বিভাগ: সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সংকট : প্রধানমন্ত্রীর শান্তি উদ্যোগ

2‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব’…। কবিগুরুর এই বেদনাবিধুর পর্যবেক্ষণ আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের রক্তাক্ত (ইষড়ড়ফু ইরৎঃয) জন্মের পর আমরা চেয়েছিলাম আর যেন রক্তপাত না হয়। আর যেন মৃত্যুর মিছিল দেখতে না হয়। আর যেন কাউকে তার ঘর-ভিটে-মাটি ছেড়ে দেশান্তরী হতে না হয়। ধ্বংস, মৃত্যু, কান্না এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের যেন চির অবসান হয়। কিন্তু আমাদের সে প্রত্যাশা অপূর্ণই রয়ে গেল। দেশের অভ্যন্তরেও যেমন আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য বিএনপি-জামাত চক্রের রক্তের হোলি খেলা দেখেছি, তেমনি দুনিয়ার দেশে দেশেও সেই উন্মত্ততা লক্ষ করেছি। দূরের দেশের কথা না হয় বাদই দিলাম। আমাদের ঘরের কাছের মিয়ানমারে অব্যাহত রয়েছে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ; ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং নিজেদের জন্ম জন্মান্তরের ভিটে-মাটি থেকে রোহিঙ্গা জাতি-গোষ্ঠীকে বিতাড়িত করার পাশবিক বর্বরতা। প্রাণ বাঁচাতে অসহায় লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশে। আর অভূতপূর্ব মানবিকতা এবং মায়ের দরদ নিয়ে ওই মানুষগুলোকে বুকে টেনে নিচ্ছে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ আর তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সারাবিশ্ব মিয়ানমার সরকারের নিন্দা জানিয়েছে। গণহত্যা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়া, তাদের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি আজ বিশ্বজনীন। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শান্তি উদ্যোগের প্রতি সমগ্র বিশ্ববাসী জানিয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার বক্তৃতায় শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৫-দফা প্রস্তাব করেছেন। অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ এই ৫-দফা শান্তি প্রস্তাবের সারমর্ম হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, মিয়ানমার তার নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিক, তাদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করুক, মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করুক এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করুক। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে প্রচারণা বন্ধ এবং অবিলম্বে এথনিক ক্লিনজিং বন্ধ করা হোক। ৫-দফায় রোহিঙ্গারা যতদিন বাংলাদেশে থাকবে ততদিন পর্যন্ত মানবিক সাহায্য প্রদানের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনার শান্তি উদ্যোগ সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আমরা মৃত্যুমুখে ঠেলে দেব না। আমরা ১৬ কোটি মানুষ, প্রয়োজন একবেলা করে খাব, তবু রোহিঙ্গাদের ক্ষুধায় খাদ্য জোগাব। আমরা ভাগ করে খাব। আমরা জানি না, বিশ্বের আর কোনো দেশ, আর কোনো রাষ্ট্রনেতা এ ধরনের মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন কি না।

বাঙালির ঔদার্য, বাঙালির মানবিকতা, বাঙালির পরার্থপরতার এই বিরল দৃষ্টান্ত বিশ্বে নতুন মহিমায় উদ্ভাসিত।

অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র, রক্তের বদলা রক্ত, হিংসার বিরুদ্ধে হিংসা, এই অমানবিক হিংসাবৃত্তির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা নিয়েছেন পিস অফেনসিভ। অর্থাৎ অস্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তি, রক্তের বিরুদ্ধে মানবিকতা এবং হিংসার বিরুদ্ধে অহিংসা। এই শান্তি উদ্যোগ, হিংসার বিরুদ্ধে শান্তির নিরস্ত্র আক্রমণ অধিকতর শক্তিশালী ‘অস্ত্র’ হিসেবে বিশ্বকে নতুন পথের নিশানা দেখিয়েছে।

এই ‘শান্তির অস্ত্র’ বা পিস অফেনসিভ যে বিফলে যায়নি, তার লক্ষণ ইতোমধ্যেই সুস্পষ্ট। যারা আরাকানে রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযোগকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিল, যারা অপপ্রচার বলে এই অভিযোগ সরকারিভাবে অস্বীকার করেছিল, সেই মিয়ানমার কিছুটা হলেও মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছে। অং সান সু চি’র একজন মন্ত্রী টিন্ট সোয়ে গত ২ অক্টোবর বাংলাদেশে এসে এই সমস্যার অস্তিত্ব যেমন স্বীকার করেছে, তেমনি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকল্পে বাংলাদেশের সাথে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের অঙ্গীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

আমরা অবশ্যই এতে বিগলিত হইনি। আমরা জানি অনেক দুরূহ পথ পাড়ি দিতে হবে। এই বৈঠকেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। তবে, ওরা (মিয়ানমার) যে বিশ্ব জনমতের চাপে, শেখ হাসিনার শান্তি উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে সমস্যাটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে, সেটি যে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতার প্রাথমিক সাফল্য তা মানতে হবে।

রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের ¯্রােত বন্ধ হয়নি। রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু অনন্তকাল এই বিপুল জনগোষ্ঠীর দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ বহন করবে না। মিয়ানমারের শাসকদের সুবৃদ্ধির উদয় হবে, তারা বিশ্ব জনমতের প্রতি, সর্বজনীন মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। যত বড় পরাশক্তিই তাদের পাশে দাঁড়াক না কেন, শেষ বিচারে তাদেরও পিছু হটাতে হবে। কেননা শান্তিতে সকলেরই স্বার্থ আছে। হিংসা অব্যাহত থাকলে মিয়ানমার হিংসার আগুনেই পুড়ে মরবে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও শান্তি একটি অভিন্ন প্রক্রিয়া। কোনো পরাশক্তি এই বাস্তবতা থেকে বেশিদিন দূরে থাকতে পারবে না। এই শান্তি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ একা না। সমগ্র বিশ্বের শান্তিকামী জনগণ আমাদের পাশে আছে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*