বিভাগ: ছোট গল্প

যুদ্ধের খেলা

3-4-2018 8-12-42 PMইমরুল ইউসুফঃ স্যার, আমাদের স্কুল কবে খুলবে? আমার এই কথা শুনে স্যার চোখ থেকে চশমাটা খুললেন। তারপর লম্বা একটা শ্বাস ছাড়লেন। বললেন, সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় স্কুল চালানো যায় না। কবে স্কুল খুলবে তাও জানি না। কারণ এখন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়। যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়। যুদ্ধ কী স্যার? বলল, মনি। যুদ্ধ মানে সংগ্রাম, লড়াই। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই। এ লড়াইয়ে জেতা মোটেও সহজ নয়। এটা একটা খেলা। বুদ্ধি করে যে ভালো খেলবে সেই জিতবে। শোনো, এ সময় তোমরা খুব সাবধানে থাকবে। দরকার ছাড়া বাইরে যাবে না। এই কথা বলে স্যার বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন।
স্যার চলে যাওয়ার পর আমি সুরুজ ও মনি স্কুলের মাঠে এসে বসলাম। ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। এমন সময় সুুরুজ বলল, আমরাও তো যুদ্ধে যেতে পারি।
মনি বলল, না ভাই আমার মা কিছুতেই যেতে দেবে না। আর আমরা তো বন্দুক চালাতে জানি না। বোমা ছুড়তে জানি না। কীভাবে শত্রুর মোকাবিলা করতে হয় তাও জানি না। আমরা কীভবে যুদ্ধ করব?
মনির এই কথা শুনে আমার হেড স্যারের কথা মনে পড়ল। বললাম, স্যারের কথা শুনিস নি। যুদ্ধ একটা খেলা। বুদ্ধি করে এই খেলা খেলতে হয়। এই খেলা যে ভালো খেলবে সে-ই জিতবে। সুরুজ, মনি শোন। কোনো অস্ত্র ছাড়াই আমরা যুদ্ধ করব। স্কুল খোলার জন্য যুদ্ধ করব। যুদ্ধ করব রাস্তাঘাটে শান্তিতে চলার জন্য। দেশ বাঁচানোর জন্য।
সুরুজের বড় ভাই মারা গেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে সুমন শহিদ হয়েছে। অনেক কষ্ট করেও মুক্তিযোদ্ধারা তাকে বাঁচাতে পারেনি। খবরটা এলো এই মাত্র। খবর শুনে সুরুজ কাঁদতে লাগল। আমরা তাকে কাঁদতে নিষেধ করলাম। বললাম, সুরুজ বাড়ি চল।
আগুন আগুন। মনিদের বাড়িতে আগুন লেগেছে। এমন চিৎকার শুনে কাটাখালী গ্রামের মানুষ জেগে উঠল। অন্ধকার গ্রাম আগুনের শিখায় আলোকিত হয়ে উঠল। আগুন দেখে বাইরে বের হতে চাইলাম। কিন্তু মা বের হতে দিলেন না।
বললেন, খবরদার বাইরে বের হবি না। এমন সময় আমার বাবা ঘরে ঢুকলেন। বললেন, খান সেনারা মনিদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মনির বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। ওদের এখন খুব বিপদ।
মনিদের বিপদ। কথাটা শুনেই আমার বুক কেঁপে উঠল। বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য ছটফট করতে লাগল। কিন্তু কথাটা বাবকে বলতে সাহস হলো না। অবশেষে বাবাই কথাটা বললেন। ‘এই রাতে ওরা কোথায় যাবে। যাই ওদের আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি।’
কথাটা শুনে আমার খুব ভালো লাগল। কিছু সময়ের মধ্যে মনি ও তার স্বজনরা আমাদের বাড়িতে এলো। কিন্তু তাদের ভয় কাটল না। গ্রামে পাকহানাদার বাহিনী ঢুকে পড়েছে। এই খবর মুহূর্তেই আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ে অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। কিন্তু মুক্তিসেনারা পালায় না। আমরা পালাই না। কীভাবে খান সেনাদের ঘায়েল করা যায় সে কথাই ভাবতে থাকি।
হঠাৎ আমার মাথায় একটি বুদ্ধি আসে। মনিকে সুরুজদের বাড়িতে পাঠাই। সুরুজকে স্কুলের মাঠে আসতে বলি। আমরা তিনজন যখন এক জায়গায় হই তখন দুপুর। রাস্তায় একজনও মানুষ নেই। স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের হই-চই নেই। স্কুলটি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
আর চুপ করে না থেকে আমরা কথা বলা শুরু করলাম। পাকসেনাদের দেখা মাত্রই আমরা কী করব তা আলোচনা করে ঠিক করলাম। এজন্য দরকারি জিনিস কীভাবে জোগাড় করব সেও ঠিক করে ফেললাম। সিদ্ধান্ত নিলাম দরকারি জিনিসগুলো সবসময় আমাদের কাছে থাকবে। কারণ যে কোনো সময় পাকসেনারা আমাদের গ্রামেও ঢুকতে পারে।
একদিন হাঁটতে হাঁটতে আমরা বাড়িতে ফিরছি। এমন সময় আমরা দুজন পাকসেনা দেখতে পেলাম। তাদের যে এত তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব, আমরা ভাবতেই পারিনি। দেখলাম তারা আমাদের দিকে গট গট করে এগিয়ে আসছে। পায়ে বুট জুতা। গায়ে খাকি রঙের পোশাক। হাতে বন্দুক। মুখে মোটা গোঁফ। চোখ দুটি গোলগোল। মাথায় হেলমেট। এর ঠিক পেছনেই একজন রাজাকার। গায়ে লম্বা জামা। মাথায় টুপি। মুখে দাড়ি। মায়ের বলা গল্পের সঙ্গে তাদের চেহারার হুবহু মিল।
‘হাঁ করে কী দেখছিস? ওরা তো এসে গেল’। মনি বলল। আমি বললাম, মনি সুরুজ তোরা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়। সময়মতো সব কাজ করবি। দেখিস ভুল হয় না যেন।
দুই পাকসেনা আমার কাছাকাছি আসতেই আমি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম মাটিতে। মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ করতে লাগলাম। আমার খুব পেট ব্যথা করছে, এমন ভান করতে লাগলাম। ‘আমার পেটের নিচে কিছু দিন। আমার পেটের নিচে কিছু দিন।’ এই কথা বলতে লাগলাম।
আমার ছটফটানি দেখে পাকসেনারা দৌড়ে আমার কাছে এলো। মুখ নিচু করে আমাকে দেখতে লাগল।
‘এ লেড়কা তুমকো কেয়া হুয়া’ একজন সেনা বলল। আমি এই কথা শুনে আরও জোরে গোঙাতে লাগলাম। আমি এমন ভাব করতে লাগলাম যে, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার কষ্ট দেখে ওদের একটু মায়া হলো। আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে মনি ও সুরুজ বের হয়ে এলো। পকেট থেকে তামাক পোড়ার গুঁড়া বের করল। তারপর দুই পাকসেনার চোখে মুখে ছুঁড়ে মারল। তামাকের গন্ধে দুই পাকসেনা কাশতে লাগল। হাঁচি দিতে লাগল। এমন সময় মনি ও সুরুজ আবার তামাক পোড়া ছুড়ল। তামাকের গন্ধে তারা দুজন ঝটপট করে উঠে দাঁড়াল। এ কয়ো হো গেয়া, এ কয়ো হো গেয়া। বদমাস ছোকড়াকা এ মুঝছে কেয়া কর দিয়া।’ এই কথা বলতে বলতে তারা আরও বেশি হাঁচি দিতে লাগল। তামাকের গন্ধে ছটফট করতে করতে তারা তাদের কাঁধ থেকে রাইফেল ফেলে দিল। তারপর চোখ মুখ ডলতে ডলতে পুকুরে ঝাঁপ দিল।
তাদের এমন কা- দেখে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে এলো। পুকুর পাড়ে দুই পাকসেনাকে ঘিরে ধরল। দুই শয়তানকে আজ আমরা কিছুতেই ছাড়ব না। এ কথা বলতে লাগল। কেউ কেউ আবার আনন্দ করতে লাগল মনি, সুরুজ ও আমাকে নিয়ে।
এমন সময় আমাদের স্কুলের হেড স্যার এলেন। রাইফেল দুটি হাতে তুলে নিলেন। আমাদের তিনজনকে কাছে ডাকলেন। ‘তো কি এমন করেছিস যে ওরা রাইফেল ফেলে পানিতে গিয়ে পড়ল?’ বললেন স্যার।
‘চোখে মুখে তামাক পোড়ার গুঁড়া দিয়েছি স্যার’ মনি বলল। ‘এত তামাক পোড়া তোরা কোথায় পেলি?’ স্যার বললেন। আমি বললাম, চুরি করেছি। আমরা সুরুজের দাদা-দাদির আর মনির নানার পান খাওয়ার তামাক চুরি করেছি। তারপর ওই তামাক শয়তান দুটির মুখে ছুঁড়ে মেরছি। আজ আমরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করেছি স্যার। এ যুদ্ধে আমরা জিতেছি স্যার।
এই কথা শুনে স্যার আমার মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, তোরা আজ যে কাজ করেছিস তাতে দেশ শত্রুমুক্ত হবেই।

লেখক : সহ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*