বিভাগ: ছোট গল্প

রক্ত পালক

8-6-2018 7-49-20 PMআনিস রহমান: ট্যামা ম-লের বুক ধড়াস ধড়াস করে উঠছে আর নামছে। যেন শাটার মিস্ত্রির হাঁতুড়ি। একবার উঠছে। একবার নামছে ধড়াম করে। কখনও মনে হয় বুকটা হাঁপরের মতো ফুলে উঠছে। আবার চিমসে যাচ্ছে মুহূর্তে। আসলে ঠিক কী হচ্ছে ওর বুকের ভেতরে তা ও কেন ওর বাবাও যদি এসে ভেতরে সেঁধিয়ে যায় তাহলেও কিছু বুঝতে পারবে কি না সন্দেহ। তবে একথা ঠিক, ট্যামা যে কিছু বুঝতে পারছে না। কাউকে বোঝাতে পারছে না। বলতেও পারছে না কিছু। যাকে বলা যায়।
ট্যামা ম-ল মানে ত্রিমোহিনী ম-ল। বুঝ হতেই দেখে ওর মাথায় ঢাউস এক বোঝা। বয়েস যত বেড়েছে। বোঝার আকারও তত বেড়েছে। একসময় ও ছিল বাবার পেছন পেছন। একসময় বলা নেই কওয়া নেই বাবা সামনে থেকে সটকে পড়ল। সটকে পড়ল মানে টসকে পড়ল জীবন থেকে। হঠাৎ বড্ড একা হয়ে পড়ল ট্যামা। নিঃসঙ্গতা এত ভারী, এত ক্লান্তিকর আর আতঙ্কময় হতে পারে তা আগে কখনও উপলব্ধি করতে পারেনি। সে উপলব্ধি আজ যেন ওকে নতুন করে চেপে ধরেছে। কিন্তু যে আতঙ্ক কিংবা নিঃসঙ্গতার স্বরূপ কেমন তা সবটুকু অবয়ব নিয়ে তাকে ধরা দিচ্ছে না। বিমূর্ত এক অবয়ব কিংবা কিছু আঁচড় না হয় কোনো এক অজানা স্কেচের অবয়বে সে যন্ত্রণা ওকে পোড়াচ্ছে। আঁচড়াচ্ছে ক্ষত-বিক্ষত করছে।
তখন ওরা থাকতো ধোলাইখালের ঢালে। ছোট্ট ডেরা মতো ঘর। ঝুপড়ি যাকে বলে। পাশাপাশি দুটো ঘর। শরীর কুঁজো করে ঢুকতে হয়। তেমনি কুঁজো হয়ে বেরোতে হয় ঢেরা থেকে। একটিতে মা-বাবা। অন্যটিতে ছিল ওদের চার ভাই-বোনের আবাস। বাবার এমনি পালিয়ে যাওয়া কিংবা পলায়নপর মনোবৃত্তি মায়েরও বুঝি পছন্দ হয়নি। তাই বছর দু না পেরোতেই বাবার পথে মা-ও পা বাড়ালো। ভাই-বোনদের দেখভালের সবটুকু দায়িত্ব কেমন করে যেন ওর ঘাড়ে চেপে বসল। বাড়তি আরেক বোঝা নিয়ে ওর কেবলই মনে হয় বাবার কাঁধের বোঝাটা ওর কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে তবে বাবা চোখ বুজেছে। কখনও মনে হয় কোনো এক মামদো ভূত ওর ঘাড়ে চেপে বসেছে আজীবনের জন্যে। বিশেষ করে ওর দুচোখ যখন মেটে চুলোর ধোঁয়ায় লালচে হয়ে উঠতো রান্নার সময়, কিংবা কখনও জল ঝরতো অঝোর ধারায়, তারপরও আগুনের পাত্তা মিলতো না চুলোর গাড্ডায়Ñ তখন মনে হতো খালের ওপারে বসে বসে বাবা-মা দুজনে তামাসা দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। ছেলেকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে। আর ভাবছে ছেলে ওদের লায়েক হবে কবে!
খালপাড়ে ট্যামার আবাস থাকলেও ওদের রোজকার পথ ছিল শ্যামবাজার থেকে ঠাঁটারীবাজার। পাইকারিপাড়া থেকে সবজির বোঝা নিয়ে ঠাঁটারীবাজারের বিভিন্ন মোকামে পৌঁছে দিত। মুটেগিরিতেই জীবন পার হয়ে গেল তার। একসময় বোঝার ভার এতটাই বাড়িয়ে নিল যে ঘাড় কাৎ হয়ে যেত। পা তুলতে পারতো না বোঝার ভাড়ে। কেবল রাবারের চপ্পল জড়ানো পা দুটি রাস্তার সিমেন্টের সঙ্গে ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে পথ কাটতো। খস্। খস্। খস্।
জায়গায় জায়গায় ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুড়িগঙ্গার মুখে চড়া পড়ায় একসময় ধোলাইখালের জলে বেশ টান দেখা দিল। তখন জলের রংও পাল্টে যেতে লাগলো দিনকে দিন। উৎকট গন্ধ সে জলে। অগত্যা ডেরা গুটিয়ে গে-ারিয়ায় চলে এলো। নতুন আবাস গড়ল রেললাইনের ধারে। কিন্তু এখানে যে এত গুমোট রাজনীতি জট পাকিয়েছিল, তা আগে জানা ছিল না ট্যামা ম-লের। রাজনীতির ঘুঁটির চালে হেরে এবং জটিল জালে জড়িয়ে খুব অল্পদিনেই উচ্ছেদ হলো ট্যামার সংসার। ট্যামার রোজগার থেকে ওদের যদি খাঁই মেটাতে যায় তাহলে সংসার চলে না। আর সংসার চালাতে গেলে ওদের মানে দখলদারদের খাঁই মেটাতে পারে না। উপায়ন্তর না পেয়ে একসময় স্টেশনের প্লাটফরমেই রাতে বিছানা পেতে শোওয়ার বন্দোবস্ত করে নেয় ওরা। তিন ভাইবোনকে ট্রেনে জল বিক্রির কাজ ধরিয়ে দিল। সে কাজের নাটাইয়ের টানে কে যে কখন কোন মাঠে ছিটকে পড়লো তার সন্ধান আর ট্যামাকে করতে হয়নি।
জেলা মিলনায়তনের গা ঘেঁষে যে জলের ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে। তা অনেক পুরনো। আবলুশ কালো স্টিলের তৈরি। সে ট্যাঙ্কের ছায়ায় টুকরির ওপর বীড়া, আর বীড়ার ওপর ওর মাথা এলিয়ে দিয়ে এক দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ল ট্যামা। যখন ওর ঘুম ভাঙলো তখন ভরসন্ধ্যা। অসংখ্য বানর আর টিয়ে পাখির কিচিরমিচির ট্যাঙ্কির তল্লাটে। বেশ কয়েকটি বানর ওকে ঘিরে আছে চারদিক থেকে। যদিও নিরাপদ দূরত্বে ওরা বসে। চোখে বিস্ময়। বিস্ময়ভরা চোখে দেখছে আগুন্তককে। বারবার দুহাতে চোখ কচলাচ্ছে। কচলানো হলে ফের বড়বড় চোখে ট্যামাকে যেন যাচাই করছে ওরা। তবে বানরগুলোর কেউই হামলা কিংবা কোনোরকম ঝামেলা পাকাতে আসেনি। আসেনি বলেই ভরসা পেল। নিশ্চিত হলো অন্তত ওরা কোনো ক্ষতি ওর করবে না। সেদিন ওর একা শরীরটা টেনেহিঁচড়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতেও কেন যেন আর মন থেকে সাড়া পেল না। পাইপের পাশে গজিয়ে ওঠা আধমরা দুব্বাঘাসের ওপর থেকে শরীরটা কোনোরকম সরিয়ে নিয়ে পাম্প হাউসের বারান্দায় নিয়ে ঠেকালো। একটি মাত্র শরীর। একটি মাত্র জীবন। তার জন্যে আর কত ভুঁই প্রয়োজন। কোনোরকম শরীরটা কাৎ করতে পারলেই হলো। ভাবে ট্যামা। ভাবনা-মতো শরীর ওর ঠিকই জায়গা করে নিল বারান্দায়। এক সন্ধ্যায় কবির ডেকে বলল, আমি তো একা মানুষ। যদি থাকতো চাও থাকতে পার। তার জন্যে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। ভেতরটায় আলো আঁধারিময়। তবে রাতে গাঢ় অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে নিবিড়ভাবে। অবশ্য এখানে বাতাস খেলে সবসময়। নদী থেকে উঠে আসা টাটকা বাতাস। ভেজা ভেজা আবেশও ছড়িয়ে সে বাতাসে। সে বাতাস ট্যাঙ্কির ছায়ার সান্নিধ্যে এসে আরও নির্মল আরও শীতল এবং হিমেল একটা ভাব নিয়ে খেলে বেড়ায় ট্যাঙ্কির তলায় ও চারপাশে। কিন্তু মনে একটুও স্বস্তি নেই ট্যামার। জমাট এক কষ্ট বুকজুড়ে। মন শুধু আনচান করে ভাইবোনগুলোর জন্যে। পথ চলতে চোখ রেখেছে অনেকদিন। খোঁজ পায়নি। অনেককে জিজ্ঞেস করেছে। খোঁজ মেলেনি। এখন আপাত নিঃসঙ্গ শরীরটা এলিয়ে দিলেও ভাইবোনগুলো ঠিকই ওর অন্তরের ভেতর থেকে ঘাঁই মারতে থাকে সদলবলে। সেই ঘাঁইয়ের আঘাত সইতে সইতে কখন যে ওর নিঃসঙ্গ শরীর ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে তা কখনোই আঁচ করতে পারে না ট্যামা ম-ল। কেবল বানরের কিচকিচ আর পাখির ট্যাঁও ট্যাঁও ডাকে ঘুম ভাঙে ওর। ঘুম ভাঙতেই ভাইবোনগুলো যেন কোথায় চলে যায় পাখির দলবলের সঙ্গে। তখন শূন্য বুকে যেমনি ধড়াম ধড়াম শব্দ ওঠে আজও তেমনি এক শূন্যতা নির্দয়ভাবে কামড়ে ধরেছে ওকে। কী এক অজানা আশঙ্কায় জিভ ওর শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। বুকের ভেতর পীড়ন হচ্ছে ভীষণরকম। ভাইবোনরা চলে যাওয়ার পর শূন্য বুকের হাহাকারের সঙ্গে এ হাহাকারের অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। মা-বাবা মরে যাওয়ার পর বুকটি যেমনি শ্মশান শ্মশান মনে হতো ওর। কেবল ছাই কেবল পোড়া গন্ধ ওকে অস্থির করে তুলতো। আজও সেই শ্মশান যেন ওর বুকের ভেতর। চিতা জ্বলছে দাউ দাউ করে। ওর শ্মশান বুকের পোড়া গন্ধের জন্যে কিনা সামনের … ?
রাস্তা আজ বড্ড শুনশান। নিশ্চুপ। তেমনি নিশ্চুপ জলের ট্যাংকের বানরগুলো, পাখিগুলো। আজ বেলা হলেও ওরা কেন যেন চুপ মেরে আছে ঠিক বুঝতে পারে না ট্যামা। অথচ ওরা সব দিব্যি জেগে আছে। যেমনি জেগে থাকে অন্যদিন। কিন্তু পার্থক্য শুধু নীরবতা। বেজায়রকম নীরব। কোনো উচ্ছলতা নেই। দৌড়ঝাপ নেই। ছিটেফোটা দুষ্টুমিও নেই। কেবল মাঝেমাঝে বানরগুলো কান চুলকোচ্ছে। পা চুলকোচ্ছে আনমনে। কখনো পা সোজা করে শরীর সটান খাড়া করে দাঁড়িয়ে পড়ছে। তখন লেজও ওদের খাড়া হয়ে যায়। এছাড়া বাড়তি কোনো চাঞ্চল্য নেই। কেমন যেন হাই তুলে ফের চুপ মেরে যায়। পাখিগুলো মাঝে মাঝে জায়গায় বসেই পাখসাট করছে। কখনো ছোট ছোট লাফ দিয়ে এদিক-ওদিক যাচ্ছে। কিন্তু মুখে কোনো রা নেই। শরীরে নেই কোনো চাঞ্চল্য। ওদের আচরণের এমনি পরিবর্তন চোখে পড়ে ঠিকই, তবে বুঝে উঠতে পারে না এর নেপথ্য কারণ। যেমনি বুঝতে পারে না ওর বুকের ভেতর কেন বইছে ঝড়ো হাওয়া। কেন শ্মশানের অত দহন।
এ যন্ত্রণার ভার ও বইছে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই। পাহাড় থেকে নেমে আসা পেল্লায় এক পাথর বুঝি ওর বুকে চেপে বসেছে। পাথরে খাঁজ কাটা। একটু ঘষা পেলেই জ্বলে ওঠে বুক অসহ্য এক যন্ত্রণায়। তখন সবেমাত্র জলের ট্যাংকের পশ্চিমের মোটা পাইপটার ওপর এসে বসেছে। তার আগে শেষ বোঝা নামিয়ে দিয়ে ফিরেছে কেবল। ক্লান্তি ওর সারাশরীরে। ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে গাঁয়ের ছেড়া গ্যাঞ্জিটা। তখন ওর চোখ যায় পশ্চিমাকাশে।
সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু টকটকে লাল রক্তে যেন ভেসে যাচ্ছে পশ্চিমাকাশ। তাজা রক্তের ধারা যেন ছড়িয়ে পড়েছে সারা আকাশজুড়ে। রক্তের ধারা টুপটাপ টুপটাপ করে একটু পরেই বুঝি ঝরে পড়বে আকাশ থেকে। অমন রক্তাক্ত আকাশ দেখে ভীষণ রকম চমকে ওঠে ট্যামা। কোনো ভাগাড় থেকে উড়ে আসা শুকুন এই মাত্তর ওর বুক খামচে ধরেছে। নির্বাক হয়ে অনেকটা সময় ধরে তাকিয়ে থাকে ট্যামা। একাত্তরের আকাশ না? বিড়বিড় করে ওঠে ট্যামার ঠোঁট। পঁচিশে মার্চের সন্ধ্যায় এমনি রক্তভেজা আকাশ দেখেছিল ট্যামা। সে রাতেই পাকিস্তানি সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঢাকার পথে-ঘাটে। অলিতে-গলিতে। দালানে-বস্তিতে। টার্গেট শুধু বাঙালি। যেখানেই পেয়েছে সেখানেই হত্যা করে। হাজারে হাজারে মানুষ নিশ্চিহ্ন করে দিল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কত বস্তি ওর চোখের সামনে পুড়েছে। ছাই হয়ে গেছে মানুষশুদ্ধ। তার চাক্ষুষ সাক্ষী সে তো নিজেই। এরপর ৯ মাস ধরে ওরা কেবল হত্যা করেছে আর রক্ত ঝরিয়েছে। দেশজুড়ে। যেখানেই বাঙালি পেয়েছে সেখানেই ওদের অস্ত্র রক্ত ঝরিয়েছে। ওর মত মুটে-মজুররাও রক্ষা পায়নি। ট্যামা যে এখনও বেঁচে আছে তা আজও ওর কাছে এক বিস্ময়। সে রক্তের ধারা যেন ফের আকাশ ছাড়িয়ে উঠেছে। এ সূর্যের আলো না। এ রক্তের নদী। এ নদীকে চেনে ট্যামা। এ রক্ত দেখে এক বুক হিম করা ভয় নিয়ে গতরাতে ছেঁড়া কাঁথায় পা এলিয়ে দিয়েছিল ও। কিন্তু সে রক্ত ওর পিছু ছাড়েনি। খানিক আগে মনে হয় গত সন্ধ্যায় যে রক্ত গড়াতে গড়াতে ওর পিঠের নিচে এসে জমা হয়েছে। সে ধারার সঙ্গে মিলেমিশে আরও নতুন নতুন ধারায় রক্ত আসছে। সে রক্তের ভেজা আভাস ওর ঘুম কেড়ে নিল এক ঝটকায়। এবং সবকিছু কেন যেন অদ্ভুত রকম বদলে যাচ্ছে। যে বদলে যাওয়ায় কোনো আনন্দ নেই। কেবল ভয়। কেবল আতঙ্ক। কেবল নিঃসঙ্গতা, কেবল রহস্য শুধু হাঁসফাঁস করছে মোটা গুঁই সাপের মতো।
ট্যামার আশ্রয় এ ট্যাংকের তলায় আলো বাতাসের খেলা থাকলেও ট্যাঙ্কির গায়ের রং তো কালো।  নিকষ কালো বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। এমনিতেই স্টিলের তৈরি। তার ওপর অনেক কালের পুরনো। বিকট আকারে দেখতে। তাকালেই গা শিউরে ওঠে। কেবল বানরের লাফ-ঝাঁপ আর টিয়ে পাখির ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ আছে বলে জায়গাটা ভৌতিক কিংবা আতঙ্কময় কিছু মনে হয় না। প্রাণের এক কোলাহল সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখে জল ট্যাঙ্কের ছায়া তার চারপাশ। ওদিকে পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অগুনতি নারকেল গাছ। বাতাস খেলে পাতার গায়ে গায়ে। বাতাস দোলে পাতার ভাঁজে ভাঁজে। বাতাস পেয়ে পাতারা আনন্দে খেলা করে। যে আনন্দ ট্যামাকেও ছুঁয়ে যায়। আনন্দ চোখে আশপাশে তাকায় ও আনন্দের যেন শেষ নেই। সকালে ঘুম ভাঙে ওদের ডাকাডাকি, চ্যাঁচামেচিতে। ভাটি সন্ধ্যায় যখন ট্যাংকের আশ্রয়ে ফেরে তখনও ওদের কিচিরমিচির। যেন ট্যামাকে দেখেই ওদের সবটুকু আনন্দ ঝরে পড়ছে। অথচ আজ সকালটায় সব উল্টো। সে আনন্দের কোনো রেশ নেই। খাঁখাঁ চারদিক বিরান সবকিছু। ঝরাপাতার মর্মর। শুকনো পাতার খসখসে শব্দে পথ ভা-ার করুণ সুর। সব তাতেই কী ভীষণ শূন্যতা। মাঝেমধ্যে একটা-দুটো টিয়ের পাখসাঁটের শব্দ কানে আসে। কিন্তু কোনো ডাকাডাকি নেই। বানরগুলোও দু-একবার কিচকিচ করে উঠলেও। কণ্ঠে বিষণœতার সুর। হয়তো বেসুরো কোনো কান্না আর সবদিনের মতো সকালের সেই উল্লাস যেন কোথাও মাটিচাপা পড়েছে।
ট্যাঙ্কির পাশ ধরে বেশ চওড়া একটা রাস্তা চলে গেছে। এখানে এসে রাস্তটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির মতো বাঁক নিয়েছে। রাস্তার ওপারেই নদী। নদী এখানে বাঁক নিয়েছে। সে বাঁক ধরেই রাস্তা চলে গেছে দূরে। রাস্তার ওপারেই বালুর গদি, ইটের মোকাম। এবং ঢালজুড়ে পাজা করে ইট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। থাকথাক ইট। তারপরেই নদী, নদীজুড়ে অসংখ্য নৌকো। মহাজনী নৌকো। গয়না নৌকো ছাড়াও খেয়াঘাটে পারাপারের লোকজনের ভিড় লেগে থাকে কাকভোর থেকে রাত অবধি। জলের ট্যাংক বাঁয়ে রেখে খানিক এগোলেই খেয়াঘাটের চারদিকে প্রাণচাঞ্চল্যের উদোম হাওয়া। সে হাওয়ায় মন ছুটে যায় নদী ছাড়িয়ে ওপারে। ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনেক দূরে। নৌকোর গায়ে নৌকো লেগে আছে। গলুইয়ের গায়ে গলুই খেয়া তরী ভরে যাচ্ছে মুহূর্তে। চড়াৎ চড়াৎ করে বৈঠা পড়ছে। আর নৌকো এগোচ্ছে মাঝ নদী বরাবর। শূন্য স্থানে নতুন নৌকো এসে ভিড়ছে। ফের যাত্রী বোঝাই হয়ে সরে যাচ্ছে সে নৌকো। মানুষের নানা কর্মের যজ্ঞ চলে এ ঘাটে। অথচ সেখানে আজ কেমন এক গুমোট নিস্তব্ধতা।
আর্মেনিয়ান গির্জা আছে কাছে। সেখানেও আজ ভোরে ঘণ্টা পড়েছে কি না ঠিক ঠিক মনে করতে পারছে না ট্যামা ম-ল। পাদ্রীদের আনাগোনাও চোখে পড়ছে না একেবারে।
দীর্ঘদিন ধরে মুটেগিরি করতে করতে ট্যামার ঘাড় বসে গেছে ভেতর দিকে। বাঁ দিকে বাঁকা হয়ে থাকে ঘাড়। সোজা করে রাখা বড্ড কষ্টকর। আজ সে ঘাড় সোজা করে বারবার রাস্তার দিকে তাকাতে চেষ্টা করে ট্যামা। সমস্ত নীরবতা ভেঙেচুরে হঠাৎ একটা নেড়ি কুকুর লম্বা কুঁই দিয়ে ডেকে ওঠে। যেন কী এক কষ্টে কুকুরের বুক ভেঙে আসছেÑ ‘মরার কুত্তা আর ডাক দেওয়ার সময় পাইলি না। ট্যাংকির তলায় আইসেই তোকে মরতি হবে… যা… যা। হুস হুস…’ এমনি নানা শব্দে কুকুরটিকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ট্যামা। যদিও কুকুরটি আর একটিবারও ডাকেনি কিংবা ডাকার চেষ্টা করেনি। তারপরও কী এক আতঙ্কে ও কুকুরটাকে তাড়িয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। দুদ- নির্ভাবনায় কাটাতে চায়। কিন্তু কুকুরটির সেদিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। কেবল পিটপিট করে তাকাচ্ছে আর লেজ নাড়ছে। ওর চোখে মুখে গভীর মেঘের ছায়া। না-কি চোখের কোণে জল!
ত্রিমোহিনী ম-ল নামটি একটু বড়সড় এবং ডাকার জন্যে একটু খটোমটো বটে। তাই বাবা ওকে ডাকতো ত্রিমো-ত্রিমো বলে। মুখে মুখে সে নাম তিমো হয়ে গেল। পরে ওর শরীর কুঁজো হয়ে ঘাড়টা এক পাশে কাঁৎ হয়ে বসে গেলে এবং শেষে কেমন করে ঝড়ে উপড়ানো গাছের গুঁড়ির মতো বেঁকে গেল। তখন তিমো কখন যেন ট্যামা হয়ে গেল। সেই ট্যামা ম-লের বুকে আজ যেন শূন্যতার হাহাকার। ট্যাসে যাওয়া ঘাড়টাকে কখনও উঁচিয়ে, কখনও ঘুরিয়ে বারবার রাস্তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। আজ বুঝি ট্যামা ওর বসে যাওয়া ঘাড়টিকে ঠিকই টেনে তুলবে। মাঝে মাঝে ঘাড়টাকে চাড়ি দিয়ে চোখ-মুখ ওপর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন মনে হয় নির্ঘাৎ আজ ট্যামা ম-ল ওর বেসাইজ ঘাড়টাকে সাইজে নিয়ে আসবে। ও যেন আজ মরীয়া ওর ট্যামা নামটা ছেঁটে ফেলতে। আসলে কে বুঝবে ওর যন্ত্রণা। একটা আগুনের গোল্লা যেন ওর বুকের ভেতর গড়াগড়ি খাচ্ছে সেই কাকভোর থেকে। এ যন্ত্রণাটাই ওকে আর ঘুমোতে দিল না।
পাম্প হাউসের বারান্দার এক কোণে ওর ছোটমতো এক বাক্স রাখা আছে। কেরোসিন কাঠের বাক্স। বাক্সের কোণায় কাগজে মোড়ানো গুলের কৌটো থেকে বড় করে তিন আঙুলের চিমটিতে এক দলা গুল নিয়ে নিচের ঠোঁট ফাঁক করে সেখানে পরম যতেœ বসিয়ে দিচ্ছিল। আর দুটো চোখের মণি নব্বুই ডিগ্রি কোণায় রেখে বাইরে কী যেন দেখছিল। সামনে বড় একটা গেট। আশপাশ সব পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তখনই খেয়াল করল দু-তিনটে আর্মি পিকআপ সাঁই সাঁই করে চলে গেল। মেশিনগান তাক করা কাছে। খানিক পরেই একটা কনভয় এসে থামল ট্যাংকির গেটে। নেমেই গেটের তালা ধরে ঝনঝন করে আওয়াজ করতে থাকে এক আর্মি। তর সইছিল না একটুও।
“গেট খোল। গেট খোল।” বলে ঝন ঝন করে ফের আওয়াজ। মাঝে মাঝে বুট দিয়ে শেকলে বাঁধা গেটের দুপাল্লার মাঝখানে লাথি মারছে। কবির তখনও ঘুমোচ্ছে। পাম্পম্যানের দায়িত্বে ও। কিন্তু ওর কোনো সাড়া নেই। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে দুজন আর্মি গেটের চৌকো খোপে পা রেখে গেট টপকাতে যাচ্ছিল। তখনই ট্যামাকে দেখে এক জোরসে ধমক লাগাল আর্মিÑ এই ব্যাটা কি দেখছ। চোখ তো চোখ। চোখের খোল বার কইরা ফালামু। গেট খোল গেট খোল। ট্যামা কোনোরকম ঠোঁট চেপে দৌড়ে আসে গেটের সামনে।
এই শালা কানে শুনছ না। কখন থেইকা হল্লা করতাছি। গেট খুলস না কেন। মতলব তো ভালো ঠেকতাছে না। এই ন্যাটা কাছে আয়। তোর কানপট্টি বরাবর একটা থাপ্পড় পড়লেই তখন ঠিকই শুনবি। বয়রা সাজো? সব বয়রামি কবুতরের লাহান পতপত করে উইড়া পালাবে। ট্যামা ওদের ধমকে গেটের আরও কাছে আসে।
উফঃ শালায় তো নেশা করছে। সারাশরীরে মুখে গাঞ্জার গন্ধ। গেট খোল। গেট খোল। তামাশা দেখো খাড়াইয়া খাড়াইয়া। আইজ তোর নেশার দাঁত তুইলা ফালামু।
ট্যামার পুরো শরীর স্প্রিংয়ের মতো কাঁপছে। আ-মা-র কাছে চা-বি নাই। আমি নেশাও করি নাই।
Ñ নেশার খবর পরে লবো আগে বল্ তালা মারছে কে?
Ñ পাম্পের মানুষ।
Ñ তুই তবে কেডা।
Ñ আমি পোজা বাই। এইহানে রাইত এট্টু আশ্রয় পাই।
Ñ তার মানে তুই ওয়াসার কেউ না।
Ñ না স্যার। এট্টুহানি মাথা গুঁইজা থাকি। ঘরবাড়ি নাই।
Ñ তুই সরকারের লোক না হয়ে সরকারি জায়গায় থাকস? শেখ তার ঘরবাড়ি দেয় নাই! তোর আইজকা খবর আছে বলেই টপাটপ গেট পেরিয়ে ভেতরে লাফিয়ে পড়ল ওরা। নেমেই কে একজন হাত ঘুরিয়ে এক চড় কষালো ট্যামার গালে। এমনিতেই ছোটখাটো শরীর। সেভাবে খাওয়াও জোটে না আজকাল। তখন চড়ের ধকল আর সামলাতে না পেরে পাঁচ-সাত হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে ও। এমনিতেই গুলের রস জমেছিল মুখে। সে রস বিজলের মতো ওর সারামুখে ছড়িয়ে পড়ে। এবার ওর কোমর বরাবর লাথি দেয়ার জন্যে যেই পা তুলেছে এক আর্মি, তখনই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে একজন লোককে। বয়েস পঁয়ত্রিশ। গায়ে সান্ডোগেঞ্জি। শত চেষ্টায়ও লুঙ্গির গিঁট খুলে যাচ্ছে বারবার। পায়ে রাবারের চপ্পল। ওকে আসতে দেখে পা নামিয়ে নেয় আর্মি। কাছে আসতেইÑ
তুই কে?
আমি কবির, পাম্পম্যান। কান্না আর ফোঁসফোঁস শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে অদ্ভুত এক শব্দ হচ্ছিল কবিরের নাক ও মুখ গলে।
বলতে না বলতেই ওর কান বরাবর এক থাপ্পড় এসে পড়ে। দুই মণ ওজনের থাপ্পড় যাকে বলে। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে কবির। দাঁত বসে যায় ওর জিভে। কলকল করে রক্ত বেরুতে থাকে ওর মুখ গলে।
এতক্ষণ গেট খুললি না ক্যান। কোন মাগীর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করছিলি?
স্যার আমি অনেক রাতে শুই। এত বড় ট্যাঙ্কি ভরা হইলে তবে শুইতে যাই। অনেক ভোরে পানি ছাড়তে হয়।
আজকে পানি ছাড়ছত?
অহনও টাইম অয় নাই। পনর মিনিট লেট আছে।
লেটের খেতাপুরি। এহনি পানি ছাড়। শেখের যুগ শেষ। মনে রাখবি কেউ যেন পানির জন্য কষ্ট না পায়। যদি শুনি কেউ পানি পায় নাই তবে তর খবর আছে। বলেই বন্দুকের নল ওর বুকে তাক করে। ভয়ে আতঙ্কে ছড়ছড় করে পেশাব করে দেয় কবির।
এ দেখে আর্মিগুলো হো হো করে হেসে ওঠে। প্রাণ খোলা সে হাসি। যেন পাকআর্মিদের প্রেতাত্মা ওদের বুকে বসে আছে।
যা এবার গেট খোল। বলে ঘাড় ধরে গেটের দিকে ঠেলে দেয় কবিরকে। কবিরের কোমরে বাধা কায়তনের সঙ্গে ইয়াবড় এক চাবির ঝোপা। চেনা চাবিটা খুঁজে পেতে আজ যেন ও কেনো বারবার খেই হারিয়ে ফেলছে। একটার পর একটা চাবি ধরে। হাতে নেয়। তালা খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না।
এটা-না
ওটা-না
তৃতীয়টা-না
পরেরটা-না
তার পরেরটা-না
আরও একটা-না।
না, চাবি কোনোটাই ফিট করছে না। তালাও খুলছে না। এক আর্মি এবার দাঁত কিড়মিড় করে পেছন থেকে এক লাথি কষায় কবিরের পাছায়। আচমকা লাথিতে ওর মুখ গেটের লোহায় থেতলে যায়। মুহূর্তে কপাল ট্যামা হয়ে ওঠে। এবার নাক দিয়েও রক্ত ঝরতে থাকে। নিজেকে ধাতস্ত করে বড্ড করুণ দৃষ্টিতে একবার তাকায় কবির। এবার ঠিকই মিলে যায় চাবি। “শালার হারামখোর। এগুলারে কেমনে শায়েস্তা করতে অয় দেখলেন? অহন ঠিকই চাবি বার হয়। আসলেই মাইরের উপরে অসুধ নাই।” বলেই সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে বিদঘুটে এক হাসিতে ওর ঠোঁট ভরে ওঠে। সে হাসি দেখে তখন ট্যামার মনে হয় মানুষকে ভয় দেখানোর জন্যে এমন হাসি শেখাতে বুঝি ওদের ট্রেনিং দেয়া হয়। কী হাসি রে বাপ, আত্মা খাঁচা ছাইড়া যাওনের জোগাড়!
গেট খুলতেই আর্মিগুলো কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ফের ফিরে আসে। কাছে ডাকে ট্যামাকে। তারপর পাছায় হালকামত এক লাথি ঝেড়ে কান ধরে বাইরে নিয়ে যায় ওকে। দূর থেকেই কবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, এই নাটা যেন আর ভিতরে না ঢুকে। যদি ঢুকছে তোর খবর আছে। মনে রাখিস এইডা সরকারি জায়গা। আবোল তাবোল কাউরে ঢুকাবি তো জানে মাইরা ফালামু। আর মনে রাখবি মানুষের যাতে পানির জন্য কোনো কষ্ট না হয়। যদি খবর পাই মানুষ পানির জন্য কষ্ট পাইতাছে, তাহলে বুঝুম তুই মুজিবের দালাল। তখন মুজিবের যে পরিণতি সেই একই পরিণতি হইবে তোরও।
গেটের বাইরে গিয়ে রাস্তায় কুকুরের মতো দাবড়াতে দাবড়াতে অনেক দূর তাড়িয়ে দিয়ে আসে ট্যামাকে। রাস্তায় মানুষজন নেই বললেই চলে। আরো কয়েকটা আর্মির জিপ সামনে পেছনে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে। তবে জিপগুলো শূন্য। আর্মিরা নেই। কোথাও গিয়েছে হয়তো।
সুড়কির টিলার ওপর একটা ছাতা তখনও মেলে আছে। জরিনা ও সখিনা দুবোনে মিলে এখানে ইট ভেঙে খোয়া বানায়। রোদকে আড়াল করার জন্য খোয়ার মাঝখানে এক বাঁশের লগি পুতে তার সঙ্গে ছাতি বেঁধে রাখে। কিন্তু গত রাতে ওরা কেন যেন ছাতিটা নিতে ভুলে গেছে। ছাতির ছায়ায় গিয়ে বসে থাকে ট্যামা। থাপ্পড় খেয়ে তখনও ওর মাথা হেলদোল করছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। তবু কোথাও একটু জলের দেখা নেই।
অনেকটা সময় ঝিম মেরে থাকে ট্যামা। একে একে সে খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে করছে। তখনও সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে ওর। মুজিবের যুগ শেষ! ‘কী কয় হালার পুতেরা।’
কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে কিছু এমন কাউকে চোখে পড়ছে না। আলু, পেঁয়াজ, আদা, কুমড়োর বড় বড় মোকামগুলো সব বন্ধ। এমনকি চান মিয়ার হোটেলটাও আজ খোলেনি। তবে হোটেলটার পেছনে কারিগররা সব থাকে ম্যাস ভাড়া করে। ওদিকে যাবে কী একবার! কিন্তু আশপাশে তাকাতেই ওর চোখ ছোট হয়ে আসে। বুক শুকিয়ে তেজপাতা। তখনও একটি কনভয়, একটা জিপ দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ভেতর দিকের বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে বেশকিছু লোকজন ধরে নিয়ে আসে ওরা। বয়েস সবার বিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে ওদের কনভয়ের সামনে। এরপর আরও কয়েকজনকে ধরে এনে সবাইকে সারবেঁধে কনভয়ে তোলে। তোলা শেষ হলে ঝুমঝুম শব্দ করে কনভয় চলে যায় বাঁকের আড়ালে কোথাও।
‘একাত্তরে পাকসেনারা গেলগা তয় এরা কারা? পাকসেনাগো মতোই তো হম্বিতম্বি করলো। নাকি পাকসেনাগো ভূত আইল?’ বিড়বিড় করে স্বগোক্তি করে ট্যামা ম-ল। কী কইল হালারা, শেখের বেটার যুগ না-কি শেষ। মাত্থা খারাপ। নেশা করছে না তো! ঢাকা ভার্সিটির ময়দানে না আজ শেখ বেটার ভাষণ দেওনের কতা। রাতের শেষ বোঝাটা নামিয়ে ফেরার সময় ঠাটারি বাজারে পার্টি অফিসের সামনে দেখেছে অনেক লোকের হল্লা। তাদের অনেকের মুখে শুনেছে। আরও শুনছে ‘দুইডা বোমা নাকি ফুটছে গুলিস্তানে না কোনহানে। কানে ঠাডা পড়ার মতো শব্দ। তব্দা লাইগা গেছে কান।’
কখন যেন আর্মির গাড়ির দুটো চলে গেছে। এখন আর্মির কোনো গাড়ি আর দেখা যাচ্ছে কোথাও। এ ফাঁকে ইটখোলা থেকে রাস্তায় উঠে আসে ট্যামা ম-ল। তখনই দেখে গেটের ওপারে বেশ খানিকটা দূরে কবির দাঁড়িয়ে। ঠোঁটমুখ ফুলে আলু। ট্যামাকে দেখেই ও একবার আকাশের দিকে হাত তোলে আবার দুহাত নেড়ে কী যেন বোঝাতে চেষ্টা করছে। একবার দুহাত ওর বুকে ঠেকায়। আবার সে হাত ঝাড়তে থাকে। ভেজা হাতের জল যেভাবে ঝেড়ে ফেলে, ঠিক সেভাবেই।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় ট্যামার। ‘অর্ধেক তো মইরেই গেছি। আর অর্ধেক মরতে কতক্ষণ, না হয় মইরেই যাব।’ বলেই এক দৌড়ে জলের ট্যাঙ্কের গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় ট্যামা। তখনও বেশ কিছুটা দূরে কবির দাঁড়িয়ে। ও চোরা দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক একবার তাকিয়ে একরকম কুঁজো হয়ে গেটের কাছে চলে আসে। কপালে ওর পুরু বলিরেখা। চোখের মণি দুটোয় বড় অস্থিরতা। ও কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, বঙ্গবন্ধু নাই! কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, কেঁদে ওঠে ওর।
‘পাগলের কতা নাকি!’ ট্যামার কণ্ঠে বিস্ময়। ‘বঙ্গবন্ধুর গাঁয়ে টোকা দিবার ক্ষমতা আছে এমন বাপের পুতের জন্ম অহনও বাংলাদেশে অয় নাই।’ ট্যামার গলায় অদ্ভুত এক ঝাঁজ ফুটে ওঠে। ‘তুই অহনও স্বপ্নে আছত ট্যামাÑ বঙ্গবন্ধু নাই। মাইরা ফালাইছে।’
কেডায় কইল তরে?
রেডিও তে?
রেডিও তে? কী কইল!
শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। আরও কত কী? বারবার কইতাছে। ডালিম নামে এক মেজর এট্টু পরপরই কইতাছে। ট্যামার তখন ইচ্ছে হলো কবিরের ঘরে গিয়ে শোনে খবরটা। কিন্তু গেটে আরও কয়েকটা পেল্লায় সাইজের তালা ঝুলতে দেখে চুপ মেরে যায় ট্যামা। ওর বুক তখন হাঁপরের মতো উঠছে নামছে। ওর খেয়াল হয় পাশের ইশকুলের গেটেও তালা। অন্যদিন এ সময়ে মেয়েদের হৈচৈয়ে রাস্তায় কানপাতা দায়। সেসঙ্গে রিকশা, ঠেলা, ঘোড়াগাড়ির জ্যাম। বেলের টুংটাং। ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ডাক। সহিশের অশ্লীল খিস্তি। সবকিছু মিলিয়ে এ জায়গাটায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে থাকে সেই সকাল থেকে।
না আজ কোনো ভিড় নেই। কোনো রিকশা নেই। গেট খোলা নেই ইশকুলের। দারোয়ানটাকেও দেখছে না কোথাও। সবকিছু কেমন উল্টোপাল্টা লাগছে। তবে কী…। ট্যামা আর দেরি করে না। চাঁন মিয়ার হোটেলের পাশের গলি ধরে ভেতরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে ম্যাসের সবাই রেডিও ঘিরে কান পেতে কী যেন শুনছে। “আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরচারী সরকার শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে…” ট্যামা চুপ করে বসে পড়ে মেঝেতে। দু-হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে গুমরে গুমরে কাঁদতে থাকে। ওর কান্নায় গভীর এক বিষণœতা ঘরের সবাইকে যেন চেপে ধরে।
বিকেলে নদী পাড়ে এসে বসে ট্যামা। একমনে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। চুক! চুক! চুক! চুক! শব্দে ঢেউয়ের পরে ঢেউ চলে যেতে থাকে ভাটির দিকে। ঢৈউয়ের এ শব্দ ভীষণ চেনা ওর। কেমন একটা ছন্দ খুঁজে পায় ও। কখনও মনে হয় ঢেউগুলো কী যেন কথা কয়ে কয়ে যাচ্ছে। অথচ আজ সে শব্দে কী এক কান্নার সুর বাজে। অনেকক্ষণ খেয়াল করেছে ট্যামা। করুণ রাগিণী বাজছে নদীর জলে। একমনে সে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হয় ট্যামার, জলের রং লাল। শুধু লাল নয়। রক্ত লাল! একটু আগেও জল ছিল ঘোলা। পরে এখন ফিকে রং ছিল একসময়। গভীর লাল আবির যেন ছড়িয়ে পড়েছে সে জলে। রক্ত না তো! বারবার চোখ কচলায় ট্যামা। ফের জলের দিকে চোখ রাখে। নাহ লাল। উৎকট লাল রং জলের। চোখ ভুল দেখছে না তো। হঠাৎ কী মনে করে আকাশের দিকে তাকায় ও। পশ্চিমাকাশে সূর্য এখনও বেশ উপরে। নামতে আরও বেশ খানিকটা সময় নেবে। খেয়াল করে আজকের আকাশ এখনও সেভাবে রক্তিম হয়নি। যেমনটি হয়েছিল গত সন্ধ্যায়। তাহলে আজ জল এত রাঙা কেন? ট্যামা আজলা ভরে জল হাতে নেয়। কিন্তু সে জলে কোনো রক্তের ছোঁয়া নেই। ফের নদীর জলে তাকায়। কী অসহনীয় রক্তিম সে জল। বড্ড পবিত্র,  নির্মোহ আর নিরাশক্ত মনে হয় সে রক্ত ধারা। রক্তের মধ্যে কোনো অভিমানের ছায়া নেই। এমনটিই ঘটবে। এভাবেই বুঝি পুরস্কৃত করবে দুখিনি বাংলার দুখি বাঙালিরা, তাই কোনো বিস্ময় নেই সে রক্তের ধারায়। এ রক্তের প্রবহমানতা চলবে অনন্তকাল ধরে।
পুরো শরীরে বড় রকমের এক ঝাঁকুনি খায় ট্যামা। কী মনে করে চারদিকে খুব বড় বড় চোখ করে তাকায় ও। না কোথাও একটিও নৌকো নেই। কার্গোগুলো স্থবির হয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছে কী এক অজানা আশঙ্কায়। একটি লঞ্চেরও ভেঁপু বাজেনি আজ সারাদিন। বুকের মধ্যে ভয়ানক এক শূন্যতা অনুভব করে ট্যামা। উঁইয়ের ঢিবির মতো খসখসে কী যেন ওর অন্তরের গভীরে মাথা তুলছে একটু একটু করে। ওই ঢিবির আড়ালে চাপা পড়ে ওর শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে।
এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে যায় ট্যামা। একছুটে জলের ট্যাঙ্কের গেটের সামনে চলে আসে কী মনে করে। কত দিনের পুরনো ঠাঁই। ছিন্ন করা কী এত সহজ। মা গেল। বাবা গেল। ভাইবোনগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল একসময়। সেই থেকে একা মানুষটির সঙ্গে এই জলের ট্যাংকের গাঁটছড়া। তা তো আজকের কথা নয়। বিয়ে থা করেনি বলে জীবন থেমে আছে ওর মধ্যেই। তা না হলে বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার এক চাতাল সমান বড় হয়ে যেত। একটি মাত্র জীবন। তাই তেমন আর নাড়াচাড়ার প্রয়োজন পড়েনি। বিশেষ করে ট্যাংকের এ আশ্রয়, এ জল এর ছায়া এবং এর বানর আর টিয়ে পাখির সঙ্গে ওর দীর্ঘদিনের যে সখ্যতা তা ওই মিলিটারির বেটাদের এক ধমকেই শেষ হয়ে যাবে? ট্যামা ট্যাংকের ভেতরের দিকের পাঁচিল কালো কালো মোটা সব পাইপ, সবই তো আগের মতোই আছে। কিন্তু কোনো চাঞ্চল্য নেই। নিথর, নীরব, বিমর্ষ ওরা। যেন ওদের রক্তেমাংসে গড়া কোনো শরীর নয়। মাটির গড়া প্রতীমা সব বসে আছে থাকে থাকে। টিয়েগুলোরও একই দশা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ওরা। কিংবা ভেতরে প্রাণ নেই। উড়তে বোধহয় ভুলে গেছে জনমের মতো।
গেটের শিক ধরে অনেক সময় অপলকে তাকিয়ে থাকে জলের ট্যাঙ্কের দিকে। একসময় ফিস ফিস করে বলে, বান্দর, ক-তো, শেখের বেটা বাইচে আছে না মইরে গেছে। বানরগুলোর কোনো সাড়া নেই। একেবারে মৌন। চুপচাপ।
ও-টিয়া, ক-তো, শেখের বেটা বাইচে আছে না মইরে গেছে। টিয়ারাও নিঃশব্দ। কোনো সাড়া মেলে না ওদের কাছ থেকে।
‘শেখের বেটারে মারি ফেলবে এমন বুকের পাটা কার? শেখের বুক হচ্ছি গে পাহাড়ের লাহান। ও বুকে বুলেট ঢোকে না। ফিরে আসবি সমান গতিতে। ওর বুকে কেউ বুলেট ঢোকানোর চেষ্টা কইরলে সে বুলেট উল্টো তার বুকে এইসে বিঁধবে। এ কথা জানে। হ¹লে জানে। সারা দেশজোড়া মানুষ জানে। তারপরও কার বেটার সাহস হবে শেখের বুকে গুলি করে। পাকসেনারা সাহস করেনি যারে গুলি কইরতে। আইউব পারে নাই। ইয়াহিয়াও পারে নাই। কব্বর খুঁইড়াও পারে নাই তারে গুল্লি করতে। সেই শেখের বেটারে অহন গুল্লি করবো কোন খানকির পুত। সেই বেজন্মার পুতের জন্ম অয় নাই অহনও বাংলাদেশে। কি টিয়া হাছা কইলাম না মিছা? কতা ঠিক কি না টিয়া? এবারও টিয়ারা নীরব।
কি বান্দর? আমার কথায় কি বিশ্বাস অয় না। অয় না বিশ্বাস? বানরগুলোও নীরব। একইরকম মৌনতার ধ্যানে ওরা মগ্ন।
বানরের কাছ থেকে, টিয়ার কাছ থেকে কোনোরকম সাড়া না পেয়ে, জেদ ধরে যায় ওর মনে, ওরে পুঙ্গির পুতেরা, কতা কস্ না ক্যান্! তবে কী আমি মিছে কথা বইলছি। তখনই সাঁই করে একটা মিলিটারি জিপ চলে গেল উত্তরে। কেমন খ্যাপাটে গাড়িটার চালচলন। যেন পাগল হয়ে ছুটছে। দ্বিগবিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ছুটছে। সে শব্দে পেছন ফিরে তাকাতেই ওর চোখ থমকে যায়। বুক কেঁপে ওঠে অজানা কোনো আশঙ্কায়।
রক্তাক্ত আকাশ। পশ্চিমে তাকালে শুধু রক্তের ঢেউ চোখে পড়ে। প্রতিদিনই সূর্য ডোবে। কিন্তু ডুবন্ত সূর্য কখনও এভাবে রক্ত ছড়ায় না। গতকাল আর আজ যা ঘটল তার সঙ্গে একাত্তরের ২৫ মার্চ সন্ধ্যার সূর্য ডোবার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পায় ট্যামা। একাত্তুরের সন্ধ্যায় যেমনি রক্তগঙ্গার ছবি মিছে হয়নি। ঠিকই রাতে রক্ত ঝরেছে হাজার হাজার মানুষের। আজও কেন যেন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি রক্ত ঝরার আলামত এটা। তবে কী শেখের বেটা ঠিকই মাটি নিয়েছে। চোখে বইজে ফেলেছে? কোনোভাবেই বিশ্বাস হয় না। এ সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোককে পথ চলতে দেখা যায়। কেউ কেউ পায়চারি করছে উদাসভবে। দু-একজন জটলা পাকালেও গাড়ির শব্দ পেলেই এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ হারিয়ে যাচ্ছে এঁদো গলির কোনো অন্ধকারে। তখনই কবির এসে এক ফাঁকে জানিয়ে যায়, আসলেই বঙ্গবন্ধু নাই।
কেমতে বুঝলি।
আকাশবানি থেইকাও কইছে।
আকাশবানিডা আবার কী?
ভারতের রেডিও স্টেশনের নাম। সরকারি রেডিও। অগো কথা মিছা না। না জাইনা তারা খবর দেয় নাই।
ট্যামা ট্যাংকের পাঁচিলের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে। দুহাতে কপাল চেপে ধরে বসে থাকে অনেকক্ষণ। অস্ফুটে বলতে থাকে, ‘এতক্ষণ ভাবছিলাম সব যেন মিছা হয়। ডালিম মিছা অয়। মিলিটারির জিপ মিছা অয়। রেডিওর কথা মিছা অয়। অহন আর কোনো ভরসায় কমু শেখের বেটা মরে নাই। কবির কইল, আকাশবাণী মিছা কথা কয় না।’
ওর চোখ গলে জল ঝরেছে অনেকটা সময় ধরে। ট্যামা একটুর জন্যেও ওর কান্নার কণ্ঠ চেপে ধরার চেষ্টা করেনি। সব বাঁধন আলগা করে দিয়ে দলা দলা কান্নাদের জল হয়ে বেরিয়ে যাবার পথ তৈরি করে রেখেছে ট্যামা। সে ধারায় বুকের পাষাণ অনেকটা যেন নেমে গেছে। বেশ হাল্কা বোধ হচ্ছে এখন নিজেকে। ওর দুচোখের তলায় জলের ধারা শুকিয়ে খসখসে কেমন এক দাগ পড়েছে। পথের ওপারে অপলকে তাকিয়ে থাকে ট্যামা। গভীর এক ধ্যানে ডুবে আছে ও। হঠাৎ মনে হয় মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে। কখনও আবার মনে হয় মানুষটা পায়চারি করছে। মুখে পাইপ। গভীর চিন্তায় মগ্ন। ট্যামা বারকয়েক চোখ কচলায়। ভুল দেখছে না তো! কিন্তু না তেমনই দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। শাদা পাঞ্জাবি পরা।
ট্যামার ভেতর থেকে সব অর্গল যেন খসে পড়ে। কথার খেই হারিয়ে ফেলে। ‘শেখের বেটা শেখ। আপনে কই যাইবেন আমাগ রাইখা। আপনি কি খালি দেশের নেতা! আপনে আমাগও নেতা। আপনে এই এলাকার এমপি। আমাগ ভোটে নির্বাচিত হইছেন। আমরা আপনারে ভোট দিয়া এমপি বানাইছি। আপনে আর যাবেন কই। এই নদী এই বালু মহাল, এই ইটের ভাটা, পাজা পাজা ইট সবই তো আপনার। অগো মালিকেরা সবাই আপনেরে ভোট দিছে। পাস করাইছে। আপনি এই এলাকার এমপি। ভুইলা গেলে তো চইলবে না।’
এ জীবনে তিন-তিনবার শেখের বেটার ভাষণ একেবারে কাছ থেকে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল ট্যামার। একবার ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে। একবার ’৭০ সালের নির্বাচনের সময় ধুপখোলার মাঠে। আরেকবার ’৭৪ সালে বানের সময়। দেশের বাড়িতে। ত্রাণ দিতে গিয়েছিল ওদের গ্রামে। আর একটা ভাষণ শুনেছে রেডিওতে। সত্তুরের নির্বাচনের আগে। জাতির উদ্দেশে নির্বাচনের আগে শেষ ভাষণ। সেসব স্মৃতি মনে করে ট্যামা বলে, ‘বাঘের বাচ্চাডারে মাইরা ফালাইল! বাঙালি হইয়া বাঙালির সিংহডারে মাইরে ফালাইল! অই হারামখোরের পুতেরা, তোদের বুকটা একটুও কাঁপে নাই! নির্ঘাৎ অজ্ঞান কইরে তারপর গুলি করিছে শুয়রের ঘরের শুয়ররা। সিংহ, বাঘ, চিতা, নেকড়ে সবটারে এক কইরলে যে শক্তি অইবে, এক শেখে তার চেয়ে বেশি শক্তি রাখে। এ কথা কাজী মতিন কইছে। বাস্তুহারা লীগের নেতা কাজী মতিন। বঙ্গবন্ধু ওরে রেডিও বিবিসি কইয়ে ডাকতো! হেই বাগডার বুকের সামনে খাড়াইয়া ওর গায়ে গুলি করা অত সহজ কাম না!’
হঠাৎ তার এ কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পায় ট্যামা ম-ল। সিংহের মতো গর্জন করে কে যেন বলছে, ‘কঠিন কাজটাই খুব সহজেই করতে পেরেছে ওরা। তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না। ওরা আমার বুক বরাবরই গুলি করেছে। আমার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে বাঙালির বুলেটের আঘাতে। ওরা পেরেছে। খুব সহজেই ওরা আমার বুকে গুলি চালাতে পেরেছে ট্যামা।’ হঠাৎ ও সম্বিৎ ফিরে পায়।
একরকম কুঁজো হয়ে ছুটতে ছুটতে রাস্তার ওপারে যায়। না কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। এমনি সিংহ কণ্ঠে দেয়া শেখের বেটার ভাষণের কথা ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে কানে ভাসে ট্যামার। “কৃষকদের প্রভুরা সকল সহায় সম্পত্তি আর সম্পদের মালিক। সব সুবিধা তারা ভোগ কইত্তেছে। অগো সহায় সম্পত্তি শুধুই বাইত্তেছে। আর অসহায় দরিদ্র কৃষক দিনদিন আরও দরিদ্র হইত্তেছে। বাঁচার তাগিদে তারা অহন গ্রাম ছাইড়ে শহরে চলি আইসতেছে।” মিছা তো কয়নাই। একটা কথাও তো মিছা কয় নাই শেখের পুত। বাংলার মীর জাফরদের তো শেখের বেটা তো ঠিকই চিনতে পাইরেছিল। তাইলে এতবড় ষড়যন্ত্রের ডিনামাইট কারা পুঁইতেছিল তা কেন ধইরতে পারলে না মুজিবর। আমাগ এমপি তুমি। তোমার কণ্ঠের সে কী তেজ। মাটি কাঁইপে ওঠে। কান ফাইটে ওঠে। তুমিই তো বইলেছিলে রেডিওর ভাষণে, বাংলার মীরজাফরদের কথা। তুমিই তো বইলেছিলে মীরজাফরদের কারণে আইজ আমাদের গায়ে কাপড় নাই। থালায় ভাত নাই। মাথার ওপর আশ্রয় নাই। তাই তো খালের ধারে রেলের ধারে থেইকা উচ্ছেদ হইলাম। অহন পানির ট্যাংক থেইকা, সরকারি জায়গা থেইকাও উচ্ছেদ হইলাম। আশ্রয় তো আর পাইলাম না শেখের বেটা। এখন তুই যে চইলে গেলি, তাইলে আশ্রয়ডা আর কেডায় দিবে। কার দিকে আর পথ চাইয়ে থাকব। তুই তো ভরসা ছিলি। তুই তো ঠিকই কইলি বাংলার ইতিহাস মানে সিরাজদ্দৌলা বনাম মীরজাফরের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস দুখিমানুষ বনাম মোনেমখাঁদের ইতিহাস। রেডিওতে কইছিলি। মনে আছে তোর? শুনছি তুই কারওরে ভুলস না। একবার দেখলে তার নাম। বদনখানি ঠিকই চিনতে পারস। আমরাও তোর ভাষণের কতা ভুলি নাই। ভুলি ক্যামনে। আমাগ প্রাণের কতা ভুলা যায়!
তাহলে তুই কেনে এমন ভুল করলি শেখের বেটা। শত্রু চিনাও তারে পুষলি। দুধ-কলা দি পুষলি। অহন তো ছোবল মারল ঠিকই। আশ্রয় ছিল না বইলে আমার তো কোনো দুঃখ ছিল না কখনও। কোনো অভিযোগ তো ছিল না! একা মানুষ। ট্যাংকির ছায়ায় খারাপ তো আছিলাম না। টিয়া, বান্দর এরা আমার সন্তানের মতো। আমারে ওরা দেইখা রাখতো। চোখে চোখে রাখতো সবসময়। আমিও অগো মায়া করি। অগো হৃদয়ডা অনেক বড়। অনেক অনেক বড় তোমার মীরজাফর আর মোনেমখাঁদের মতো বাঙালিদের চেইয়ে। ওরা অই ট্যাঙ্কির ওপরে থাকে না। অগো আত্মার লগে আমার আত্মার বাধি ফালাইছে, ওরা আমার আত্মীয়। সন্ধ্যা হলি পরে ওরা আমার জন্য পথ চাইয়ে থাহে। আমি ঠিকই বুঝতে পারি। ট্যাংকির ভেতরে পা রাখতেই আমি বুঝি ওদের মনের কথা। ওরা খুশিতে মুহূর্তে চিঁচি ট্যাঁ ট্যাঁ করে এতবড় ট্যাংকি ডারে মাথায় তুইলে ছাড়ে। প্রেম! গভীর এক প্রেম আমার সঙ্গে ওদের। কিন্তু বাঙালির প্রেমে যে অনেক বিষ ছিল তা আমরা না জানলেও তুমি তো ঠিকই জেইনেছিলে মুজিব। তারপরও…।
বলে দু-হাতে বুক চাপড়াতে থাকে ট্যামা। বাঁধনছেঁড়া কষ্ট। বুক যেন ভেঙে পড়বে এক্ষুণি। অনেকে ওকে জাপটে ধরে। অনেকে আশ্বস্ত করে মাথায় হাত বুলিয়ে। কেউ বলে মিলিটারি আসতেছে। গুলি করবে ট্যামা। তোর বুক বরাবর গুলি করবে। এ কথায় আরও বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় ও। এবার দুহাত প্রসারিত করে বুক উঁচিয়ে দাঁড়ায় ট্যামা। ঘাড়টা কাৎ হয়ে থাকে। সে ঘাড়টাকে সোজা করার চেষ্টা করে বারবার। আর কেমন এক খিঁচানি দিয়ে বলে, ডাকো তোমার মিলিটারি। দেখি কয়ডা গুলি কইরতে পারে। গুলিতেও শান্তি কিন্তু মীরজাফরদের এই বিজয়, মোনেমখাঁদের এই উল্লাস আমি সহ্য কইরতে পাইতেছি না। কোনোভাবেই পাইতেছি না। মৃত্যু চাই। মৃত্যু পরোয়ানা হাতে ওরে তোরা কেউ আয় না আমার কাছে। দেরি কচ্ছিস কেন। মৃত্যু বড় সহজ। এই দেশে মৃত্যু বড় সহজ। যুদ্ধে মানুষ মরেছে। আন্দোলনে মরেছে। এখন মরেছে শেখের বেটা নিজেই। তফাৎ কেবল একটাই। ওরা মইরেছে পাকসেনাদের হাতে। শেখ মইরেছে বাংলা সেনাদের হাতে। ওর দুঃখী বাংলার পোলাপানের হাতেই।
ও মুরুব্বিরা, ও দাদারা মীরজাফরের এই দেশে, মোনেমখানের এই দেশে আমার আত্মা কেন যেন আর শান্তি পাচ্ছে না। আমি শান্তির দেশে যাব। আমার নেতার কাছে যাব। আমার এমপির কাছে যাব। নির্বাচনের কালে গলা ফাটাইয়া কত ক্যানভাস কইরেছি। মিছিল কইরেছি আমর নেতার জন্য ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। বলেই দুহাত তুলে নাচাতে নাচাতে মাথাটা হঠাৎ ঢলে পড়ে ওর। এ খবর ওর প্রিয় টিয়ে পাখিরা, ওর প্রিয় বানরেরা জানে কি না কে জানে। তবে ওদের জীবনযাপনে যে বধিরতা, মৌনতা আর শূন্যতা নেমে এসেছে তা বোধহয় অনেক অনেক দিন বিমর্ষ করে রাখবে এই জলের ট্যাংকের তল্লাট। এর ছায়া এর আশপাশ। লঞ্চের ভেঁপুতে ওদের চিত্তে কোনো চাঞ্চল্য আর জাগবে কি না কে জানে। যদিও জাগে সে অনেক অনেক দিন পরে। যেদিন মানুষ বলবে একদেশে আছিল এক শেখের বেটা। শেখ মুজিব ওর নাম। পাহাড়ের লাহান। দুখি বাংলার জন্য জীবন দিয়েছিল। পঞ্চান্ন বছরের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেল খেটেছিল। তবু আপস করে নাই মীরজাফরদের সঙ্গে। কবির শোনে ট্যামা যেন বলছে :
লোকে আরও বলবে মৃত্যুর পরও ওর আত্মা যায় নাই। সাত আসমান উপরে যায় নাই। সাত আসমান কী, এক আসমানেও উঠে নাই। মাটিতেই আছে। ট্যাকের ঝোপে, খালে-বিলে, মাটিতে। পাহাড়ের পাথরের খাঁজে খাঁজে, ঝোপঝাড়ে, চরের বালুতে, আলু গাছের লতা-পাতায়, গাঙশালিকের গর্তে কোথায় সে নাই?  এত বছর পরও ওর আত্মা ঘোরে ধানের সবুজ বিচালি ছুঁয়ে। নদীর জলে সাঁতার কাটে। নৌকা বায়। লাঙল চষে। আর দুখি মানুষদের দেখে চোখের জল ফেলে। মুজিব যাবে কোণে। বাংলার মাটি ওরে ছাইড়বে না। কোনোদিনই ছাইড়বে না কবির। চোখ বুজলি ওরে দেখতি পাবি। চোখ খুললি পরে ওরে দেখতি পাবি। তবে যে সে চোখে দেখলি পরে তারে দেখা যাবে না। প্রেমের চোখে দেখতি হবে। ভালোবাসার চোখে দেখতি হবে। তোরা তো জানস না, প্রেম আর ভালোবাসা দিয়াই শেখের শরীর, ওর রক্ত গইড়েছে খোদায়। গুল্লি মাইরা শরীর মারা যায়, দেহ ফেলা যায়। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসারে তুমি গুল্লি করবা কেমনে। নিরাকার ভালোবাসার কোন অঙ্গে অদেখা প্রেমের কোন শরীরে গুল্লি করবা! বুকে প্রেম শরীরে ভালোবাসা জড়াইয়া শেখ ঠিকই এই বাংলার জলে, মাটিতে, আকাশে, পাখির নীড়ে, পাখির নরম ডানার ভিড়ে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*