‘সবার জন্য গড়ব অভিন্ন ভবিষ্যৎ’

Posted on by 0 comment
33

কমনওয়েলথ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ভূমিকা

রাজিব পারভেজ: ‘টুওয়ার্ডস এ কমন ফিউচার’ প্রতিপাদ্য নিয়ে শুরু হওয়া কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে গত ১৬ এপ্রিল লন্ডন পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ ৫৩টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নেন এ সম্মেলনে। এবারে সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য গড়ব একই ভবিষ্যৎ’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম পুরনো সংস্থা কমনওয়েলথ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনে থাকা দেশগুলোই এই সংস্থার সদস্য। ১৯৩১ সালে ওয়েস্টমিনস্টার সংবিধি বলে গ্রেট ব্রিটেন, আইরিশ ফ্রি স্টেট (বর্তমানে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র), কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কমনওয়েলথ গঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৫৪টি স্বাধীন রাষ্ট্র কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত।
এবারের কমনওয়েলথ সম্মেলনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সফলতা রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোটভুক্ত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ঐকমতে নিয়ে আসা। যুক্তরাজ্য সফরে প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। পাশাপাশি ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে-সহ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে মিলিত হন। গত জাতিসংঘ সম্মেলনের মতো কমনওয়েলথ সম্মেলনেও নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরব ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ফলাফল হিসেবে কমনওয়েলথের লন্ডন ঘোষণায় গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা সংকট। ঘোষণার ৫০ অনুচ্ছেদে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করারও তাগিদ দেয় কমনওয়েলথ।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাশে থাকার ঘোষণা
রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রশংসা করে এ ইস্যুতে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে কমনওয়েলথ সদস্যভুক্ত দেশগুলো। ২৪০ কোটি জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী কমনওয়েলথভুক্ত ৫৩ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের এ সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিচারের ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে উত্থাপিত একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে টেকসই প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি জোরাল দাবিও উঠেছে।

এশিয়ার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত চান প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমনওয়েলথ সচিবালয় পরিচালনা পর্যালোচনায় উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপে এশিয়ার দেশসমূহ থেকে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত করে এই গ্রুপটিকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার পরামর্শ দিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, কমনওয়েলথের কর্মকা- এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সচিবালয়ের জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ দক্ষতাকে আমরা মূল্য দেই। আমরা মনে করি, সঠিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মতামতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই গ্রুপে কমনওয়েলথের বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এই রাষ্ট্রসংঘকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করতে হবে। শেখ হাসিনা উইন্ডসর ক্যাসেলে সিএইচওজিএম রিট্রিটে কমনওয়েলথ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন পারস্পরিক আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন। রিট্রিটে উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপের সম্প্রসারণ, অর্থায়ন ও কমনওয়েলথ সচিবালয় গভর্ন্যান্স এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।

সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান
সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন কমনওয়েলথ নেতারা। লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের (সিএইচওজিএম) ঘোষণায় জোটের ৫৩ নেতা সাইবার অপরাধ বন্ধে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন। এ ঘোষণা সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং ভৌগোলিক দিক থেকে আন্তঃসরকারের একটি বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি। কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড বলেন, সাইবার স্পেস আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। কমনওয়েলথ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় যে কোনো সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে পৃথক কিংবা সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ নিতে পারবে।

শেখ হাসিনা-তেরেসা মে আলোচনা
কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। লন্ডনের কনফারেন্স মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত শেষ সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন কমনওয়েলথের নেতারা।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসায় জাস্টিন ট্রুডো
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ২৫তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম নির্বাহী অধিবেশনে বক্তৃতাকালে এই প্রশংসা করেন। জাস্টিন ট্রুডো বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কমনওয়েলথ নেতৃবৃন্দকে অবশ্যই তাকে সমর্থন দিতে হবে।’ কমনওয়েলথ মহাসচিবের রিপোর্ট উপস্থাপনের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে আলোচনার জন্য ফ্লোর উন্মুক্ত করে দেন। এ সময় ফ্লোর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন জাস্টিন ট্রুডো।

শেখ হাসিনা-মোদি বৈঠক
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২৫তম কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের (সিএইচওজিএম) সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্নিষ্ট নানা বিষয়ে কথা বলেন।  সর্বশেষ গত বছরের এপ্রিলে ভারত সফরে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আবারও তার ভারত সফরের কথা রয়েছে।

বাণিজ্য প্রসারে প্রধানমন্ত্রীর ৭-দফা প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তঃকমনওয়েলথ ব্যবসা, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনা উন্নয়নের জন্য ৭-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তিনি বাণিজ্য প্রশাসন আরও উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করে তুলতে কমনওয়েলথ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। ‘বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের প্রসারে কমনওয়েলথের ভূমিকা’ শীর্ষক এক বৈঠকে তিনি ওই প্রস্তাব উত্থাপন করে এ আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা অবশ্যই বাণিজ্য প্রশাসন উন্মুক্ত, আইনভিত্তিক, স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করব। তিনি বলেন, আন্তঃকমনওয়েলথ বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনার লক্ষ্যে দেশগুলোকে অবশ্যই অভিন্ন সুযোগ-সুবিধা জোরদার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এ লক্ষ্যে ৭-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এগুলো হলোÑ
১. সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শিল্প-সম্ভাবনা ও উৎপাদনশীলতার খাতভিত্তিক সমীক্ষা, ২. ছড়িয়ে থাকা বিনিয়োগ সম্ভাবনাসহ অভিন্ন বিনিয়োগ নীতি, নির্দেশনা ও কৌশল গ্রহণ, ৩. বাণিজ্য সহায়ক সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন এবং পিটিএ ও এফটিএ’র অশুল্ক বাধা কমিয়ে আনা, ৪. সেবা বাণিজ্যের জন্য উদার শাসন এবং স্বতন্ত্র পেশার সেবা সুবিধার জন্য খোলাবাজার চালু, ৫. প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ যাতায়াত এবং সরকারি ও বেসরকারি ক্যাটাগরিতে নির্দিষ্ট লোকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ, ৬. অবকাঠামো এবং যোগাযোগ প্রকল্প গ্রহণ ও ৭. এসএমই এবং ব্লু ইকোনমি খাতসহ উৎকৃষ্ট কেন্দ্র এবং প্রতিষ্ঠানের সহায়তা এবং উন্নয়ন, আরএন্ডডি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তহবিল গঠন।

কমনওয়েলথে সংস্কারের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর সংস্থা কমনওয়েলথের সচিবালয়সহ এর বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভূমিকার আমূল সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সদস্য দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে এই সংস্কার অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি। লন্ডনে ল্যানক্যাস্টার হাউসে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনে এই প্রস্তাব দেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কমনওয়েলথের ব্যাপক সংস্কারের জন্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি গ্রুপ (ইপিজি) গঠনের সুপারিশ করছি। কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংস্থার সচিবালয়ের সংস্কার প্রয়োজন।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐকমত্য
যুক্তরাজ্যের বাকিংহাম প্রাসাদে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপস্থিত অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা এ সময় তারা বিগত দিনের সাফল্য ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং বৈশ্বিক ও কমনওয়েলথের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এখানেই পরবর্তী কমনওয়েলথ প্রধান হিসেবে প্রিন্স চার্লসের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন কমনওয়েলথ নেতারা। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটেছে সংস্থাটির এবারের শীর্ষ সম্মেলনের। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে রানি এলিজাবেথ কমনওয়েলথের প্রধানের পদ ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করার পর ব্রিটিশ সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকার প্রিন্স চার্লসকে এ পদে বসানো হচ্ছে।

Category:

Leave a Reply