহিদকে রাখা হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেড সেলে। এই সেলের যে কক্ষটিতে কামারুজ্জামানকে রাখা হয়েছিল সেটিতে তাকেও রাখা হয়েছে। কক্ষটি ফাঁসির মঞ্চের কাছেই। কারা সূত্রমতে, আপিলের রায় ঘোষণার আগের দিন ১৫ জুন তাকে নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। রায়ের কপি কারাগার ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর সাকা চৌধুরীর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের সাথে দেখা করে আইনি পরামর্শ করেছেন বলে জানা গেছে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গাজীপুরে কাশিমপুর কারাগার পার্ট-১-এ বন্দী রয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদ-ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ায় এই দুই অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পথে আর দুটি ধাপ বাকি থাকল। এ দুটি ধাপ হলো রিভিউ আবেদন ও রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন। আপিল বিভাগের এই রায় রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করতে আসামিরা ১৫ দিন সময় পাবেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ায় ৩০ সেপ্টেম্বর থেকেই রিভিউ আবেদনের দিন গণনা হবে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, তারা রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর দিন গণনা শুরু হবে। এই দুই সাবেক মন্ত্রীর মৃত্যুদ- বহাল রেখে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে আলাদা দিনে সংক্ষিপ্ত রায় দিলেও ৩০ সেপ্টেম্বর একই দিন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এই বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। গত ১৬ জুন মুজাহিদের এবং ২৯ জুলাই সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদ- বহাল রেখে সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।
মুজাহিদের মামলায় ১৯১ পৃষ্ঠার এবং সাকা চৌধুরীর মামলায় ২১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপিতে চার বিচারপতি সই করার পর ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেলে তা সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এই রায় প্রকাশের পর রিভিউ আবেদন করতে ১৫ দিন সময় পাচ্ছেন আসামিরা।
এ দুটি আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর জামাতের সিনিয়র নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ অপেক্ষাধীন থাকল। নিয়মানুযায়ী রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার পর ফাঁসির দ- বহাল থাকলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করার সুযোগ পাবেন মুজাহিদ ও সাকা। মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রে রিভিউ আবেদন আপিল বিভাগ খারিজ করার পর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করার জন্য সরকার বেশ কয়েক দিন সময় দিয়েছিল। তার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ গত ৬ এপ্রিল রিভিউ আবেদন খারিজ করেন। রিভিউয়ের রায় প্রকাশ করা হয় ৮ এপ্রিল। এরপর রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করার জন্য সরকার তাকে সময় দেয়। ১০ এপ্রিল কামারুজ্জামান কারা সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেন তিনি ক্ষমা চাইবেন না। এটি জানানোর পর সেদিন রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যাসহ ৩টি অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মৃত্যুদ- দেন। ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে আনা ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগে সাজা এবং দুটি অভিযোগ থেকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রমাণিত হওয়া অভিযোগের মধ্যে ৩টিতে মৃত্যুদ-, একটিতে যাবজ্জীবন কারাদ- ও একটিতে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে মুজাহিদ ওই বছরের ১১ আগস্ট আপিল করেন। ১৬ জুন আপিল বিভাগ মৃত্যুদ- বহাল রেখে রায় দেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন মুজাহিদকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়। সেই থেকে তিনি কারাবন্দি।
একাত্তরে চট্টগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করা এবং একের পর এক গণহত্যা, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদ- দিয়ে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এসবের মধ্যে ৪টিতে মৃত্যুদ-, ৩টিতে ২০ বছর করে কারাদ- ও দুটিতে পাঁচ বছর করে কারাদ- দেওয়া হয়। বাকি ১৪টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সাকা ওই বছরের ২৯ অক্টোবর আপিল করেন। ২৯ জুলাই রায় দেন আপিল বিভাগ। ২০১০ সালের ২৬ জুন হরতালের আগের রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর একটি ঘটনায় একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর সাকা চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ১৯ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেওয়া হয় ট্রাইব্যুনালে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*