বিভাগ: সংগঠন

ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে আমরা সক্ষম

PMউত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনকে সাধুবাদ জানালেও অতীতের মতো নির্বাচন বানচালের নামে অগ্নিসন্ত্রাসের চেষ্টা হলে তা মোকাবেলায় চরম ব্যবস্থা গ্রহণের কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
তিনি বলেন, এখানে খুনি, স্বাধীনতাবিরোধী, জঙ্গিবাদ, জাতির পিতার খুনি, ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলাকারী, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নরা মিলে ঐক্য করেছে। এখানে স্বার্থ ছাড়া তো রাজনীতি নেই। সবাই মিলে এক জায়গায় হয়েছে। এটাকে বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে দেখেন সেটাই বিষয়। তবে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী বাংলাদেশে অবশ্যই নির্বাচন হবে। নির্বাচন সঠিক সময় এবং সুষ্ঠু হবে। তবে নির্বাচন নিয়ে যে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবেলার ক্ষমতা সরকার ও আওয়ামী লীগের রয়েছে। খুনি, দুর্নীতিবাজ, মানি লন্ডারিংকারী, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, অগ্নিসন্ত্রাসীরা এক হয়েছে। এখানে রাজনীতি কোথায়? আমি তো রাজনীতিটা খুঁজে পাচ্ছি না। আমি দেখছি, কয়েকটা স্বার্থান্বেষী গ্রুপ এক হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টে এ গাছের ছাল ও গাছের বাকল যোগ দিয়েছে।
২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বানচালের নামে অগ্নিসন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াও, জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যার পুনর্বার চেষ্টা করা হলে তা কঠোর হস্তে দমনে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতক্ষণ বেঁচে আছি বাংলাদেশের মানুষকে আর আন্দোলনের নামে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার হতে দেব না। এ ধরনের ঘটনা যদি কেউ করার চেষ্টা করে তা মোকাবেলায় যা যা করার প্রয়োজন হবে তার সবই করা হবে। অতীতের মতো দেশের জনগণই যে কোনো ধরনের অগ্নিসন্ত্রাস, নাশকতাকারীদের ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করবে, রুখে দাঁড়াবে।
গত ২২ অক্টোবর বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এমন কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আগামী নির্বাচনের অঙ্গীকার কী? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। যেটা প্রমাণ করার দরকার ছিল যে আমরা উন্নয়ন করতে পারি, সেটা আমরা করেছি। আমরা দিনবদল করতে পেরেছি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশকে আমরা দেখতে চাই দারিদ্র্যমুক্ত। আমার লক্ষ্য, উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত থাকবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে দেশকে আমরা গড়ে তুলতে চাই। যেটুকু বাকি আছে আরেকবার ক্ষমতায় এলে সেটুকু আমরা করতে পারব এ বিশ্বাস আমার আছে। অন্তত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটুকু করতে পারব, এ বিশ্বাস আমার আছে।
সম্প্রতি সৌদি আরব সফরে অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। তবে প্রশ্নোত্তর পর্বে ঘুরেফিরে আগামী নির্বাচন, বিরোধী জোটের ঐক্য, নির্বাচনকালীন সরকারসহ রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের জবাব স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাস্যোজ্জ্বলভাবেই সব উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে দেশের জনগণ আগামী নির্বাচনেও তার ওপর আস্থা রাখবে বলেও দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পাশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচএম মাহমুদ আলী এমপি উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা, দলের কেন্দ্রীয় নেতা, এমপিসহ সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে প্রস্তুত সরকার ও আওয়ামী লীগ : নির্বাচনের প্রাক্কালে নানামুখী ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের চিরাচরিত বিষয়। আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কম হয়নি। কিন্তু সবকিছু মোকাবেলা করেই আমরা এগিয়ে যেতে পারছি। তার কারণ জনগণই আমাদের কাছে মূল শক্তি। জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস আমার আছে। তাই আমার বিশ্বাস, সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে আমরা সক্ষম হব। তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি নির্বাচন কমিশন। এখানে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাধীনভাবে। তবে নির্বাচন নিয়ে যারা সংশয় সৃষ্টি করতে চাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা যেন না থাকে। আর ধারাবাহিকতা না থাকলে তো কিছু লোকের সুবিধা হবে। তাই তারা নির্বাচন নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করতে চায়। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের যে প্রস্তুতি নিচ্ছে, যে সময় তারা নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণা দেবে, ঠিক সে-সময়েই নির্বাচন হবে। আমি বিশ্বাস করি নির্বাচন সঠিক সময় এবং সুষ্ঠু হবে। তবে অতীতের মতো নির্বাচন বানচালের কেউ চেষ্টা করলে তা মোকাবেলায় সরকার ও আওয়ামী লীগ প্রস্তুত রয়েছে। কেউ ফের অগ্নিসন্ত্রাস, পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার চেষ্টা করলে দেশের জনগণ আবারও তাদের রুখে দেবে। দেশের জনগণকে আমি আহ্বান জানাব, এসব ষড়যন্ত্রকারীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ান।
স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার অধিকার সকলের : জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের বিষয়ে অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এক হয়েছে। রাজনীতিতে সকলেরই স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার অধিকার আছে। এটাকে আমরা স্বাগত জানাই। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আছে, কথা বলারও স্বাধীনতা আছে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আছে। দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এক হয়েছে, সেটাকে আমরা স্বাগত জানাই। তারা (জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা) সেখানে যুক্ত হয়েছেন, তারা কেমন? দেশের মেয়েদের প্রতি কেমন মনোভাব সেটাও সবাই দেখেছেন। এখানে স্বাধীনতাবিরোধী, খুনি, সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, এতিমের টাকা আত্মসাৎ করে কারাদ-িত, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলাকারী, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের লালন-পালন ও পুরস্কৃতকারীরা এক হয়েছেন। ড. কামাল হোসেনরা তাদের সঙ্গে ঐক্য করেছেন। অনেকেই (জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের) আওয়ামী লীগে ছিলেন, এখন আওয়ামী লীগ থেকে চলে গিয়ে জোট করেছে আওয়ামী লীগেরই বিরুদ্ধে। এখন তো ইমার্জেন্সি নেই, মার্শাল ল’ নেই। গণতান্ত্রিক ধারায় তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। রাজনীতিকে সকলেরই স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারা ঐক্য করেছে তা খেয়াল রাখতে হবে। দেখতে হবে কার কী অঙ্গভঙ্গি, কার কী বাচনভঙ্গিÑ সেটাও দেখতে হবে। এদের একজন মেয়েদের প্রতি কী ধরনের কটূক্তি করেছে সেটাও দেখেছেন। ঐক্যফ্রন্টে এ গাছের ছাল, ও গাছের বাকল যোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগ এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে না। বরং ভালোই হয়েছে সব ধরনের লোক মিলেই একটা জোট হয়েছে। বাংলাদেশ মানুষ এটাকে কীভাবে দেখছে সেটাই দেখার বিষয়। তারা রাজনৈতিকভাবে জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারলে করুন। এখানে অসুবিধার তো কিছু নেই।
ঐক্যফ্রন্টের মোট দাবি কত দফায় দাঁড়ায় দেখি : ঐক্যফ্রন্টের সাত-দফা দাবি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমে তারা পাঁচ-দফা দাবি দিল। পরে আবার হলো সাত-দফা। আগামী নির্বাচনের আগে তাদের দাবি মোট কত দফায় দাঁড়ায় তা আগে দেখি। আর সরকারের সঙ্গে সংলাপের জন্য আমরা কোনো চিঠি পাইনি। ড. কামাল হোসেনের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ড. কামাল হোসেন কার সঙ্গে ঐক্য করেছেন? দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের দ-প্রাপ্ত আসামি, একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও মানিলন্ডারিং মামলার দ-িত আসামি যে দলটির নেতৃত্ব দেয় (বিএনপি), সেই দলের নেতৃত্ব মেনে তিনি ঐক্য করেছেন। যিনি ওয়ান ইলেভেনের সময় খালেদা জিয়ার নামে এতিমের টাকা আত্মসাতের মামলা দিয়েছিলেন, তিনিও (ব্যারিস্টার মইনুল) এই ঐক্যে রয়েছে। ড. কামাল হোসেন যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার-আলবদর-আলশামস, যারা (বিএনপি-জামাত) পুড়িয়ে পুড়িয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করেছে, তাদের সঙ্গে এক হয়েছেন। খুনি, দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী, জঙ্গিগোষ্ঠীদের সঙ্গে তিনি ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। এখানে রাজনীতি কোথায়? এখানে তো রাজনীতি নেই, এটা স্বার্থান্বেষীদের নিয়ে এই ঐক্য। তিনি আরও বলেন, ড. কামাল হোসেন যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন, সেই কামাল হোসেনই ’৭২-এর সংবিধান নিয়ে আপত্তি আছে বলে জানিয়েছেন। ড. কামাল হোসেন নিজেকে সংবিধানের প্রণেতা বলেন। তাকে জিজ্ঞেস করেন তো, ’৭২-এর সংবিধান নিয়ে তিনি আপত্তি করেন কি না? তিনি বলেন, মানুষ আমাকে চাইলে ভোট দেবে, না চাইলে দেবে না। আমরা যেটুকু করার ছিল করেছি। দেশের উন্নয়ন করতে চেয়েছিলাম তা করেছি। তবে দেশের জনগণের প্রতি আমার আস্থা-বিশ্বাস রয়েছে। আমার শক্তিও দেশের জনগণ।
মইনুল ইংরেজি খাবার খেতে শিখলেও ব্যবহার শেখেনি : জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের একজন নারী সাংবাদিক সম্পর্কে শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্যের বিষয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মইনুল হোসেন যুক্তরাজ্যে বার-এট-ল পড়তে গিয়ে ইংরেজদের খাবার খাওয়া শিখলেও ইংরেজদের ভদ্রতা ও ভাষা শিখতে পারেন নি। সেই আমলে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়া কম কথা না। কিন্তু তিনি গিয়ে শিখলেন ইংরেজদের খাবার খাওয়ার কায়দা। ইংরেজ খাবার ছাড়া তিনি খেতে পারতেন না। তার অবস্থাটা কাকের ময়ূরপুচ্ছ পরে ময়ূর হওয়ার মতো। তিনি ইংরেজ খাওয়াটা শিখলেন; কিন্তু তাদের ভদ্রতাটা শিখেন নি, কথা বলা শিখেন নি। এটাই হলো বাস্তবতা, এই হলো সেই লোক।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের অতীত ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে সরকারপ্রধান বলেন, একজন নারী সাংবাদিককে তিনি যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন তা অত্যন্ত জঘন্য, বাজে। তার বাচনিক ভঙ্গি, অ্যাটিচিউড সবই খারাপ। তার কাছে মানুষ কী আশা করবে? ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তো তিনি পাকিস্তানের দালালি করেছেন। ইত্তেফাকের সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল রাজাকাররা। এর জন্যও তিনি কম দায়ী নন।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর খুনি মোশতাক যে দল করেছিল, সেই দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ব্যারিস্টার মইনুলের। উনি কিন্তু পরে একটা দলও করেছিলেন। জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনি যারা, তাদের নিয়ে তিনি দল করেছিলেন। ইত্তেফাকেও তো মার্ডার করে ভাইকে (বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু) ফাঁসানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের যে জমি, সেটা নিয়েও ঝামেলা রয়েছে। তাদের জমি নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সঙ্গে মামলা আছে। আপনারা সাংবাদিকরা খুঁজে বের করে দেখেন। তার (ব্যারিস্টার মইনুল) আসলে গুণের শেষ নেই।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বাবা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সুসম্পর্কের সুবাদে মইনুল হোসেনের জীবনের অনেক তথ্যই জানেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উনি সেই আমলে ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন ব্যারিস্টারি পড়তে। এইটা তো কম কথা না। তিনি ব্যারিস্টারি পাস করে সাহেব হয়ে ফিরলেন। তিনি আর বাংলাদেশি খাবার খেতে পারেন না, তার সাহেবি খাবার দরকার। মানিক কাকা (তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া) আমার মায়ের কাছে এসে আফসোস করে বলেন, ছেলে তো ইংরেজ খাবার ছাড়া কিছু খায় না। সেই যুগে মানিক কাকা ছেলের জন্য ১০০ টাকা দিয়ে বাবুর্চি রাখলেন। ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে মইনুল হোসেন ইংরেজ খাওয়াটা শিখলেন; কিন্তু তাদের ভদ্রতাটা শিখেন নি, অ্যাটিকেট শিখেন নি, কথা বলা শিখেন নি। এসব কথা সবার জানার কথা না। আরও জানি, এখন বলব না, পরে বলব।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্বেগের কারণ নেই
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচন নিয়ে বিশ্বনেতাদের কোনো পরামর্শ বা আন্তর্জাতিক চাপ নেই উল্লেখ করে বলেছেন, কে সমর্থন করল কী করল না কিংবা বাইরের দিকে মুখাপেক্ষী হয়ে আমি রাজনীতি করি না। আমার রাজনীতি দেশের জন্য, জনগণের জন্য। দেশের জনগণের ভোটের শক্তির ওপর আমার বিশ্বাস আছে। আমার জোর হচ্ছে, আমার দেশের জনগণ। আর সঠিক সময়েই আগামী নির্বাচন হবে। আমার প্রত্যাশা সব দলই নির্বাচনে আসবে। তবে অসংখ্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো দল যদি নির্বাচনে না আসে, সেটি তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এক্ষেত্রে আমাদের কিছু করণীয় নেই।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আইন নিয়ে ভয় তাদেরই আছে যাদের অপরাধী মন। কারও যদি অপরাধী মন না থাকে বা ভবিষ্যতে কিছু অপরাধ করবে এ-রকম পরিকল্পনা না থাকে; তার উদ্বেগ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান সরকার এবং দলের নেতা-মন্ত্রীদের নামে মিথ্যা সংবাদের ফাইল প্রস্তুত করে রেখেছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করবেনÑ তারাই এই আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন। যারা ন্যায় ও সত্যের পথে রয়েছেন তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। ভবিষ্যতে অপরাধ করার মানসিকতাও যাদের নেই তাদেরও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অন্তত আমি যতদিন ক্ষমতায় আছি সাংবাদিকদের কোনো ভয় বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আর শয়তানের সঙ্গেও যারা (বিএনপি) জোট করতে চায়, তারা নিজেরা কি তা সবাই জানে। এদেশের মানুষ শয়তানদের কখনও ভোট দেবে না, ক্ষমতায় দেখতে চায় না। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় আগামী নির্বাচনেও দেশের জনগণ নৌকা মার্কাকে বিজয়ী করবে বলেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গত ৩ অক্টোবর বিকেলে গণভবনে জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ৭৩তম অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফিরে এই সম্মেলনের বিভিন্ন দিক ও সাফল্যগুলো তুলতে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচএম মাহমুদ আলী এমপি উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী প্রায় সোয়া ঘণ্টাব্যাপী দেশের সর্বশেষ রাজনীতি, আগামী নির্বাচন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, দেশকে নিয়ে নানা মহলের ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিক নানামুখী তৎপরতা এবং দেশকে নিয়ে তার আগামী দিনের পরিকল্পনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে সাংবাদিকদের অসংখ্য প্রশ্নের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসিমুখে সবগুলোর বিস্তারিত উত্তর দেন।
আবার যেন ক্ষমতায় আসি বিশ্বনেতাদের প্রত্যাশা : জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের পর আগামী নির্বাচন নিয়ে বিশ্ব নেতাদের কোনো পরামর্শ কিংবা আন্তর্জাতিক চাপ আছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের রাজনীতি কিংবা নির্বাচন নিয়ে বিশ্বনেতারা তাকে কোনো পরামর্শ দেননি। তবে বিশ্বের বড় বড় দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধান যার সঙ্গেই কথা বলেছি, তারা বলেছেন, তারা চান আগামীতেও যেন আমাদের সঙ্গে দেখা হয়। যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, আমি যেন পুনরায় ক্ষমতায় আসি। তখন আমি তাদের বলে আসিনি, আপনারা একটু আসেন আমাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে যান। আমি তাদের জবাব একটাই দিয়েছি, দেশের মানুষ যদি ভোট দেয় তবে আছি, না দিলে নাই। ক্ষমতা থাকলে লক্ষ্মী, যায় বালাই। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনাকালে আমাদের দেশের নির্বাচন নিয়ে কী হবে না হবে, তা নিয়েও কোনো কথা হয়নি। বরং আমিই তাদের বলেছি যে, আমাদের দেশে আগে নির্বাচন নিয়ে কী হতো, মিলিটারি ডিক্টেটর থাকতে নির্বাচন বলতে কী হতো। তিনি বলেন, বিশ্বনেতাদের জানিয়েছি আমাদের দেশে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ছবিসহ ভোটার তালিকা, নির্বাচনী পরিবেশের যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, সেটা আমরাই করেছি। আমাদের সরকারের আমলে ৬ হাজারের ওপরে নির্বাচন হয়েছে, কয়টা নির্বাচনে আমরা হস্তক্ষেপ করেছি? বরিশাল সিটি নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন তদন্ত শুরু করেছে। তারা তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছে। আমরা তো সেখানে হস্তক্ষেপ করিনি। তিনি বলেন, সিলেটে আমরা হেরে গেছি সামান্য ভোটে। বিএনপি থাকলে তো সিল মেরেই নিয়ে নিত। আমরা তো সে পথে যাইনি। কাজেই, আমাদের ওপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দেশের উন্নয়ন করি মনের টানে, নিজেদের স্বার্থে রাজনীতি করি না। জনগণের স্বার্থে, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য আমরা রাজনীতি করি। তিনি বলেন, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে মানুষ নৌকায় ভোট দেবে। কারণ একমাত্র নৌকা ক্ষমতায় থাকলেই দেশের উন্নয়ন হয়, দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যায়। পুড়িয়ে মানুষ হত্যাকারীদের নিয়ে এত মায়াকান্না কেন? আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে এবং দেশের মানুষও ভোট দেবে। দেশে অনেক রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে কোন দল আসবে, আর কোন দল আসবে না। নির্বাচনে আসা বা না আসা সেই দলটির সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সেই সিদ্ধান্ত তো আমরা নিতে পারি না। তবে আমাদের আশা, সব দলই নির্বাচনে আসবে।
এ সময় বিএনপিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে আমার চেষ্টা ছিল, সবাই অংশ নিক। কিন্তু সেই নির্বাচন ঠেকানোর নামে পুড়িয়ে মানুষ মারা হলো। আপনারা যাদের নির্বাচনে চাইছেন, তারা শত শত মানুষকে নিষ্ঠুর কায়দায় পুড়িয়ে মেরেছে। আর যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, এতিমের টাকা পর্যন্ত মেরে খায়, তাদের জন্য এত কান্নাকাটি কেন? তিনি বলেন, নির্বাচন ঠেকানোর নামে যাদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তাদের পরিবার কেমন আছে, আহত দগ্ধ মানুষগুলো কেমন আছে কেউ কি খোঁজ নিয়েছেন?
এ সময় সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ওই সময় যাদের পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, তাদের পরিবার কেমন আছে একটু খোঁজ নিন। অনেক মানুষ কর্মক্ষমতা হারিয়ে পঙ্গুত্ব নিয়ে জীবনযাপন করছেন। যাদের কারণে মানুষের এই অবস্থা, তাদের জন্য মায়াকান্নার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আরও নানা অভিযোগ আছে, মামলা আছে। ওই সব অভিযোগ-মামলার সাক্ষী দিতে এফবিআই পর্যন্ত প্রস্তুত রয়েছে। খালেদা জিয়া, তার ছেলে, তার দলের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। সাংবাদিকরা উদ্বিগ্ন, আমাদের উদ্বেগ দেখবে কে? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে দুজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, সাংবাদিকরা খুব উদ্বিগ্ন, আমি বুঝলাম। কিন্তু আমাদের উদ্বেগটা দেখবে কে বা যারা ভিকটিমাইজ হচ্ছে, তাদের উদ্বেগটা কে দেখবে? আর তাদের কীভাবে কম্পোনসেট করবেন। ওই জায়গায় একটু কমতি আছে। যেটা ইংল্যান্ডের আইনে আছে। তিনি বলেন, আমরা এটা করার আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনগুলো দেখেছি। আইনগুলো দেখা হয়নি, তা নয়। তারপর এটা অনলাইনে ছিল। এটা সকলের সঙ্গে আলোচনাও হয়ে গেছে। এরপর এসে হঠাৎ এত উদ্বিগ্ন হয়ে গেলেন কিসের জন্য? আমার সেটাই প্রশ্ন?
তিনি বলেন, কারও যদি অপরাধী মন না থাকে বা ভবিষ্যতে কিছু অপরাধ করবে এ-রকম পরিকল্পনা না থাকে; তার উদ্বেগ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আগে তো সমন জারি করা হতো, সরাসরি গ্রেফতার করা হতো। আমি সেটা পরিবর্তন করে দিয়েছি। আপনারা সাংবাদিকরা যাদের কাছে নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের জন্য কি করতে পেরেছেন? আর আপনারা এখন উদ্বিগ্ন। এটা নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠককে আমি এমন এমন মানুষ দেখেছি, তারা লেখা তৈরি করে বসে আছে। একটার পর একটা লেখা আমার বিরুদ্ধে চালাবে। উদ্বিগ্ন হবে তারা। আপনাদের তো উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অন্তত আমি যত দিন আছি। আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এখানে স্পষ্ট বলব, যে সাংবাদিকরা মনে করে তারা কোনো অন্যায় কাজ করে না, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ বা মিথ্যা তথ্য দেবে না বা বিভ্রান্ত করবে না; তাদের উদ্বেগ হওয়ার তো কিছু নাই। সেখানে আইনের যেটা দেয়া আছে, সিআরপিসিতে যা আছেÑ তাই দেয়া আছে। সেখানে ডিজিটাল ডিভাইসগুলো ব্যবহার সম্পর্কে উল্লেখ করা আছে। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে আমাদের কিছু কিছু ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের ট্র্যাক করার জন্য। এখন ট্র্যাক করার পর তো বসে থাকা যাবে না। তাকে তো ধরতে হবে। কারণ সে তো আমাদের জন্য বসে থাকবে না। সারাবিশ্ব এটাই করে। তাই উদ্বিগ্ন তারা বেশি হবে, যারা এতদিন ধরে খুব তৈরি-টৈরি হয়ে আছে। নির্বাচনের সিডিউল এলে যারা আমাদের ভালো করে ঘায়েল করার জন্য মিথ্যা ডকুমেন্ট তৈরি করে বসে আছে তারা উদ্বিগ্ন হতে পারে। তারা ভাবছে যে এ-রকম একটা মিথ্যা নিউজ করব, এই আইন থাকলে তো তা মাঠে মারা যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওখানে (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) একটা জিনিসের ল্যাপস (ঘাটতি) আছে। একটা জিনিস ওখানে ঢোকানো উচিত বলে আমি মনে করি। সেটা হলোÑ যদি কেউ কারও বিরুদ্ধে কোনো মিথ্যা তথ্য দেয়, তাহলে সেই মিথ্যা তথ্যটা তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, এটা সত্য। যদি সে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, যে সাংবাদিক লিখবে বা যে পত্রিকা বা মিডিয়ায় তা প্রকাশ করবে তাদের সবাইকে শাস্তি পেতে হবে। যার বিরুদ্ধে লিখবে, তার যে ক্ষতিপূরণ হবে সেটার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এটা ইংল্যান্ডে আছে।
সম্প্রতি বিবিসিতে ঘটে যাওয়া ঘটনারও উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনারা স্মরণ করে দেখুন, বিবিসি একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নিউজ করেছিল। পরে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল। আর বিবিসির টপ টু বটম সবাইকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। ২০০৭ সালে আমি যখন বন্দী। আমার বিরুদ্ধে যত নিউজ করা হলো, পরে সেটা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হলো। ওই পত্রিকার কোনো সাজা হলো না। কিন্তু তার সম্মান তো নষ্ট হলো। তাদের তো এই লজ্জা হয় না যে একটা মিথ্যা তথ্য দিল, তাতে সমাজে তার সম্মান নষ্ট হলো। যার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা লেখা হলো তার তো সব গেল। পদ্মাসেতু নিয়ে যারা বড় বড় হেডলাইন লিখেছে, তারা তো এখনও সমাজে বুক উঁচু করে চলছে। কিন্তু পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে যে হেয়প্রতিপন্ন হলো; অসম্মান হলো তাদের কে দেখবে?

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*