রায়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের ভাষারই পুনরাবৃত্তি

Posted on by 0 comment
20

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে বিতর্কিত পর্যবেক্ষণের কঠোর সমালোচনা

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ষোড়শ সংবিধান সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিতর্কিত পর্যবেক্ষণের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, বিএনপি-জামাতসহ স্বাধীনতাবিরোধীরা যে ভাষায় কথা বলে, প্রধান বিচারপতি তার রায়ে সেই ভাষাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। তার এই স্ববিরোধিতাপূর্ণ রায় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এমন রায় দিয়ে প্রধান বিচারপতি নিজেকেই শুধু বিতর্কিত করেন নি, সংসদ, সংবিধান ও গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। এর পেছনের উদ্দেশ্য কী? সুপ্রিমকোর্ট সংসদে প্রণীত কোনো আইনের ব্যত্যয় ঘটলে ব্যাখা দিতে পারে; কিন্তু সংবিধান সংশোধন করতে পারে না, সেই অধিকার তাদের নেই। সংবিধান সংশোধনের একমাত্র অধিকার সার্বভৌম জাতীয় সংসদের।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ষোড়শ সংশোধনী রায় নিয়ে কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ বিধি অনুযায়ী আনীত সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, সংসদকে হেয় করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা, দেশের স্বাধীনতা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির রায়ে অনেক স্ববিরোধিতা ও সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে। রায়টি কোথা থেকে কে করে দিয়েছে সেটা দেখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ ছাড়াও সরকার ও বিরোধী দলের ১৮ জন সংসদ সদস্য আনীত এই প্রস্তাবটি সমর্থন করে প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদলের আনীত প্রস্তাবটি স্পিকার ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুপ্রিমকোর্টের যে রায় দেয়া হয়েছে এটা কারও কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। রায়ের পর বিএনপি খুশি হয়ে মিষ্টি বিতরণ করেছে। এমন হতে পারে এই রায়ে জিয়াউর রহমানের অবৈধ ক্ষমতা দখল বানানো গণতন্ত্র বলা হয়েছে। হয়তো ওটাতে খুশি হয়ে এতদিন আমরা যেটা বলতাম সেটা মেনে নিয়ে মিষ্টি বিতরণ করেছে। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে হবে। গণতন্ত্র ছাড়া দেশের উন্নতি কখনও হয়নি, হবেও না। তাই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আনীত প্রস্তাবটি সর্বাত্মক সমর্থন করে বলেন, রায়ের পর্যবেক্ষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে যেসব কথা বলা হয়েছে, স্বাধীনতা-বিরোধী বিএনপি-জামাত যেভাবে কথা বলে, সেই ভাষারই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে ওই রায়ে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী রায়ে সংসদ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী এমপিদের নিয়েও কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করেন সংসদের সকল সংসদ সদস্যরা। সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরাও এতে ভোট দেন। রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন বিচারপতিদের। এখন উনি (প্রধান বিচারপতি) যদি সংসদ সদস্যদের নিয়ে এভাবে কথা বলেন তাহলে উনার অবস্থান কোথায় থাকে?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি তার রায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপমান করেও কথা বলেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। যা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রায়টার ভেতরে সাংঘর্ষিক বিষয় আছে। উনার বক্তব্যে স্ববিরোধিতা আছে। কোথায় কে করে দিয়েছে তা দেখতে হবে। তিনি বলেন, আমরা সংবিধানের মূল কাঠামোতে যখন ফিরে গেলাম, প্রধান বিচারপতি সেটা মানছেন না। তিনি সামরিক অধ্যাদেশকে সংবিধানের মূল কাঠামো বলছেন, এর উদ্দেশ্য কী? কোন বিষয়ে আপিল হলে সুপ্রিমকোর্ট আপিলের রায় দিতে পারেন, ব্যাখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু সংবিধান সংশোধন করে দিতে পারেন না। এ অধিকার সংবিধান সুপ্রিমকোর্টকে দেয়নি। আসলে প্রধান বিচারপতি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলে নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। সংবিধান ও গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
সংসদ নেতা বলেন, রাষ্ট্রের মূল কাঠামোই হচ্ছে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ। এই ৩টি স্তম্ভ একে অপরের পরিপূরক ও সমান অধিকার রয়েছে। কেউ কাউকে খাটো করবে না। সংসদে পাস হওয়া কোনো আইনে ব্যত্যয় ঘটলে সর্বোচ্চ আদালত এ ব্যাপারে বিশ্লেষণ করতে পারেন, কিন্তু সংবিধান সংশোধন করতে পারেন না। রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি শত শত বছর আগের বিষয়গুলো টেনে এনেছেন। জবাবদিহিতা সবার থাকতেই হবে। আমরা প্রতি পাঁচ বছর পরপর জনগণের কাছে গিয়ে কাজের জবাবদিহি করি।
সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি ও অন্য দুই বিচারপতির নেতৃত্বে এই কাউন্সিল হয়। এই এক ব্যক্তি কোনো বিচারপতিকে পছন্দ না হলে অপসারণ করতে পারবেন। কে বিচারপতি থাকবেন কি থাকবেন নাÑ তা ওই এক ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। কারও (বিচারপতি) প্রতি এতটুকু বৈরী হলে সেই বিচারপতির চাকরি চলে যাবে। প্রধান বিচারপতি রায়ে আমিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে উনি নিজেই আমিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। অথচ ষোড়শ সংশোধনী অনুযায়ী কোনো বিচারপতিকে অপসারণ করতে হলে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের সমর্থন লাগবে। এরপর আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা নিতে পারবেন। অথচ এই ব্যবস্থাকেই করা হলো অবৈধ!
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক। আর জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আমরা দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আর আপিল বিভাগের এখতিয়ারও সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, রায়ে বলা হয়েছে সংসদ পরিচালনা হয় না-কি কেবিনেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। বাস্তবে সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবিনেটের কোনো ভূমিকাই নেই। সংসদ পরিচালনা হয় সংসদের কার্যোপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্তে, সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী। এমন অনেক কিছুই প্রধান বিচারপতির রায়ে স্ববিরোধিতা ও সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, জনগণের শক্তিই মূল শক্তি, জনগণের এ অধিকার সমুন্নত রাখতে হবে।

১২০০ কোটি টাকা পাচার করেছে জিয়া পরিবার
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, জিয়া পরিবার দুবাইসহ ১২টি দেশে ১২০০ কোটি টাকা পাচার করেছে। এ সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গোয়েন্দা সংস্থা গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের (জিআইএন) রিপোর্ট সরকারের হাতে এসেছে। বিষয়টির তদন্ত চলছে। তদন্তে রিপোর্টের সত্যতা প্রমাণিত হলে, যারা দেশের জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করেছে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পাচারকৃত অর্থ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরত আনা হবে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির (এ) সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তদন্ত করে যখনই আমরা সঠিক তথ্য পাব কোথায় কীভাবে অর্থ রয়েছে, নিশ্চয় আমরা ফেরত আনার পদক্ষেপ নেব। ইতোমধ্যে আমরা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। তদন্ত চলার স্বার্থে হয়তো সব আমি বলতে পারলাম না। তবে সত্যতা প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। প্রশ্নকারী ফখরুল ইমাম জিআইএনের রিপোর্টের কিছু অংশ তুলে ধরে বলেন, জিআইএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু দুবাই নয়, অন্ততপক্ষে ১২টি দেশে জিয়া পরিবারের সম্পদ রয়েছে। যার প্রাক্কলিত মূল্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সৌদি আরবে আল আরাবা শপিংমল রয়েছে, এর মালিকানা বেগম জিয়ার। কাতারে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ইকরা’র মালিকও উনি এবং তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান। তা ছাড়া খালেদা জিয়ার ভাতিজা তুহিনের নামে কানাডায় ৩টি বাড়ি রয়েছে। এছাড়া বিএনপির সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ সিঙ্গাপুরের হোটেল মেরেনডি’র ১৩ হাজার শেয়ারের মালিক। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের নামে লন্ডনে স্টেন্ডফোর্ড ও অলগেটিতে দুটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। আরেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের নামেও অ্যাপার্টমেন্ট আছে। বিএনপি আমলের মন্ত্রী মির্জা আব্বাসের স্ত্রীর নামে দুবাইতে আছে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। সিঙ্গাপুরেও মির্জা আব্বাস ও তার সন্তানদের নামে রয়েছে দুটি অ্যাপার্টমেন্ট। বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খানের নামেও সিঙ্গাপুরে রয়েছে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, উল্লিখিত তথ্যগুলো যখন বের হয়েছে তখন নিশ্চয় আমাদের কাছে আছে এবং এটা নিয়ে তদন্ত চলছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে মানিলন্ডারিং আইনেও তদন্ত করা হচ্ছে। এই তদন্তের মধ্য দিয়ে সত্যতা যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে সংসদে প্রশ্ন করায় জাতীয় পার্টির এমপিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদ নেতা বলেন, সংসদে তথ্যটি তুলে ধরার জন্য সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা সরকার থেকে তুলে ধরলে বহু লোক আছে, তারা মায়াকান্না শুরু করত, বলত আমরা হিংসাত্মক হয়ে এটা করি। বিরোধী দল থেকে যেহেতু এটা এসেছে, নিশ্চয়ই মানুষ এটা উপলব্ধি করতে পারবেÑ জনগণের সম্পদ কীভাবে লুট করেছে। যার কারণে তাদের আমলে বাংলাদেশ পাঁচ-পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কোনো উন্নতি করতে পারেনি। আর্থ-সামাজিক অবস্থার অবনতি ঘটেছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, এ কথা তো সকলেই জানে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর একদিকে মানুষ হত্যা-খুন করেছে। আন্দোলনের নামে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। একদিকে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ, অপরদিকে ক্ষমতায় থাকতে দুর্নীতি, অর্থ পাচার করা এ ধরনের বহু অভিযোগ তো জনগণ সব সময় করেছে এবং এটা সকলেই জানে। এজন্য খালেদা জিয়ার ছোট ছেলের পাচারকৃত কিছু টাকা আমরা ফেরত এনেছি। বোধহয় বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম কারও পাচার করা টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।

Category:

Leave a Reply