বিভাগ: অন্যান্য

মঙ্গল কামনায় দুর্গোৎসব ও আশুরা

41উত্তরণ প্রতিবেদন: দুর্গাপূজা : গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকের বাদ্য, নৃত্যগীত আর সিঁদুর খেলা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো হিন্দু ধর্মের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের অবাঙালিরাও ভিন্ন ভিন্ন নামে এই উৎসব পালন করে। যেমন কাশ্মীর ও দাক্ষিণাত্যে অম্বা ও অম্বিকা, গুজরাটে হিঙ্গুলা ও রুদ্রাণী, কান্যকুব্জে কল্যাণী, মিথিলায় উমা এবং কুমারিকা প্রদেশে কন্যাকুমারী নামে দেবীর পূজা ও উৎসব পালিত হয়। হিন্দু ধর্মে তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, সিংহবাহনা ইত্যাদি নামে অভিহিত হন। দুর্গ বা দুর্গম নামক দৈত্যকে বধ করেন বলে তার নাম হয় দুর্গা। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলেও তাকে দুর্গা বলা হয়। ব্রহ্মার বলে অবধ্য মহিষাসুর নামে এক দানব স্বর্গরাজ্য দখল করলে রাজ্যহারা দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণুর নির্দেশে সকল দেবতার তেজঃপুঞ্জ থেকে যে দেবীর জন্ম হয় তিনিই দুর্গা। দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হয়ে এই দেবী যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন। তাই দেবীর এক নাম হয় মহিষমর্দিনী। কালীবিলাসতন্ত্র, কালিকাপুরাণ, দেবীভাগবত, মহাভাগবত, বৃহন্নন্দিকেশ্বরপুরাণ, দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী, দুর্গোৎসববিবেক, দুর্গোৎসবতত্ত্ব প্রভৃতি গ্রন্থে দেবী দুর্গা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই দুর্গাপূজার মূল তাৎপর্য। পূজা শেষে বাবার বাড়ি থেকে ‘আনন্দময়ী’ দেবী দুর্গা ফিরে গেছেন কৈলাসের দেবালয়ে। বিজয়ার ১০ দিন আগে মহালয়ার পুণ্য তিথিতে দেবীদুর্গা মর্ত্যে আবাহনের মাধ্যমে যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, বিজয়া দশমীতে ‘বিহিত পূজা’ আর ‘দর্পণ বিসর্জনে’ দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটে। সারাদেশে কড়া নিরাপত্তায় শেষ হয় পূজা এবং প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা। সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) নৌকায় চড়ে আসায় দেশে হবে অতি বৃষ্টি ও শস্য বৃদ্ধি। আর স্বর্গালোকে ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে যাওয়ায় রোগ-ব্যাধি বাড়বে ও হবে ফসল নষ্ট। তবে ভক্তদের বিশ্বাস, ফল যা-ই হোক মা মঙ্গলময়ী, আনন্দময়ী তিনি জগতের কল্যাণ করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী; দেবী দুর্গা যে কদিন পিতৃগৃহে ছিলেন, ঢোলের বাদ্য সে কদিন ভক্তদের মনে ভক্তি আর আনন্দ মূর্ছনা দুই-ই জাগিয়েছে। বিজয়ার দিন সকালে সকল ম-পে দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও বিসর্জনের আগে দেশের ম-পে ম-পে দুপুর পর্যন্ত চলে সিঁদুর খেলা আর আনন্দ উৎসব। মহাদশমী পূজা অন্তে 42গৃহবধূরা একে অপরকে সিঁদুর দান, আলিঙ্গন ও দেবী দুর্গা মায়ের পায়ে ছোঁয়ানো সিঁদুর নিজের সিথীতে লাগিয়ে পুরহিতের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন ম-পে ম-পে। ম-প এলাকা পরিণত হয় এক মহামিলন ক্ষেত্রে। পূজার কদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে হতেই সারারাত নির্ঘুম কাটানোর ফলে চোখে ঘুম ঘুম ভাব থাকলেও যেন কোনো ক্লান্তির প্রভাব লক্ষ করা যায়নি ভক্তদের চেহারার মাঝে। ম-প থেকে ম-পে ঘুরে ফিরেছেন অগণিত ভক্ত। বিজয়া দশমী উপলক্ষে দিনটি ছিল সরকারি ছুটি। এদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। ধর্ম যার যার উৎসব সবারÑ এ বিশ্বাসে সম্প্রীতির এক অটুট বন্ধনের মধ্য দিয়ে আর প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য নির্বিঘেœ শেষ হলো চার দিনব্যাপী দুর্গা উৎসবের। বিএনপি-জামাত আমলে দুর্গোৎসবের পূর্বে জঙ্গি তৎপরতা ও সারাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার কারণে পূজায় গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কার ছায়া পড়েছিল। পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ম-পের সংখ্যা বেড়েছে। সারাদেশে ৩০ হাজার ৭৭টি ম-পে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
আশুরা : গত ১ অক্টোবর পবিত্র আশুরা কারবালা প্রান্তরের বিয়োগান্তক ঘটনার ঐতিহাসিক দিন। এ দিনেই বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে শহীদ হন। সেই থেকে মুসলিম বিশ্বে কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে ত্যাগ ও শোকের প্রতীক হিসেবে পালন করা হয়। তবে ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা স্মরণে প্রতিবছর আশুরা পালিত হলেও আরও অনেক কারণে এই দিনটি ইসলামে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসের বর্ণনামতে, পৃথিবী সৃষ্টি থেকে শুরু করে অনেক ঘটনাই এ দিনে সংঘটিত হয়েছে। আজকের এ দিনেই পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাবে। ইসলামের পরিভাষায় এ দিনটি আরও অনেক কারণে পবিত্র দিন। কারণ ১০ মহররম তারিখে পৃথিবী ও আসমান সৃষ্টি করা হয়েছিল। এ দিনে পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়। এ দিনেই হযরত ইব্রাহিম আ. নমরুদের অগ্নিকু- থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। ফেরাউনকে নীলনদে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ দিনেই নুহ (আ.)-এর কিস্তি ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তিনি জুদি পাহাড়ে নোঙ্গর ফেলেছিলেন। এ দিনেই হযরত ইসা (আ.)-কে ঊর্ধ্ব আকাশে তুলে নেওয়া হয়েছে।
আরবি ৬০ হিজরিতে এজিদ বিন মুয়াবিয়া পিতার মৃত্যুর পর নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। শাসক হিসেবে সে ছিল স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী তাই ইমাম হোসেন (রা.) তার আনুগত্য করেন নি। ইসলামের সংস্কারের জন্য মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে আসেন। সেখান থেকে কুফার উদ্দেশে যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কারবালার উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই সময়ে উমর বিন সাদ আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে ৪ হাজার সৈন্য কারবালায় প্রবেশ করে। কয়েক ঘণ্টা পর সীমারের নেতৃত্বে বহু সৈন্য এসে তার সাথে যোগ দেয়। কারবালায় দুপক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। অসম এই যুদ্ধে ইমাম হোসেন এবং তার ৭২ জন অনুসারী মৃত্যুবরণ করেন। সীমার নিজে ছুড়ি চালিয়ে ইমাম হোসেনকে হত্যা করে। সেদিন ছিল আরবি ৬১ হিজরির ১০ মহররম।
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা কারবালার ঐতিহাসিক ত্যাগের ঘটনাকে স্মরণ করে জাতীয় জীবনেও ত্যাগের দৃষ্টান্ত অনুসরণসহ মুসলিম উম্মার সুখ সমৃদ্ধি এবং শান্তি কামনা করেছেন। এ বছর পুলিশি নিরাপত্তা ছিল আরও বেশি। এছাড়াও মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বকশিবাজার, লালবাগ, পল্টন, মগবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও আশুরার মিছিল বের করা হয়েছে। শিয়া সম্প্রদায় ছাড়াও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি পবিত্র কোরআনখানি, ওয়াজ ও মিলাদ মাহফিল, জিকির-আজকার, আলোচনা সভা, নফল নামাজ আদায়, দান-খয়রাতের মাধ্যমে পালন করেছেন। অনেকে নফল রোজাও রাখেন এই দিনে। আশুরা উপলক্ষে বেতার ও টেলিভিশনে প্রচার করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠানমালা, সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশ হয়েছে বিশেষ নিবন্ধ।
গ্রন্থনা : সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*