বিভাগ: তত্ত্ব তথ্য ইতিহাস

শীতল যুদ্ধ, শান্তি আন্দোলন ও পিস অফেনসিভ

3-4-2018 7-16-48 PMপিস অফেনসিভ শব্দটি গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী। এই শব্দটির উদ্গাতা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি। অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধের পাঁয়তারা এবং শীতল যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে সংগঠিত করা এবং জনমতের চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে যুদ্ধংদেহী তৎপরতা বন্ধ বা হ্রাস করার লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী শান্তি আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। পিস অফেনসিভ কথাটার অর্থ হয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি, সমরাস্ত্র শিল্পের বিকাশের বিরোধিতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে শান্তি, স্থানীয় বা আঞ্চলিক যুদ্ধ প্রতিহত করতে শান্তি এবং জাতিসমূহের স্বাধীনতা রক্ষায় শান্তি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্বযুদ্ধের আগে সামরিক শক্তি এবং বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা বা ধরে রাখা এবং সর্বত্র মোড়লিপণা যারা করত তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য অর্থাৎ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ ছিল প্রধান। পর্তুগাল ও স্পেনেরও অনেক উপনিবেশ ছিল। ইতালি ও জার্মানি মূলত দুনিয়াকে নতুন করে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার জন্য পুরাতন শক্তিধর বৃহৎ ঔপনিবেশিক শক্তি ইংল্যান্ড, ফরাসি ও রাশিয়াকে টার্গেট করে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে মানবেতিহাসের নজিরবিহীন গণহত্যা ও জীবনহানি, সম্পদহানি এবং ধ্বংস সাধন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তি অর্থাৎ ‘জার্মানি-ইতালি-জাপানের’ পরাজয় নিশ্চিত করতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে যুদ্ধ পরিসমাপ্তির পরও মূলত নিজের পারমাণবিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। জনবহুল ঐ দুটো শহর মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং পরমাণু বোমা সোভিয়েত ইউনিয়নকে শঙ্কিত করে তোলে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইউরোপে জামার্নির পরাজয়ের নির্ধারক শক্তি ছিল সোভিয়েত বাহিনী। বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের মোকাবিলা করার মতো সামরিক শক্তির অধিকারী ছিল একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন তার প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়। ফলে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যের সমাপ্তি ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে শুরু হয় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব বলয় সৃষ্টির অশুভ প্রতিযোগিতা। ১৯৪৭ সাল থেকেই কোল্ড ওয়ার বা ঠা-া যুদ্ধের যুগের শুরু।
শীতল যুদ্ধ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক, ভাবাদর্শগত ও অর্থনৈতিক সংগ্রাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশেষত ট্রুম্যান স্তালিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে সহ্য করতে পারতেন না। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব ছিল সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিজমের ঘোর বিরোধী। তারা সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েতের ধ্বংস কামনা করত। পক্ষান্তরে সোভিয়েত ইউনিয়নও বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদ উৎখাত, পশ্চিমা বিশ্বের মোড়লিপণাকে খর্ব করা এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চেষ্টা করত। আর এসবই ছিল ঠা-া যুদ্ধের প্রধান কারণ।
সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টি এবং পরাধীন জাতিসমূহের স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বলয়ের বাইরে ১৯৪৮ সালে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে ‘ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব ইন্টেলেকচুয়াল ফর পিস’ নামে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠান করে। এই সমাবেশ থেকে একটি স্থায়ী সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিয়ন কমিটি অব ইন্টেলেকচুয়াল ফর পিস নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ১৯৪৯ সালে এই কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ৭৫টি দেশের ২ হাজার প্রতিনিধি যোগদান করে। কমিটির বা সংগঠনের নাম হয় ওয়ার্ল্ড কমিটি অব পার্টিজান্স ফর পিস।
১৯৫০ সালে হেলসিংকিতে অনুষ্ঠিত হয় এই সংগঠনের দ্বিতীয় কংগ্রেস। সম্মেলনে সংগঠনের নতুন নামকরণ করা হয়, বিশ্বশান্তি পরিষদ। বিশ্বশান্তি পরিষদের প্রথম সভাপতি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও ফ্রান্সের নোবেলজয়ী ফ্রেডারিক জুলিও কুরি। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন ইলিয়া এরেনবুর্গ, আলেকজান্ডার ফাদায়েভ, ডিমিট্রি সেস্তোভিচ, ডব্লিউ বইস, পল রবসন, পাবলো পিকাসো, হাওয়ার্ড ফাস্ট, লুঁই আরাগঁ, জর্জ অ্যামাদো, পাবলো নেরুদা, গিয়র্গি লুকাস, বেনাটো গুটোস, জন পল সার্ত্রে, লেরি, দিয়াগো রিভেরা ও মোহাম্মদ আল আসমার প্রমুখ মনীষীসহ বিশ্বের বহু নোবেলজয়ী ও খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী।
বস্তুত, ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিশ্বশান্তি পরিষদ একটি কার্যকর সামাজিক ও সিভিল সোসাইটি আন্দোলন হিসেবে প্রভূত মর্যাদা অর্জন করে। ‘শান্তি পরিষদ’ বিশ্বশান্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামে বিশেষ অবদানের জন্য ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পুরস্কার প্রবর্তন করে। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জুলিও কুরি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। বিশ্বে শান্তি ও মুক্তির বাতাবরণ সৃষ্টি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃত্ববাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে শান্তি পরিষদ ছাড়াও অনেকগুলো আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছেÑ
১. খ্রিস্টান পিস কনফারেন্স ২. প্রতিরোধ সংগ্রামীদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ৩. ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পিস ৪. আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক আইনজীবী সংগঠন ৫. আন্তর্জাতিক অরগানাইজেশন অব জার্নালিস্ট ৬. ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস ৭. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ৮. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব সাইন্টিফিক ওয়ার্কার্স ৯. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নস ১০. উইমেনস ইন্টারন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন ১১. ওয়ার্ল্ড পিস এসপারেন্টো মুভমেন্ট ইত্যাদি।
বস্তুত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আর্থিক সহায়তায় বিশ্বশান্তি পরিষদসহ উল্লিখিত সংগঠনগুলো পরিচালিত হতো। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে বিশ্বশান্তি পরিষদের হেডকোয়ার্টার ছিল। মানব বিধ্বংসী নতুন নতুন পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা এবং পরমাণু অস্ত্রের বিস্তারের বিরুদ্ধে, নিরস্ত্রীকরণ, মানব বিধ্বংসী অস্ত্রের পুনরুৎপাদনশীল ক্ষমতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে এবং সত্তরের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, দেশে দেশে মার্কিন আগ্রাসন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি ইস্যুতে বিশ্বশান্তি পরিষদ পশ্চিমা বিশ্বসহ সর্বত্র সুশীল সমাজের সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
বিশ্বশান্তি পরিষদ (ডব্লিউপিসি) দেশে দেশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা, জাতিসমূহের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা হ্রাস, সকল প্রকার পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ তথা নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে প্রচারাভিযান ও জনমত গঠনে নিয়োজিত ছিল। বাংলাদেশেও বিশ্বশান্তি পরিষদের শাখা রয়েছে। ১৯৭১-এর পরেও দীর্ঘদিন বিশ্বশান্তি পরিষদের সভাপতি ছিলেন ভারতের রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের সভাপতি ছিলেন প্রয়াত কবি সুফিয়া কামাল প্রমুখ।
সোভিয়েত তাত্ত্বিকদের মতে, এভাবেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধবাজ নীতি প্রতিরোধের জন্য ‘শান্তি আন্দোলনকে’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাকেই চবধপব ঙভভবহংরাব হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো।
সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নৃ-গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করা এবং লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শান্তির নীতিকে অনেকেই ‘পিস অফেনসিভ’ হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণ ও ৫-দফা সমাধান সূত্র, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান ও মানবিক সাহায্য প্রদানের অঙ্গীকার ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার শাসকগোষ্ঠীর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার এবং কূটনৈতিক তৎপরতার যে অবস্থান তিনি নিয়েছেন, এক কথায় তাকে ‘পিস অফেনসিভ’ বলা যেতে পারে। তার এই শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ফলে মিয়ানমার অস্বীকৃতির অবস্থান থেকে সরে এসে রোহিঙ্গা সমস্যার বাস্তবতা মেনে নিতে এবং তাদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে।
সোভিয়েত আমলের ‘পিস অফেনসিভ’ কথাটি বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করেছে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*