বিভাগ: যুদ্ধাপরাধ

রক্তপিপাসু ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধী সাকার মৃত্যুদণ্ড বহাল

06উত্তরণ প্রতিবেদন: সর্বোচ্চ আদালত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা বহাল থাকায় মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামের ত্রাস সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ফাঁসিকাষ্ঠেই যেতে হবে। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ গত ২৯ জুলাই এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য ছিলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
চট্টগ্রামের রাউজানে কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, সুলতানপুর ও ঊনসত্তরপাড়ায় হিন্দু বসতিতে গণহত্যা এবং হাটহাজারীর এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তার ছেলেকে অপহরণ করে খুনের চার অভিযোগে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এক বছর ৯ মাস পর আপিলের রায়ে ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগের সবগুলোতেই সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখা হয়েছে। ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ২০ বছরের কারাদ-ও বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া পাঁচ বছর কারাদ-ের রায় বহাল রাখা হয়েছে ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগেও। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আদালতের ভেতরে-বাইরে উপস্থিতদের স্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, এই রায়ে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।
জীবনভর বিভিন্ন কর্মকা- ও মন্তব্যের কারণে বিতর্কিত সাকা চৌধুরীই প্রথম বিএনপি নেতা, যাকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলতে হচ্ছে। আর তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করা দ্বিতীয় ব্যক্তি, এই অপরাধে চূড়ান্ত রায়েও যার সর্বোচ্চ সাজার রায় হলো। মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের (ফকা) চৌধুরীর ছেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাকা চৌধুরী যে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে হিন্দু ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক নিধন এবং নির্যাতন শিবির চালিয়েছিলেন, এ মামলার বিচারে তা উঠে আসে।
২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালে দ-িতদের মধ্যে সাকা চৌধুরী হলেন পঞ্চম ব্যক্তি, আপিল বিভাগে যার মামলার নিষ্পত্তি হলো। পাঁচ বছর আগে বিজয় দিবসের ভোরে তখনকার সংসদ সদস্য সাকা চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২৯ জুলাই যখন আপিলের রায় হলো তখন তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে।
নিয়ম অনুযায়ী, সুপ্রিমকোর্ট এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে। সেটি হাতে পেলে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবেন ট্রাইব্যুনাল। সেই মৃত্যু পরোয়ানা ফাঁসির আসামিকে পড়ে শোনাবে কারা কর্তৃপক্ষ। পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করতে পারবে আসামিপক্ষ। তবে রায়ের নির্ভরযোগ্যতায় ‘খাদ আছে’ বা ‘বিচার-বিভ্রাটের’ আশঙ্কা আছে বলে মনে করলেই আদালত তা পুনর্বিবেচনার জন্য গ্রহণ করবে। রিভিউ যে আপিলের সমকক্ষ হবে না, তা যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামাত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ‘রিভিউ’ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়েই স্পষ্ট করা হয়েছে। রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তি হয়ে গেলে এবং তাতে মৃত্যুদ- বহাল থাকলে আসামিকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টি ফয়সালা হয়ে গেলে সরকার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। দুই জামাত নেতা কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের রায় বাস্তবায়নের আগে পালিত প্রক্রিয়াগুলো এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৩ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার গহিরা গ্রামে। তার বাবা মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী একসময় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকারও হয়েছিলেন। সালাউদ্দিন কাদেরের রাজনীতির শুরুও মুসলিম লীগ থেকে। পরে জাতীয় পার্টি ও এনডিপি হয়ে তিনি বিএনপিতে আসেন।
সাকা চৌধুরী বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। এর আগে সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের শাসনামলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সাকা চৌধুরী। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয় ১৯ ডিসেম্বর। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তার বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলামসহ মোট ৪১ জন সাক্ষ্য দেন। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া আরও চারজনের জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে প্রহণ করা হয়। অন্যদিকে সালাউদ্দিন কাদেরের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তিনি নিজেসহ মোট চারজন। ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদ-ের রায় দিলে এর ২৮ দিনের মাথায় আপিল করেন সালাউদ্দিন কাদের। চলতি বছর ১৬ জুন থেকে মোট ১৩ দিন দুই পক্ষের যুক্তি শোনেন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ। শুনানি শেষে আদালত ২৯ জুলাই রায়ের দিন ধার্য করেন।
সাকা চৌধুরীর মামলাসহ চূড়ান্ত রায় এসেছে পাঁচ মামলায়। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রায়ে জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ হলে ওই বছর ১২ ডিসেম্বর দ- কার্যকর করা হয়। ঠিক এক বছর পর আপিলের দ্বিতীয় রায়ে জামাতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দেন আপিল বিভাগ। তবে সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত না হওয়ায় রিভিউ নিষ্পত্তি হয়নি। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ তৃতীয় রায়ে জামাতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সর্বোচ্চ সাজা দিলে ২০১৪ সালের ১১ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। চলতি বছর ১৬ জুন জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায়ই বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হলে তার দ- কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আপিল শুনানি চলাকালেই মৃত্যু হয়েছে জামাতের সাবেক আমির গোলাম আযম এবং বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের।

একাত্তরে হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে ফোরকানের মৃত্যুদ-
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে পটুয়াখালীর রাজাকার ফোরকান মল্লিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ১৬ জুলাই এই আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম।
ফোরকান মল্লিকের বিরুদ্ধে আনীত ৫টি অভিযোগের মধ্যে ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে ফাঁসির দ- দেওয়া হয়েছে। ৪ নম্বর অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়। মোট ৯৯ পৃষ্ঠা রায়ের মূল অংশ পাঠ করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহিন। ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর প্রসিকিউশন পক্ষ বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে পটুয়াখালীর ফোরকান মল্লিকের সর্বোচ্চ সাজা ‘প্রত্যাশিতই ছিল’।
মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ফোরকান মল্লিকের রায়টি ২০তম রায়। এর মধ্যে ৯টি রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ১১টি রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বাগেরহাটের তিন রাজাকার কসাই শেখ সিরাজুল ইসলাম ওরফে সিরাজ মাস্টার, আবদুল লতিফ তালুকদার ও খান আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি রাখা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফোরকান মল্লিকের মৃত্যুদ- প্রদান করায় প্রসিকিউশন পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল বলেন, আসামি ফোরকানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৫টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল ৩টি অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছেন। ৩ এবং ৫ নম্বর অভিযোগ দুটিতে মৃত্যুদ- এবং ৪ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেছেন।
২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর ফোরকান মল্লিকের বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থা তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ২৮ অক্টোবর এ প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ২৬ জুন থেকে শুরু করে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মামলাটির তদন্ত করেন তদন্ত কর্মকর্তা সত্যরঞ্জন রায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের দায়ে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই ফোরকানের বিরুদ্ধে মির্জাগঞ্জ থানায় আবদুল হামিদ নামে এক ব্যক্তি মামলা দায়ের করেন।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*