বিভাগ: ইতিহাস : প্রবন্ধ

মুজিবনগর দিবস প্রবন্ধ

3মেহেরপুর পূর্ব-পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী মহকুমা। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের সময় কৃষ্ণনগর থেকে কেটে এই ছোট মহকুমাটির সৃষ্টি হয়। ভারত বিভাগের মূল নকশাকার স্যার র‌্যাডক্লিফের অপরিণামদর্শী আচরণ ও নানান খামখেয়ালিপনার এটি একটি উদাহরণ। কারণ মেহেরপুর ও কৃষ্ণনগরের মধ্যে কোনো প্রাকৃতিক সীমারেখা নেই। এই বৈশিষ্ট্যটি কয়েক যুগ পরে ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে মেহেরপুরের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হবে, সে কথায় পরে আসছি।

পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানের এই সীমান্তবর্তী ভূখ-ও ২৪ বছর পর ইতিহাসের স্রোতধারায় একাকার হয়ে গেল।
মেহেরপুর পলাশী যুদ্ধপ্রান্তর হতে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে যেখানে ১৭৫৭ সালে সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজত্বের সূচনা হয়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, পলাশীর যুদ্ধ মানব ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ এবং পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশে সবচাইতে সুদূরপ্রসারী ঘটনা ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশ পরিত্যাগের সময় হাজার মাইল দূরের দুটি ভূখ-কে এক দেশ বা পাকিস্তান হিসেবে জন্ম দিয়ে একটি অবাস্তব রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে যায়।
১৯৭১-এর মার্চ মাসকে তাই ইতিহাসের শুদ্ধি অভিযানের সময় বললেও অত্যুক্তি হবে না।
পাকিস্তানি তথা পশ্চিম পাকিস্তানিদের তিন দশকের শঠতা, বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সুকৌশলে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের অহিংস আন্দোলনে সারাদেশ যখন উত্তাল, মেহেরপুরও তখন এর ব্যতিক্রম ছিল না। ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে ছোট্ট নিভৃত এই সীমান্ত এলাকার মহকুমা প্রশাসক ছিলাম আমি।

প্রতিরোধ যুদ্ধ ও মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা
২৬ মার্চ ভোরবেলা। মেহেরপুরকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আমার কাছে মনে হলো সমস্ত জনতার মধ্যে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে এবং প্রত্যেকে তার একক সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে এক সম্মিলিত সত্তায় রূপান্তরিত হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রেরণা এবং এর অবশ্যম্ভাবী শক্তি এই জনতার নব রূপান্তরিত সত্তার মধ্যে নিহিত ছিল। প্রতিটি লোক এবং প্রতিটি ছেলে আমার কাছে নতুনভাবে ধরা দিয়েছিল। গাঁয়ের বধূরা পর্যন্ত এই স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণে অঙ্গাঙ্গীভাবে একাত্মতা অনুভব করেছিল। সেই মুহূর্তে আমি যেন দিব্যচক্ষে পৃথিবীর বড় বড় বিপ্লবকে দেখতে পেলাম।
সমগ্র পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, আমাদের যে কোনো জায়গা থেকে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে। শুধুমাত্র ভারতই সেই সময় এ বিষয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারে। দ্বিতীয়ত; ভারত-পাকিস্তানের ঐতিহাসিক বিরোধের পটভূমিকায় এটা স্পষ্ট ছিল যে বাংলাদেশে যে কোনো সামরিক বা গণ-অভ্যুত্থান হলে ভারতের সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে দুটি চিঠি পাঠাই।
প্রথম চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল নদীয়া জেলা প্রশাসকের কাছে। একটা অনুলিপি পাঠাই লেফটেন্যান্ট কর্নেল চক্রবর্তীর (সিও, ৭৬ বিএসএফ, যা মেহেরপুর সীমান্তের ভারতে মোতায়েন ছিল) কাছে। দ্বিতীয় চিঠিটি আমি ভারতবর্ষের জনগণকে উদ্দেশ্য করে পাঠাই। দুটোতেই আমি আমার স্বাক্ষর এবং মহকুমা প্রশাসকের সিলমোহর ব্যবহার করি।
কর্নেল চক্রবর্তীর কাছে জানতে পারি যে চিঠিটা নদীয়ার জেলা প্রশাসক মি. মুখার্জীর কাছে লেখা। দিল্লিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনতিবিলম্বে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তারই ফলস্বরূপ ২৯ মার্চ আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণ পাই বেতাই বর্ডার পোস্টে সাক্ষাতের জন্য।
২৯ মার্চ আমি বেতাই বিওপি-তে উপস্থিত হই। নদীয়ার জেলা প্রশাসক এবং কর্নেল চক্রবর্তী আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং স্থানীয় বিএসএফের একটি ছোট দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। আমি এবং কর্নেল চক্রবর্তী গার্ড অব অনার পরিদর্শন করি। নদীয়ার জেলা প্রশাসক আমাকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে অভিহিত করে মর্যাদা দেন।
আমাদের বৈঠক এক ঘণ্টাকাল স্থায়ী হয়। আপ্যায়নের মাধ্যমে মি. মুখার্জী আমাকে জানান যে আমার চিঠির উত্তরে ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া আমাকে শীঘ্রই জানানো হবে এবং তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দেশের অপেক্ষা করছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাদের সংগ্রামে ভারতের জনগণের ও সরকারের সমর্থন জানান এবং সাহায্যের ব্যাপারে আশ্বাস দেন।
এর পরেই আমাকে খবর পাঠানো হয় যে আমি যেন ৩০ মার্চ চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে চেংখালী চেকপোস্টের অদূরে ভারতীয় বিওপি-তে কোনো একজন সামরিক অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করি আমাদের সামরিক প্রয়োজন সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করার জন্য। ইতোমধ্যে চুয়াডাঙ্গায় তদানীন্তন ইপিআরের উইং কমান্ডার মেজর ওসমানের সাথে আমার যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
৩০ মার্চ সকালে মেহেরপুর থেকে ১৮ মাইল দূরে চুয়াডাঙ্গায় মেজর ওসমানের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে যাই। চুয়াডাঙ্গায়, কুষ্টিয়ায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায় মেজর ওসমান পরামর্শ দেন যে আমি যেন আমার ছেলেবেলার বন্ধু এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কমরেড-ইন-আর্মস মাহবুব উদ্দীন আহমেদকে (তদানীন্তন ঝিনাইদহের এসডিপিও) সাথে নিয়ে যাই। আমি মাহবুবের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু অল্প সময় পরে হঠাৎ সে মেজর ওসমানের চুয়াডাঙ্গা অফিসে আবির্ভূত হয়। মাহবুবকে আমি ভারতীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত করি এবং তাকে বলি ঐদিন সন্ধ্যায় ভারতের চেংখালী চেকপোস্ট বিওপি-তে যেতে হবে, কিছু সামরিক অস্ত্রশস্ত্র নিতে হবে। আর এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সাথে বিশদ আলোচনা করতে তাকে বলি। আমি তখন অত্যধিক উত্তেজিত ছিলাম। লক্ষ করলাম মাহবুবও কম উত্তেজিত ছিল না। কারণ একটু পরেই বুঝতে পারলাম। মাহবুব আমাকে অদূরবর্তী একটি জিপের কাছে নিয়ে চলল এবং খুব গোপনে বলল (মেজর ওসমানও এ ঘটনা সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন না) যে, ঐ জিপের ভিতরে দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বসে আছেনÑ তারা হচ্ছেন জনাব তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম। আমরা দুজনে জিপের ভেতরে প্রবেশ করলাম।
আলাপ-আলোচনার পর বুঝতে পারলাম তারা বিভিন্ন জনপদ ঘুরে ঝিনাইদহে এসেছেন এবং সেখান থেকে মাহবুব তাদের মেহেরপুরে নিয়ে আসে। উদ্দেশ্য তাদের যেন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছানো যায়। তাজউদ্দীন আহমদ এবং আমীর-উল-ইসলামের সীমান্তের অপর দিকে যাবার ব্যবস্থা করা হবে আমার সহযোগিতায়। শর্ত একটা আমরা যাদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি তাদের কাছে এ দুজনের পরিচয় গোপন রাখব। তারা জানতে চাইলে আমরা বলব, এ দুই ব্যক্তি আমাদের পরিচিত।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাক্ষাতের জন্য বিকেলে সীমান্তের উদ্দেশ্যে দুটো জিপে আমরা রওয়ানা দেই। পথে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। আমরা ব্যারিকেড সরিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমাদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড্ডীয়মান। রাস্তার দুপাশে জনতা মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিয়ে আমাদের সম্বর্ধনা জানাচ্ছিল। দুটো জিপগাড়ি তাদের কাছে স্বাধীনতার শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছিল। এরা অনেকেই আমাদের চিনত। গ্রামবাসীরা বুঝতে পেরেছিল যে আমরা কোনো গোপন মহৎ সামরিক উদ্দেশ্যে সীমান্তে ঘোরাফেরা করছি। পথে পথে দেখতে পেলাম স্বতঃস্ফূর্ত জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, অস্ত্র বলতে ছিল হয়তো একটা-দুটো শটগান। তখনই এদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের নিউক্লিয়াস এবং আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম যে ভবিষ্যতে প্রস্তুতি, সামরিক প্রতিরোধ এবং সংঘর্ষে জনশক্তি এবং প্রেরণা এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অথচ দলবদ্ধ জনতাই জোগাবে।
সন্ধ্যার পরপর আমরা চেংখালী চেকপোস্টে পৌঁছলাম। ভারতীয় বিএসএফের একজন সিপাহির সহযোগিতায় আমরা বিওপি-তে পৌঁছলাম। আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন বিএসএফের মহাপরিচালক গোলক মজুমদার এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল চক্রবর্তী। আনুষঙ্গিক আলোচনার পর দুটো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলোÑ
১. আমাদের আগামীকাল থেকে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হবে এবং
২. ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে হবে এবং যথাসম্ভব প্রচেষ্টা চালাতে হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের সাথে যোগাযোগ করার।
তখনও তারা জানতেন না যে আমাদের সাথে তাজউদ্দীন আহমদ এবং আমীর-উল-ইসলাম রয়েছেন।
আমি এবং মাহবুব নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করলাম যে, আমাদের সাথে তাজউদ্দীন আহমদ রয়েছেন তা গোলক মজুমদারকে জানাব এবং গোলক মজুমদারকে তা জানালাম। তিনি আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে তাড়াতাড়ি তাজউদ্দীন সাহেবকে তার কাছে নিয়ে আসতে বললেন। আমরা তাজউদ্দীন সাহেবকে তাঁর কাছে নিয়ে আসলাম। তারা একে অপরকে আন্তরিকভাবে করমর্দন এবং আলিঙ্গন করলেন। গোলক মজুমদার আমাদের বলেছিলেন যে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে একটি সামরিক জেট বিমান অপেক্ষা করছে। যদি কোনো নীতি-নির্ধারণী রাজনীতিবিদ আসেন তবে তাতে তক্ষুণি দিল্লিতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। হয়তো ঐ প্লেনেই তাজউদ্দীন আহমদ এবং আমীর-উল-ইসলাম দিল্লিতে গিয়েছিলেন।
দু-একদিনের মধ্যেই চুয়াডাঙ্গার সাথে মেহেরপুরের যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং আমি মেজর ওসমানের সাথে চুয়াডাঙ্গায় সাক্ষাৎ করি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার বিষয়বস্তু তাকে অবহিত করি। মেজর ওসমান আমাকে প্রয়োজনীয় সামরিক অস্ত্রসম্ভার সম্বন্ধে ধারণা দেন।
চুয়াডাঙ্গাতে ইতোমধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত এবং কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিলÑ
১. ইপিআর উইং হেড কোয়ার্টার চুয়াডাঙ্গা এবং তার অধীনস্ত সমস্ত বিওপি-তে সকল অবাঙালি ইপিআর-কে নিরস্ত্র করা;
২. কুষ্টিয়া জেলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোতায়েন সম্বন্ধে বিশদ খবরাখবর সংগ্রহ করা;
৩. কুষ্টিয়ার উপর একটা আক্রমণের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করা।
এই মিশনের জনশক্তি জোগাবে একদিকে ইপিআর, অন্যদিকে আনসার, মুজাহিদ এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা। আক্রমণ এবং অবরোধ মোটামুটি ত্রিমুখী হবে। একদিকে মাহবুব উদ্দীন আহমেদ ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া রাস্তা অবরোধ করবেন এবং মেহেরপুর থেকে ইপিআর, আনসার, মুজাহিদদের একটি দল কুষ্টিয়া অভিমুখে অগ্রসর হবে। অপরদিকে প্রাগপুর-ভেড়ামারা-কুষ্টিয়া থেকে ইপিআর বাহিনী কুষ্টিয়া অভিমুখে অগ্রসর হবে। এই সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী।
প্রথমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে এই আক্রমণ ২৯ মার্চ ভোর ৫টার সময় শুরু করা হবে। পরে এই সিদ্ধান্ত ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অনধিক দুই কোম্পানি সৈন্য কুষ্টিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো পাহারা দিচ্ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, রেকি এবং সাপোর্ট ব্যাটালিয়নের একটা অংশ ছিল। এদের ফায়ার পাওয়ার, মোবিলিটি এবং কমিউনিকেশন পাকিস্তানের অন্যান্য সাধারণ পদাতিক ব্যাটালিয়নের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
শহরের উপকণ্ঠে, অনেকটা অবরোধের মতো প্রথমে মুক্তিবাহিনীকে ‘যার মধ্যে ইপিআররা ছিলেন মূল শক্তি’ মোতায়েন করা হয়। আমাদের অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল পুরনো ৩০৩ রাইফেল এবং কিছু পুরনো এসএমজি। ইপিআর ছাড়া আনসার এবং মুজাহিদের কাছে ১০ রাউন্ড বা অনূর্ধ্ব ২০ রাউন্ডের মতো গুলি ছিল।
৩০ মার্চ সকালে অবরোধের স্থানগুলো থেকে যুগপৎ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অবস্থানের ওপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করা হয় এবং সাথে সাথে আমাদের প্রত্যেকটি অবস্থানের পেছনে সমবেত হাজার হাজার লোক গগনবিদারী আওয়াজে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তোলে এবং সেøাগান দিতে দিতে মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রসর হতে থাকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই অতর্কিত আক্রমণে, জনতার এই আকাশফাটা চিৎকারে এবং রাইফেল ছাড়াও কিছু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের আওয়াজে দিশেহারা এবং ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এটা তাদের কল্পনাতীত ছিল যে বাঙালি ইপিআর জওয়ানরা ঐ অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের সংগঠিত করে সুসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণ করার দুঃসাহস করবে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিক্ষিপ্ত দলগুলো এই আক্রমণের মুখে তাদের কুষ্টিয়া সেনাবাহিনীর সদর দফতরের দিকে পিছিয়ে পড়তে থাকে। তাদের এই পশ্চাদপসরণে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও মনোবল দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য এই আক্রমণ ছিল সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিজনক। কারণ, তারা বুঝতে পারেনি কারা কোথা থেকে তাদের ওপর এই আক্রমণ চালাচ্ছে এবং কেন?
এই পশ্চাদপসরণই তাদের জন্য কাল হলো। কারণ প্রত্যেকটা ঘটনার সাথে সাথে তাদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছিল এবং আমাদের মনোবল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এভাবে যুদ্ধ সারাদিন চলতে থাকে। সন্ধ্যার দিকে শত্রুপক্ষ অবস্থান থেকে পুল আউট করে কুষ্টিয়া জেলা স্কুল এবং সার্কিট হাউসে একত্রিত হতে থাকে। এটাই তাদের জন্য কাল হয়। আমরাও তাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। আমাদের অবরোধ তিন দিক থেকে এসে জেলা স্কুল এবং সার্কিট হাউস ঘিরে ফেলে, যদিও তখন পর্যন্ত কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ রাস্তার কয়েক মাইল জনশক্তির অভাবে আমাদের আয়ত্তাধীন ছিল না। পরে অবশ্য আমরা এই দল থেকে বন্দী লেফটেন্যান্ট আতাউল্লার কাছ থেকে জানতে পারি যে, মেজর শোয়েব এবং অন্যান্য অফিসাররা রি-ইনফোর্সমেন্টের জন্য বারবার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন যশোর সেনাবাহিনীকে। কিন্তু যশোর সেনানিবাস তাদের কোনো সাহায্যের আশ্বাস দিচ্ছিল না। এতে তথাকথিত দুর্ধর্ষ ২৭ বেলুচ সেনাবাহিনী একেবারে ইঁদুরের মতো হয়ে যায় এবং পালাবার পথ খুঁজতে শুরু করে। ৩১ মার্চ থেকে তারা পলায়ন করতে শুরু করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠান
মেহেরপুরের কোনো এক স্থানে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের প্রস্তাবের কথা আমরা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের দিকে জানতে পারি। তাই আমরা তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল-ইসলামের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য গভীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করতে থাকি। এই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে এগিয়ে আসছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে শত্রুবাহিনীর প্রচ- আক্রমণের মুখে আমরা পশ্চাদপসরণ শুরু করি। ওদের সৈন্যসংখ্যা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। আমাদের রণকৌশলগত পশ্চাদপসরণ ছিল প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধ অনিবার্য পরাজয়েরই সূচনামাত্র।
১২ এপ্রিলÑ দিনের পর দিন মরণপণ যুদ্ধের পরও আমরা যখন কোনো স্বীকৃতি পাচ্ছি না, তখন আমাদের মনোবল ভাঙতে শুরু করে। একটা পর্যায় পর্যন্ত মানুষের মনোবল অক্ষুণœ থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে অনেকগুলো ব্যর্থতা আমাদের যোদ্ধাদের মনেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। এমন এক সংকটজনক দিনে আমি খবর পেলাম, বাংলাদেশ সরকার ১৬ কিংবা ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করবে। তার আগেই আমি প্রাথমিক ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করে ফেলেছিলাম। ৩টি বিষয়ের ভিত্তিতে আমাদের স্থান নির্ধারণের কাজ করতে হয়েছেÑ
১. শত্রুর অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রাখা;
২. ভারতীয় এলাকা থেকে সহজ যাতায়াতের সুযোগ থাকা এবং
৩. শত্রুর সম্ভাব্য বিমান আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ছদ্মাবরণ থাকা।
১৬ এপ্রিল মাহবুব ও আমি চূড়ান্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট স্থানের দিকে যাত্রা করি। তখন ছিল অত্যন্ত সংকটজনক সময়। আমাদের বাহিনীর পশ্চাদপসরণের খবর পাচ্ছি। অগ্রবর্তী এলাকার সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। আমাদের সেনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে পরিণত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। মেজর ওসমান তখন আমাদের বাহিনীর প্রধান। তার সদর ঘাঁটি মেহেরপুরে সরিয়ে এনেছেন। মেজর ওসমান ভীষণ ব্যস্ত এবং চিন্তান্বিত। পাকিস্তানি বাহিনী একের পর এক আমাদের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে এগিয়ে আসছে। আমরা তখনও জনতাম না আর কতদিন মাতৃভূমির বুকে আমাদের শেষ ঘাঁটি টিকিয়ে রাখতে পারব।

১৭ এপ্রিল
নীরব আম্রকুঞ্জ। সমবেত গ্রামের মানুষ। অতীতে এখানে কোনো অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়নি। আমরাও অনুষ্ঠানের কথা গোপন করে রেখেছিলাম। গ্রামের মানুষের শূন্য দৃষ্টির ভাষা আমি বুঝতে পেরেছি। তারা যেন এক অঘটন ঘটতে দেখছেÑ বিস্ময়াবিষ্ট, নিষ্পলক। মেহেরপুরের নীরব নিস্তব্ধ আম্রকানন। ভাগ্যের লিখনে আজ তা ঐতিহাসিক এক ঘটনার জন্য প্রস্তুত।
সকালেই মাহবুব ও আমি আমার জিপে করে এখানে উপস্থিত হই। কয়েক দিন অনাহারে-অর্ধাহারে থাকার পর কিছু খাদ্যের জন্য লালায়িত ছিলাম। সীমান্ত ফাঁড়ির আনসার ও মুজাহিদরা তাদের উদ্বৃত্ত খাবার থেকে কিছু ডাল-ভাত আমাদের বেড়ে দেয়। আমরা গোগ্রাসে তা শেষ করি। ঘুরে-ফিরে সাদামাটা আয়োজনের কিছু তদারকিও করি।
বেশ কয়েক দিন ধরে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছিল। গত রাতে মুষলধারায় বৃষ্টি হয়। ভারত সীমান্ত থেকে কয়েকশ গজ পূর্বে বৈদ্যনাথতলার সীমান্ত ফাঁড়ির পাশের আমবাগান। সকালের বৃষ্টি বিধৌত রৌদ্রস্নাত আমবাগানটি যেন এক মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। আশপাশেও আরও অনেক আমবাগান। আমবাগানের বিস্তৃত চাঁদোয়ার নিচে পুরনো ধরিত্রী পুনরুজ্জীবিত। ফাঁকে ফাঁকে সূর্যরশ্মি সকালে খেলায় ব্যস্ত। একটা মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে নিতান্তই সাদামাটা। সামনে কয়েক সারি কাঠের চেয়ার। আশপাশের গ্রাম থেকে এবং কিছু সীমান্তের ওপারের ভারত থেকেও আনা হয়েছে। ১০টা-১১টার দিকে একটা গাড়ির বহরে বৈদ্যনাথতলা সরবে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ভারত ও বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমের অনেক প্রতিনিধিও সেই বহরে ছিলেন।
এই নিভৃত গ্রামে আমি ও মাহবুব তাদের অভ্যর্থনা জানাই ও মঞ্চে নিয়ে যাই। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন, বাইবেল ও গীতা থেকে পাঠ করা হয়। পাশে খ্রিস্টান মিশন থাকায় বাইবেল পাঠের লোক সহজেই পাওয়া যায়। অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পড়ে শোনান। সংক্ষিপ্ত এই ঘোষণায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে বাঙালির নির্যাতন, প্রবঞ্চনা ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। সেই সাথে সরকার গঠন ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিবরণ দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রপতির অবর্তমানে উপ-রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকারের এই ঘোষণা শুনতে শুনতে আমি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে।
এরপর অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্যদের শপথবাক্য পাঠ করান।
স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। স্থানীয় লোকজনদের নিয়ে একটি দল জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ পরিবেশন করে। এ সময় জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন জানায় মাহবুবের নেতৃত্বে স্থানীয় আনসার-মুজাহিদদের ছোট্ট একটি দল। এখানে বলে রাখা দরকার মেজর ওসমান চৌধুরীর নেতৃত্বে ইপিআরের একটি দলের গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা ছিল। অনুষ্ঠান শুরুর আগে তারা পৌঁছতে না পারায় আমি তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করি। পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ায় এসব অনুষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা মাহবুবের ছিল। আমি তাকে অনুরোধ করি উপস্থিত আনসার-মুজাহিদদের নিয়ে গার্ড অব অনার দেওয়ার একটি অনুশীলন করার জন্য। মাহবুব তাৎক্ষণিকভাবে সম্মত হয়ে প্রস্তুতি নেয়। অত জৌলুসপূর্ণ না হলেও আনসার-মুজাহিদদের এ ধরনের প্রশিক্ষণ ছিল। যদিও তাদের পোশাক-আশাক ছিল নিতান্ত সাধারণ ও মলিন। কিন্তু এই ঐতিহাসিক সুযোগের আনন্দে তারাও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন।
মাহবুব গার্ড অব অনার প্রদান করলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সালাম গ্রহণ করেন এবং গার্ড পরিদর্শন করেন। মঞ্চে ফেরত আসার পর আমি উপ-রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে অন্যান্য উপস্থিত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। এরপর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভাষণ দিলেন। শেষ ভাষণটি ছিল উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের।
দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকসহ অন্যরা অনুষ্ঠানটি ধারণ করেন। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি দু-ঘণ্টার মতো স্থায়ী ছিল। অনুষ্ঠান শেষে সবাই আবার গাড়িতে উঠে পড়লে গাড়ির বহর যে পথে এসেছিল সে পথেই ভারতের দিকে ফিরে যায়।
রূপকথার সোনার কাঠি-রূপার কাঠির ছোঁয়ায় হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল এই জনপদ। সবাই চলে যাওয়ার পর আবার সুনসান নীরবতা। ঐতিহাসিক ঘটনার আকস্মিকতায় অনেকেই হতবাক। ১০০ কিলোমিটার দূরে পলাশীর প্রান্তরে হৃত স্বাধীনতা ও পরবর্তী বিকৃত ইতিহাসের শুদ্ধি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
তাজউদ্দীন আহমদ তার বক্তৃতায় ঘোষণা দেনÑ এই জনপদের নাম হবে মুজিবনগর।
[ঈষৎ সংক্ষেপিত]

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*