বিভাগ: উত্তরণ ডেস্ক

শান্তি হচ্ছে উন্নয়নের সোপান

17

‘… বাংলাদেশ আজ একটি উদার, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সকল উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশ পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে আসছে।

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৃতীয় মেয়াদে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। পরিবারের সকল সদস্য নিহত হওয়ার পর দীর্ঘ ৬ বছর নির্বাসন জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। একজন গৃহবধূ থেকে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি হয়ে ওঠেন জননেত্রী। ষড়যন্ত্রের নিকষ অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ অভিধায় হয়েছেন অভিষিক্ত। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে হয়েছেন ইতিহাসের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক। জননেত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাসহ সার্বিক উন্নয়ন আজ বিশ্ববাসীর কাছে অনুকরণীয়। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কর্মকুশলতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে নিজেকে উন্নীত করেছেন বিশ্বনেতৃত্বের আসনে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত শান্তির রূপরেখা গৃহীত হয়েছে। হয়ে উঠেছেন বিশ্বশান্তির অগ্রদূত, শান্তিকন্যা। বাঙালির বিশ্বজয়ের স্বপ্নসারথি। এছাড়াও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহে তার প্রস্তাবনাকে গ্রহণ করা হয়েছে। অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছেন তিনি।
পাকিস্তান ও ভারত তাদের পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটালে উভয় দেশের মধ্যে আসন্ন যুদ্ধ বন্ধে দুই দেশেই ভ্রমণ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে বৈঠকের মধ্য দিয়ে শান্তি স্থাপন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন, গঙ্গার পানি চুক্তির মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, ভারতের সাথে স্থল সীমানা বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের মাধ্যমে দীর্ঘ ৬৮ বছরের মানবিক বিপর্যয় থেকে ছিটমহলবাসীকে মুক্তিদান, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর এবং আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনাল গঠন করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বিচারের রায় কার্যকর, মিয়ানমারে মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়প্রার্থী লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় ও অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ অংসখ্য কালজয়ী সাফল্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছে। উত্তরণের পাঠকদের জন্য বিশ্ব রাজনীতির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২০০৯-১৬ পর্যন্ত জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা প্রদত্ত ভাষণের সার-সংক্ষেপ তুলে ধরা হলোÑ
২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেনÑ
‘… ৩৫ বছর আগে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই মঞ্চ থেকেই জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছিলেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। অঙ্গীকার করেছিলেনÑ বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণরাষ্ট্র। দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখার।
দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং পরিবারের ১৮ জন সদস্য। এরপর বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক ও আধা-স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়। নব্বই দশকের কিছু সময় বাদে গত বছর বিদেশ থেকে আমার দেশে ফেরা এবং গত বছরের ২৯শে ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত দেশে অসাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা বজায় ছিল।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ২৯শে ডিসেম্বর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আমার দল আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে।
জনগণের এই বিপুল সমর্থন তাঁদের প্রত্যাশা পূরণে আমাদের দায়িত্ব অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমাদের সরকার ইতোমধ্যে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আমাদের লক্ষ্যÑ বাংলাদেশকে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা।…’
‘… খাদ্য নিরাপত্তা আমাদের সরকারের জন্য সব সময়ই একটি উদ্বেগের বিষয়। আমাদের বিগত সরকারের সময়ে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক কর্মসূচি গ্রহণের ফলে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিলাম। এজন্য জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বাংলাদেশকে মর্যাদাপূর্ণ ‘সেরেস’ পদকে ভূষিত করে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ আবারও খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত হয়। এবার আমাদের সরকার জাতীয় খাদ্যনীতি প্রণয়ন করেছে, যাতে সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা যাতে অধিক পরিমাণে খাবার পায় এবং খাবারের দাম যাতে কম থাকে তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আমরা জ্বালানি ও কৃষি উপকরণ, যেমনÑ সার, বীজ, কীটনাশক এবং পানি সেচের মূল্য হ্রাস এবং সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। …’
‘… ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষা বাংলার জন্য ভাষা শহীদরা জীবন দিয়েছিলেন। সেদিনের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রতিবছর এই দিন ইউনেস্কো বিশ্বের সকল ভাষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দিবসটি পালন করে। বাংলাদেশ ও ভারতের একটি প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলেন। সম্প্রতি আমাদের পার্লামেন্ট জাতিসংঘকে অনুরোধ করেছে বাংলাকে এর অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য। ভাষার শক্তির প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে বাংলা’কে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে আমি সকল সম্মানিত সদস্যের সমর্থন কামনা করছি।…’
২০১০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেনÑ
‘… বাংলাদেশ আজ একটি উদার, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জাতিসংঘের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং দায়িত্ববান সদস্য। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সকল উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশ পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে আসছে।
দেশ এবং দেশের বাইরে বৈরী শক্তির বিরুদ্ধে বিশেষ করে, সন্ত্রাসবাদ দমনে, বাংলাদেশ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যেসব ব্যক্তি হত্যা, নারী ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করতে আমরা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছি। আমাদের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সংক্রান্ত রোম ঘোষণার সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের উদ্দেশ্য হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করেছে তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করা। আমি বিশ্বাস করি, কেবল সুবিচারই পারে অতীতের অমার্জনীয় ভুলের নিরাময় করতে।…’
‘… ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর বারবার আমার ওপর হামলা হয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত, যখন আমরা বিরোধী দলে ছিলাম তখন সংখ্যালঘুসহ অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে তৎকালীন বিএনপি-জামাত সরকারের সময়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আমার শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল; ২৪ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্ত্রী, আমার দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানও সেই হামলায় নিহত হয়েছিলেন। গুরুতর আহত পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী এখনও পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এবং আমার পরিবার বারবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি। কিন্তু সন্ত্রাসের কাছে মাথা নত করিনি। আমি পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, বাংলাদেশের মাটিতে আমরা কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-কে প্রশ্রয় দেব না। এজন্য আমরা ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের সন্ত্রাসবিরোধী সকল কনভেনশনের অনুমোদন দিয়েছি।…’
‘… আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি বলেই ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি করে জাতিগত সংঘাত নিষ্পত্তি করেছিলাম। ২০০৯ সালে শান্তিপূর্ণভাবে বিডিআর বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়েছিলাম।
আমি বিশ্বাস করি, উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শান্তি এবং স্থিতিশীলতা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে আমরা তার প্রমাণ দিয়েছি। ১৯৮৮ সালে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ ২৪টি দেশে ৩২টি মিশনে ৯৭ হাজার সৈন্য প্রেরণ করেছে। এসব শান্তি মিশনে আমরা আমাদের ৯২ জন বীর সেনানীকে হারিয়েছি। বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ সেনা প্রেরণকারী দেশ।…’
২০১১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৬তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেনÑ
‘শান্তিই হচ্ছে উন্নয়নের সোপান। আর শান্তি তখনই বিরাজ করে, যখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। এজন্য আমি মনে করি শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্বদেশে এবং বিদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান “সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়” এবং “সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান” নীতি গ্রহণ করেছিলেন। সাঁইত্রিশ বছর আগে এই মঞ্চ থেকেই তিনি একথা উচ্চারণ করেছিলেন। শান্তির এ বাণী শুধু উচ্চারণই করেননি, তিনি তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন।
এরই ধারাবাহিকতায় শান্তির জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা আমার সরকারের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল আদর্শ শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আইনের শাসনের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আমাদের সাহায্য করেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের অংশগ্রহণও একই নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।
সময়ের পরিক্রমায় জাতিসংঘের ভূমিকায় পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তা রক্ষাই এখন জাতিসংঘের প্রধান কাজ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তঃরাষ্ট্র জাতিগত সংঘাত নিরসন, সন্ত্রাসবাদ দমন, আন্তঃসীমানা অপরাধ দমন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলা, দারিদ্র্য বিমোচন, পানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি এবং ধনী ও গরীবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য বিলোপ।’
‘… আমি বিশ্বাস করি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এজন্যই ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমাদের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সনদের অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমরা অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ। অতীত ভুলের সংশোধনের এটিই একমাত্র পথ। এর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য সুসংহত হবে।…’
‘… আমার সারাজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি আপনাদের সামনে একটি শান্তির মডেল উপস্থাপন করতে চাই। এটি একটি বহুমাত্রিক ধারণা যেখানে গণতন্ত্র এবং উন্নয়নকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হয়েছে। এতে আছে ছয়টি পরস্পর ক্রিয়াশীল বিষয় যা শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এগুলো হচ্ছে (১) ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ (২) বৈষম্য দূরীকরণ (৩) বঞ্চনার লাঘব (৪) ঝড়েপড়া মানুষদের সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি (৫) মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং (৬) সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটন।
আমি এর নাম দিয়েছি “জনগণের ক্ষমতায়ন এবং শান্তি-কেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল”। এর মূল বিষয় হচ্ছে সকল মানুষকে সমান চোখে দেখা এবং মানবিক সামর্থ্য উন্নয়নের কাজে লাগানো। একমাত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করে সমাজ থেকে অবিচার দূর করতে পারলেই সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। এজন্য প্রতিটি রাষ্ট্রকে আন্তরিকভাবে সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানেও এটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
আসুন, আমরা শান্তির এ মডেলটি প্রয়োগ করে দেখি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এর মাধ্যমে সাত বিলিয়ন মানুষের এই বিশ্বকে আমরা পাল্টে দিতে পারব। এমন একটি বিশ্ব গড়তে সক্ষম হব যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।…’
২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৭তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেনÑ
‘এখানে আমি আমার বাবা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করছি। যিনি আজ থেকে ৩৮ বছর আগে এ মঞ্চে দাঁড়িয়েই ‘সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরিতা নয়’, ‘সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান’, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বল প্রয়োগের অবসান’ এবং ‘বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান’-এর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর এই নীতি দেশে-বিদেশে মূলত ন্যায়বিচার ও শান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। যা আমাকে ১৯৯৭ সালে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম মেয়াদে, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদনে অনুপ্রাণিত করেছে। ফলে ২০ বছরের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ২০ হাজার প্রাণবধের অবসান হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এ নীতিই আমাকে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বর্ডার গার্ড বিদ্রোহ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে প্রেরণা জুগিয়েছে।’
‘… বিশ্ব খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ব্যাপক অশান্তির সৃষ্টি করতে পারে। যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তায় আরও বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বাজারে এলডিসি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং ওডিএ প্রতিশ্রুতি পূরণ অত্যাবশ্যক। ব্রেটন উডস্ ইনস্টিটিউশনস ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সব দেশে শ্রমিকের অবাধ চলাচল নিশ্চিতের বিষয়গুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী দেশগুলোর সুবিধা নিশ্চিতে ‘জিএটিএস’-এর মুড-ফোর আশু বাস্তবায়ন প্রয়োজন। নিরাপদ অভিবাসন এবং নারীসহ অভিবাসী কর্মজীবীদের অধিকার সংরক্ষণে অভিবাসী প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী দেশগুলোর যৌথ দায়িত্ব ডব্লিউটিও নীতির অংশ করা উচিত।’
২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেনÑ
“বাংলাদেশকে এখন ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল’ এবং ‘দক্ষিণ এশিয়ার মান বাহক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড, গ্লোবাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড এবং এফএও ফুড অ্যাওয়ার্ড ২০১৩ লাভ করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৬তম অধিবেশনে আমার উত্থাপিত ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ‘জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন মডেল’-এ বর্ণিত নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এই গৌরব অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।”
‘… আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন এবং ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য শিক্ষাই প্রধান চালিকাশক্তি। নারীর ক্ষমতায়ন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল প্রত্যাশিত অগ্রগতি সাধন সম্ভব। তাই আমরা নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী মেয়েদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছি। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দিচ্ছি। ১ কোটি ১৯ লক্ষ শিক্ষার্থী মাসিক উপবৃত্তি পাচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দিচ্ছি। আমরা তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৪ হাজারের বেশি নারী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আছেন। বর্তমান সংসদে ৭০ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছে। পাঁচজন নারী মন্ত্রী এবং একজন নারী সংসদের হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্ভবত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদ উপনেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা নারী। সরকারি চাকুরিতে নারীর জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষিত কোটা তাদেরকে বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন এবং সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চতর পদে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।…’
‘… বিশ্বায়নের কিছু অনন্য সমস্যা আছে যেগুলো মাঝে মধ্যেই শান্তির প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেয়। এ ধরনের হুমকি মোকাবেলায় ন্যায়ভিত্তিক নীতি গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত হয়। যা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, প্রতিবেশ, পানিসহ আন্তঃদেশীয় সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক মালিকানা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় অবদান রাখে। এই চেতনা নিয়েই আমরা প্রতিবছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘শান্তির সংস্কৃতি’ প্রস্তাব উত্থাপন করি এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এমন একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়াই আমাদের সকলের লক্ষ্য। একটি প্রতিশ্রুতিশীল বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় আমাদের এ প্রয়াস বিশ্বের জনগণ ও রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বার্তা নিয়ে আসুক, এই কামনাই আমি করি।…’
২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেনÑ
‘… বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের জন্য আমরা বেশ কয়েকটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে দেশের দীর্ঘতম ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পদ্মাসেতু নির্মাণকাজ শুরু করেছি। চট্টগ্রামের সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এক্সপ্রেসওয়ে এবং রিভার টানেলসহ সড়ক-মহাসড়ক এবং রেলওয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও এগিয়ে চলছে। ২০২১ সাল নাগাদ চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের বেশ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা ভারত, চীন ও জাপানের মতো বন্ধুরাষ্ট্রের সাথে এ ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অব্যাহত গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সারাদেশে ১৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে।
তরুণনির্ভর বাংলাদেশের জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ২০৩১ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম থাকবে। আমাদের এই তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা অপরিহার্য।
একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সমসাময়িক তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রের এবং জনগণের সক্ষমতা তৈরি করছি। বর্তমানে সাড়ে ৪ হাজারেরও ওপর ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে জনগণ ২০০-এরও বেশি বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণ করছেন। ১৫ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন।…’
‘…. বাংলাদেশ এ বছর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। এ বিশেষ মুহূর্তে আমি আমার জনগণের পক্ষ থেকে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছিলেন তা পুনর্ব্যক্ত করতে চাই।
‘আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি বিশ্ব গড়ে তুলি, যা দারিদ্র্য, ক্ষুধা, যুদ্ধ এবং মানবিক দুঃখ-দুর্দশা নির্মূল করতে পারে এবং মানুষের কল্যাণের জন্য বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।…’
‘… বিশ্বে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আজ আমরা সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। যার প্রথমটি হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস জঙ্গিবাদ। বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়নের পথে এটি প্রধান অন্তরায়। সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই। সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সকল রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।
আমি নিজে সন্ত্রাস এবং সহিংস জঙ্গিবাদের শিকার। আমার পিতা বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ভাই এবং অন্যান্য নিকট আত্মীয়দের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আমি নিজেও কমপক্ষে ১৯ বার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি। আমার সরকার সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ, সহিংস জঙ্গিবাদ এবং মৌলবাদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে বিশ্বাসী। বাঙালি জাতির গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে যারা লিপ্ত রয়েছে, সেসব চরমপন্থি ও স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির মোকাবিলায় আমরা সদা-তৎপর।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন একটি মারাত্মক উন্নয়ন হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব না হলে, আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। নতুন উন্নয়ন এজেন্ডায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, আমাদের এই ধরিত্রী, এর প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু সংরক্ষণের জন্য সকল কার্যক্রম বাস্তবায়নে সকলের দৃঢ় প্রত্যয় থাকতে হবে। আমাদের সামনে সামান্যই সুযোগ অবশিষ্ট আছে। এ বিশ্বকে নিরাপদ, আরও সবুজ এবং আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে আমাদের অবশ্যই সফলকাম হতে হবে।…’
২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেনÑ
‘…. আমরা মনে করি, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। এদেরকে সর্বোতভাবে সমূলে উৎপাটন করার সংকল্পে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদের মূল কারণগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে এদের পরামর্শদাতা, মূল পরিকল্পনাকারী, মদতদাতা, পৃষ্ঠপোষক, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহকারী এবং প্রশিক্ষকদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিজে একজন সন্ত্রাসী হামলার শিকার হিসেবে সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে বিশ্বাসী। আমাদের দেশে যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপের উদ্ভব হয়েছে, তাদের নিষ্ক্রিয় করা, তাদের নিয়মিত অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাংলাদেশের ভূখ- থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম নির্মূল করার ক্ষেত্রে আমাদের সরকার সফল হয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠী তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পুনঃসংগঠনের মাধ্যমে নতুনরূপে আবির্ভূত হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। গত পহেলা জুলাই আমরা এক ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলার শিকার হই। ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় কিছু দেশীয় উগ্রপন্থি সন্ত্রাসী ২০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এ সময় ১৩ জন জিম্মিকে আমরা উদ্ধার করতে সমর্থ হই। এই ভয়ঙ্কর ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে আমরা এই নতুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন করতে এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আমরা ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এতে সাড়া দেওয়ার জন্য আমি সমগ্র জাতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছি। আমরা সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। আমি আত্মবিশ্বাসী যে, জনগণের দৃঢ়তা ও সহযোগিতায় আমরা বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসীদের সমূলে উচ্ছেদ করতে পারব।…’
‘… বিশ্বায়নের এই যুগে আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে, যদি আমরা সঠিক পন্থা অবলম্বন করি, তা হলে এখানে সম্ভাবনা ও সুযোগও রয়েছে প্রচুর। “এক মানবতার” জন্য কাজ করার উদ্দেশে আমরা সকলে এখানে সমবেত হয়েছি। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আসুন আমরা মানবতার স্বার্থে সকলে অভিন্ন অবস্থানে উপনীত হই এবং বিশ্ব থেকে সংঘাত দূর করে শান্তির পথে এগিয়ে যাই। এক্ষেত্রে জাতিসংঘই হতে পারে আমাদের জন্য একটি অনন্য প্লাটফর্ম। আসুন আমরা এই সংস্থাকে আরও টেকসই এবং প্রাসঙ্গিক করে তুলতে নতুন করে শপথ গ্রহণ করি।…’

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*