মুক্তিযুদ্ধ : নতুন প্রজন্মের চোখে

50মহান বিজয় দিবস আসন্ন। ৪৩ বছর আগে এই দিনে ৩০ লাখ তাজা প্রাণের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে রক্ত¯œাত লাল-সবুজ পতাকার আশ্রয়স্থল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। স্বাধীনতা-পরবর্তী আমাদের অর্জন যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ব্যর্থতাও। এরপরও সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ এ কথা বারবার উচ্চারিত হয়ে এলেও আমরা সেই সম্ভাবনাটুকু কাজে লাগাতে পারিনি যথোপযুক্তভাবে। অশিক্ষা, দুর্নীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, জঙ্গিবাদসহ নানা সমস্যার ফলে কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি আমাদের প্রিয় এ মাতৃভূমির। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রচেষ্টা, নারীর অধিকার সংরক্ষণ, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাসহ সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারব। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সে পথে এগিয়েছে বহুদূর। তবে, এদেশে জঙ্গিবাদ তথা স্বাধীনতাবিরোধী চক্র প্রতিনিয়ত দেশবিরোধী কর্মকা-ে যুক্ত থাকলেও এদেশের শান্তিকামী জনগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে তা প্রতিনিয়তই প্রতিহত করে আসছে। বিশ্বাস করি ২০২১ সালের মধ্য বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে মালয়েশিয়া যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম ২৫ বছর যুদ্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল, জাপান আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হয়েও ঘুরে দাঁড়াল, আমরাও দীর্ঘদিন পর হলেও সে পথেই হাঁটছি। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যও এদেশের অর্থনীতির বিকাশ ক্রমবর্ধমান। গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনা করছে। রোগ-ব্যাধির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে মানুষের গড় আয়ু আরও বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর পদাচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাক্ষরতার হার বেড়েছে, কমেছে দরিদ্রতা। স্থায়ী হয়েছে বহুদলীয় ব্যবস্থা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মাধ্যমে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ করা হয়েছে। বিজয় দিবস জাতিকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, অত্যাচার ও শোষণের কালো হাত গুঁড়িয়ে দিতে, অধিকার আদায়ে আত্মসচেতন করে তোলে। বিজয় সংগ্রামের এ দিনটিতে উঁকি দেয় অসাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসমুক্ত শস্য শ্যামল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়।
সানাউল হক সানী
সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির এক বড় প্রাপ্তি। মুক্তিযুদ্ধ না হলে আমরা স্বাধীনতা পেতাম না, পালন করতে পারতাম না ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে।
আমরা বর্তমান প্রজন্ম দেখিনি মুক্তিযুদ্ধ। তারপরও ’৭১-এর সেই ভয়াল দিনগুলোর কথা শুনলে রক্ত গরম হয়ে যায়। মনে হয় কেন ’৭১-এ জন্ম নিলাম না। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধে বহু ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সূর্য ছিনিয়ে আনে বাঙালিরা। পাকবাহিনীর সেদিনের অবস্থা খুব দেখতে ইচ্ছা হয়।
বাঙালি জাতির বহু আকাক্সিক্ষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ অনেক এগিয়েছে। ২০১৩ সালে বিজয়ের মাসে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো বাঙালি জাতির জন্য এক বড় প্রাপ্তি। এ বছর কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আশা করব, এই বিজয়ের মাসে অন্তত একজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর করে বাংলাদেশ কলঙ্ক মোচনে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। এটি শুধু বর্তমান সরকারের সাফল্য নয়, দেশবাসীর সাফল্য।
তবে বিজয় দিবসে আমি মনে করি, আমরা যা-ই করি না কেন তা যেন লোক দেখানো না হয়। বিজয় দিবসকে আমরা পালন করব অন্তর দিয়ে। শহীদদের প্রতি আমরা যখন ফুলেল শ্রদ্ধা জানাই, তখন যেন সে শ্রদ্ধা অন্তর থেকে আসে।
মো. শামীম রিজভী
তরুণ সাংবাদিক

তরুণ প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে বিজয়ের ৪৪তম দিবসে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে চক্রান্ত সক্রিয় হয়। সেই চক্রান্তের জাল ছিঁড়ে বর্তমানে আবারও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। এটাই আমার সৌভাগ্য। পঁচাত্তরের পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রথমবার যখন ক্ষমতায় আসে তখন পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে নি। এবার দীর্ঘমেয়াদে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের হাতে সেই সুযোগ এসেছে। আমার বিশ্বাস, এই বাংলার মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
বিশেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে বাংলার ইতিহাস থেকে নতুন কলঙ্ক মোচন হওয়ার পথে। তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেছে। এই অর্জনগুলো আমাদের ভবিষ্যতের পথ চলার পাথেয় হয়ে থাকবে।
দেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠছে। বেকার যুবকরা চাকরি পাচ্ছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ সবক্ষেত্রে নিজেরাই নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার পালা চলছে। এবারের বিজয় দিবস আমাদের সামনে নতুন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। ‘ভিশন-২০২১’ অনুযায়ী বাংলাদেশ শিগগিরই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এ প্রত্যয় আমাদের। সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।
একেএম জিয়াউল হক জিয়া
শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত টানা দ্বিতীয়বারের সরকারের প্রথম বিজয় দিবস আসছে। বিষয়টা আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ যে স্বপ্নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিরা দেশকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস তার সঠিক ধারায় ফিরে আসে। এটাই নিয়ম। তাই এবারের বিজয় দিবস ভিন্ন আমেজে উপলব্ধি করছি। বিশ্বের বুকে বাঙালি জাতি তার স্বকীয়তা ধরে রেখে এগিয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। তবে, বাংলার বুকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি সেই স্বকীয়তায় কালিমা লেপন করেছিল চার দশকেরও বেশি সময়। লৌহমানবী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ওই কালিমা থেকেও রক্ষা করেছে আমাদের। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারই শুধু হচ্ছে না, তা কার্যকরও হচ্ছে।
যুদ্ধাপরাধীরা ’৭১-এর যেমন চক্রান্ত করেছিল, তেমনি বিচার নিয়েও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ষড়যন্ত্রে মেতে ছিল। সব বাধা উপেক্ষা করে এই বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষেই সম্ভব ছিল, হয়েছেও তাই।
আমরা তরুণ প্রজন্ম বড় হয়েছি বদ্ধ রাজনৈতিক সময়ে। যখন যুদ্ধাপরাধীরা জাতীয় পতাকা নিয়ে সংসদে ঢুকেছে। বাংলার মাটি সেই রাজাকারদের দম্ভ সহ্য করেনি, করবেও না। নতুন প্রজন্ম একটি শুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশে গড়ে উঠবেÑ এ প্রত্যাশা করছি বিজয় দিবসের প্রাক্কালে।
রাজিব বিশ্বাস
ব্যাংকার

বিজয় দিবসের আনন্দ অন্য কোনো আনন্দের সঙ্গে মেলানো যায় না। এই দিনে আমরা নতুন একটি দেশ পেয়েছি, পরিচয় পেয়েছি বিশ্বের বুকে। আমি যুদ্ধ দেখিনি, স্বাধীনতার আন্দোলন দেখিনি, মা-বোনদের লাঞ্ছিত হওয়া দেখিনি। কিন্তু অনুভব করি। কী অস্বাভাবিক সাহসিকতায় আমাদের বীর যোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছেন। বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভূমিকে পবিত্র রেখেছেন। তাদের সেই সাহসিকতার অনন্য অর্জন আমাকে শিহরিত করে। আমি আবেগ আপ্লুত হই। নিজের মধ্যে শক্তি খুঁজে পাই। আমরা সেই বীরের জাতি যারা দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে নিজের অধিকার আদায় করেছি। দেশকে শত্রুমুক্ত করেছি। এসবই সম্ভব হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনবদ্য অবদানের কারণে। তার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজের হাল ধরেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। আগত নতুন বিজয় দিবসের শপথ হোক গণতন্ত্রবিনাসী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমরা আছি, থাকব।
হ্যাপি আক্তার
শিক্ষার্থী, ইডেন কলেজ

বিজয় দিবসের দিনে লাল-সবুজের পতাকাটা নতুনভাবে আমাকে ভাবায়। মনে হয় এই দিনে বুঝি পতাকাটা তার নতুন প্রাণ ফিরে পায়। পতপত করে বাতাসে উড়ে ঘোষণা দেয়, দেখÑ আজ আমার আনন্দের দিন। অন্য বছরের বিজয় দিবসের চেয়ে এবারের বিজয় দিবস নতুন বার্তা নিয়ে আসছে আমাদের মাঝে। আমার মতে, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ একটি ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তা সারানোর উদ্যোগ নিয়েছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্নের মাধ্যমে। বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে, এগিয়ে যাবে। আমাদের উন্নয়নের এই ধারা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাক, বিজয় দিবসে এই প্রত্যাশা।
সুরভী খানম
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমার সন্তানকে নিয়ে যখন শাহবাগে একত্রিত হয়েছিলাম লাখো মানুষের সমুদ্রে তখন নতুন জীবনের স্বাদ পেয়েছি। মনে হয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধীদের যে দাপট দেখে আমরা বড় হয়েছি, আমার সন্তানকে অন্তত তা দেখতে হবে না। তারা জানতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস।
তথ্যপ্রযুক্তির নতুন দুনিয়ায় অনেক কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু মৌলিক অর্জনগুলো একই রকম থেকে যায়। তেমনি বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। কৈশোর থেকে তরুণে রূপান্তরের বয়সে ইতিহাস বিকৃতির যে চিত্র আমরা দেখেছি তা বদলাতে শুরু করেছে। তরুণ প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারছে। এটা আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক বড় পাওনা। যদিও ইতিহাস তার সত্য কক্ষপথ কখনও ত্যাগ করে না। এবারের বিজয় দিবস সবার মাঝে দেশ গড়ার নতুন উদ্দীপনা জাগাকÑ এই প্রত্যাশা করি।
লিপি আক্তার
গৃহিণী

১৯৭৫ থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির এক মহাযজ্ঞ সাধিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূ-লুণ্ঠিত করা, গণতন্ত্রকে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করা, যুদ্ধাপরাধীদের এদেশে পুনর্বাসন করা সহ তাদের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত বানিয়ে সকল প্রকার অপকর্ম সাধন করা হয়। ’৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয় তখন বিশ্ববিবেক হতভম্ব হয়ে ধিক্কার দিয়েছিল এই বাঙালি জাতিকে।
এরপর বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করে। কিন্তু এত কিছুর পরও খুনিরা তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। তরুণ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জেনেছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের কাজ শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা খুনিদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করেছিলেন জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি দেশরতœ শেখ হাসিনা। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের সাথে নিয়ে আবারও কুচক্রীমহল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পরপর পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। হত্যা, খুন, ধর্ষণ, জঙ্গিবাদসহ সরকারের সকল স্তরে অপকর্ম চলতে থাকে।
এমতাবস্তায় ২০০৪ সালের নির্বাচনে প্রায় ২ কোটি তরুণ ভোটার যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে তাদের বিচার করা। আর এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন জানাই তরুণ প্রজন্ম। এরপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু হয়।
যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্ল্যাকে যেদিন ফাঁসির আদেশ না দিয়ে আদালত যাবজ্জীবন কারাদ-ের আদেশ প্রদান করে সেদিন প্রথম ফুঁসে উঠেছিল তরুণ প্রজন্মই। শাহবাগের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরাই সেদিন কসাই কাদেরের ফাঁসির দাবিতে সারাদেশকে একাট্টা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করেই নিজেদের উজ্জীবিত করেছিল। কিছুদিন আগেই রাজাকার পুত্র, যুদ্ধাপরাধীদের এজেন্ট পিয়াস করিমের লাশ যখন শহীদ মিনারে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল তখন এই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। পবিত্র শহীদ মিনারকে অপবিত্র করার অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রূপকল্পে তরুণ প্রজন্ম অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে।
জয়দেব নন্দী
কবি ও শিক্ষার্থী

প্রজন্মের চোখে মুক্তিযুদ্ধ, আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে ৭ মার্চের উত্তাল ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” নিরস্ত্র বাঙালির মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির জন্য রক্তদানের সাহস, পাকিস্তানের শোষণের প্রতিবাদে বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলন এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনা। না, আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কারণ আমার জন্ম হয়েছিল ’৭১-এর প্রায় এক যুগ পরে। মুক্তিযুদ্ধকে যতটুকু জানি বই, চলচ্চিত্র, নাটক, কবিতার মাধ্যমে জেনেছি প্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাজি রাখার ইতিহাস শুনে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১, বীর বাঙালির এক অনন্য ইতিহাস। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক বীরত্বগাঁথা কাহিনি। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ নিবেদন করেছিল একটি স্বাধীন মানচিত্র বিশ্ব ভূ-খ-ে অঙ্কনের জন্য। দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়ে জন্ম দিয়েছিল এক নতুন দেশ। যার নাম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার রক্তমিছিলে সেদিন যারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন আমাদের ধমনিতে তাদের রক্ত। সব শহীদের রক্তঋণ শোধাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এই প্রজন্ম। ’৭১-এর নরপশু পাকিস্তানিদের সাথে যুক্ত হয়ে যারা সেদিন গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ করে বাঙালির পরিচয়কে মুছে ফেলতে চেয়েছিল তাদের বিচারের দাবিতে সোচ্ছার এই প্রজন্ম। ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের দামে যে স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি তাদের সন্তান হয়ে পবিত্র মাতৃভূমিকে কলঙ্কমুক্ত করার লড়াইয়ে রাজপথে অতন্ত প্রহরীর ন্যায় মহান ’৭১-এর চেতনা ধারণ করে লড়াই করে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশের বিনিময়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে শিক্ষায়, প্রযুক্তিতে, স্বাস্থ্যে, শিল্পে, ব্যবসা-বাণিজ্যে এক অন্যন্য দৃষ্টান্ত রাখার লক্ষ্যে পূর্বসূরিদের সাথে কাজ করে যাচ্ছে প্রজন্মযোদ্ধারা। প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে বলতে চাইÑ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তির ওপর যে রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে তাকে সমুন্নত রাখতে চাই সঠিক নেতৃত্ব। ’৭১-এর চেতনায় উদ্বুদ্ধ প্রতিটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সেই লড়াইয়ে অংশ নিয়ে পবিত্র মুক্তিযুদ্ধকে স্বার্থক করে তুলতে হবে।
এফএম শাহিন
সংগঠক, গণজাগরণ মঞ্চ

53আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। বড়দের কাছ থেকে শুনেছি, বইপুস্তক পড়ে জেনেছি। শুনতে শুনতে, পড়তে পড়তে বিস্ময়ের সঙ্গে অনুধাবন করি, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রের জন্মকাল কতই না বেদনার! কত রক্ত, কত অশ্রু, কত লাশ, কত গুম-খুন আর কত হাহাকার এই রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িত। একটি ভূখ-ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এমন বর্বরোচিত গণহত্যা, নারীদের প্রতি এমন পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা পৃথিবীতে আর কোথায় ঘটেছে? পূর্বপুরুষরা এভাবেই রক্তনদী পাড়ি দিয়ে আমাদের একটি স্বাধীন ভূখ- উপহার দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ইতিহাস থেকে জেনে আমার কাছে যতটা মনে হয়, আমাদের যা কিছু প্রাপ্তি সবই মুক্তিযুদ্ধের কারণেই। এই যে আমি এখন একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে গর্ব করতে পারি, নির্ভয়ে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোভাসি’ গানটি গাইতে পারি, বৈশাখের প্রথম প্রহরে রমনার বটমূলে সমবেত হয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে পারি, বাংলা ভাষায় অবাধে সাহিত্য-সংস্কৃতি করতে পারি, গল্প-উপন্যাস লিখতে পারি, স্বাধীনভাবে পত্র-পত্রিকায় লিখে নিজের মত প্রকাশ করতে পারি, সম্মানের সঙ্গে একটা চাকরি করতে পারছিÑ সবই মুক্তিযুদ্ধের কারণেই। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে না পারলে আমরা থেকে যেতাম পাকিস্তান নামক একটি উদ্ভট রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে। যে রাষ্ট্রধর্মের কারণে বিভাজিত, যে রাষ্ট্র আমার মায়ের ভাষা বাংলাকে অপমান করে রফিক-সালাম-বরকত-জব্বারের মতো দেশপ্রেমিককে হত্যা করেছে। যে রাষ্ট্রে মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণরা উপেক্ষিত। যে রাষ্ট্রের পরিচালকরা চর্যাপদ বোঝে না, রামায়ণ, মহাভারত, মঙ্গলকাব্য, গীতগোবিন্দ, রবীন্দ্রসংগীত, জারি-সারি-ভাটিয়ালি বোঝে না। তারা আমার আচরিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে খাটো করে দেখেছে, আমার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছে।
আমার কাছে মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ আসলে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। আমার সংস্কৃতিই প্রমাণ করে আমি বাঙালি আর ওরা অবাঙালি। ওই অবাঙালিরা যখন বাঙালির সংস্কৃতিকে অপমান করতে শুরু করল তখনই বাঙালি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করল। সিদ্ধান্ত নিল, এই আধিপত্যবাদী, প্রতিহিংসাপরায়ণ, লুটেরা, নিপীড়ক অবাঙালিদের সঙ্গে আর যৌথ বসবাস নয়। ওদের শাসন মানা বাঙালিদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। শেষ পর্যন্ত বাঙালি বিদ্রোহ করল। অকুতোভয় বাঙালির এই গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় যতবারই তাকে দেখি ততবারই এক অহঙ্কারে বুকটা ফুলে ফুলে ওঠে। রেসকোর্সের মাঠে ৭ মার্চ তার সেই কালজয়ী ভাষণ যতবারই শুনি ততবারই বুকটা কেঁপে ওঠে। মনে হয়, কোনো মানুষ ভাষণ দিচ্ছে না, যেন এক বাঘের গর্জন। ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব’, ‘বাঙালিকে তোমরা দাবায়ে রাখতে পারবা না’Ñ কোন বাঙালি এমন হুঙ্কার ছেড়ে শত্রুকে সাবধান করে দিতে পেরেছে বঙ্গবন্ধু ছাড়া? শেখ মুজিবের সেই সাহসী কণ্ঠ আমাকে সর্বদাই অনুপ্রাণিত করে। আমার ‘হীরকডানা’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছি বঙ্গবন্ধুকে।
স্বকৃত নোমান
কথাশিল্পী ও সহযোগী সম্পাদক, সাপ্তাহিক এই সময়

গ্রন্থনা : মাসুদ পথিক ও বাহরাম খান

Category:

Leave a Reply