বিভাগ: সংস্কৃতি

সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতা

4-5-2018 7-25-46 PMইমদাদুল হক মিলন: আমার প্রথম লেখা ছাপা হয় ১৯৭৩ সালে। সেই সময়কার দৈনিক পত্রিকা ‘পূর্বদেশ’-এর ছোটদের পাতা চাঁদের হাটে। লেখা ডাকে পাঠিয়েছিলাম। পরের সপ্তাহেই ছাপা হয়েছিল। তখনও পর্যন্ত জানি না ‘চাঁদের হাট’ পাতা কে সম্পাদনা করেন, ওই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কে? এরপর থেকে যখন নিয়মিত লিখতে শুরু করলাম, ধীরে ধীরে যাতায়াত শুরু হলো বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের কাছে। সেই সময়ে কয়েকজন সাহিত্য সম্পাদক লেখক-কবিদের খুবই সমীহের জায়গায় অবস্থান করছিলেন। যেমনÑ আহসান হাবীব, আবুল হাসনাত বা মাহমুদ আল জামান। আহসান হাবীব দৈনিক বাংলা-য় সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন। আর হাসনাত ভাই করতেন দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য পাতা। দুজনই কবি। হাসনাত ভাই কবিতা লিখতেন মাহমুদ আল জামান নামে। এখনও এই নামেই লেখেন। দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই। তিনি বিখ্যাত ছড়াকার এবং শিশু-কিশোর সংগঠন ‘কচি ও কাঁচা’র প্রতিষ্ঠাতা। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যতটা না খ্যাতিমান তার চেয়ে অনেক বেশি নাম ছিল তার কচি ও কাঁচার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। ইত্তেফাকের ছোটদের পাতাটির নাম ‘কচি ও কাঁচা’। তিনি সেই পাতাটিও সম্পাদনা করতেন। ‘জনপদ’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা ছিল। এই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক এখলাস উদ্দিন আহমেদ। ওই পত্রিকায় ছোটদের পাতাটিও তিনি সম্পাদনা করতেন। পুরান ঢাকার বাংলাবাজার গার্লস হাই স্কুলে ঢোকার মুখে একটি পুরনো বাড়িতে ছিল অফিস। আমি তখন জগন্নাথ কলেজে পড়ি। আর দু-হাতে ছোটদের লেখা, বড়দের লেখাÑ যখন যা মনে আসছে লিখে যাচ্ছি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এখলাস ভাই আমার সেই সব কাঁচা লেখা অতি যতেœ সম্পাদনা করে ছাপতেন। ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় বা কচি ও কাঁচা পাতায় দাদা ভাইয়ের হাত দিয়ে আমার কোনো লেখা কখনোই ছাপা হয়নি। বোধহয় শেষ দিকে, আটাত্তর-ঊনআশি সালে কোনো বিশেষ সংখ্যায় দাদা ভাই আমার একটা-দুটো লেখা চেয়ে নিয়ে ছাপিয়েছিলেন। ততদিনে লেখক হিসেবে আমার পায়ের তলার মাটি একটু একটু শক্ত হচ্ছিল। বাংলা একাডেমির পাক্ষিক পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’ সম্পাদনা করতেন কবি রফিক আজাদ। আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবতজীবন’ ধারাবাহিকভাবে ছেপে তিনি আমাকে কথাসাহিত্যের জায়গায় অনেকটাই দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কারণে পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক এবং লেখক-কবিদের কাছে আমার কিছুটা কদর হয়েছে। বোধহয় সেই কারণেই দাদা ভাই আমার লেখা চেয়েছিলেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বেশ অনেকগুলো বছর বাংলাদেশে তরুণ-কবিদের সবচাইতে আগ্রহের জায়গা ছিল দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতা। কবি আহসান হাবীব সম্পাদনা করেন। নতুন লেখকদের লেখা অতি যতেœ সম্পাদনা করে ছাপতেন। একটু সম্ভাবনা আছেÑ এমন নবীন লেখককে গুরুত্ব দিতেন। আর তখন এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছিল, আহসান হাবীবের পাতায় লেখা ছাপা হওয়া মানে লেখক বা কবি হিসেবে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রতিষ্ঠিত লেখক-কবিরাও সমীহ করতেনÑ ও আচ্ছা, তোমার লেখা তাহলে হাবীব ভাই ছেপেছেন। খুব ভালো। এই তো লেখক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলে।
সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কবি আহসান হাবীবের ছিল এই মর্যাদা। আমার একটিমাত্র লেখা তিনি ছেপেছিলেন মনে আছে। সেই লেখা কোথায় হারিয়ে গেছে, লেখার নামও আজ আর মনে নেই। তবে তিনি আমার অনেক লেখা ছাপার অনুপযুক্ত বলে ফেরত দিয়েছেন। একসময় খুব অভিমান হলো। ঠিক আছে, আর লেখাই দেব না হাবীব ভাইয়ের পাতায়। তার কাছে আর যেতামও না। মৃত্যুর বছরখানেক আগে দৈনিক বাংলা ভবনে একদিন দেখা হয়েছিল। তিনি স্নিগ্ধ মুখে বললেন, ‘তুমি তো আর লেখা দাও না। তোমার অভিমানটা আমি টের পাই।’ মাথা নিচু করে বলেছিলাম, ‘লিখব হাবীব ভাই।’ কিন্তু লেখা হয়নি। তার মৃত্যুর পর বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলাম দৈনিক বাংলায় সাহিত্য পাতায়। ‘কোন কাননের ফুল’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলাম। তখন পাতার সম্পাদক সালেহ চৌধুরী অথবা নাসির আহমেদ।
দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের মধ্যে আমাকে সবচাইতে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন সংবাদের হাসনাত ভাই। এই পত্রিকায় সাহিত্য পাতাটিও তখন খুবই উঁচু স্তরের। অসামান্য সব লেখা ছাপা হতো। এই পাতাটির জন্য সাহিত্যপ্রেমীরা সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করত। পাতাটি বেরোত বৃহস্পতিবার। আমার শিল্পী বন্ধু কাজী হাসান হাবিব পাতা মেকআপ করতেন, গল্প-কবিতায় ইলাস্ট্রেশনস করতেন। এও ছিল আরেক বাড়তি আকর্ষণ আমাদের। হাবিবের লেটারিং ছিল অসাধারণ। ইলাস্ট্রেশনস করতেন চোখে লেগে থাকার মতো। মঙ্গলবার বিকেলে সাহিত্য পাতায় মেকআপ ইত্যাদির কাজ করতেন হাবিব। আর আমরা চার বন্ধু গিয়ে বসে থাকতাম হাবিবের টেবিলের পাশে। গল্পকার সিরাজুল ইসলাম, মুহম্মদ জুবায়ের, ফিরোজ সারোয়ার আর আমি। চা আর ডালপুরি খাওয়া চলছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক। হাবিব মাথা নিচু করে লেটারিং করছেন, ইলাস্ট্রেশনস করছেন। আমরা গল্পগুজব, হাসি-ঠাট্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এক-দুবার হাসনাত ভাই এসে উঁকি দিয়ে গেলেন। তিনি গম্ভীর মানুষ। সহজে হাসেন না, কথাও বলেন নিম্নস্বরে। হাসনাত ভাইকে আমরা যেমন ভালোবাসি, গাম্ভীর্যের কারণে ভয়ও পাই কিছুটা। নিয়মিতই তিনি আমাদের লেখা ছাপছেন। লেখার ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন। সংবাদের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ম্যাগাজিন সাইজের দুর্দান্ত একটি সংখ্যা প্রকাশ করলেন। একেবারেই তরুণ লেখকদের মধ্য থেকে আমার একটি গল্প ছাপলেন। গল্পের নাম ‘রাজা বদমাশ’। কত জ্বালা যে হাসনাত ভাইকে আমি জ্বালিয়েছি। লেখক হিসেবে আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, দুজন মানুষ ঠেলে ঠেলে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। একজন রফিক আজাদ, আরেকজন হাসনাত ভাই। এই দুজনের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা-পরিসীমা নেই।
স্বাধীনতার পর আমাদের সাহিত্যে শুরু হয়েছিল এক নতুন জোয়ার। একসঙ্গে অনেক তরুণ লিখতে শুরু করেছিলেন। লেখা প্রকাশের জায়গা ছিল কম। তিন-চারটি দৈনিক পত্রিকা, দু-একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, একটি-দুটি মাসিক পত্রিকা। কিন্তু প্রতিটি পত্রিকারই একটি মানের জায়গা ছিল। যারা সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তারা খুব মন দিয়ে নতুন লেখকদের লেখা পড়তেন। অতি যতেœ সম্পাদনা করতেন। অপছন্দের লেখা নির্দ্বিধায় ফেরত দিতেন। কারও মুখ চেয়ে লেখা ছাপাতেন না। অমুকের সঙ্গে আমার খাতির আছে বলে তার দুর্বল লেখাটি আমি ছেপে দেবÑ এই মনোভাব একজন সাহিত্য সম্পাদকেরও ছিল না। যে লেখক-কবির মধ্যে সম্ভাবনা দেখতেন তাদের ডাকতেন। লেখার ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলতেন। লেখার দুর্বলতা ধরিয়ে দিতেন। একজন কবির কিংবা কথাসাহিত্যিকের সাহিত্যের পড়াশোনার জায়গাটি নিয়ে কথা বলতেন। এক লেখাই হয়তো লেখককে দিয়ে দু-তিনবার লেখাতেন। এ অবস্থাটি নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পত্রিকার সংখ্যা বাড়তে লাগল। শ্রদ্ধেয় সাহিত্য সম্পাদকরা বিদায় নিতে লাগলেন। নতুন নতুন মানুষ সাহিত্য সম্পাদক হলেন। একদিকে পত্র-পত্রিকার সংখ্যা হলো অগণিত, অন্যদিকে লেখক তৈরি হওয়া কমতে লাগল। উচ্চমানের লেখা সব সময় কম লেখা হয়। কিন্তু শুদ্ধ সুন্দর পরিশীলিত ভাষায় চলনসই লেখার পরিমাণও বিস্ময়করভাবে কমে গেল। ফলে সাহিত্য পাতা ভরানো খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। এ অবস্থায় অনেক অলেখকেরও জায়গা হতে লাগল ভালো ভালো পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। আসলে, সাহিত্য সম্পাদকদেরও এ অবস্থায় কিছু করার নেই। সব দেখেশুনে রফিক আজাদ একবার বললেন, ‘এখন আর সাহিত্য সম্পাদক সেই অর্থে নেই। যারা পত্রিকার ওই পাতাটিতে কাজ করেন তারা অসহায়। তাদের বিশেষ কিছু করার নেই। তারা আসলে সম্পাদক না, তারা সংগ্রাহক। লেখা সংগ্রহ করে ছেপে যাচ্ছেন।’
এখনও আসলে এ অবস্থাই চলছে। ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকাটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের বাঁকবদল ঘটেছিল। আজকের বাংলাদেশে যে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় এই আঙ্গিক তৈরি করে দিয়েছে আজকের কাগজ। দৈনিক পত্রিকার ভেতরে সাপ্তাহিক কাগজের চরিত্র এবং বিষয়, পাক্ষিক এবং মাসিক কাগজের চরিত্র এবং বিষয় সন্নিবেশিত করে চলছে এখন দৈনিক পত্রিকাগুলো। ফলে সাপ্তাহিকের কদর বাংলাদেশে আর নেই, পাক্ষিক এবং মাসিকের কদরও নেই। দৈনিক পত্রিকা একাই ধারণ করে আছে বহু পত্রিকার চরিত্র। হয়তো এই অবস্থারও বদল ঘটবে। হয়তো সংবাদপত্র অচিরেই বাঁক নেবে নতুন আরেক দিকে। সংবাদ পরিবেশন ভঙ্গিমায়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সংস্কৃতিতে ও সাহিত্যের পাতাগুলো ঢুকে যাবে নতুন ভাবনাচিন্তার জগতে। একটি আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা টের পাওয়া যাচ্ছে। নতুন চিন্তা-চেতনার উন্মেষ টের পাওয়া যাচ্ছে।
আমি যেহেতু সাহিত্য এবং সংবাদপত্র দু-জায়গারই লোক, দু-জায়গা থেকেই নতুন সম্ভাবনার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। আমাদের সংবাদপত্র ধীরে ধীরে নতুন স্তরে উন্নীত হচ্ছে, তার সঙ্গে সাহিত্যও চলছে নতুন স্তরের দিকে। নতুন মেধাবী লেখক-কবিরা এসে নতুন আঙ্গিকের সাহিত্য উপহার দেবেন, আর নতুন সাহিত্য সম্পাদকরা সেই সম্ভাবনায় রাখবেন তাদের মূল্যবান হাতের পরশ। সব মিলিয়ে আমাদের সংবাদপত্র এবং সাহিত্য আরও অনেক বড় জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*