বিভাগ: আন্তর্জাতিক

মালয়েশিয়ায় নির্বাচনে মাহাথিরের অভূতপূর্ব জয়

june2018সাইদ আহমেদ বাবু: মালয়েশিয়ায় গত ৯ মে অনুষ্ঠিত ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাশনাল (বিএন)-কে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী পদে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নির্বাচিত নেতা হিসেবে ইতিহাস গড়লেন মাহাথির মোহাম্মদ। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর থেকে রাজনৈতিক জোট বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার শাসনক্ষমতায় থেকেছে। মাহাথির মোহাম্মদ অতীতেও প্রধানমন্ত্রীর এবং বারিসান ন্যাশনাল প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২২ বছর তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। ২০০৩-এ তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান।
যে মাহাথির মোহাম্মদের হাত ধরে মালয়েশিয়া আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই ব্যক্তির হাত ধরে দেশটিতে ঘটে গেল আরেক বিপ্লব। সুদীর্ঘ ৬০ বছরের শাসক-জোটের পতন ঘটালেন তিনি। নির্বাচনে প্রমাণিত হলো যে কারও ‘সৎ কর্ম, মহৎ কর্ম কখনও হারিয়ে যায় না’। মাহাথিরকেও হারিয়ে যেতে দেয়নি মালয়েশিয়ার জনগণ তার কাজের জন্য। তাকে আবার প্রধানমন্ত্রী করেছে তারা। সততা, সৎ চিন্তা, বুদ্ধিদীপ্ত মানসিকতা এবং নেতৃত্বের প্রগাঢ়তার কারণে মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
শুধু বৈশ্বিক অঙ্গনেই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিবাচক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সারথি হিসেবে, দক্ষ প্রশাসক হিসেবে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মাহাথির মোহাম্মদের প্রথিতযশা ভূমিকা অগ্রগণ্য। ব্যক্তিগত কারিশমা, জনগণের নিকট জবাবদিহিতা, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা তথা আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের মননশীলতার পতাকাবাহী ব্যক্তিক সমীক্ষায় অন্য যে কোনো প্রার্থীর চেয়ে মাহাথিরের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনামূলকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। মালয়েশিয়ার নির্বাচনে মাহাথির মোহাম্মদই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাপকাঠি হিসেবে কাজ করেছেন। ব্যক্তি মাহাথির যেখানে নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন, সেখানে দলের ভূমিকা কিয়দংশ হলেও গৌণ ছিল। কারণ, মাহাথির যে দলের হয়ে দীর্ঘ ২২ বছর দেশ শাসন করেছিলেন সেই দলের বিরুদ্ধে এবং তার সাবেক শিষ্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কারিশমা দেখিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং বলা চলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল রাষ্ট্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদকে মালয়েশিয়ার জনগণ পুনরায় রাজনীতিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং দেশ পরিচালনার দায়িত্বও প্রদান করেছেন দেশের কল্যাণার্থে। পাশাপাশি, মালয়েশিয়ায় যে দুর্নীতি এবং অরাজকতার সংস্কৃতি বিরাজ করেছিল তার থেকে পরিত্রাণের জন্য মালয়েশিয়ার জনগণ নানাবিধ উপায় কিংবা প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান করেছিল। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার শেষে মালয়েশিয়ার জনগণ ব্যালট বাক্সকেই বেছে নেয় প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে এবং সেখানে তাদের প্রিয় মানুষ মাহাথির মোহাম্মদকে নির্বাচিত করে রাষ্ট্রক্ষমতায় এনেছেন মালয়েশিয়ার জনগণ পরবর্তী সরকার পরিচালনার জন্য।

যেভাবে বদলে দিলেন মালয়েশিয়াকে
মালয়েশিয়ার আমূল পরিবর্তনে শুরু থেকেই স্বপ্ন দেখেছেন মাহাথির। ক্ষমতায় এসে একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নও করেছেন সেগুলো। দেশটির ২০২০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মসূচিও তার ঘোষণা করা ছিল। মাহাথির শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দিকÑ
মালয়েশিয়ার সকল মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন তিনি। মালয়েশিয়ানদের শিক্ষার ৯৫ শতাংশ খরচ সরকার বহন করে। এই নীতি চালু হয় মাহাথিরের আমল থেকে। আশির দশকে গৃহীত ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাস্তবায়ন করা শুরু করেন তিনি। ফলাফল এই যে, ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থান দিয়ে উল্টো আরও ৮ লাখ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেয় মালয়েশিয়া। একই বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতেই ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করে। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার নির্মাণ, সমুদ্র থেকে ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি উদ্ধার, অত্যাধুনিক এয়ারপোর্ট তৈরি, একাধিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, হাইওয়ে নির্মাণসহ তার অসংখ্য উদ্যোগ সফল হয়েছে। ১৯৯০ সালেই বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে যায় ৮ শতাংশের বেশি। ১৯৮২ সালে থাকা মালয়েশিয়ার ২৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি ২০০২ সালে এসে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর তালিকার তলানীতে থাকা মালয়েশিয়াকে নিয়ে আসেন তালিকার ১৪তম স্থানে। ব্যক্তিজীবনে মাহাথির ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি একাই যে স্বপ্ন দেখেছেন এমনটা নয়। পুরো জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। চীনা, মালয়ী, তামিলসহ বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত মালয়েশিয়াকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে সক্ষম হন তিনি।
মূলত দুর্নীতির অভিযোগেই নাজিব রাজাকের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার সাধারণ ভোটাররা। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। অভূতপূর্ব এক বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন নাজিব রাজাকেরই রাজনৈতিক গুরু বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মাহাথির মোহাম্মদ। নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ভোটার ও প্রতিপক্ষের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বারহাদের (ওয়ানএমডিবি) অর্থ, তিনি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও সহযোগীরা মিলে ওই তহবিল থেকে কয়েকশ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে নাজিব রাজাকের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। নানা অভিযোগে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে চলেছেন নাজিব রাজাক।
ভগ্নদশায় পড়ে যাওয়া মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে মেরামতের পথ খুঁজছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তার দাবি, পূর্বতন সরকার বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরও খারাপের পথে গেছে।
মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, নাজিব রাজাকের আমলে এমন অনেক বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যার জন্য ব্যয় করতে হয়েছে হাজার হাজার কোটি ডলার। একের পর এক ব্যয়বহুল মেগা প্রজেক্ট। হয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি রিঙ্গিতে (২৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার), যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৮০ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেউলিয়াত্বের পথে মালয়েশিয়া। এ অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার হাল ধরলেন মাহাথির মোহাম্মদ।
আসন্ন দেউলিয়াত্বকে ঠেকাতে রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছেন মালয়েশিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুয়ালালামপুর থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত নির্মিতব্য একটি হাইস্পিড রেলওয়ে প্রকল্প বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের আমলে নেওয়া সব মেগা প্রকল্প পুনরায় যাচাইয়ের। সাক্ষাৎকারে ‘অপ্রয়োজনীয়’ সব অবকাঠামো প্রকল্প বাতিলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন মালয়েশিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ব্যয় সংকোচনের পদক্ষেপ হিসেবে কয়েক হাজার সরকারি কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুত করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। নিজ দেশকে ‘দেউলিয়া হিসেবে ঘোষণা করার পথ রুদ্ধ করতেই’ এত বড় পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, এ মুহূর্তে যেসব বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে অন্যতম হলো মালয়েশিয়ার আর্থিক পরিস্থিতি।
মালয়েশিয়ার জনগণ মহাসড়কে যান চলাচলে টোল হ্রাস, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দান এবং গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (জিএসটি) বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন অনেক দিন ধরেই। এতে সায় দিয়ে এসব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। এতে মালয়েশিয়া সরকারের বার্ষিক রাজস্ব কমবে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ, যা দেশটির এ বছরের মোট রাজস্ব আয়ের এক-পঞ্চমাংশ। এতে কিছুটা প্রতিকূলে পড়তে পারেন তার সরকার। তবে এ প্রসঙ্গে মাহাথিরের বক্তব্য হলো, গণতন্ত্র মানেই পরিবর্তন ও সার্বক্ষণিক চাপ। কখনও কখনও আমাদের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের বদলে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হয়।
কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেলওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৬ সালে। ৩৭০ কিলোমিটার (২১৭ মাইল) দীর্ঘ রেলপথটির নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য অনুমিত সময় ধরা হয়েছিল ২০২৬ সাল পর্যন্ত। কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেলওয়ের ওপর নজর ছিল বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানেরই। মূলত ‘দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার’ ঝুঁকি এড়াতেই প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহাথির মোহাম্মদ। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, তার পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের আমলে মালয়েশিয়ার মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি রিঙ্গিত ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি সই হয়েছিল, তার সবই পুনরায় খতিয়ে দেখবেন তিনি।
মাহাথির মোহাম্মদ জানান, এরই মধ্যে চীনা অর্থায়নে মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে নির্মিতব্য এক রেল লিংক প্রকল্প নিয়ে পুনরায় দরকষাকষি করবে তার সরকার। মূলত চুক্তির ‘অসম’ বিষয়গুলো দূর করতেই এ দরকষাকষি করতে চাইছেন তিনি। ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ভবিষ্যতে ক্ষমতার এ ধরনের অপব্যবহার ও গোটা সিস্টেম একজনের কুক্ষিগত হয়ে পড়ার পথকে রুদ্ধ করতে সংসদীয় ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেন, এটা কোনো লুটেরা সরকার হবে না। অবশ্যই এ দেশ আরও অনেক বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*