বিভাগ: প্রতিবেদন

‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’

11উত্তরণ প্রতিবেদন: নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিন্দা ও দ্রুত সংকট সমাধানের আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংসদীয় সংস্থা কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্স সিপিসির ৬৩তম সম্মেলন। কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন সিপিএ ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ যৌথভাবে আয়োজিত ৬৩তম সম্মেলন গত ১ নভেম্বর ঢাকায় শুরু হয়ে ৭ নভেম্বর শেষ হয়। সম্মেলনে কমনওয়েলথভুক্ত ৫২টি দেশের প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। ৭ নভেম্বর সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে গৃহীত সর্বসম্মত এক যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিঃশর্তভাবে দ্রুত মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে সেখানে তাদের স্থায়ী নিরাপত্তাসহ পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রস্তাব করা হয়। বিবৃতিতে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এর আগে ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী ও সিপিএ ভাইস প্যাট্রন শেখ হাসিনা এই সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সম্মেলনের শেষ দিনে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে (বিআইসিসি) সিপিএ’র সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নতুন চেয়ারপারসন নির্বাচন ছাড়াও বিভিন্ন কমিটির প্রস্তাবগুলো গৃহীত হয়। সম্মেলনে সিপিএ নির্বাহী কমিটির নতুন চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন ক্যামেরুনের ডেপুটি স্পিকার এ্যামেলিয়া মোনজোয়া লিফানকা।
কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) ৬৩তম সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাইস প্যাট্রন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সিপিএ নির্বাহী কমিটির চেয়ারপারসন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

সিপিএ’র স্মল ব্রাঞ্চেস কনফারেন্স
সিপিএ’র সাধারণ অধিবেশন ৫ নভেম্বর শুরু হলেও ১ নভেম্বর হয় সিপিএ’র ৩৬তম স্মল ব্রাঞ্চেস কনফারেন্স। ঢাকার হোটেল রেডিসনে ২ থেকে ৪ নভেম্বর সিপিএ’র বিভিন্ন অঞ্চল, কমনওয়েলথ উইমেন পার্লামেন্টারিয়ান্স এবং নির্বাহী কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটির বৈঠক হয়। ৫ লাখের নিচে জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দেশগুলো নিয়ে কমনওয়েলথভুক্ত দেশসমূহ নিয়ে গঠিত হয় স্মল ব্রাঞ্চ। প্রথম পর্যায়ে স্মল ব্রাঞ্চেস থেকে দুর্নীতি দূর করা, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তির কাজে স্বচ্ছতা, নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করা, জলবায়ু দূষণরোধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়াসহ বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। যা এরপর ৫ নভেম্বর থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হওয়া দ্বিতীয় পর্বের সম্মেলনে প্রস্তাবগুলো এক্সিকিউটিভ কমিটিতে উত্থাপন করা হয়।
হোটেল রেডিশন ব্লুতে সিপিএ’র ৩৬তম স্মল ব্রাঞ্চেস কনফারেন্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সিপিএ নির্বাহী কমিটির চেয়ারপারসন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সোচ্চার হয়ে বিভিন্ন গ্লোবাল ফোরামে বিষয়টি উত্থাপনের আহ্বান জানান।
শিরীন শারমিন বলেন, এই কনফারেন্সের মাধ্যমে স্মল ব্রাঞ্চের দেশগুলোর একত্র হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্রাঞ্চের দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতা বিনিময় সম্ভব হবে, যা পরবর্তীতে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে পার্লামেন্টের ভূমিকা রয়েছে। জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করতে সিপিএ’র পার্লামেন্টসমূহ কাজ করছে।
সিপিএ স্মল ব্রাঞ্চ চেয়ারপারসন ও মাল্টা সংসদের স্পিকার এঞ্জেলো ফারুগিয়া (অহমবষড় ঋধৎৎঁমরধ) অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া সিপিএ সেক্রেটারি জেনারেল আকবর খান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের প্রথম পর্যায়ে ২ থেকে ৪ নভেম্বর সিপিএ’র বিভিন্ন অঞ্চল, কমনওয়েলথ উইমেন পার্লামেন্টারিয়ান্স এবং নির্বাহী কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটির বৈঠক হয়। স্মল ব্রাঞ্চেস থেকে দুর্নীতি দূর করা, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তির কাজে স্বচ্ছতা, নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করা, জলবায়ু দূষণরোধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়াসহ বিভিন্ন প্রস্তাব করা হয়। ২ নভেম্বর শুরু হওয়া স্মল ব্রাঞ্চেসের বিভিন্ন সেমিনার শেষে ৪ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্লু-তে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়। সিপিএ মিডিয়া কমিটির সদস্য তানভীর ইমাম এমপি সংরক্ষিত নারী আসনের অ্যাডভোকেট ফজিলাতুন নেছা বাপ্পি এই প্রেস ব্রিফিং করেন।

কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) ৬৩তম সম্মেলন
গত ৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ৬৩তম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্সের (সিপিসি) উদ্বোধন করেন সিপিএ ভাইস প্যাট্রন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের দক্ষিণ প্লাজায় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংসদীয় ফোরামের এই কনফারেন্সের জমকালো ও মনোলোভা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন সারাবিশ্ব থেকে আসা জনপ্রতিনিধিরা। সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী ও সিপিএ ভাইস প্যাট্রন শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলে ঘণ্টা বাজিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। ‘আলোকের এই ঝরনা ধারায় ধুইয়ে দাও’ এবং ‘আমার মুক্তির আলোয়’ গান দুটির সাথে উদ্বোধনী নৃত্য পরিবেশন করেন শিবলী মোহাম্মদ ও শামীম আরা নীপার নেতৃত্বে নৃত্যাঞ্চলের শিল্পীরা।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিএ চেয়ারপারসন এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। পরে তিনি সিপিএ’র প্যাট্রন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পাঠানো লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। শিরীন শারমিন চৌধুরীর স্বাগত বক্তব্যের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবন এবং সিপিএ’র কার্যক্রম নিয়ে দুটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। দুই তথ্যচিত্রের মাঝে নাচের দল নৃত্যাঞ্চল দলগত নৃত্য পরিবেশন করে। শিল্পকলা একাডেমি এবং নৃত্যাঞ্চল শিল্পীগোষ্ঠীর সৌজন্যে বাংলাদেশের ইতিহাস ও কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে তুলে ধরে বেশ কিছু বর্ণাঢ্য প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিপিএ মহাসচিব আকবর খান তাদের মেয়াদে সিপিএ’র কার্যক্রম সারাবিশ্ব থেকে আসা জনপ্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন। এছাড়া কমনওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রেশিয়াকে স্কটল্যান্ডের একটি ভিডিও বার্তা দেখানো হয়। অষ্টম কমনওয়েলথ ইয়ুথ পার্লামেন্টের যুব প্রতিনিধি আয়মান সাদিকও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সিপিএ’র কোষাধ্যক্ষ ও অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপিটাল টেরিটরির লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লির ডেপুটি স্পিকার ভিকি ডান। পরে ‘বাংলাদেশ দ্য গোল্ডেন ডেল্টা’ শীর্ষক নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয়। এছাড়া ‘সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি তথ্যচিত্রও দেখানো হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সিপিএ ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংসদীয় ফোরাম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের ৫২টি দেশের মধ্যে ৪৪টি দেশ, ১৮০টি শাখার মধ্যে ১১৪টি শাখা এবারের সম্মেলনে অংশ নেয়। এসব দেশের জাতীয় ও প্রাদেশিক সংসদের ৫৬ জন স্পিকার, ২৩ জন ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদ সদস্যসহ সাড়ে ৫০০-এর মতো প্রতিনিধি এ সম্মেলন উপলক্ষে ঢাকায় আসেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয় ‘কনটিনিউনিং টু এনহ্যান্স হাই স্টান্ডার্ডস অব পারফরমেন্স অব পার্লামেন্টারিয়ান্স’।
সিপিসি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’Ñ এই নীতির ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে সব সময়ই সুসম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এর ফলে আমরা ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানি-চুক্তি এবং স্থল সীমানা চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি করতে পেরেছি। একইভাবে মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং তাদের জোরপূর্বক বিতাড়িত করে দেওয়া শুধু এ অঞ্চলে নয়, এর বাইরেও অস্থিরতা তৈরি করছে। সম্প্রতি মিয়ানমার সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে সেখান থেকে ৬ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি সে দেশের নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাই মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে এবং বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগ করুন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে বলেন, এই ঐতিহাসিক নগরী ঢাকায় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের ৬৩তম সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। বাংলাদেশের জনগণ, সরকার এবং তার নিজের পক্ষ থেকে সকল অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের প্রথম ও প্রধান নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে গণতন্ত্র এবং সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা এবং এসব রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের পূর্ণ আস্থা তৈরি করা।

‘বাণিজ্য, ভিসা সমস্যা’ শীর্ষক কর্মশালা
৬ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সিপিএ সম্মেলন ২০১৭-এর ষষ্ঠ দিনে ৪টি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে গ্রুপ-‘বি’ তে ‘কমনওয়েলথ দেশসমূহের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য সংসদ সদস্যদের ভূমিকা : বাণিজ্য, ভিসা সমস্যা, ভ্রমণ ও ট্যারিফ বিধিনিষেধ’ শীর্ষক কর্মশালায় ইইউর আদলে সিপিএভুক্ত দেশের মধ্যে ভিসা পদ্ধতির সুপারিশ করা হয়। কানাডার প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রা মেন্ডেজের সঞ্চালনায় কর্মশালায় মূল আলোচক ছিলেন নাইজিরিয়ান সিনেটর ইকে ই বেরেমাদু। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন যুক্তরাজ্যের লর্ড ডেভিস ও গায়ানার জোসেফ এফ হারমান। আলোচনায় তারা সিপিএ’র নির্বাহী কমিটির কাছে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এসবের মধ্যে আছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মতো কমনওয়েলথভুক্ত দেশে ভিসা পদ্ধতি, ট্যারিফ বিধিনিষেধ সহজীকরণ, বাণিজ্য উন্নয়ন এবং আগ্রহী সবাই যাতে এক হয়ে কাজ করে সেজন্য প্রস্তাব পেশ করেন তারা। সেমিনারে তারা বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে এক হয়ে কাজ করার বিকল্প নেই। এজন্যই সিপিএভুক্ত দেশের মধ্যে ভাব এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করতে হবে। ভিসা পদ্ধতিও সহজ করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নিতে সর্বসম্মত বিবৃতি
৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের ৬৩তম (সিপিসি-২০১৭)-এর সমাপনী অধিবেশনে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিঃশর্তভাবে দ্রুত মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে একটি বিবৃতি গৃহীত হয়। অধিবেশনে পরবর্তী তিন বছরের জন্য সিপিএ নতুন চেয়ারপারসন নির্বাচিত করা হয়। সাধারণ অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে বিকেলে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে একটি গৃহীত বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা নির্যাতনের ঘটনায় নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নাগরিকরা যে মানবেতর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো সন্ত্রাস ও জাতিগত নিধন মিয়ানমার সরকারকে নিঃশর্তভাবে বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসাসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব রাখাইন প্রদেশে স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মিয়ানমার সরকার রাখাইন প্রদেশে যা করছে তা চরম অন্যায়।’ এ ছাড়াও বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়া এবং তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) অনুষ্ঠিত এ সভায় বিবৃতিটি উত্থাপন করেন সিপিএ সেক্রেটারি জেনারেল আকবর খান। এর পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, সেন্ট ভেনসেন্ট অ্যান্ড গ্রানাডাসহ বেশ ক’টি দেশের ডেলিগেটরা। তবে বারবাডোজের প্রতিনিধি সিপিএ’র মতো ফোরাম থেকে এ ধরনের বিবৃতি দেওয়া যায় কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তিনি বিবৃতির বিরোধিতা করেন নি।
৫ নভেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপির পক্ষ থেকে সম্মেলনের প্রতিনিধিদের রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্রিফিং করা হলে সেখানে সব দেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি প্রস্তাব গ্রহণের দাবি ওঠে। পরে সিপিএ নির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সক্রিয় বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি বিবৃতিটি সভায় উত্থাপন করা হলে এর পক্ষে সমর্থন জানিয়ে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি ড. মোহাম্মদ হাত্তা বলেন, এ বিবৃতির মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়কে একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা পরিদর্শনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তাদের দেশ থেকে দ্রুত একটি প্রতিনিধি দল কক্সবাজার সফরে যাওয়ার চেষ্টা করবে। একই সাথে তিনি সিপিএ’র একটি প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে পাঠিয়ে এই সম্মেলনের বার্তা তাদের সরকারকে অবহিত করার কথা বলেন।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, এ সম্মেলনে প্রস্তাব গ্রহণের সুযোগ ছিল না। তারপরও নানা পরিক্রমা পেরিয়ে একটি বিবৃতি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হওয়ায় তিনি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আলোচনায় অংশ নেওয়া সব প্রতিনিধি বিষয়টির সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেওয়া শুরু করলে সিপিএ চেয়ারপারসন শিরীন শারমিন সবার মতামত আহ্বান করেন। এ সময় উপস্থিত প্রতিনিধিরা হাত তুলে সমর্থন জানান। এর পরই সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবারের সিপিএ সম্মেলনের সমাপ্তি টানেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। এ সময় নবনির্বাচিত চেয়ারপারসন ক্যামেরুনের ডেপুটি স্পিকার এমিলিয়া লাফাকাও (বর্তমান কমিটির ভাইস চেয়ারপারসন) মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
গৃহীত বিবৃতিতে বলা হয়, কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকারকে বাংলাদেশ সরকারের সাথে এক হয়ে কাজ করতে হবে। এসব দেশকে একযোগে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে তারা দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়। এ ছাড়াও সিপিসির সব আইন সভায় রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো অত্যাচারের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানোর আহ্বান জানানো হয়।
সিপিএ’র ৬৩তম সম্মেলনের সাধারণ অধিবেশনে ভোটাভুটিতে নতুন চেয়ারপারসন হিসেবে এমিলিয়া লাফাকাও নির্বাচিত হন। ফল ঘোষণা করেন সিপিএ’র সেক্রেটারি জেনারেল আকবর খান। নির্বাচনে আরও দুজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এমিলিয়া লাফাকাও ১৯২ ভোটের মধ্যে ১০৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কুক আইল্যান্ডের নিকি র‌্যাটেল। তিনি পেয়েছেন ৭০ ভোট। অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী মনসেরাটের শার্লি এম অসবোর্ন পেয়েছেন মাত্র ১৫ ভোট। গোপন ব্যালটে এ ভোট নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ পদ থেকে বিদায় নিলেন। ২০১৪ সালে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সিপিএ প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ
কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) প্রতিনিধি দল ৭ নভেম্বর  সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। প্রধানমন্ত্রী গণভবনের লনে অতিথিদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং সিপিএ সম্মেলনে যোগদানের জন্য তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি সিপিএ’র নবনির্বাচিত চেয়ারপারসন ও ক্যামেরুনের ডেপুটি স্পিকার এমিলিয়া লাফাকাওয়ের সাথেও কথা বলেন। নবনির্বাচিত সিপিএ চেয়ারপারসনকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা দায়িত্ব পালনে তার সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*