বিভাগ: সম্পাদকীয়

রাজনৈতিক জোট-দলের সঙ্গে সংলাপ, রাজনীতিতে সুবাতাস

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া একটা নতুন পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনায় সম্মতি জানিয়েছেন এবং ১ নভেম্বর ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সূচনাও করেছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের লিখিত প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে তাতে সম্মতি জানান। তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেনকে জানান সংবিধানসম্মত যে কোনো বিষয়ে আলোচনার জন্য তার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ১ নভেম্বর আলোচনার জন্য গণভবনে আমন্ত্রণ জানান।
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অবাধ নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সদিচ্ছা থেকেই প্রধানমন্ত্রী সংলাপের প্রশ্নে ঔদার্য প্রদর্শন করেন। কেবল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক জোটকেও তিনি আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অবশ্য ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পক্ষ থেকে আগেই সংলাপের আবেদন জানানো হয়। অন্যান্য জোটও সংলাপে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
আমরা মনে করি, নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংলাপ অনুষ্ঠানই একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। দীর্ঘদিন যাবত দেশের রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা এবং বিরোধী দলগুলোর সংবিধান লঙ্ঘন করে সরকার পতন বা এই সরকারের পদত্যাগসহ যেসব অযৌক্তিক দাবি নিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতার পাঁয়তারা চলছিল, চলমান সংলাপ তার অবসান ঘটাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংলাপ হতে হবে সংবিধানের আওতায়। যে দাবিই করা হোক না কেন, তা যদি সংবিধানসম্মত না হয়, তাহলে সংলাপের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। বিএনপি নেতারা সংলাপের লিখিত প্রস্তাব দিয়ে ভেবেছিলেন, সরকার বা আওয়ামী লীগ তাতে তাৎক্ষণিক সাড়া দেবে না। তারা সংলাপের বিষয়টিকে ইস্যু করতে পারবেন এবং এই ইস্যুতে এজিটেশন চালাতে পারবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাব গ্রহণ এবং আজকের সংলাপ তাদের সেই উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেয়।
এবারের সংলাপ নানা কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী। এবারই প্রথম কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা বা ভূমিকা ছাড়াই দুটি প্রধান প্রতিপক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংলাপ হচ্ছে। অতীতে কমনওয়েলথ বা জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারির দূতিয়ালি এবং সর্বোচ্চ সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। ঐ সংলাপে কোনো সুফল বয়ে আনেনি। পক্ষান্তরে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা ছাড়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে সূচিত সংলাপ হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ২০ জন নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৪ দলের নেতৃবৃন্দসহ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৩ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
উভয় পক্ষই বলেছে, আলোচনা অত্যন্ত খোলামেলা পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ দীর্ঘ সময় নিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তারা অনেকেই একাধিকবার আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার একটানা আলোচনায় উভয় পক্ষ উভয় পক্ষের বক্তব্য খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করেছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের পদত্যাগ, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া এবং নিরপেক্ষ সরকারের দাবির প্রশ্নে তার কিছু করার এখতিয়ার নেই। সংবিধানে এর কোনো সুযোগ নেই। সরকারপ্রধান হিসেবে সংবিধানের বাইরে তিনি যেতে পারেন না। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কিত দাবিতেও সরকারের কিছু করণীয় নেই। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা। সরকারের এখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে বিরোধী দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সভা-সমাবেশের ওপর কোনো বাধা থাকবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করেছেন। দ্বিতীয়ত; প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভাষায় যাদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক মামলা’ রয়েছে তার তালিকা সরকারের কাছে প্রদানের কথা বলেছেন। এছাড়া নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণে কোনো বাধা থাকবে না বলে তিনি বিরোধী দলকে আশ্বস্ত করেছেন। ড. কামাল হোসেনের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দল চাইলে আরও ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন।
অবিশ্বাস, অনাস্থা এবং পরস্পরের ছায়া না মাড়ানোর এতদিনের অসহিষ্ণুতার রাজনীতির ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা ও যুক্তফ্রন্ট, জেনারেল এরশাদের জোট এবং বামজোটসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ রাজনীতিতে সুবাতাসের সুস্পষ্ট আভাস। সকল দলের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে ন্যূনতম কতক ইস্যুতে যদি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। আমরা আশা করি, সংলাপের প্রেক্ষিতে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করবে। দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সকল দল ও জোট এগিয়ে আসবে। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা দেশবাসী চায় না। দেশবাসী চায় সংবিধান সমুন্নত রেখে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। সংলাপের ভেতর দিয়ে সেই জন-আকাক্সক্ষা পূরণ হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*