বিভাগ: শোক সংবাদ/স্মরণ, সংগঠন

সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে

03

জেলহত্যা দিবসে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা

নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সাথে আলোচনার সম্ভাবনা এবং তাদের সহায়ক সরকারের দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলেছেন, আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে হবে। কোনো সহায়ক সরকার হবে না, কোনো ভাবনার সরকার হবে না। এ নিয়ে বিএনপির সাথে কোনো আলোচনা করা হবে না, সমঝোতার প্রশ্নই ওঠে না। আর বিএনপিকে নির্বাচনে আনার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নয়। বিএনপি বুঝতে পেরেছে তাদের মিথ্যাচার, মানুষ হত্যা, লুটপাট, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির জন্য জনগণ আগামী নির্বাচনেও তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। তাই তারা নানা ষড়যন্ত্র করছে।
গত ৩ নভেম্বর বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্যে রাখতে গিয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আমরা চাই বিএনপি নির্বাচনে আসুক। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে ফের ষড়যন্ত্র করা হলে, আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে, সন্ত্রাসী কর্মকা-, জ্বালাও পোড়াও করলে কোনোরকম ছাড় দেওয়া হবে না। এসব যারা ফের করবে তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচার করা হবে।
স্মরণ সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্ব করার কথা থাকলেও অসুস্থতার জন্য তিনি অংশ নেননি। তার পরিবর্তে সভায় সভাপতিত্ব করেন দলটির উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি। আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সভাপতিম-লীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, ডা. দীপু মনি এমপি, জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সিমিন হোসেন রিমি এমপি, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমির হোসেন আমু এমপি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। অন্য কোনো পন্থায় নির্বাচন হবে না। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করেছিল, খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। এখন তিনি কোন মুখে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি করেন?
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপিও বিএনপির সহায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচন হবে। আগামী নির্বাচনে জনগণের রায় নিয়ে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। আদালতের মাধ্যমে হেনস্থা করা হচ্ছে খালেদা জিয়া ও বিএনপির এমন অভিযোগের জবাবে মতিয়া চৌধুরী বলেন, আপনি তো (খালেদা জিয়া) কোর্টকে হেনস্থা করছেন। ১৪৩ বার সময় নিয়েছেন। আপনার ভাষায় বলতে চাই, আপনিই আদালতকে হেনস্থা করছেন। আদালত আপনাকে হেনস্থা করছে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেন, সাংবাদিক ভাইদের বলছি লিখে রাখুন। আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হবে। ২০১৯ সালে বিজয়ের মাসে এই নির্বাচন হবে। বিএনপির আন্দোলনের হুমকির জবাবে তিনি বলেন, আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। আওয়ামী লীগ আন্দোলনে চ্যাম্পিয়ন। আমরা মার খেয়ে মাঠে থেকেছি। বিএনপির মতো আওয়ামী লীগ নয়। বিএনপিকে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, যদি সাহস থাকে আগামী নির্বাচনে আসেন। নির্বাচনের মাঠ থেকে পালাবেন না। দেখব জনগণ কাকে চায়। মিথ্যাচার, মানুষ হত্যা, লুটপাট, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির জন্য জনগণ বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করবে। খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতারা সিরিয়াল মিথ্যাবাদী হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাদের মিথ্যার জবাব আগামী নির্বাচনে বাংলার জনগণ দেবে।
বিএনপির সহায়ক সরকারের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি বলেন, কোনো সহায়ক সরকার হবে না, কোনো ভাবনার সরকার হবে না। আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হবে। আপনারা (বিএনপি) আসলে আসবেন, না আসলে রাস্তায় গিয়ে চিৎকার করুন। আপনাদের সাথে কোনো কথা হবে না। এরা একাত্তরের ও পঁচাত্তরের খুনি। খুনিদের সাথে কোনো আলোচনা হবে না। আর বিএনপিকে নির্বাচনে আনার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নয়। বিএনপির আন্দোলনের হুমকির জবাবে আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে, সন্ত্রাসী কর্মকা-, জ্বালাও পোড়াও করলে ছাড় দেওয়া হবে না। মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচার হবে। স্বাধীনতা বিরোধী, বিএনপিকে অপশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দলের নেতা-কর্মীদের সব অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকা-ের নেপথ্যে যারা জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। নইলে কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। অসুস্থতার কারণে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি জানিয়ে তিনি বলেন, ওনার (প্রধানমন্ত্রী) অস্ত্রোপচারের পর ওনার যতটুকু বিশ্রামে থাকার কথা ছিল উনি তা ছিলেন না। তিনি চাপ নিয়ে কাজ করেছেন। উনি এ রকম জাতীয় দিবসের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন নি এমনটা ঘটেনি। উনি অসুস্থতার কারণে আসতে পারেনি।

জেলহত্যা দিবস পালিত
গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে স্মরণ করল কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি। পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার আদর্শ বাস্তবায়ন করার প্রত্যয় এবং শহীদের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি, আলোচনা সভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গত ৩ নভেম্বর ঢাকাসহ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে শোকাবহ জেলহত্যা দিবস। দেশের ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত এই কালো অধ্যায়টিকে স্মরণ করে দেশবাসী। দিবসটির প্রতিটি অনুষ্ঠানেই একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসরদের আগামী নির্বাচনসহ সর্বক্ষেত্রে পরাজিত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্য-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসুস্থ থাকায় তার পক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় তিন নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন দলের সিনিয়র মন্ত্রী-নেতারা। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি এবং জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এম মনসুর আলীর পুত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তারা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
পরে দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। এ সময় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সকাল ৮টায় আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল বনানী কবরস্থানে জাতীয় তিন নেতা শহীদ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোমেন আমু এমপি, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপিসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বনানী কবরস্থানে পবিত্র ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় চার নেতার মধ্যে এএইচএম কামারুজ্জামানকে রাজশাহীর কাদিরগঞ্জে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে সেখানেও অনুরূপ কর্মসূচি পালিত হয়।
আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং শাখা কমিটিসমূহ এবং বিভিন্ন দল ও সংগঠন জাতীয় চার নেতাসহ ১৫ আগস্টের নিহত শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। দিবসটি পালন উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলীয় কার্যালয়সহ দেশের সর্বত্র সংগঠনের শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো পতাকা উত্তোলন এবং কালোব্যাজ ধারণ করা হয়।

কেন্দ্রীয় কারাগার স্মৃতি জাদুঘরে শ্রদ্ধাঞ্জলি
পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের স্মৃতি জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি। পরে কারা অধিদফতরের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আইজি প্রিজন ইকবাল হাসান পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি ও সাহারা খাতুন এমপি। পরে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং কারা কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*