বিভাগ: সম্পাদকীয়

মার্চ : গৌরব ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মাস

3-4-2018 7-16-48 PMমার্চ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গৌরব ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মাস। বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শুভ জন্মদিন, এই মাসের ১৭ তারিখ। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে নানা তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে। বলা হয়ে থাকে জনগণ হচ্ছে ইতিহাসের নির্মাতা। এ কথাটা যেমন সত্য, তেমনি ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ভূমিকা হয়ে ওঠে ইতিহাস নির্মাণের অনুঘটক এবং নিয়ামক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তেমনি বাঙালির স্বাধীনতা ও জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহানায়ক। ১৭ মার্চ তাই আমাদের সৌভাগ্যের দিন, আনন্দের দিনÑ উৎসবের দিন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ওই মহামানব আসে। দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে…। ১৭ তারিখ মহামানব শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব দিবস হিসেবে আমাদের রোমাঞ্চিত করে, উদ্বেলিত করে। শুভ জন্মদিনে জাতির পিতার প্রতি আমাদের নমিত শ্রদ্ধা।
৭ মার্চ ও ২৬ মার্চ এক সুতোয় গাঁথা পরিপূরক দিন। আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ যদি মুক্তিযুদ্ধকালে ‘৭ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করতেন তাতে ইতিহাসের তেমন কোনো ব্যত্যয় ঘটত না। বিষয়টার তৎকালীন রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশনের কারণে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চ-ই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংগ্রামের লক্ষ্য ও চরিত্র নির্ধারণ করে দেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রামÑ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’Ñ এই ঘোষণার মধ্যেও কোনো দ্ব্যর্থবোধকতা ছিল না। তবে এটাকে টেকনিক্যালি ‘আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা’ বলা যায় নি; কারণ তখন তা করলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে, বঙ্গবন্ধুকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পেত। দ্বিতীয়ত; ৭ মার্চের ভাষণ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক ধরনের আল্টিমেটাম। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই দাবি উত্থাপন করে বলেছিলেন, “আমার দাবি মানতে হবে প্রথম। সামরিক আইন, মার্শাল ল’ উইথড্র করতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের বিচার করতে হবে। এবং জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর আমরা ভেবে দেখব এসেমব্লিতে বসতে পারি কি না।” সাদামাঠাভাবে কেউ বলতে পারেন, এই দাবি মেনে নেওয়া হলে, অর্থাৎ জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে তো, মেজরিটি পার্টি আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে হতো। তার মানে দাঁড়াত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করত আওয়ামী লীগ। দৃশ্যত, এ রকম ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। তর্কের খাতিরে বলাও যায়, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যদি এই দাবি মেনে নিত, তাহলে তো পাকিস্তান ঐ যাত্রায় টিকে যেত।
কিন্তু ইতিহাস এত সহজ-সরল পথে চলে না। বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনোই বাঙালিদের হাতে নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারে না। বঙ্গবন্ধু এটা জেনে-বুঝেই ৭ মার্চের ভাষণে এসব পূর্বশর্ত দিয়েছিলেন। আইনের দৃষ্টিতে যা ন্যায়সংগত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও যুক্তিসংগত ছিল। ৭ মার্চ সংগ্রামের লক্ষ্য স্বাধীনতা ঘোষিত হলেও, এই যে ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি’ বঙ্গবন্ধু দেন নি, এটি তার রাষ্ট্র নায়কোচিত দূরদর্শিতা এবং দেশবাসীকেও চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। ৭ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলে, যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রথম আক্রমণকারী হিসেবে বাংলাদেশকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দায়ী করত। আর ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার পথে আর কোনো রাজনৈতিক, নৈতিক, আইনগত এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বাধা থাকে না। বস্তুত, ৭ মার্চেরই যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে ২৬ মার্চ, আমাদের প্রিয়তম স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এখন সমগ্র মানব জাতির ঐতিহাসিক দালিলিক মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে। এই অর্জনের পটভূমিকায় এবারের স্বাধীনতা দিবস নিঃসন্দেহে নবতর তাৎপর্য অর্জন করেছে। ৭ মার্চ ও ২৬ মার্চÑ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে আমরা স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদানের স্মৃতি। শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই প্রিয় দেশবাসীকে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*