বিভাগ: আন্তর্জাতিক

রক্তাক্ত শ্রীলংকা : ব্যর্থতার দায়ভার প্রশাসনের

PMসাইদ আহমেদ বাবু: গত ২১ মে স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ৯টার দিকে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় উৎসব ইস্টার সানডের প্রার্থনার সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সে-সময় শ্রীলংকার দ্বীপরাষ্ট্রটির রাজধানী কলম্বোর কোচিকাডের সেন্ট অ্যান্টনিস চার্চ, পশ্চিমের উপকূল শহর নেগোম্বোর সেন্ট সেবাস্টিয়ান চার্চ এবং পূর্বের বাত্তিকালোয়া শহরের চার্চে পরপর বিস্ফোরণ ঘটে। অন্তত ৮টি স্থানে পরপর বোমা হামলা হয়। ৩টি পাঁচতারা হোটেলÑ শাংগ্রি লা, দ্য সিনামন গ্র্যান্ড হোটেল এবং দ্য কিংসবেরি হোটেলে বিস্ফোরণ হয়েছে। এই হামলার ঘটনার পর শ্রীলংকার সরকার কয়েক মিনিটের মধ্যে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে উদ্ধার তৎপরতা জন্য। অন্যদিকে, দেশটির নিরাপত্তা বিষয়ক পরিষদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহে। আর প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা জনগণকে শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
এক টুইট বার্তায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহে বলেছেন, ‘অবর্ণনীয় এই ট্র্যাজেডির পরও আমরা শ্রীলংকানরা ঐক্যবদ্ধ আছি।’
পরে শ্রীলংকায় ১০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এরপরই শহরের রাস্তায় নামে সশস্ত্র পুলিশ কমান্ডো। অপরাধ অনুসন্ধান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বিমান চলাচল। দুদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হামলার সঙ্গে যোগসূত্র থাকতে পারে সন্দেহে সিরিয়া ও মিসরের নাগরিকসহ পুলিশ এখন পর্যন্ত ৭৬ জনকে আটক করেছে।
হামলার পর দেশজুড়ে জারি করা হয়েছিল কারফিউ। তবে তা ২২ এপ্রিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, অপপ্রচার ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইন্সটগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরপরই ১৭ এপ্রিল শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতি মৈত্রিপালা সিরিসেনা দেশটির পুলিশের প্রধান ও প্রতিরক্ষা সচিবের পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ এনে পুলিশপ্রধানকে গ্রেফতারেরও দাবি উঠেছে।
শ্রীলংকার নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নজরদারি করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট, যিনি এ ঘটনার ত্রুটি খুঁজে দেখার জন্য সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারকের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন।
দেশটির পুলিশ জানায়, মূলত টার্গেট ছিল খ্রিষ্টান, হোটেলের ভিনদেশের অতিথিরা। নিহত ছাড়াও যে ৫০০ জন আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হামলায় নিহতদের অধিকাংশই শ্রীলংকার নাগরিক। এছাড়া ৩৯ জন বিদেশি নাগরিকও এ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে কলম্বো সরকার। নিহত বিদেশিদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ, মার্কিন, অস্ট্রেলীয়, তুর্কি, ভারতীয়, চীনা, ড্যানিশ, ডাচ, পর্তুগিজ ও বাংলাদেশের নাগরিক। নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৪৫ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল।
বিক্রমাসিংহে বলেন, ‘ভারত আমাদের গোপন তথ্য দিয়েছিল; কিন্তু আমরা ঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারিনি।’ একের পর এক বোমা হামলায় তিন শতাধিক মানুষ নিহত ও পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার তিন দিন পর এই মন্তব্য করলেন শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী। ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তদন্তকাজে শ্রীলংকাকে সহায়তা করছে বলে নিশ্চিত করেছেন শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকেও সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করাই আমাদের প্রথম লক্ষ্য। তারা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত কেউই নিরাপদ নয়।
পুলিশ নানা জায়গা থেকে ২৪ জনকে আটক করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৮৭টি বোমা ডেটোনেটর, যার একটি পরে নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরিত হয়েছে।
ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলায় রক্তাক্ত লংকা। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে শ্রীলংকায় সন্ত্রাসী হামলা সবচেয়ে প্রাণঘাতী বলে জানিয়েছে রয়টার্স। শোকে স্তব্ধ দেশটির লোকজন। এই হামলা কেন হলো, কীভাবে হলোÑ সবার মুখে মুখে শুধু একই জল্পনা।
শ্রীলংকার মোট আয়তন ৬৫ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই ৭০ শতাংশ বৌদ্ধ। এছাড়া ৭ শতাংশ খ্রিষ্টান, ৯ শতাংশ মুসলিম ও ১৩ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও রয়েছে। দেশটির খ্রিষ্টানরা এতদিন যাবতীয় সংঘাত ও জাতিগত সহিংসতার প্রকোপ থেকে মুক্ত ছিল, যার ইতি ঘটলো ২১ এপ্রিলের বোমা হামলায়।
চার্চ ও হোটেলে সিরিজ বোমা হামলায় ৯ আত্মঘাতী অংশ নিয়েছে। এদের মধ্যে একজন নারী সদস্য ছিল। এই হামলায় এখন পর্যন্ত ২৫৩ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৯ জন বিদেশি। আহত হয়েছেন ৫০০ জন। শ্রীলংকার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান ওয়াইজেবর্ধনে জানিয়েছেন, ৮টি স্থানে পরপর বোমা হামলায় অংশ নেওয়া আটজনকে শনাক্ত করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। নিহত জঙ্গিরা স্থানীয় মুসলিম সংগঠন ন্যাশনাল তৌহিদ জামাতের (এনটিজে) সদস্য, নিহতদের মধ্যে তিন আত্মঘাতী বোমারু রয়েছে বলে জানায় দেশটির পুলিশ। শ্রীলংকায় সিরিজ বোমা হামলার সঙ্গে এই সংগঠনটি জড়িত রয়েছে বলে এর আগে জানিয়েছিল শ্রীলংকার সরকার।
শ্রীলংকায় ১৪০ উগ্রপন্থির সঙ্গে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
হামলার জন্য দেশটির সরকার যখন স্থানীয় মুসলিম মৌলবাদী একটি সংগঠনকে দায়ী করছে, হামলার তিন দিন পরে ওই ঘটনার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)। তারা এ ঘটনার মূল হোতাসহ সাতজনের ছবিও প্রকাশ করে। ওই সাতজনের মধ্যে জাহরান হাশিম নামে এক ব্যক্তিও ছিলেন। তবে দায় স্বীকার করলেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনটি।
শ্রীলংকার সরকার বলছে, জাহরান হাশিম কলম্বোর সাংরি-লা হোটেলে সংঙ্গী ইলহামকে নিয়ে হামলা চালিয়েছিলেন এবং বোমা হামলার সময় সেখানে নিহত হন বলে জানানো হয়। জাহরান হাশিম অনেক আগে থেকেই ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য বিতর্কিত ছিলেন। এমনকি তার ব্যাপারে এর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কও করা হয়েছিল। এদিকে, ৯ জন বোমারু এই হামলা চালিয়েছে বলে জানায় শ্রীলংকার সরকার। শ্রীলংকার অপরাধ অনুসন্ধানকারী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ আরিয়ানন্দ ওয়েলিয়াঙ্গ বলেছেন, হামলাকারীদের দেহের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মনে হয়েছে, তারা সবাই আত্মঘাতী বোমারু ছিলেন। এর মধ্যে শ্রীলংকার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে আত্মঘাতী তিনজনসহ ১৫ জন নিহত হন। দ্বীপদেশটিতে এই হামলায় জড়িত সন্দেহে ১০০ জনকে আটক করেছে। শ্রীলংকায় গির্জা ও হোটেলে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ‘গোয়েন্দা দপ্তরের একেবারে উচ্চ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছে করেই গোয়েন্দা তথ্য লুকিয়েছিলেন। কর্মকর্তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেননি।’
সরকারের প্রধান নিরাপত্তা শাখায় সমন্বয় না থাকায় হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। হামলা সম্পর্কে আগেই সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। ১০ দিন আগে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েও রাষ্ট্রপতি পক্ষ প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনা জানান নি। হামলার পর তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তাকে গোয়েন্দা তথ্য না দিয়ে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। শ্রীলংকার প্রতিরক্ষা, আইন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের হাতে। এই ব্যর্থতার জন্য প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকেই দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। তার দাবি, বিক্রমাসিংহের আমলেই শ্রীলংকার গোয়েন্দা সংস্থা দুর্বল হয়েছে।
সরকারের মধ্যকার কোন্দলের বিষয়টি উঠে আসায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় দেশটির ‘ন্যাশনাল তাওহীদ জামাত’ বা এনটিজে নামক ইসলামপন্থি সংগঠনটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সহায়তায় এই হামলা চালিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে শ্রীলংকার পুলিশ।
ওই বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। ২০১৪ সালে খেলাফত ঘোষণার আগে বিদেশের মাটিতে এটিই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আইএসের প্রচারমাধ্যমে আমাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলছেন, শ্রীলংকায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ও খ্রিষ্টানদের লক্ষ্যবস্তু করে যারা হামলা চালিয়েছেন, তারা সবাই আইএস সদস্য। হামলাকারীদের মধ্যে তিনজনের নাম হচ্ছেÑ আবু উবাইদাহ, আবু বাররা ও আবু মুখতার।
শ্রীলংকায় সহিংসতা নতুন নয়। সত্তরের দশকে বামপন্থি বিদ্রোহ বা আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যবহার করেছে তামিল টাইগাররা। গৃহযুদ্ধের ধকল বইতে হয়েছে দেশটিকে। হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী সুলেমান বন্দরনায়েককে গোঁড়া বৌদ্ধরা হত্যা করেছিল। তার কন্যা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাকেও সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে আহত করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসাকেও বোমা হামলায় হত্যা করা হয়েছিল। তার পরিণতিতে লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম বা এলটিটিই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণকে যেভাবে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে শ্রীলংকান সৈন্যরা হত্যা করেছিল, যেভাবে নিঃশেষ করা হয়েছে তার দলকেÑ সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ও দেখেছে দেশটির মানুষ। কিন্তু নতুন এই হামলার নির্মমতা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। শ্রীলংকায় ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনা থাকলেও, খ্রিষ্টানরা বরাবরই সব ধরনের সহিংসতা এড়িয়ে চলেছে। বিশেষ করে এই ধর্মে যেহেতু সব গোত্রের মানুষই রয়েছে।
শ্রীলংকায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কের ইতিহাস এমনিতেই খুব ভালো না। ২০১৮ সালে মার্চের সহিংসতা হয়েছিল সিংহলি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে। শ্রীলংকার মুসলমানদের মসজিদ, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কট্টর বৌদ্ধদের হামলায় প্রচুর ক্ষতি সাধন হয়েছিল। শ্রীলংকা সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছিল। ফলে ২১ এপ্রিলের হামলার সাথে মুসলিম একটি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের কথা প্রকাশ হওয়ার পর স্বভাবতই অনেক মুসলিম উৎকণ্ঠায় পড়েছেন। শ্রীলংকার মুসলমানরা এই হামলায় স্তম্ভিত ও লজ্জিত। এখন তাদের উপাসনালয়ে সরকার পাহারার ব্যবস্থা করেছে ওই হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও শোক প্রকাশ করেছেন শ্রীলংকার অল সিলন জামিয়াতুল ওলামা (এসিজেইউ) প্রধান রিজভী মুফতি।
তিনি বলেন, আমাদের খ্রিষ্টান ভাইবোনদের ওপর নৃশংস ও ন্যক্কারজনক এই হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরাও তাদের দুঃখে সমব্যথী। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষও এই কাজ করতে পারে না। ‘সোশ্যাল মিডিয়াতে শত শত মুসলিম লিখছেন এই সন্ত্রাসের সাথে ইসলামের শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই।’ তারাও ব্যানার নিয়ে হামলার নিন্দা করছে, আর খ্রিষ্টানদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে।
শ্রীলংকার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান ওয়াইজেবর্ধনে জানিয়েছেন, বোমা হামলায় অংশ নেওয়া আটজনকে শনাক্ত করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। ধারাবাহিক এই বিস্ফোরণে জড়িত ছিল ৯ জন আত্মঘাতী বোমারু। প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে এরা প্রত্যেকেই স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠী ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত (এনজেটি)-এর সদস্য। আত্মঘাতী জঙ্গির এই দলটির বেশির ভাগ সদস্যই উচ্চশিক্ষিত। মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ফলে এদের কেউ আর্থিকভাবে দুর্বল নয়। আর এটাই উদ্বেগের বিষয়। হামলাকারীদের মধ্যে বোমা হামলায় নিহত একজনকে আবদুল লতিফ মোহাম্মদ জামিল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যিনি শ্রীলংকাতে ফিরে আসার আগে যুক্তরাজ্যে এবং অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেছিলেন এবং বেশ কয়েকজনের বিদেশে যোগাযোগ ছিল। কেউ বিদেশে শুধু থেকেছে, কেউ বা পড়াশোনা করেছে।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শীর্ষ গবেষক শাফকাত মুনির বলেছেন, বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই প্রধানত এ ধরনের সহিংস সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে। ‘এটি একটি কমন প্যাটার্ন। উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের, পশ্চিমা দেশগুলোতে লেখাপড়া করা অনেক তরুণ যুবকদের সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।’
২০১৬ সালে বাংলাদেশে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় জড়িতদের মাত্র দুজন বাদে সবাই বিদেশে লেখাপড়া করেছিল। বাংলাদেশের পুলিশও বিভিন্ন সময় বলেছে, ধর্মীয় উগ্রপন্থায় জড়িতদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া, ধনী ঘরের সন্তান। শ্রীলংকা নিয়ে এ-মুহূর্তে সতর্ক আন্তর্জাতিক মহল। দ্বীপরাষ্ট্রে পুনরায় হামলা হতে পারে, এই আশঙ্কার চীন ও মার্কিন নাগরিকদের নিজ নিজ দেশের জনগণকে শ্রীলংকায় না যেতে পরামর্শ দিয়েছে।
নিহত ও আহত বিদেশিদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন পর্যটক। কেবল বেড়ানোর জন্য শ্রীলংকায় যান তারা। তবে বেশিরভাগ লোক শ্রীলংকান ছিল, যদিও কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে কমপক্ষে ৩৯ জন বিদেশিকেও হত্যা করা হয়েছে। শ্রীলংকায় ভয়াবহ বোমা হামলায় সেখানে সপরিবারে বেড়াতে যাওয়া আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির মেয়ে জামাই মশিউল হক চৌধুরী বোমা হামলায় গুরুতর আহত এবং তার আট বছরের নাতি জায়ান চৌধুরী নিহত হন।
শ্রীলংকার বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহতের ঘটনায় শোক ও নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। ভারত, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রীলংকায় বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করেন।  নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী একটা সমস্যা। শ্রীলংকায় যে ঘটনা ঘটলÑ সবচেয়ে দুর্ভাগ্য অনেকগুলো শিশু সেখানে মারা গেল। সেখানে আমাদের জায়ানকে হারাতে হয়েছেÑ এ জঙ্গি সন্ত্রাসের কারণে। আমরা জঙ্গিবাদ চাই না, আমরা শান্তি চাই। ভয়মুক্ত সন্ত্রাসমুক্ত পৃথিবী চাই। প্রত্যেক মানুষেরই তার ধর্ম পালনের মৌলিক অধিকার রয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি ধর্মের মানুষই চায় স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে নিজ ধর্ম পালন ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা করা। কিন্তু কিছু নরকের কীট সে-পথে বাধা। ধর্মের বিষবাষ্প ছড়িয়ে নিজ স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে, ওরা সমাজে ভীতি সঞ্চার করে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা বা মতবাদ জোর করে চাপিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। উগ্র ধর্মান্ধদের হিংসার বলি।
আমরা এই ঘটনায় হতাহত সবার আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং তাদের নিকটজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। শ্রীলংকা সরকার এবং জনগণের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের ব্যক্তিগত রেষারেষি নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের ওপর কালো ছায়া ফেলছে। নেতাদের দায়িত্ব জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া; কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আর তাদের ব্যর্থতার মূল্য সাধারণ নিরাপত্তা মানুষ দিয়েছে নিজেদের জীবন দিয়ে।
পরিশেষে বলতে হয়, শ্রীলংকার এই ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার পেছনের কারণ সহজ-সরল না। জাতিগত হিংসার ইতিহাস এবং রাষ্ট্র কাঠামোতে বিরাজমান দ্বন্দ্বের আঙ্গিকে পর্যালোচনা করলে ঘটনার পেছনের ঘটনা সম্পর্কে কিছুটা গভীর বিশ্লেষণ উঠে আশা সম্ভব। কোনো ঘৃণা নয়, বিদ্বেষ নয়, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, মমত্ববোধÑ সেটাই হোক একমাত্র সকল ধর্মপ্রাণ মানুষের চাওয়া।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*