বিভাগ: প্রবন্ধ

সন্ত্রাস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করবে

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়

হাফিজুর রহমান কার্জন: আগস্ট বাঙালির ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর মাস। যার জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হতো না, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আবার অন্য এক বিয়োগান্তক ঘটনার আখ্যান রচিত হয়। ওইদিন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রার আগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হয়। ঘটনাস্থলে নিহত হন ২৪ জন, আহত হন আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী। দুঃখের বিষয় হচ্ছে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। ওই হামলায় জড়িতদের রক্ষা করার জন্য প্রথমে জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়েছিল। ১৪ বছর আগে সংঘটিত ওই মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার রায় দেওয়া হয় গত ১০ অক্টোবর। এই রায়ে ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদ-, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- ও সাবেক তিনজন আইজিপিসহ ১১ জন সরকারি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে দ- প্রদান করেন। এই রায়ের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস যেমন নিরুৎসাহিত হবে, তেমনি তা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকে কণ্টকমুক্ত করবে বলে মনে হয়।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার ও রায়
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তৎকালীন জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদ-ের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- এবং সাবেক তিন আইজিপিসহ ১১ সরকারি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন ১০ অক্টোবর সকালে ১৪ বছর আগে সংঘটিত ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় মোট ৪৯ আসামির মধ্যে ৩১ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন, বাকিদের পলাতক দেখানো হয়েছে। রায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ১৯ জন ব্যক্তি হলেনÑ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম ও রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) সদস্য ও আবদুুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মইনুদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, মো. রফিকুল ইসলাম সবুজ, মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন, হুজি নেতা আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মাদ ওরফে জিএম, শেখ আবদুস সালাম, কাশ্মীরি নাগরিক আবদুল মাজেদ ভাট ও মাওলানা শাওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ। তাদের মধ্যে মো. হানিফ ও মাওলানা তাজউদ্দিন ছাড়া অপর ১৭ আসামি কারাগারে রয়েছেন।
এই আসামিদের দ-বিধি ৩০২, ১২০খ, ৩৪ ধারায় হত্যার দায়ে মৃত্যুদ-ের পাশাপাশি ১ লাখ টাকা জরিমানা, দ-বিধি ৩০৭ ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গুরুতর জখম করার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, বিস্ফোরক আইনের ৩ ও ৬ ধারায় হত্যার দায়ে মৃত্যুদ-ের পাশাপাশি ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং বিস্ফোরক আইনের ৪ ও ৬ ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গুরুতর জখম করার দায়ে ২০ বছরের কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এই ১৯ আসামির ক্ষেত্রে কেবল মৃত্যুদ-ের শাস্তিই কার্যকর হবে। মৃত্যু পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাদের দ- কার্যকর করতে বলা হয়েছে রায়ে।
যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত ১৯ জন ব্যক্তি হলেনÑ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম, হুজি সদস্য শাহাদত উল্যাহ ওরফে জুয়েল, আরিফ হাসান সুমন, আবদুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, বাবু ওরফে রাতুল বাবু, মহিবুল মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল ও লিটন। তাদের মধ্যে কমিশনার আরিফ, জুয়েল, সুমন, সাব্বির, আবদুর রউফ, সেলিম হাওলাদার এবং ইয়াহিয়া কারাগারে রয়েছেন। অপর ১২ আসামি পলাতক।
দ-প্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ-বিধি ৩০২, ১২০খ, ৩৪ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা; দ-বিধি ৩০৭, ১২০খ, ৩৪ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা; বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের ৩ ও ৬ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং বিস্ফোরক আইনের ৪ ও ৬ ধারায় ২০ বছরের কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছে রায়ে। তবে সব সাজা একযোগে কার্যকর হবে বলে এই ১৯ আসামির ক্ষেত্রে কেবল যাবজ্জীবন কারাদ- কার্যকর হবে।
এছাড়া ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে রায়ে। তাদের মধ্যে সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, মামলার প্রথম দিকের তদন্ত কর্মকর্তা বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশীদকে দ-বিধির দুই ধারায় দুই বছর ও তিন বছরের জেল দেওয়া হয়েছে। তবে এই দ- একসঙ্গে কার্যকর হবে বিধায় তাদের মোট তিন বছর সাজা ভোগ করতে হবে। এছাড়া সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা ও আইজিপি শহিদুল হক, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাইফুল ইসলাম ডিউক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক এটিএম আমিন আহমদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদারকে দুই বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে।
অপর দুই আসামি পুলিশের সাবেক উপ-কমিশনার (পূর্ব) মো. ওবায়দুর রহমান এবং উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) খান সাইদ হাসানকে দুই বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে রায়ে।
দ-প্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাজতবাসের সময় সাজা থেকে বাদ যাবে। ৩০ দিনের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে। [তথ্যসূত্র : দৈনিক বণিক বার্তা, দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক সমকাল ও অন্যান্য জাতীয় দৈনিক, ১১ আগস্ট ২০১৮]

ফিরে দেখা একুশে আগস্ট
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা হওয়ার কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের মাঝখানে একটি ট্রাক এনে তৈরি করা হয়েছিল মঞ্চ। শোভাযাত্রার আগে সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বক্তৃতা শেষ করে তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলার সময় ঘটে পরপর দুটি বিস্ফোরণ। এরপর সামান্য বিরতি দিয়ে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হয়। ইতিহাসের নৃশংসতম এই হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন শতাধিক। এই ঘটনায় শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও তার কান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাষ্ট্রীয় মদদে হামলা : আদালতের পর্যবেক্ষণ
দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা ও বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের কী ধরনের মনোভাব থাকা উচিত, তা নিয়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব তুলে ধরা হয়। আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, রাজনীতিতে অবশ্যই ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদারনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়। সাধারণ জনগণ এই রাজনীতি চায় না।
সাধারণ জনগণ চায় যে কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে যোগ দিয়ে সেই দলের নীতি, আদর্শ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ধারণ করার। আর সেই সভা-সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে রাজনৈতিক নেতাদের ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এই ধারা চালু থাকলে পরবর্তী সময়ে দেশের সাধারণ জনগণ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে। এই আদালত চায় না সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফের ঘটনার, সাবেক অর্থমন্ত্রী এসএএমএস কিবরিয়ার ওপর নৃশংস হামলার, রমনা বটমূলে সংঘটিত বোমা হামলার এবং এই মামলার ঘটনায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর নৃশংস বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার পুনরাবৃত্তি।
আদালত তার রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, রক্ত ও মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতি একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালাতে থাকে। পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে রোধ করে। অগ্রগতির চাকাকে পেছনে ঘোরানোর চেষ্টা চালিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ও লাল-সবুজ পতাকাকে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। বিচার না হওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যার দীর্ঘ ২৩ বছর দুই মাস পর জাতি জাতির পিতা হত্যার দায় থেকে কলঙ্কমুক্ত হয় বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার পর চার জাতীয় নেতাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র না থেমে বহমান থাকে। পরে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করানো হবে’Ñ এই উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ নম্বর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সামনে যুদ্ধে ব্যবহৃত স্পেশালাইজড মারণাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন ওঠে কেন এই মারণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয়, দলকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা। রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, এই আদালত সাক্ষীর কাঠগড়ায় গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত মাকে দুর্বিষহ কষ্ট পেয়ে মৃত্যুবরণ প্রত্যক্ষ করা নাজমুল হাসান পাপন ও তার স্ত্রী রোকসানা হাসানের কষ্ট প্রত্যক্ষ করেছেন। আরও প্রত্যক্ষ করেছেন মোসাম্মৎ উম্মে কুলসুম রেণুকা, নুজহাত এ্যানী, রাশেদা আক্তার রুমা, নীলা চৌধুরী ঘটনার সময় ঘটনাস্থল থেকে যারা গ্রেনেড হামলায় মারাত্মকভাবে জখম হয়ে দেশে-বিদেশে চিকিৎসার পরও এখনও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন, যাদের চোখে ঘুম নেই, গ্রীষ্ম বা শীত সবসময়ই শরীরের বিভিন্ন অংশে স্পিøন্টারের তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছেন, যাদের পরিবারের সুস্থ সদস্যরাও প্রাণহীনভাবে বেঁচে রয়েছেন তাদের।
আদালত গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপির আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য, ঘটনাস্থলে যে মারাত্মক ও ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল সেই মর্মে বক্তব্য দিয়েছেন। আদালত গভীরভাবে অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, যিনি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার কানের চিকিৎসা করেন, তার জবানবন্দি পর্যালোচনা করেছেন। ঘটনার সময় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ফলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার ডান কানে গুরুতর জখম হয়। তাই আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে এই নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে বলে এই আদালত মনে করেন।
সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূল ঘটনার আগে বিভিন্ন ঘটনাস্থলে এই মামলার আসামিরা অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সভা করে পরিকল্পিতভাবে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সামনে ঘটনার তারিখ ও সময় মারাত্মক সমরাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ ২৪ জনকে হত্যা এবং শতাধিক নেতাকর্মীকে মারাত্মকভাবে জখম করে। এই মর্মে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আসামিদের শাস্তি প্রদান যুক্তিসংগত বলে এই আদালত মনে করেন। [তথ্যসূত্র : দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সমকাল ও অন্যান্য জাতীয় দৈনিক, ১১ আগস্ট ২০১৮]

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের গুরুত্ব
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা যেমন এক নজিরবিহীন নৃশংসতার আখ্যান, সেই মামলার বিচার ও রায়ও তেমনি এক অনন্য ঘটনা। কেননা এই রায় বাংলাদেশের বিচারের ইতিহাসে এক মাইলফলক। আবার এ-কথাও নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় বাংলাদেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে আরও মজবুত ও শক্তিশালী করবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ’৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসকরা আইন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধ করে দেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়ে ’৭১-এর ঘাতক দালাল ও হন্তারকদের যে বিচার চলছিল, সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্থায়ীভাবে কালচার অব ইমপিউনিটি বা বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকে পড়ে, যা কি না আইনের শাসনকে যেমন বাধাগ্রস্ত করে, তেমনি ন্যায়বিচারের চেতনাকেও নষ্ট করে দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার ও দ- এবং ’৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও দ-ের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের মধ্যদিয়ে এ ধারাটি আরও শক্তিশালী হবে।
এই মামলার রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুকে যেমন মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে, তেমনি ২০০৪ সালে অমিত ক্ষমতার অধিকারী ও বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদ-। এছাড়া সাবেক তিনজন আইজিপিসহ সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মেয়াদে দ- দেওয়া হয়েছে। আদালত তার পর্যবেক্ষণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসের বিষয়টিকে উন্মোচিত করেছেন। সার্বিকভাবে এই মামলার বিচার, রায় ও পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে এ-কথা বলা যায় যে, এই রায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসকে নিরুৎসাহিত করবে। বন্ধ হবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এই রায় আইনের শাসনকে যেমন সুদৃঢ় ভিত্তি দেবে এবং তেমনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকেও করবে মসৃণ।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*