বিভাগ: ইতিহাস : প্রবন্ধ

শেষের সেদিনে মুখোমুখি যারা

shPMcজাফর ওয়াজেদ: ছিলেন তিনি ক্ষণজন্মা পুরুষ। হিমালয়ের চেয়ে উঁচু যার ব্যক্তিত্ব ও সাহস। নিজ জাতিকেও করে তুলেছিলেন সাহসী যোদ্ধা। স্বাধীন দেশে ষড়যন্ত্রকারীরা শান্তিতে দেশ পরিচালনা করতে দেয়নি। কেমন কেটেছে শেষের দিনগুলো? রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শেষের দিনগুলো কেমন ছিল? ঘাতকের নিঃশ্বাস কি তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন? ‘নাগিণীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস’; যিনি নিজেই জনসভায় আবৃত্তি করতেন, তিনি কি টের পাবার সময়টুকু পেয়েছিলেন যে ঘাতকরা যে কোনো সময়, যে কোনো মুহূর্তেই আঘাত হানবে? বিশ্বাস তো ছিল তার প্রখর যে, কোনো বাঙালি তাকে হত্যা দূরে থাক, আঘাত করার মতো মানসিকতা রাখে না। ভেবেছিলেন ‘সাড়ে সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করো নি’র বিপরীতে তার বাঙালি মানুষে পরিণত হয়েছে; সুতরাং মনুষ্যবিবর্জিত কোনো কর্মকা- বাঙালি করবেÑ এ ছিল ভাবনার জগতে অস্পৃশ্য। অথচ বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ঘাতকরা তখনও ‘শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস’ করে অস্ত্র শানিয়ে যাচ্ছে ষড়যন্ত্রের নানা ঘুঁটি পাকিয়ে। দেশজুড়ে নানারকম অস্থিরতা, অরাজকতার যে ডালপালা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, তা নিরসনের পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল শান্তির পরিবেশ সৃষ্টির। আর এই সময়টাতে তিনি দ্রব্যমূল্যকে নিয়ে এসেছিলেন নিয়ন্ত্রণে। সবকিছু সুনসান হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলো ধরা দিতে থাকে ক্রমশ।
শেষের দিনগুলোতে খুনিদের সহযোগী, পরামর্শকরাও দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তারা কি ঘটনাপূর্ব ‘রেকি’ করছিলেন না-কি সবটাই দাফতরিক কাজ ছিল, তা স্পষ্ট হয় পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্য। এই হত্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির নেপথ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে জড়িত ছিল দেশি-বিদেশি অনেক কুশীলব। সেসব ক্রমশ প্রকাশিত হয় এখনও। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু হত্যার ষড়যন্ত্র আজও সম্পূর্ণ ও সঠিকভাবে অনুদ্ঘাটিত।
১৯৭৫ সালের ১ আগস্ট হতে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দু-সপ্তাহের দিনগুলোতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু কাটিয়েছিলেন খুবই ব্যস্ত সময়। সরকারি কর্মসূচির বাইরেও গঠিত নতুন দল বাকশালের পূর্ণাঙ্গ ‘সেট আপ’ তৈরিতেও ছিলেন ব্যস্ত। পাশাপাশি খুনিরাও ছিল অপতৎপরতায় শশব্যস্ত।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের ১৪ দিনের সরকারি কর্মসূচির তালিকা পর্যালোচনা করলে বিস্ময় জাগে যে, শেষের সেই দিনগুলোতে ব্যস্ততার মাঝেও কেটেছে রাষ্ট্রনায়কের বিচিত্র মানুষের সংস্পর্শে। নেতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এমন লোকজন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও শেষ দিনগুলোতে তাকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দিয়েছে, এমনটা নয়। নানামুখী চাপ তার স্কন্ধজুড়ে তখন।
বিস্ময় বাড়ে যে, বঙ্গবন্ধুর এই সময়ের সাক্ষাৎপ্রার্থী, যারা নেতার সান্নিধ্য পেতে ভিড় করেছিলেন তাদের অনেককেই দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের পর তার খুনি ও শত্রুদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ ও হাতে হাত মেলাতে, দখলদার সরকারের মন্ত্রী হতে। ছিল যারা তার পারিষদ। আরও বিস্ময় জাগায় যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে যেসব দেশ বা তার রাষ্ট্রদূতরা নানাভাবে জড়িত তা ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে এই একুশ শতকে এসেও। ফাঁস হচ্ছে ষড়যন্ত্রের নানাবিধ জাল। দেখা যায়, শেষের দিনগুলোতে তাদের কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, কথা বলেছেন। তারা রাষ্ট্রপতি মুজিবের মানসিক অবস্থা বুঝতে দেখা করেছিলেন সম্ভবত। অনুমান করা যায়, তাদের এই সাক্ষাৎ বঙ্গবন্ধুর ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারার’ মতোই ছিল হয়তো।
কর্মসূচি ছিল ১৫ আগস্ট সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধুর। তার একদিন আগে ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ১৫ আগস্টের ১০ দিন আগে ৫ আগস্ট দেখা করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইএ বোস্টার। সর্বশেষ সাক্ষাৎপ্রার্থী ছিলেন ১৪ আগস্ট সাংসদ অধ্যাপক আজরা আলী, যিনি ১৫ আগস্ট মোশতাকের পার্শ্বচর হয়ে যান। এমনকি খুনিদের পক্ষে সাফাই গেয়ে অন্য সাংসদদের মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য চাপ প্রয়োগ করতেন। পরবর্তীতে তিনি মোশতাকের দল ডেমোক্র্যাটিক লীগও করেন। প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী সর্বাধিক সাক্ষাৎ করেছেন একা বা তিন বাহিনী-প্রধানকে নিয়ে পৃথকভাবে।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের দৈনন্দিন সরকারি কর্মসূচিতে নজর দিলে দেখা যায়, সাক্ষাৎপ্রার্থীরা সাক্ষাৎকালে বেশি সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন, তা নয়। ১৫ হতে ২৫ মিনিট সময়কাল তারা অতিবাহিত করেন। স্বল্প সময়ে তারা কি হাসিল করেছেন তা স্পষ্ট হয় তাদের পরবর্তী কার্যক্রমে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কর্মরত অনেকেই পরে খুনিদের সঙ্গে হাতও মেলায়। সর্বশেষ দিন ১৪ আগস্টের তালিকা হতে পেছনের দিকে গেলে ভেসে আসে অনেক নাম, যাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয় ১৫ আগস্টের পর।
১৪ আগস্টের তালিকায় দেখা যায় দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হির বিশেষ দূত সাক্ষাৎ করেন। সকাল ১০টায় নৌবাহিনী প্রধান দেখা করেন, যিনি ১৫ আগস্ট সকালে বেতারে গিয়ে মোশতাকের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেন অন্য বাহিনী-প্রধানদের সঙ্গে। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টায় খুনিদের অন্যতম সহযোগী বেতার ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং সকাল ১১টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রামের পটিয়ার নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিমানবাহিনীর প্রধান এ কে খোন্দকার দেখা করেন। তাদের এই সাক্ষাতের ১৮ ঘণ্টা পর বঙ্গবন্ধু খুন হন। বিমানবাহিনী প্রধান ১৫ আগস্ট সকালে মোশতাকের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। প্রতিমন্ত্রী পরে মোশতাকের মন্ত্রী হন। সকাল সাড়ে ১১টায় দেখা করেন জাতীয় লীগ সভাপতি আতাউর রহমান খানের দুই কন্যা। এদের জামাতারা এবং সহোদররা পরে বিএনপিতে যোগ দেয়। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বোস প্রফেসর ড. আবদুল মতিন চৌধুরী দেখা করে পরদিন সমাবর্তন আয়োজন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। সন্ধ্যা ৬টায় শিক্ষামন্ত্রী প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী ও শিক্ষা সচিব সাক্ষাৎ করেন। ড. মোজাফফর পরে জিয়ারও শিক্ষা উপদেষ্টা হয়েছিলেন। সর্বশেষ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাক্ষাৎ করেন সংসদ সদস্য অধ্যাপক আজরা আলী এবং শ্রীমতি সুপ্রভা মাঝি। আজরা আলী মোশতাকের ডেমোক্র্যাটিক লীগের নেত্রী হয়েছিলেন। সুপ্রভা সম্পর্কে পরে কিছু জানা যায়নি। অনুমান করা যায়, আজরা আলী সেদিন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে হয়তো এমন তথ্য নিয়েছেন, যা হত্যাকারীদের পরিকল্পনায় কাজে লেগেছে। ১৩ আগস্ট ছিল বুধবার। সকাল ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এমআর সিদ্দিকী বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চাঁদপুরের এমপি এমএ রব সাক্ষাৎ করেন।
মঙ্গলবার ১২ আগস্ট সকাল ১০টায় সাক্ষাৎ করেন অর্থমন্ত্রী ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, যিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী কর্নেল ফারুকুর রহমানের সম্পর্কে আপন খালু এবং মোশতাকের অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিন দিন পর ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় শপথ নেন যখন বঙ্গবন্ধুর লাশ সিঁড়িতে। সন্ধ্যা ৬টায় দেখা করেন সফররত কমনওয়েলথ সেক্রেটারি অধ্যাপক এএফ হোসেন, যিনি পাকিস্তানি।
শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১১ আগস্ট সোমবার সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাকশালের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ছিলেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী। এই সাক্ষাতের চার দিন পর তিনি মোশতাকের মন্ত্রী হন। পরে জিয়াউর রহমানেরও শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাক্ষাৎ করেন কর্মকমিশনের সদস্য আযহারুল ইসলাম।
রোববার ১০ আগস্ট ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। পাকিস্তান জামানা হতে এই ছুটি বহাল ছিল। এরশাদ যুগে রোববার ছুটি বাতিল হয়। ৯ আগস্ট শনিবার বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার স্থানীয় প্রতিনিধি ড. স্যাম স্ট্রিট সকাল ১০টায় সাক্ষাৎ করেন। আর সকাল ১১টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সন্ধ্যা ৬টায় বাকশালের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যসহ অন্যরা সাক্ষাৎ করেন। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর বাকশাল নেতাদের প্রতি শেষ ভাষণ। সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় অ্যাটর্নি জেনারেল দেখা করেন।
৮ আগস্ট ছিল শুক্রবার। সকাল ১০টায় প্রথম ও দ্বিতীয় কর্মকমিশনের চেয়ারম্যানদ্বয় দেখা করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় রেল প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আলতাফ হোসেন এবং সাড়ে ১১টায় পানি, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মোমিনউদ্দিন আহমদ সাক্ষাৎ করেন। এরা দুজন পরে মোশতাকের মন্ত্রী হন। সৈয়দ আলতাফ ছিলেন ন্যাপ (মুজাফফর) নেতা।
৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় সুইজারল্যান্ডের নয়া রাষ্ট্রদূত পরিচয়পত্র পেশ করেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে ‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ডে’ রূপান্তর করার যে স্বপ্ন দেখেন, তা ব্যক্ত করেন। পরদিন সংবাদপত্রে তা ছাপা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী, ১১টায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী সাক্ষাৎ করেন। এরা দুজনে পরে মোশতাকের মন্ত্রী হন। বেলা ১২টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বিদেশ সফরের প্রাক্কালে সাক্ষাৎ করেন, যা ছিল শেষ সাক্ষাৎ। এই দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার সমর সেন সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎকালে মিস্টার সেন সতর্ক করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে নানা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। প্রতিক্রিয়াশীল চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে তাদের কাছে তথ্য ছিল। সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় সদস্য আবদুল আওয়াল এবং ৬টা ১০ মিনিটে কাজী মোজাম্মেল হক এমপি সাক্ষাৎ করেন।
৬ আগস্ট বুধবার দুপুর ১২টায় শ্রমমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরী এবং ১২টা ১০ মিনিটে সংস্কৃতি, তথ্য ও বেতারমন্ত্রী কোরবান আলী ও প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং সচিব মতিউল ইসলাম দেখা করেন।
৫ আগস্ট মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সাক্ষাৎ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইএ বোস্টার। বোস্টার জানতেন খুনিদের তৎপরতা। তিনি শেখ মুজিবকে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেন নি। বরং ঘটনার অনুচক্র হিসেবে তার ভূমিকা পরে প্রকাশিত হচ্ছে, হবে। হত্যাকা- সংঘটিত করার নেপথ্যে তার ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। সাড়ে ১০টায় সাক্ষাৎ করেন শিল্পমন্ত্রী। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে সিলেটের সাংসদ মোহাম্মদ ইলিয়াস, কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী ও গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী সাক্ষাৎ করেন। এই তিন সাংসদের কেউই মোশতাককে সমর্থন করেন নি; না করায় মানিক চৌধুরীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। এদিন সন্ধ্যা ৬টায় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শামসুর রহমান বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন এবং গাইডলাইন নেন। ২০ আগস্ট তিনি মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাক্ষাৎ করেন বেতারের ডিজি আশরাফুজ্জামান খান।
৪ আগস্ট সোমবার। সকাল ১০টায় দেখা করেন পাকিস্তান ফেরত মেজর জেনারেল মাজেদুল হক। ঢাকায় আসার আগের দিনও পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করেছেন। ঢাকায় স্ক্রিনিং বোর্ড তাকে বাদ দেয়। কিন্তু তদবিরে সফল হয়ে সেনাবাহিনীর চাকরি ফিরে পান। পরে জিয়া-খালেদার মন্ত্রী হন। এই দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় মোয়াজ্জেম আহমদ চৌধুরী, সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় কৃষক লীগ নেতা রহমত আলী এমপি সাক্ষাৎ করেন। তিনি মোশতাকের ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ কর্মসূচির কর্ণধার ছিলেন। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে মস্কোতে নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত শামসুল হক সাক্ষাৎ করেন।
২ আগস্ট শনিবার সকাল পৌনে ১০টায় উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ইয়াং ফপ দেখা করেন। সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কফিলুদ্দিন মাহমুদ, সন্ধ্যা ৬টায় সাবেক এমসিএ মোশাররফ হোসেন চৌধুরী এবং সোয়া ৬টায় সিলেটের মোস্তফা শহীদ এমপি সাক্ষাৎ করেন।
১ আগস্ট শুক্রবার দুপুর ১টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী এবং দুপুর দেড়টায় পাহাড়ি নেতা মংপ্রু সাইন সাক্ষাৎ করেন।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের এই সরকারি কর্মসূচির বাইরেও অনেক অনির্ধারিত কর্মসূচি থাকত। নির্ধারিত তালিকার বাইরেও অনেক সাক্ষাৎপ্রার্থী আসত। সাধারণত তিনি কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না। বাসায়ও দর্শনার্থীর ভিড় থেকেই যেত এবং এটা ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরার পর হতেই।
বঙ্গবন্ধুর দৈনন্দিন কর্মসূচির যে বিবরণী পাওয়া যায়, তাতে একাধারে বাংলা, খ্রিস্টীয় ও আরবি সন তারিখ মাসের উল্লেখ থাকত। সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময়ও।
১ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি সাক্ষাৎ করেছেন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী, যিনি মোশতাকের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ও দায়িত্ব পালন করেন। আর এই মন্ত্রীর অধীনে সশস্ত্র বাহিনীর বিপথগামী একাংশ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল। হত্যার ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটিত হলে অনেক ঘটনা, ব্যক্তিবিশেষের ভূমিকা সবই প্রকাশিত হতো। কিন্তু সে কাজটি আজও হয়নি। বর্তমান সরকার দেশ, জাতির স্বার্থে হত্যা-ষড়যন্ত্রের ইতিহাস প্রকাশ করতে পারে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*