বিভাগ: যুদ্ধাপরাধ

মীর কাসেমের ফাঁসির রায় বহাল নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি

33উত্তরণ প্রতিবেদন: মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ গত ৮ মার্চ ঐকমত্যের ভিত্তিতে আপিল নিষ্পত্তি করে সংক্ষিপ্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে আলবদরের কমান্ডার ছিলেন মীর কাসেম। সেখানে হত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে ২০১৪ সালের নভেম্বরে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছিলেন।
সর্বোচ্চ আদালত রায় ঘোষণার সাথে সাথে আদালতের বাইরে ও শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চসহ দেশের অনেক স্থানে আনন্দ মিছিল করেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দ্রুত রায় কার্যকর করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। রায়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ১৪ দল।
রায় ঘোষণার পর চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চ ও মুক্তিযোদ্ধারা পৃথক আনন্দ মিছিল বের করেন। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা ও সেক্টরস কমান্ডারস ফোরাম।
বর্তমানে জামাতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মীর কাসেম। দলের নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পর মীর কাসেম ছিলেন আলবদরের তৃতীয় প্রধান। রায়ের পর বিবিসি, এএফপি, এপি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভিসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
একাত্তরের নভেম্বরে ঈদুল ফিতরের পরদিন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমউদ্দিন আহমেদসহ ছয়জনকে অপহরণের পর চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লায় ডালিম হোটেলে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যার দায়ে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদ- বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। আরও ছয় অভিযোগে ৫৮ বছরের কারাদ- বহাল রাখা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে হত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদ- এবং বাকি ৮টি অভিযোগে সব মিলিয়ে ৭২ বছর কারাদ- দেওয়া হয়েছিল। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে অভিযোগ থেকে খালাস চান মীর কাসেম।
আপিল বিভাগ তার আবেদন আংশিক মঞ্জুর করে ১২ নম্বরসহ আরও দুটি অভিযোগ (৪ ও ৬) থেকে মীর কাসেমকে খালাস দেন। ১১ নম্বর অভিযোগে জসিমউদ্দিনসহ কয়েকজনকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়। বাকি ৬টি অভিযোগের সাজা বহাল রাখা হয়।
যে অভিযোগে ফাঁসি বহাল : মীর কাসেমের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আনা অভিযোগের মধ্যে ১১ নম্বরটিতে বলা হয়েছে, কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমউদ্দিনসহ মোট পাঁচজনকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়। ঈদের পরদিন জসিমকে অপহরণের পর ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে হত্যা করে লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে ফাঁসির আদেশ দেন। গত ৮ মার্চ আপিল বিভাগ ওই আদেশ বহাল রাখেন।
যে অভিযোগে খালাস : ১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, রঞ্জিত দাস লাতু ও টুন্টু সেন রাজুকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এরপর হত্যার পর তাদের লাশ গুম করা হয়। এই অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে মীর কাসেমকে ফাঁসির আদেশ দেন। ৮ মার্চ আপিল বিভাগ ওই অভিযোগ থেকে আসামিকে খালাস দেন।
ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে ডালিম হোটেলে নির্যাতন কেন্দ্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব ছিল মীর কাসেম আলীর হাতে। ওই সময় তিনি চট্টগ্রাম শহর শাখা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি, আলবদর বাহিনীর নেতা ও নির্দেশদাতা ছিলেন। ডালিম হোটেলে নির্যাতন ও নির্মমতার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তাকে ‘বাংলার খান সাহেব’ হিসেবেও অনেকে উল্লেখ করেছেন। শহরের আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলকে ‘মৃত্যুঘর’ উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, আলবদর সদস্য ও পাকিস্তানি সেনারা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের ধরে এনে ডালিম হোটেলে আটক রাখত। সেখানে তাদের নির্যাতন চালানো হতো। ডালিম হোটেল সত্যিকার অর্থে একটি ‘ডেথ ফ্যাক্টরি’ ছিল।
একাত্তর সালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট ও জোর করে দেশান্তরকরণের অসংখ্য ঘটনা ঘটে। এর অনেক ঘটনার সাথে মীর কাসেম নিজে জড়িত। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন বিকেলে মতিঝিলে নয়াদিগন্ত কার্যালয়ের (দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন) থেকে তাকে গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ ও দেশান্তরের অভিযোগে পরের বছর ৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মীর কাসেমের বিচার। সেই থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
মীর কাসেমের উত্থান : মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার চালা গ্রামের তৈয়ব আলীর দ্বিতীয় ছেলে মীর কাসেম আলীর জন্ম ১৯৫২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তার ডাকনাম পিয়ারু হলেও চট্টগ্রামের মানুষ তাকে চিনত মিন্টু নামে। বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকার সিঅ্যান্ডবি কলোনিতে তারা থাকতেন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর সেখানেই ¯œাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হন কাসেম। পরের বছর জামাতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের কলেজ শাখার সভাপতি হন। ’৭১-এর ৬ নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর শাখা ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন মীর কাসেম। একই সাথে চট্টগ্রামে আলবদর বাহিনীর নেতা ছিলেন।
১৯৮০ সালে জামাতে যোগ দেন মীর কাসেম। তখন তিনি রাবেতা আলম আল-ইসলামী নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের সমন্বয়ক ছিলেন। এরশাদের আমলে ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক গঠন হলে মীর কাসেম প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান হন। ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মীর কাসেম ছিলেন ইবনে সিনা ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য।

নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একাত্তরের গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনীর নেতা ও জামাতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ১৫ মার্চ নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল রেখে আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর এই মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়।
গত ১৫ মার্চ বিকেলে নিজামীর ফাঁসি বহালের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। এরপর সন্ধ্যায় তা পৌঁছায় ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে। এরপর প্রক্রিয়া শেষে নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানায় সই করেন ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারক।
রাতে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার শহীদুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, রাত সোয়া ৯টায় নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানাসহ পূর্ণাঙ্গ রায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোতে পাঠানো হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করার জন্য ১৫ দিন সময় পাবেন নিজামী।
আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার প্রায় আড়াই মাস পর ১৫ মার্চ বিকেলে নিজামীর মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ১৫৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ এই রায় লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। এই রায়ের সাথে একমত হয়ে সই করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দিয়ে রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, নিজামী যে ঘৃণ্য অপরাধ করেছেন, মৃত্যুদ- ছাড়া আর কোনো সাজা তার জন্য যথেষ্ট নয়। ট্রাইব্যুনালের ওই রায়ের বিরুদ্ধে নিজামী আপিল করেন। গত ৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সর্বোচ্চ দ- বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

নিজামীর মৃত্যুদ- : আপিল বিভাগ রায়ে যা বলেছে
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামাত আমির মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিষ্ঠুর ও বর্বর অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন আলবদর বাহিনীর নৃশংসতার দায় ওই বাহিনীর নেতা হিসেবে নিজামী এড়াতে পারেন না। সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত মনে করে, আলবদর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল নিজামীর হাতে। এ কারণে তিনি আলবদর বাহিনী দ্বারা সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যার মতো অপরাধের দায়ে দোষী এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ই তার প্রাপ্য।
গত ১৫ মার্চ আপিল বিভাগ পূর্ণাঙ্গ এই রায় প্রকাশ করেন। প্রকাশিত রায়টি ১৫৩ পৃষ্ঠার। রায় লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। রায়ে একমত পোষণ করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
রায়ে বলা হয়েছে, প্রমাণিত সত্য যে আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে। প্রসিকিউশনের হাজির করা সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা প্রমাণ করে নিজামী ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনিই এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে যুদ্ধাকালীন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিই বদর বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যেসব দালিলিক সাক্ষ্য ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে তা প্রমাণ করে নিজামী একজন সক্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন। তিনি দেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে সভা-সমাবেশ করে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মী ও আলবদর বাহিনীর নেতা-কর্মীদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতে উজ্জীবিত করেন। স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করেন।
রায়ে বলা হয়, ৪২ বছর আগের সংঘটিত অপরাধের বিচার হওয়ায় এই মামলায় এত বছর পর ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেক সাক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। অনেকে বৃদ্ধ হয়েছেন। অনেকে সব কিছু মনে করতে পারেন নি। তারপরও প্রসিকিউশন সাক্ষ্য নিয়েছেন যা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। এ কারণে আসামি পক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্যে কিছুটা অমিল খুঁজে পেয়েছে, যা সামান্য। আদালত মনে করে, এত বছর আগের ঘটনায় সাক্ষীদের বক্তব্যে যে অমিল পাওয়া যায় তা ধর্তব্য নয়। রাষ্ট্রপক্ষ নিজামীর বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
রায়ে ১৯৭১ সালে জামাতে ইসলামী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকারদের ভূমিকা তুলে ধরে বলা হয়, ডা. আলীম চৌধুরীসহ বুদ্ধিজীবীরা অপহৃত হন এবং তাদেরসহ আরও বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে ফেলে দেওয়া হয়। আর এদের অপহরণ ও হত্যার সাথে আলবদর বাহিনী জড়িত ছিল বলে সাক্ষ্য-প্রমাণে পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া স্বাধীনতার মূল্যবান দলিলপত্রেও এ ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
রায়ে আরও বলা হয়, আলবদর বাহিনীর নীতি ও পরিকল্পনা ছিল স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাঙালি, জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী ও হিন্দু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা। এদের আলবদর বাহিনী দুষ্কৃৃতকারী বলত। এই আলবদর বাহিনী ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘ডেথ স্কোয়াড’। তাদের কাজ ছিল সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবী ধরে নিয়ে হত্যা করা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর বাহিনী নিজামীর অধীনস্থ ছিল। জামাতে ইসলামী শুধু পাকিস্তানকে সহায়তাই করেনি, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতেও এই আলবদর বাহিনী গঠন করে। ইসলামী ছাত্রসংঘ সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কাজ করেছে।
রায়ে বলা হয়, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ যথা গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ ছিল নিষ্ঠুর, বর্বর ও হৃদয় বিদারক। আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল এসব অপরাধে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে।
এসব এমন অপরাধ যে মৃত্যুদ- মওকুফ করে সাজা কমানোর কোনো সুযোগ নেই। নিজামী নিষ্ঠুর ও অমানবিক প্রকৃতির অপরাধের সাথে জড়িত থাকায় তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দেওয়া হলো।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*