বিভাগ: প্রতিবেদন

মিয়ানমারের রাখাইনে মানবিক বিপর্যয়

3রাজীব পারভেজ: গত ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্টে বিদ্রোহীদের হামলার পর ক্লিয়ারেন্স অপারেশন জোরদার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তখন থেকেই মিলতে থাকে বেসামরিক নিধনযজ্ঞের আলামত। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে শুরু করে মৌসুমি বাতাসে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে শূন্যে ছুড়ে দেয় সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। সহিংসতা শুরুর পর থেকে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী নিরীহ রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ করেছে এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। এরপর থেকেই বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। সেই আলোচনার ঝড় বিশ্ব দরবার পর্যন্ত পৌঁছেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশসহ প্রায় প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র এই সমস্যার সমাধানে একাধিক প্রস্তাব রাখে। রোহিঙ্গা সমস্যা এবং পরিস্থিতি মোকাবেলা নিয়ে একটি সার্বিক চিত্র উত্তরণের এই সংখ্যায় তুলে ধরা হলো।

রোহিঙ্গাদের পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

গত ১২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বিতরণ করতে যান প্রধানমন্ত্রী। সে সময় রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে চোখের পানি আটকে রাখতে পারেন নি তিনি। কেঁদে ফেলেন প্রধানমন্ত্রী, সান্ত¦না দেন ও এই দুঃসময়ে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা দমন অভিযানের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি তাদের দুর্দশার কথা শোনেন তিনি। এরপর তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে তাদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই তাদের ফেরত নিতে হবে। আশ্রয়ের এই সাময়িক সময়ে বাংলাদেশ সরকার সাধ্যমতো শরণার্থীদের সহায়তা করবে। তিনি মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধেরও আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি। ঘরবাড়ি হারিয়ে যেসব রোহিঙ্গা এখানে এসেছেন, তারা সাময়িক আশ্রয় পাবেন। আপনারা যাতে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন, সে ব্যাপারে চেষ্টা চলছে।’ প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

 

ত্রাণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে আওয়ামী লীগ

রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে কয়েক দফায় কক্সবাজার যায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপির নেতৃত্বে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম এবং ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার ত্রাণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখেন এবং সেখানে দলের নেতা-কর্মীদের সাথে সমন্বয় সভা করেন।

 

শরণার্থী শিবিরে বিদেশি কূটনীতিকরা

মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে ঢাকায় কর্মরত প্রায় অর্ধশত বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা কক্সবাজার সফর করেছেন। সেখানে তারা শরণার্থী ক্যাম্পে ঘরে ঘরে গিয়ে নতুন করে আসা শরণার্থীদের দুর্ভোগের কাহিনি শোনেন এবং কথা বলেন পুরনোদের সাথেও। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তারা তাদের নিজ নিজ সরকারের সাথে আলোচনা করবেন। কূটনীতিকরা পরে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাও পরিদর্শন করেন। মূলত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরির যে চেষ্টা বাংলাদেশ শুরু করেছে তারই অংশ হিসেবে বিদেশি কূটনীতিকদের বিশাল এই দলটিকে কক্সবাজার নিয়ে যায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইওরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন, ভারত, সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতরা এই সফরে শামিল হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকার মনে করছে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য যে প্রচেষ্টা নিয়েছে সেটিকে আরও জোরদার করবে বিদেশি কূটনীতিকদের এই পরিদর্শন।

 

রোহিঙ্গা সেল গঠন

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সহিংসতা ও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তের ওপার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের কারণে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলাসহ সন্নিহিত সীমান্তবর্তী এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের সুবিধার্থে রোহিঙ্গা সেল গঠন করা হয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, পুশব্যাক সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছে এই সেল। সম্প্রতি অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের শুমারি (বায়োমেট্রিকসহ) ও সর্বশেষ অগ্রগতি, সন্নিহিত সীমান্তবর্তী এলাকায় সর্বশেষ পরিস্থিতি, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করছে। চিহ্নিত ও নির্ধারিত স্থানের মধ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থান সীমাবদ্ধ রাখা সম্পর্কিত গৃহীত সর্বশেষ ব্যবস্থা এবং রোহিঙ্গাদের আবাসন ও মানবিক সহায়তা দেওয়া সংক্রান্ত কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে থাকে সেল। এছাড়া মানবিক সহায়তায় নিয়োজিত বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কিত অগ্রগতি, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অংশে বিদেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সফর সম্পর্কিত তথ্যাদি এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত তথ্যাদিও রোহিঙ্গা সেল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে থাকে।

 

ত্রাণের দায়িত্বে সেনাবাহিনী

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব গ্রহণ করল সেনাবাহিনী। বিক্ষিপ্তভাবে ত্রাণ বিতরণ হয়েছিল বেশ কয়েকদিন। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ত্রাণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয় সেনাবাহিনী। তবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থাগুলোর ত্রাণ বিতরণে কোনো বিধিনিষেধ নেই সেনাবাহিনীর। সংস্থাগুলো নিজস্ব তত্ত্বাবধানেই ত্রাণ বিতরণ করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আনা ত্রাণকে সেনাবাহিনী সম্মানের সাথে গ্রহণ করছে। কেউ কেউ নগদ অর্থও সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করছে। দাতাদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে, তাদের প্রতিটি ত্রাণই সুষমভাবে শরণার্থীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। ত্রাণ থেকে কোনো রোহিঙ্গাই বাদ যাবে না। বরং এতদিন বিক্ষিপ্তভাবে যে ত্রাণ দেওয়া হয়েছিল, তাতে অনেক নারী ও শিশু বঞ্চিত হয়েছে। এখন সুষ্ঠুভাবে সবার তাঁবুতেই ত্রাণ পৌঁছে যাবে। পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে। একজন রোহিঙ্গাও না খেয়ে থাকবে না। তবে যে রোহিঙ্গারা যত দ্রুত নিবন্ধিত হবে, তারাই সর্বাগ্রে ত্রাণ পাবে।

জানা যায়, উখিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ পাহাড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। এদের জন্য কুতুপালং ও বালুখালীতে সরকার ২ হাজার একর জমিও বরাদ্দ করেছে। কিন্তু সেখানে একটি ক্ষুদ্র অংশ গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বেশির ভাগই বিভিন্ন সরকারি পাহাড় ও বনভূমিতে নিজেদের মতো করে আশ্রয়শিবির বানিয়েছে। তাদের এক স্থানে নিয়ে আসাও বড় চ্যালেঞ্জ। আপাতত সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্থানে গিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। তবে পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের একটি প্লাটফরমে নিয়ে আসা হবে।

 

জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা রোহিঙ্গারা

মিয়ানমারের রাখাইনের সহিংসতা-কবলিত এলাকাগুলোর একটি মংডু। এই শহরের উত্তর দিকে প্রধান সড়কের ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত গ্রামগুলোতে বসবাস ছিল কয়েক হাজার মানুষের। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ক্লিয়ারেন্স অপারেশনে সবগুলো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেনাদের তা-বের ভয়াবহতায় পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা। এখনও যারা পালিয়ে যেতে পারেনি; সেনাদের ভয়ে তাদের বনজঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। সেখানে ঘাস আর পানি খেয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। রয়টার্স মারফত জানা যায়, ২০১৬ সালের অক্টোবরে সামরিক অভিযানের সময় ইউ শেই কিয়া গ্রামের রোহিঙ্গারা সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলে। এবারও সেনাদের তা-বের শিকার হয়েছে গ্রামটির বাসিন্দারা। ওই গ্রামের একজন শিক্ষক বলেছেন, ‘৮০০টি পরিবারের মধ্যে এখন আছে মাত্র ১০০টির মতো পরিবার। যারা রয়ে গেছে তাদের সেনাদের সাথে লুকোচুরি করে থাকতে হচ্ছে। কারণ সেনারা সকালে গ্রামে আসে। সেনারা গ্রামে আসলে তারা জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে এবং রাতে বাড়িতে ফিরে আসে।’

সেনাদের পুড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা বসতবাড়িগুলোতে সৃষ্ট বিরাণভূমিতে দেখা গেছে, সেখানে কয়েকশ গরু চষে বেড়াচ্ছে। জমিতে রোপণ করা ধানের চারা খাচ্ছে। ক্ষুধার্ত কুকুরগুলো ছোট ছোট ছাগল খাচ্ছে। একসময় রোহিঙ্গা মুসলিমদের পদচারণায় মুখর স্থানীয় মসজিদ, বাজার ও স্কুল এখন একেবারে নীরব। রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর মধ্যেই সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্রভাবে সহিংসতা-কবলিত অঞ্চলটিতে সরেজমিন প্রত্যক্ষ করা হয়। কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পক্ষে রাখাইনে এটিই প্রথম সরেজমিন প্রতিবেদন। এই সহিংসতা-কবলিত অঞ্চলে জাতিসংঘ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ তুলেছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, উত্তর রাখাইনের ২১৪টি গ্রামের কয়েক হাজার বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। মিয়ানমার সরকার বলছে, ৬ হাজার ৮০০ বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এজন্য তারা রোহিঙ্গাদের দায়ী করে আসছে। দেশটির ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চি’র মুখপাত্র জাউ হিতায় বলেন, ‘আমরা যে তথ্য পেয়েছি তাতে জানা গেছে সন্ত্রাসীরা আগুন লাগিয়েছে।’

 

জাতিসংঘ ও অন্যান্য রাষ্ট্রের প্রস্তাব

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুয়েতেরেজ বেশ কিছু প্রস্তাব দেন। সেগুলো হলোÑ ১. সহিংসতা বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে ২. জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অবিলম্বে চালু করতে দিতে হবে ৩. বাংলাদেশের সাথে আলোচনা করে নতুন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। কারণ ১৯৯৩ সালের চুক্তি যথেষ্ট নয় ৪. কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং মূল সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি তার প্রস্তাবে বলেছেনÑ ১. মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অবশ্যই কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে ২. জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অবিলম্বে চালু করতে দিতে হবে ৩. বাংলাদেশের সাথে আলোচনা করে নতুন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে ৪. কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনকে মিয়ানমারে কাজ করতে দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি তার প্রস্তাবে বলেনÑ ১. মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অবশ্যই মানবাধিকারকে সম্মান দিতে হবে ২. যারা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত তাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে ৩. মিয়ানমারে অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে ৪. মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন।

ফ্রান্সের প্রতিনিধি তার প্রস্তাবে বলেনÑ ১. সহিংসতা থামাতে হবে ২. মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করতে হবে ৩. নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে ৪. সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এবং মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারকে সমর্থন দিতে হবে।

নিরাপত্তা পরিষদে সোচ্চার বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতিসংঘে সোচ্চার অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে রাখাইনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জাতিগত নিধনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে মিয়ানমারের সাথে সমন্বিত সেনা পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারকে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।

সাম্প্রতিক রাখাইন সহিংসতা কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে এরই মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। এদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ। নিরাপত্তা পরিষদকে জানানো হয়, ধর্ষণ-নিপীড়ন-পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা মানুষের জমি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে, যা ভয়াবহ নিপীড়নকেই সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেনা অভিযানের সমালোচনা করা হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেনা অভিযানের এই ধরন শান্তির পক্ষে সহায়ক কি না। এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপও দাবি করেছে এশিয়ার এই ক্ষুদ্র দেশটি। সেনা অভিযান শান্তির পক্ষে হুমকি কি না নিরাপত্তা পরিষকে তা ভেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানের কিছু সুপারিশ হাজির করা হয়। সেগুলো হলোÑ সহিংসতা বন্ধ ও মানবিক সহায়তা, মিয়নামার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সম্মিলিতভাবে রাখাইন কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার ১৯৯২ সালের মিয়ানমার-বাংলাদেশ চুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের জন্য মর্যাদা, স্থিতিশীলতা ও সুরক্ষা ফিরিয়ে দেওয়া।

 

জাতিসংঘে ৫-দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের রক্ষা ও তাদের ফেরত নিতে জাতিসংঘে ৫-দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘসহ বিশ্বনেতাদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দিয়ে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে তাদের (বিশ্বনেতা) জোরালো সমর্থন চান। এছাড়া মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, জুলুম ও নির্যাতনের চিত্র বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্প ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তার হৃদয় আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত। শেখ হাসিনা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ‘জাতিগত নিধন’ এখনই বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন, শরণার্থীদের ফেরত নিয়ে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান। মুসলিম রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারে ‘সেইফ জোন’ গঠনের প্রস্তাব বিশ্ব সংস্থায় তুলেছেন তিনি; বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিবকে একটি অনুসন্ধানী দল পাঠাতে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার পাশাপাশি সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থানের কথাও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয়, মানবকল্যাণ চাই।’

 

রোহিঙ্গাদের রক্ষা ও তাদের ফেরত নিতে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৫-দফা প্রস্তাব হলো-

১. অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা;

২. অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা;

৩. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা;

৪. রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা;

৫. কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

 

বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার জাতিসংঘের

রাখাইনের জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানকারী বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে জাতিসংঘ। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্টনিও গুয়েতেরেজ এই অঙ্গীকার করেন। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে অবিলম্বে সেনা অভিযান বন্ধ করা, সহিংসতা নিরসন, রাখাইনে ত্রাণসামগ্রীর অবাধ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় জাতিসংঘ মহাসচিব এসব পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন। এর আগেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুই দফায় নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক হয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কাঠামোগত সহিংসতার অভিযোগ এনেছেন মহাসচিব। ৭০টিরও বেশি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সহিংসতার জন্য দুপক্ষকেই নিন্দা জানিয়েছেন গুয়েতেরেজ। অবিলম্বে সেনা অভিযান বন্ধ এবং সহিংসতা বন্ধে আশু পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। বক্তব্যে তিনি আরসাকে ইঙ্গিত করে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম বন্ধ করতে বলেছেন। বাংলাদেশের সাথে ঐক্যবদ্ধ আলোচনার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ারও তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের রাজনীতিকরণের শিকার বলে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। পাচার করা হচ্ছে কাউকে কাউকে। নারী ও শিশু নির্যাতনসহ যৌন নিপীড়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন মহাসচিব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীর মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিতে মিয়ানমারকে তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

 

সহিংসতা বন্ধের আহ্বান শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রধান ফিলিপো গ্র্যান্ডি। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ নাগরিকত্ব, এর সমাধান করতে হবে। এই সমস্যার শুরু মিয়ানমারে, সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে। রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদে তাদের দেশে ফেরত যেতে পারে, সে ব্যবস্থাও মিয়ানমারকেই করতে হবে। রাখাইনে সহিংসতা বন্ধের কাজ ও মানবিক সাহায্যদাতা সংস্থাগুলো যেন কাজ শুরু করতে পারে, তার ব্যবস্থা করা এখন জরুরি। গ্র্যান্ডি গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসার পর দুদিন কক্সবাজারে ছিলেন। তার মতে, এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি সেখানে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেছেন। তাদের ওপরে শারীরিক ও যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের অবস্থান সম্পর্কে গ্র্যান্ডির বক্তব্য হলোÑ সেখানে রোহিঙ্গাদের থাকার জায়গা, পানি, স্যানিটেশন ও খাদ্যের প্রয়োজন। কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বিষয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে সেখানে বলা হয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা প্রধান বলেন, এই নিরাপদ অঞ্চলে কে সুরক্ষা দেবে, সেটি বিবেচনার বিষয়। মিয়ানমারের দায়িত্ব হচ্ছে, তার নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া। তারা না দিলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই সুরক্ষা দিতে হয়, তাহলে সেটি হবে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা।

 

সু চি’র বক্তব্য পর্যবেক্ষণে রেখেছে বাংলাদেশ

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি’র ভাষণ পর্যবেক্ষণে রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। বিশ্বব্যাপী এই ভাষণের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও রাষ্ট্রনেতারা সু চি’র বক্তব্যে ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনা করেন। বাংলাদেশ সরকার সু চি’র বক্তব্যের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা ও এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় গ্রহণের ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরে হলেও অং সান সু চি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে প্রমাণিত হয় আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। এখন কফি আনান কমিশনের রিপোর্টসহ অন্যান্য বিষয় কতটা সু চি বাস্তবায়ন করেন, তা দেখার বিষয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীনের মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। চীন ও ভারত দুটি রাষ্ট্রই বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র। সমস্যা সমাধানে যতটুকু করা যায় তারা তা করবেন। এমন বার্তা তারা সরাসরি দিয়েছে।

 

বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো হচ্ছে ত্রাণ

এ নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০৩ টন ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ভারত একাই পাঠিয়েছে ৮০৭ টন, চীন দুটি বিমানে করে পাঠিয়েছে ১১০ টন, সৌদি আরব ৯৪ টন, ইন্দোনেশিয়া ৮টি বিমানে করে ৭৭ টন, ইরান দুটি বিমানে ৬৮ টন, মরক্কো ১৪ টন ও মালয়েশিয়া ১২ টন ত্রাণ পাঠিয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ান রেডক্রিসেন্ট ১০১ টন ও জাপানিজ রেডক্রস সোসাইটি ১৮ টন ত্রাণ পাঠিয়েছে।

 

২ মিলিয়ন ডলার দেবে জাপান

সেনা নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় ২ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে জাপান সরকার। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), ইউনিসেফ এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর)-এর মাধ্যমে আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং সুরক্ষার লক্ষ্যে এই মানবিক অর্থ সাহায্য দেবে জাপান।

 

শিশুদের জন্য ইউনিসেফের ত্রাণ

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য ইউনিসেফের দেওয়া ত্রাণ সহায়তা ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। কোপেনহেগেন থেকে ১০০ টনের মতো ত্রাণ নিয়ে একটি কার্গোবিমান ঢাকায় এসেছে। এর মধ্যে প্লাস্টিক তারপুলিন, স্বাস্থ্যবিষয়ক বস্তু ও শিশুদের বিনোদনের জন্যও অনেক কিছু রয়েছে। গত ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর সামরিক অভিযান থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ শিশু। তাদের সবাই খাদ্য, বস্ত্রসহ মৌলিক বস্তুর অভাবে ভুগছে। তাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা। সেই ধারবাহিকতায় ইউনিসেফের ত্রাণ এসে পৌঁছাল।

বাংলাদেশের ইউনিসেফ প্রতিনিধি এদোয়ার্দ বেগবেদার বলেছেন, শিশু ও তার পরিবারের জন্য নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। ডায়রিয়াসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। তিনি আরও বলেন, এখন খুবই সংকটময় পরিস্থিতি। রোহিঙ্গারা যেখানে আশ্রয় নিয়েছে সেখানে অবস্থা খুবই খারাপ, বিশেষ করে বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। স্কুল ব্যাগ, তাঁবু, শিশুদের প্রয়োজনীয় জিনিস, পরিবারের স্বাস্থ্যবিষয়ক বস্তুও ত্রাণ সহায়তা হিসেবে আসছে বলে জানান তিনি। কক্সবাজারে আশ্রয়কেন্দ্রে ট্রাকে করে ত্রাণগুলো পৌঁছে দেওয়া হবে। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আগামী তিন মাসের জন্য ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।

 

বিশ্বব্যাংকের কাছে ২৫ কোটি মার্কিন ডলার চেয়েছে সরকার

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে ২৫ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ২৫ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, এই এক মাসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ। এর মধ্যে নারী-শিশুই বেশি। এছাড়া অন্তঃসত্ত্বা নারীর সংখ্যা ১৬ থেকে ১৭ হাজার হলেও সন্তানকে এখনও দুধ পান করাচ্ছেন এমন মা-সহ নারীর সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৭০ হাজার। সরকারের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। আশ্রয় নেওয়া অনেকে আছেন, যারা বিভিন্ন ঘটনায় আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিবেশ এখনও ভালো করা সম্ভব হয়নি। সেখানে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাই যে কোনো সময় যে কোনো রোগ মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। এটি ঠেকাতেই আগে থেকেই এর প্রতিরোধ প্রয়োজন। এ জন্যই এই অর্থ সহায়তা প্রয়োজন। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারের আশপাশের জেলা থেকে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী এনে ক্যাম্পে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে অনেকগুলো মেডিকেল টিম কাজ করছে।

 

পুনর্বাসনে প্রস্তুতি চলছে ভাসানচরে

রোহিঙ্গা পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচর। প্রতিদিন পরিদর্শন করছেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সরকারি-বেসরকারি বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার খবরে হাতিয়াসহ উপকূলবাসী শঙ্কা প্রকাশ করলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, আতঙ্কের কিছু নেই। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পুনর্বাসিত করলে, এখানে পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল ও তৎপরতা বাড়বে। ভাসানচরকে জোয়ার-ভাটার হাত থেকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে বালু ফেলে উঁচু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে হেলিপ্যাড, পন্টুনসহ কয়েকটি স্থাপনা। অভ্যন্তরীণ চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে সড়ক। ভাসানচর হবে একটি আধুনিক শরণার্থী শিবির। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিনোদন কেন্দ্র, খেলার মাঠসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। কয়েকটি ধাপে রোহিঙ্গাদের এখানে আনা হবে। প্রথম ধাপে ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন করা হবে। দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করতে চায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

 

নির্যাতনের ঘটনায় বাংলাদেশের বৌদ্ধরা ক্ষুব্ধ

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও সেনা অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করছে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়। মিয়ানমার একটি বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশ এবং একটি বড় অভিযোগ রয়েছে যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনে শামিল হয়েছে সেখানকার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও। কিন্তু এটা কোনোভাবেই বৌদ্ধ ধর্মের মূল নীতির সাথে যায় না উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা, ধর্মগুরু ও সাধারণ সদস্যরা।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*