বিভাগ: প্রবন্ধ

সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মহিমায় চিরউজ্জ্বল

PMশেখর দত্ত: আজও মনে পড়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মে দিবস পালনের কথা। মুক্ত দেশে উৎসব-শপথের ভেতর দিয়ে মুক্তভাবে পালিত হলো মে দিবস। পাকিস্তানি আমলে দমনপীড়ন ও বিধিনিষেধের কারণে মাঝে মাঝেই প্রকাশ্যে মে দিবস পালন করা যেত না। যেমন ১৯৬৬ সালে ৬-দফা আন্দোলন চলমান থাকায় আইয়ুব-মোনায়েম স্বৈরসরকার পল্টনে মে দিবসের অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেয়নি। ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন জারি হলে রাজনীতি, সমাবেশ, মিছিল বন্ধ থাকায় মে দিবস পালন করা সম্ভব হয় না। তাই নবোজাত বাংলাদেশে মে দিবস পালনের দিনগুলোতে মনে হতে থাকে পাকিস্তানি আমল সুদূর অতীতের বিষয়, যা আর কোনো দিনই শহিদের রক্তে রঞ্জিত বাংলার মাটিতে ফিরে আসবে না। সরকারি ছুটির দিন হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে দিনটি পালিত হলো। জাতির উদ্দেশ্যে জাতির পিতা ভাষণ দান করলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তিনি শ্রমিকদের দুর্দশার কথা চিন্তা করে ওইদিন এডহক সাহায্য প্রদানের ঘোষণা দিলেন।
কতই আনন্দ-উচ্ছ্বাস, প্রতীজ্ঞা-শপথ, আশা-স্বপ্ন! কেবল ছুটির দিনে কিছু প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে মুক্তভাবে দিবসটি পালনের জন্যই ওই অবেগ-অনুভূতির সৃষ্টি হয়নি। ১৬ ডিসেম্বর ’৭১ থেকে ৩০ এপ্রিল ’৭২, সাড়ে চার মাসে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী সরকার যেসব নীতি-পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, তা ছিল দেশের গ্রাম ও শহরের মেহনতি জনগণ তথা মে দিবসের মর্মবাণীর পক্ষে। পাকিস্তানি কারাগার থেকে ফিরেই প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে জাতির পিতা ‘গণতান্ত্রিক পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের লক্ষ্য’ ঘোষণা করেন। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ১৪ এপ্রিল ’৭২ পর্যন্ত বকেয়া ও সুদসমেত কৃষি জমির ওপর সবরকম খাজনা মওকুফ করা হয়। স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ ’৭২ বৃহৎ শিল্প ব্যাংক বীমা জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। এসব নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ সবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগে পরে জনগণের দাবি-দাওয়া ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। এতে পরাজিত দেশি-বিদেশি শত্রুরা প্রমাদ গুনলো। শুরু হলো কল-কারখানা শ্রমিক এলাকায় আকস্মিক ধর্মঘট ঘেরাও প্রভৃতি গণবিরোধী কার্যক্রম। তাই মে দিবস পালনের আগে আগে বিনা নোটিসে ঘেরাও ও ধর্মঘট বে-আইনি করা হয়।
তাই বলা যায়, স্বাধীনতার পর প্রথম মে দিবস পালনের দিনগুলোতে আনন্দ-উচ্ছ্বাস, প্রতীজ্ঞা-শপথ, আশা-স্বপ্নের মধ্যেও বিপদ ও শঙ্কা বিরাজমান ছিল। এই শঙ্কাই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এসে কালরাতে কলঙ্কিত রূপ নিয়েছিল। ওইদিন সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার ভেতর দিয়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়। যার প্রত্যক্ষ ফল ছিল ১ মে ’৭৬ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনগণের মতামতকে তোয়াক্কা না করে সামরিক উর্দ্দি পরে অস্ত্রের জোরে ক্ষমতাদখলকারী মেজর জেনারেল জিয়ার ভাষণ। মুখে সেখানে মধুর কথা যা-ই বলা হোক না কেন, বাস্তবে তা ছিল ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ তথা লুটপাটের অর্থনীতি আমদানি করারই নামান্তর। যা ছিল রাজনীতিকে রাজনীতিকদের জন্য ‘ডিফিক্যাল্ট’ করার সাথে সংগতিপূর্ণ। বাস্তবে মে দিবস পালনের ভেতর দিয়ে মে দিবসের মর্মবাণীকে পদদলিত কিংবা কলঙ্কিত করার রাজনীতি সেই থেকে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশে।
কিন্তু পরাজিত শত্রুরা ওই কলঙ্কিত ধারায় দেশকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। পরাজিত ও বিধ্বস্ত হয়ে আজ তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিপতিত হচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হয়, ইতোমধ্যে বিশ^ ও জাতীয় পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। সমাজতন্ত্র-ধনতন্ত্র ঠা-া যুদ্ধযুগের অবসান হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিপ্লব হচ্ছে এই পরিবর্তনের নায়ক। ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বেকারত্ব-শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজ গড়ার সে স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা সোভিয়েতমুখী ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দের মধ্য দিয়ে সেই যুগে অভিব্যক্ত হতো, তারও পরিবর্তন হয়েছে। তবে সামাজিক ন্যায়বিচার, সকল মানুষের মৌলিক সব অধিকার পূরণ, অধিকার ও সুযোগের সমতা, বৈষম্য দূরীকরণ, মানবাধিকার প্রভৃতি নিশ্চিত করে উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য এখনও বহাল রয়েছে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগ সরকার সে-লক্ষ্যেই দেশকে অগ্রসর করে নিচ্ছেন। এই প্রেক্ষপটে মে দিবস পালন নতুন তাৎপর্য নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয়েছে।
সার্বিক বিচারে মে দিবসÑ ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ আমাদের জাতীয় আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে, মুক্তিযুদ্ধের সাথে, অগণিত শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণের নিজস্ব দাবিতে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছে। দিনটি আমাদের জাতির লড়াই-সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের অংশ এবং অশেষ প্রেরণার উৎস। জনগণ বিশেষত শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণের গভীর ও বিস্তৃত আবেগ-অনুভূতির সাথে যুক্ত। আমাদের দেশসহ বিশে^র দেশে দেশে সংগ্রামী জনগণের সাথে সৌহার্দ্য একাত্মতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ চিরজাগরূক রাখা এবং সর্বমানবের মিলনের চেতনায় এই দিনটি অনন্য। এত সুদীর্ঘ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কোনো দিবস পালনের ঘটনা আমাদের ইতিহাসে নেই।
বিশে^ পুঁজিবাদের উত্থান তথা শ্রমিক আন্দোলন ও সংগঠন বিশ^ব্যাপী বিকশিত হয়ে ওঠার প্রাথমিক পর্যায়ে আমেরিকার সংগ্রামী শ্রমিকদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়ে বিশ^ ইতিহাসে দিনটি আবির্ভূত হয়। প্রসঙ্গত এটাই ইতিহাসের নির্মম সত্য যে, প্রথম দিকে পুঁজিপতিদের শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়ন কীভাবে প্রতিরোধ করতে হবে, তা শ্রমিকরা জানতো না। কাজের সময়ের কোনো বালাই ছিল না। মেশিনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হতো বলে দম নেওয়ার সময়টুকু মিলতো না। প্রাপ্ত মজুরি দিয়ে দিনের খাবার জুটত না। এই অমানবিক পশুসুলভ অবস্থা থেকে শ্রমিকরা মুক্তি পেতে চাইত। পুঁজিবাদের জন্মভূমি ইউরোপে শ্রমিকদের এই সংগ্রাম ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠন বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে কখনও মেশিন ভাঙা বা কারখানা আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া, কখনও অভ্যুত্থান কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের (প্যারি কমিউন) মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। এসব আন্দোলন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রথম ১৪ ঘণ্টা, পরে ১৮৪৭ সাল থেকে সাড়ে ১০ ঘণ্টা কর্মদিবসের আইন চালু হয়।
ইতোমধ্যে ‘নতুন দুনিয়া’ আমেরিকায় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অষ্টাদশ শতকের শেষ দিক থেকে শ্রমিকদের মধ্যে ধর্মঘট আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে ১৮৩৩ থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত মজুরি বৃদ্ধি ও ১০ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবিতে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। ১৮৪৭ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে ১০ ঘণ্টা শ্রম দিবস আমেরিকার সকল রাজ্যে আইনগত স্বীকৃতি পায়। প্রসঙ্গত আমেরিকার গৃহযুদ্ধে দাসপ্রথার পরাজয় সেখানে বিশেষত শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে মানবতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ইস্যুটি জোরালোভাবে সামনে আসে। এই প্রেক্ষাপটে ১৮৬৬ সালে এগিয়ে আসেন লোহা ঢালাই শ্রমিক নেতা উইলিয়ম এইচ. সিলভিস এবং তার সংগঠন ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন। এই সংগঠনই প্রথম ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবি উত্থাপন করে। দ্রুতই এই দাবি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সব মত-পথের শ্রমিকদের নিয়ে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও কারখানায় ‘৮ ঘণ্টা শ্রম সমিতি’ গঠিত হয় এবং আন্দোলন ব্যাপক ও তীব্র হয়ে ওঠে। আমেরিকার আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে ইউরোপে। সেখানেও ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে, দুই বছরের মধ্যেই আমেরিকার আইনসভা এই মর্মে একটি আইন পাস করে এবং কতক রাজ্যের সরকারি অফিসগুলোতে এই দাবি কার্যকর হয়। কিন্তু মাত্র ৪১ বছর বয়সে শ্রমিক নেতা সিলভিসের মৃত্যু হলে এই আন্দোলন অগ্রসর হতে পারে না এবং সংগঠনটিও লোপ পায়।
তবে শ্রমিকদের মনে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলেছিল তা নেভানো সম্ভব হয় না। ১৮৭০-এর দশকে শ্রমিক আন্দোলনে কতক বীরত্বপূর্ণ ও হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে। ১৮৭৪ সালে নিউইয়র্কের টমকিং স্কোয়ারে এক শ্রমিক জনসভায় গুলি হয়। ১৮৭৫ সালে পেনসিলভেনিয়া কয়লা শ্রমিকদের প্রতিরোধ আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠলে ১০ জন খনি শ্রমিককে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ১৮৭৭ সালে রেল ও ইস্পাত শ্রমিকদের আন্দোলন দমন করতে সেনাবাহিনী নামানো হয়। এসব আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের আন্দোলন নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়। এই সময় জন সুইটনের একটি সাপ্তাহিক ওই আন্দোলনকে জনপ্রিয় করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। শ্রমিকদের প্রচার ও আন্দোলন চলে সমান গতিতে। ইতোমধ্যে ১৮৮০ সাল থেকে আমেরিকায় শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাজারের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। কিন্তু অচিরেই অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়ে এবং অনেক কল-কারাখানায় লক আউট ঘোষণা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার ১৮৮৬ সালের ১ মে ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসসহ অন্যান্য দাবিতে ধর্মঘট আহ্বান করে।
শিকাগো শহরে ওইদিন শ্রমিক ধর্মঘট সার্বিকভাবে সফল হয়। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে উজ্জীবিত হয়ে ৩ মে আরও ব্যাপকভাবে শ্রমিকরা ধর্মঘটে শামিল হয়। ওইদিন ম্যাককর্মিক ফসল কাটার কারখানায় ধর্মঘটি শ্রমিকরা সভায় মিলিত হলে মালিকদের দালাল ও পুলিশের হামলায় ছয়জন শ্রমিক নিহত ও বেশ কিছু শ্রমিক আহত হয়। পরদিন এই পাশবিক হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে ৪ মে হে মার্কেটে প্রতিবাদ সভায় শ্রমিকরা সমবেত হয়। সেখানে চলে বোমা, হামলা লাঠি ও গুলি। এতে চারজন শ্রমিক ও আটজন পুলিশ নিহত ও বহু আহত হয়। হে মার্কেট চত্বর রক্তের বন্যায় ভেসে যায়। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘হে মার্কেটের ঘটনা’ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। পরে এই আন্দোলনের চার নেতা পার্সনস, স্পাইজ, ফিসার, এঞ্জেল-কে ফাঁসি দেওয়া হয়। লিঙ-কে জেলের সেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং ফিলডেন, স্কোয়াব ও অস্কার নিবে-কে দীর্ঘমেয়াদি কারাদ- প্রদান করা হয়। এই বর্বোরোচিত প্রহসনের বিচার ও হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইউরোপে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে এবং ইউরোপ ও আমেরিকার শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সংগ্রামী ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি চেতনা জাগ্রত করে।
এই অবস্থায় ইউরোপ ও আমেরিকার ২০টি দেশের কমিউনিস্ট শ্রমিক সংগঠনগুলো ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকী ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক’ প্রতিষ্ঠা করে এবং ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবি আদায়, শিকাগোর শহিদ ভাইদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি প্রকাশের জন্য পরের বছর ১ মে দিনটি সারাদুনিয়ায় ঐক্যবদ্ধভাবে পালনের জন্য আহ্বান জানায়। প্রসঙ্গত, আমেরিকায় যে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে সব দল-মত-পথ ও চিন্তা-চেতনার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। যেসব শ্রমিক নেতারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, তারা সকলেই ছিলেন এনার্কিস্ট বা নৈরাজ্যবাদী। এদিকে যারা দুনিয়াব্যাপী মে দিবস পালনের ঘোষণা দেন, তারা ছিলেন কমিউনিস্ট। তবে মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে শ্রমিক ও শ্রমজীবীদের ঐক্য ও সংগ্রামই দিবসটির মর্মবাণী। সার্বিক বিচারে তত্ত্ব ও মত-পথের ঊর্ধ্বে মে দিবস হচ্ছে দুনিয়াব্যাপী শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনতার একাত্মতা সৌহার্দ্য ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। সর্বমানবের মিলনের সংগ্রামী চেতনায় লালিত একটি অনন্য দিন। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ সেøাগানটি তাই মে দিবসের সেøাগান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
ওইদিন থেকে আজ পর্যন্ত তাই দিবসটি দুনিয়ার দেশে দেশে পালিত হচ্ছে। কিন্তু তখন পরাধীন ভারতে দিবসটি পালিত হওয়ার অবস্থা ছিল না। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে ভারতের মাদ্রাজে প্রথম মে দিবস পালিত হলেও পূর্ব বাংলায় মে দিবস পালিত হয় আরও অনেক বছর পরে। প্রসঙ্গত, ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ভারতে পুঁজিবাদী অর্থনীতি তথা শ্রমিক-শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ শুরু হয়। ১৮৫৭ সাল থেকে সিলেটে চা-বাগান প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। ১৮৬২ সালে কুষ্টিয়া-কলকাতা রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে রেল যোগাযোগ বাড়লে পাহাড়তলী ও সৈয়দপুরে রেলওয়ে ওয়ার্কশপ প্রতিষ্ঠা পায়। ইতোমধ্যে প্রধানত আখ শিল্পকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ায় রেনউইক অ্যান্ড কোম্পানি ও ষজ্ঞেশ^র ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে গড়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কুষ্টিয়ায় মোহিনী মিল এবং পরে ত্রিশ দশকে নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে কাপড়ের মিল ও উত্তরবঙ্গের কতক স্থানে চিনিকল প্রতিষ্ঠা পায়।
এভাবে পূর্ব বাংলায় শ্রমিক-শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ হতে থাকলেও সেই দিনগুলোতে মে দিবস পালিত হয়েছিল কি না তা জানা যায় না। খবরাখবর থেকে ধারণা করা যায়, ১৯৩৭ সালে কুষ্টিয়ায় ধর্মঘট পালনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা প্রথম মে দিবসটি পালন করে। বিধিনিষেধের ফলে দিবসটি নিয়ে কোনো সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে পারেনি। তবে প্রশাসন যে ওইদিন সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছিল, তা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তারপর থেকে আর কোনো বছরই মে দিবস পালন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছুটির দিন মে দিবসে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে দিবসটিকে জাতির জীবনে চিরঞ্জীব করে রেখে গেছেন। এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস পালিত হচ্ছে।
তবুও এটা তো নির্মম সত্য যে, পরিস্থিতির নানামুখী ইতিবাচক পরিবর্তন সত্ত্বেও বাংলাদেশে শহর ও গ্রামের শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ বিপুল সংখ্যাধিক্য হলেও তারা এখনও অব্যাহত শোষণ বঞ্চনা ও বিচারহীনতার শিকার। মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার থেকেও তারা অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে অধিকার সংবিধানে ও আইনকানুনে থাকলেও তা প্রয়োগে সমস্যা রয়েছে। ধনী-গরিব, গ্রাম-শহর, পুরুষ-মহিলা বৈষম্য পর্বত প্রমাণ। শিশুশ্রম চালু রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মে দিবস পালনের ভেতর দিয়ে শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে অগ্রসর করে নেওয়া আজ জাতীয় দেশপ্রেমিক কর্তব্য। এই কর্তব্য মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, শহিদের রক্ত ও জাতীয় চারনীতির ভেতর দিয়ে স্থিরীকৃত এবং সুস্পষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী।
ইতোমধ্যে প্রথম শিল্প বিপ্লব (শুরু আনুমানিক ১৭৬০) থেকে চলমান চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সময়কালের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশসহ বিশে^র দেশে দেশে যতদিন মানুষের ওপর মানুষের শোষণ-নির্যাতন অব্যাহত থাকবে, শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচার যতদিন উপেক্ষিত থাকবে, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বেকারি যতদিন থাকবে, রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য যতদিন থাকবে: ততদিনই মে দিবসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব থাকবে অমøান। বলাই বাহুল্য এই তাৎপর্য ও গুরুত্ব অমøান আছে বলেই বিদ্যমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় মালিক-শ্রমিক এবং শ্রম-মজুরির সম্পর্ক উন্নয়ন আজও জাতীয় জীবনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে বিরাজমান রয়েছে।
পঁচাত্তরের সেই কলঙ্কিত পটপরিবর্তনের পর নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বিগত ১০ বছরে ৪৩টির মধ্যে ৪০টি সেক্টরে শিল্প শ্রমিকদের বেতন শতভাগ এবং তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বেতন ২০১০ সালের ১ হাজার ৬৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। গ্রাম ও শহরের শ্রমিক ও শ্রমজীবী এবং অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নতি ঘটে চলেছে। ২০০৫-০৬ সালে দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪১.৫১ শতাংশ থেকে ২০১৭-১৮ সালে ২৫.১০ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৫.১০ থেকে ১১.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় ৪২৭ ডলার থেকে ১ হাজার ৭৫১ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নতির সাথে সাথে সামাজিক সূচকের উন্নতির ক্ষেত্রে দেশ আজ ‘বিশে^র বিস্ময়’, উন্নয়নের রোল মডেল। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০১৩, বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা-২০১৫, শিশুশ্রম নিরসন আইন-২০১০, গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি-২০১৫, পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি নীতিমালা-২০১২, কৃষি শ্রমিকদের শ্রম আইন-২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। সমস্যা যা আছে তা হচ্ছে প্রয়োগে। সর্বোপরি এসব আইন সম্পর্কে শ্রমিক ও শ্রমজীবীরা সব জানেই না এবং সচেতন নয়। প্রবাদ বলে, বাচ্চা না কাঁদলে মা-ও দুধ দেন না। তাই শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণকে সংগঠিত ও সচেতন করা আজ জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থেই একান্ত প্রয়োজন।
ইতোমধ্যে নতুন নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের তিন মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। নতুন সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, নির্বাচনী অঙ্গীকারে আওয়ামী লীগ ধনী-দরিদ্র ও শহর-গ্রামের আয় বৈষম্য হ্রাস করা; শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করা; শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকা; গার্মেন্ট শ্রমিকসহ সকল শ্রমিক হতদরিদ্র এবং গ্রামীণ ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের জন্য বিশেষ বিবেচনায় নানা পদক্ষেপসহ রেশনিং প্রথা চালু প্রভৃতি অঙ্গীকার করেছে। শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণ তথা জাতি যখন এবারে মে দিবস পালন করবে, তখন একদিকে নজর রাখবে যাতে সরকার ওই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে অবিচল থাকে আর অন্যদিকে সরকারকে সহযোগিতা করতে সংগ্রামের শপথ নেবে, যাতে এসব অঙ্গীকার আগামী দিনে বাস্তবায়িত করার পথ সুনিশ্চিত হতে পারে। বলাই বাহুল্য সোনার বাংলা গড়ে উঠতে পারে কেবল মে দিবসের মর্মবাণী সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, সুশাসন, পরমত সহিষ্ণুতা, বৈষম্য দূরীকরণ তথা সর্বমানবের সম্প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব ও একাত্মতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ভেতর দিয়েই। শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণকে মে দিবসের অভিনন্দন।
জয় হোক বাংলার মেহনতি মানুষের।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*