বিভাগ: উত্তরণ ডেস্ক

মারিদায় দুর্ধর্ষ জঙ্গি সবুজ এবং ১১ সহযোগী গ্রেফতার

36

বাংলাদেশ-স্পেনে একযোগে জঙ্গিবিরোধী অভিযান

উত্তরণ প্রতিবেদনঃ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য ছিল সিরিয়ায় নিহত জঙ্গি সাইফুল হক সুজন ওরফে সিফুলের ভাই বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী আতাউল হক সবুজ স্পেনে পলাতক। আইটি ফার্মের আড়ালে সে দেশি-বিদেশি জঙ্গিদের অর্থায়ন করছে এমন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত গত ২২ সেপ্টেম্বর স্পেনের এপ্রিমাদুরা প্রদেশের মারিদা শহরে তার খোঁজ পায় সেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর ওই দিন বিকেল ৫টা থেকে ৮টা পর্যন্ত বাংলাদেশ-স্পেনের মধ্যে তাৎক্ষণিক যৌথ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে মারিদা, ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীতে একযোগে অভিযান শুরু হয়। অভিযানে স্পেনে গ্রেফতার হয় জঙ্গি অর্থায়ন মামলার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামি আতাউল হক সবুজ। একই সময়ে অভিযান চালিয়ে তার ১১ ‘সহযোগী’কে বাংলাদেশের তিন জেলা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর রূপনগর থানায় গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দুই দেশে একই সময়ে এ ধরনের অভিযানকে পারস্পরিক সহযোগিতার ‘উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত’ বলে অভিহিত করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমতিতে স্পেনের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট যোগাযোগ করে। দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যবিনিময় ও তৎপরতার কারণে সবুজ ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা গেছে। এদিকে চীনা বার্তা সংস্থা শিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সাথে জড়িত অভিযোগে ২২ সেপ্টেম্বর ৩৪ বছর বয়সী এক বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করেছে স্পেনের পুলিশ।
জানা যায়, সন্ত্রাস দমন ও জঙ্গি অর্থায়নের একাধিক মামলায় আসামি সবুজ। এরই মধ্যে তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে স্পেনে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল।
র‌্যাব জানায়, সবুজ ‘আইসিংকটেল’ ও ‘ওয়াহমি টেকনোলজি’র নামে দুটি আইটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। দেশে গ্রেফতার ১১ জনের মধ্যে ৮ জন পল্লবীর ‘ওয়াহমি টেকনোলজি’তে কর্মরত ছিল। যারা মূলত সবুজের অনুসারী। তারা একসময় আইব্যাকসেও কাজ করত। ‘আইসিংকটেল’ থেকে ওয়াহমির অনুকূলে বিপুল অর্থ পাঠানো হয়। সুজনের প্রতিষ্ঠিত ‘আইব্যাকস’ বন্ধ হওয়ার পর ‘আইসিংকটেল’ ও ‘ওয়াহমি টেকনোলজি’ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে আড়ালে জঙ্গি অর্থায়ন করে সে। এরই মধ্যে সবুজ যে অর্থ পাঠিয়েছে যার ৫৩ শতাংশই জঙ্গি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে বলে তথ্য আছে র‌্যাবের কাছে।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, ওয়াহমি টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে জঙ্গিদের অর্থায়নের সাথে জড়িত। এরই সূত্র ধরে র‌্যাব-৪-এর একটি দল ধারাবাহিক অভিযানে ১১ জনকে গ্রেফতার করে। ২২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীতে এ অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে পল্লবীর ই/২ নম্বর রোডের ১৫০ নম্বর বাড়িতে ওয়াহমির কার্যালয় থেকে ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলোÑ হেলাল উদ্দিন, আল আমিন, ফয়সাল ওরফে তুহিন, আল মামুন, আল আমিন (২), আমজাদ হোসেন, মঈন খান ও জাহেদুল্লাহ। রাজশাহী থেকে নাহিদ এবং খুলনা থেকে তাজুল ইসলাম ওরফে শাকিল ও টলি নাথকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১১টি ল্যাপটপ, ১২টি মোবাইল ফোন, ৭টি কার্ড পাঞ্চিং মেশিন, পাসপোর্ট ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে স্পেনের এপ্রিমাদুরা প্রদেশের মারিদা শহরে অভিযান চালিয়ে জঙ্গি অর্থায়ন চক্রটির হোতা আতাউল হক সবুজকে গ্রেফতার করে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মুফতি মাহমুদ খান জানান, গ্রেফতারদের বেশিরভাগই আগে ‘আইব্যাকস লিমিটেডে’ কর্মরত ছিল। ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশসহ ৯টি দেশে পরিচালিত হতো। এর চেয়ারম্যান ছিল সিফুল হক সুজন। সে ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর সিরিয়াতে বিমান হামলায় নিহত হয়। এরপর ওই বছরের ২৫ ডিসেম্বর জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে বাংলাদেশে আইব্যাকসের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ও বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জঙ্গি অর্থায়নের ৫০ হাজার মার্কিন ডলারসহ (৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা) নাহিদ নামে সুজনের এক সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে জানা যায়, ওই টাকা জঙ্গি বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেটের হাত ঘুরে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। এ ঘটনায় সাতজনকে আসামি করে মামলা হয়। তাদের পাঁচজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল। এর মধ্যে সুজনের বাবা হাসনাত কারাগারে মারা যান। বাকি চার আসামি জামিনে রয়েছে। তাদের মধ্যে নাহিদ ও তাজুলকে এবারের অভিযানে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*