বিভাগ: অন্যান্য

লাল চালের ভাত কেন খাব

বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন এতই কম যে, বাজারে এই চাল খুঁজে পাওয়া যায় না। উচ্চফলনশীল ধানের কল্যাণে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি বটে, বিনিময়ে পেয়েছি পুষ্টির দুর্ভিক্ষ।

38আলমগীর আলম: শত শত বছর ধরে আমাদের বাপ-দাদা তথা পূর্বপুরুষদের পরিবেশবান্ধব দেশীয় ঢেঁকিছাঁটা আউশ এবং আমন চালই ছিল প্রধান খাদ্য। তখন রোগবালাই ছিল অত্যন্ত কম। সিংহভাগ মানুষ ছিল স্বাস্থ্যবান, বিবেকবান, অল্পে সন্তুষ্ট ও মায়া-মমতার মতো মানবিক গুণে গুণান্বিত। শারীরিক সুস্বাস্থ্যের মূলে ছিল প্রকৃতিনির্ভর খাদ্যাচার আর কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ছাড়াই খাদ্যের বিপুল সমাহার। কোনো ধরনের জেনিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও হাইব্রিড শস্য ছিল না। তাই মানুষের মধ্যে নিরাপদ খাদ্যের কোনো অভাব ছিল না। যার দরুন মানুষের মধ্যে শারীরিক সুস্থতা বজায় থাকত।
খাদ্যের সাথে মানবিক গুণগুলোও জড়িত। প্রশ্ন আসতে পারে খাদ্যের সাথে এগুলোর সম্পর্ক কি? উত্তর হচ্ছে, সুষম খাদ্য মানুষের মস্তিষ্কে স্বস্তি দেয় আর স্বস্তি মানুষের মানবিক গুণ ঠিক রাখে, আর মানবিক গুণ ঠিক থাকলে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, বিবেক, বিনয়ী হতে সাহায্য করে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে খাদ্যের জোগান বাড়াতে পঞ্চাশ দশকের পর থেকে কৃষিবিজ্ঞানের কল্যাণে নানা জাতের উচ্চফলনশীল ইরি ধানের উৎপাদন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে শরীরের জন্য পুষ্টিকর আউস এবং আমন ধানের ফলন কমতে থাকে। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন এতই কম যে, বাজারে এই চাল খুঁজে পাওয়া যায় না। উচ্চফলনশীল ধানের কল্যাণে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি বটে, বিনিময়ে পেয়েছি পুষ্টির দুর্ভিক্ষ।
উচ্চফলনশীল ধান জেনিটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মোডিফাই করা জাত, যা প্রাকৃতিক জীবনচক্রের সাথে সাংঘর্ষিক উপায়ে শুধু উচ্চফলনশীল করা; যা শুধু ফলনই দেবে, গুণাগুণ বহুলাংশে কমে যাবে, যদিও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতের ভিন্নতা রয়েছে। তবু এটা নিয়ে বিশ্বে প্রচুর মতপার্থক্য আছে; কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে যে কৃত্রিমতা ঘটেছে, বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদনে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি গবেষণা আরেকটি গবেষণাকে বাতিল করেছে মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর বলে।
বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত, আমরা গড় ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম চালের ভাত খেয়ে থাকি, আমাদের ভাতের চাল এখন ধবধবে সাদা আর মিহি, স্বচ্ছ, কোনো ধরনের পোকা বা মরা চাল থাকে না, মূলত মেশিনের মাধ্যমে চালের উপরিভাগ ছেঁটে ফেলে দেওয়া হয়, সাথে মোমের রাসায়নিক দিয়ে মসৃণ করে আমাদের কাছে ধবধবে সুন্দর চাল দেওয়া হয়, যার মধ্যে খাদ্যগুণ নাই বললেই চলে। চালের উপরিভাগের খাদ্যগুণ ফেলে দেওয়ার ফলে আমরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছি এবং হচ্ছি। কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাসিডিটি, ওবেসিটি, কিডনি এবং লিভার সংক্রান্ত রোগ এখন ঘরে ঘরে দেখা যায়। এর প্রধান কারণ মেশিনে মিলিং করা সাদা পরিশোধিত চালের আবরণে লেগে থাকা নানা ধরনের মিনারেল নিশ্চিহ্ন হয়ে এনার্জি বর্ধনকারী নিরেট শ্বেতসারে (ঈধৎনড়যুফৎধঃব) রূপান্তরিত হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য।
এবার আমরা দেখে নেইÑ লাল চাল আর সাদা চালের খাদ্যগুণ কতটা হেরফের করে।
পুষ্টি বিবেচনায় লাল এবং সাদা চাল (পরিমাণ ১ কাপ)
লাল ভাতের ক্যালোরি সাদা ভাতের প্রায় সমান, যা দেহে এনার্জি প্রদান করে থাকে।
খাদ্যে আঁশ : সাদা ভাতে আছে ০.৬ গ্রাম, পক্ষাক্ষরে লাল ভাতে আছে ৩.৫ গ্রাম, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং এর (এষুংড়সরপ ওহফবী) কম বিধায় সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
ক্যালসিয়াম : সাদা ভাতে বিন্দুমাত্র নেই, লাল ভাতে ৬০ এমজি’র ওপরে থাকে যা হাড়, দাঁত মজবুত রাখে হৃৎপি-ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রেখে মাংসপেশির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং দেহকে রোগবালাই আরোগ্য করার প্রক্রিয়াকে উজ্জ্বীবিত করে।
আয়রন : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে ৩.৪ এমজি থাকে, যা রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন করে, চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায় ও ক্লান্তি দূর করে।
ম্যাগনেসিয়াম : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে থাকে ২৭২ এমজি, যা ¯œায়ুর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখে, হজম প্রক্রিয়া শক্তিশালী করে এবং ভিটামিন বি এবং ই-এর কার্যক্ষমতা বাড়ায়।
ফসফরাস : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে থাকে ৫০০ এমজি, যা চুলের বৃদ্ধি, হৃৎপি- এবং কিডনির কার্যক্রম ঠিক রাখে, দেহে এসিড এবং অ্যালকালাইনের ভারসাম্য রক্ষা করে।
পটাসিয়াম : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাত থেকে পাওয়া যায় প্রায় ৫০৯ এমজি, যা দেহের পানির ভারসাম্যতা রক্ষা করে। মাংসপেশির সংকোচন সহজ করে, মেয়েদের হরমোনের সমস্যা থেকে রক্ষা করে।
সোডিয়াম : সাদা ভাতের চাইতে লাল ভাতে বেশি থাকে, যা দেহের পানি ভারসাম্য রক্ষা করে ¯œায়ুর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।
জিঙ্ক : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে পাওয়া যায় ৩.৮ এমজি, যা চুল ও চামড়ার স্বাস্থ্য সুন্দর রাখে। ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে নিরাময় হয়, সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে। গর্ভধারণ এবং পুরুষত্ব স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
কপার : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে সামান্য পরিমাণে থাকে ০.৫ এমজি, যা খাদ্য হতে প্রাপ্ত লৌহকে হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া শরীরে ভিটামিন সি-এর ব্যবহার নিশ্চিত করে।
ম্যাঙ্গানিজ : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে থাকে ৭.৯ এমজি, যা ¯œায়ু এবং মস্তিষ্কে পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করে। এছাড়া চর্বি এবং আমিষ হজম করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
এবার বেছে নিন আপনি কোন চালের ভাত খাবেন?
অনেকেই প্রশ্ন রাখবেন যে লাল চাল কোথায় পাব? ঢেঁকি কোথায় পাব? সুস্থ থাকতে চাইলে আপনাকে জোগাড় করতে হবে, অনেকেই ধানের এক পলিশ দিয়ে চাল সংগ্রহ করে, এক পলিশে চালের উপরি আবরণ নষ্ট করে না, তাই এক পলিশওয়ালা চাল নিরাপদে খেতে পারেন। বিশেষ করে যারা একাধিক রোগে ভুগছেন তাদের জন্য লাল চালের ভাত একটি আদর্শ পথ্য।

লেখক : ন্যাচারোপ্যাথি সেন্টার

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*