বিভাগ: ক্রীড়া

সাফ-গৌরব ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন

uttaran আরিফ সোহেল: ৩১ আগস্ট ২০১৮। সাফজয়ী ফুটবলারদের মিলনমেলা। তাদের শুভ কামনায় অনুপ্রাণিত হচ্ছেন তাদের উত্তরসূরিরা। তারা পণ করেছেনÑ এবার ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের। তাতে অভ্যাগতরা আবারও সাফ-গৌরব ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৮। এই আসরের উন্মাদনা-আবেদন-নিবেদন ছড়িয়ে দিতেই দীর্ঘ ১৫ বছর পর এমন আয়োজন। আয়োজক বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি [বিএসপিএ]। সেখানে সম্বর্ধিত হয়েছেন ২০০৩ সালে সাফজয়ী ফুটবলাররা। দেশের ফুটবল ইতিহাসে ওই শিরোপা জয়ই সবচেয়ে বড় মর্যাদার অর্জন বাংলাদেশের। পুরনো-নতুনের বেগ-আবেগের আবীর ছড়ানো পরিবেশে শিরোপাজয়ী জয়-রজনী-মামুন-মনি-কাঞ্চন-আমিনুলরা ফুটবলের সোনালি অতীতের কথা রোমন্থন করেছেন। তা মুগ্ধতার সঙ্গে শুনেছেন বর্তমান সাফ শিরোপা প্রত্যাশী বাংলাদেশ দলের ফুটবলাররা। ফলে আবেশের রং ছড়ানো সুর-মূর্ছনায় সেখানে বেজে উঠছে ফুটবলের নতুন সম্ভাবনার আলো। ভিন্নমাত্রার পরিবেশে পুরনোদের স্মৃতিকথা, দৃঢ়তা, দেশের প্রতি কমিটমেন্টÑ সবমিলিয়ে সাফে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নটা আরও একবার উসকে দিয়েছে এশিয়ান গেমসে দুর্দান্ত ‘টিম বাংলাদেশকে’।
বাংলাদেশ ফুটবলের হতাশার সময়ে এবারের এশিয়ান গেমস স্বস্তি এনে দিয়েছে। নতুন ইংলিশ কোচ জেমি ডের হাত ধরে অনূর্ধ্ব-২৩ দল এশিয়ান গেমসের প্রথম ম্যাচে উজবেকিস্তানের কাছে ৩-০ গোলে হারলেও পরের ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ড্র করে শক্তিশালী থাইল্যান্ডের সঙ্গে। আর ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক কাতারের মতো ‘বিগ জায়ান্ট’কে হারিয়ে শেষ ষোলোতে উঠে আরেকটি ইতিহাসের পাতা খুলেছে বাংলাদেশ। পরের লড়াইয়ে এশিয়ার পরাশক্তি উত্তর কোরিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হারলেও বাংলাদেশের তরুণদের সাহসী পারফরমেন্স নজর কেড়েছে সবার। ফলে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাফ ফুটবলের আসরকে ঘিরে নতুন আলোর দ্রুতি সঞ্চারিত হচ্ছে। নিরাশার ফুটবলে হঠাৎ করেই আশার বাতি জ্বলে উঠছে। সেই বাতি জ্বালিয়েছে এশিয়ান গেমসে অনবদ্য সাফল্য।
uttaran2বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন এখন আবর্তিত-বিবর্তিত ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ওই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে ঘিরেই। বড় আসরে কাতারকে হারানো যায়, সেক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বিপক্ষে জয় পাওয়া কঠিন নয়। ইংল্যান্ডের উয়েফা লাইসেন্সধারী এই কোচ প্রথম আসরেই কিছু একটা দিতে পারেন; অনেকেই ভেবে ফেলেছেন। তবে বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ জেমি ডে বারবারই সেই আশায় রাশ টেনে ধরেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, গত তিন আসরে বাংলাদেশ বিদায় নিয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকেÑ সেই পুরনো কথা। স্বাগতিক হয়ে সেই লজ্জার আবরণ সরিয়ে ব্রিটিশ কোচ কি পারবেন বাংলাদেশ ফুটবলের ভাগ্য বদলাতে! এমন আলোচনার পারদ ছুঁয়ে দেখছে আকাশ সীমানা। স্বপ্ন জয়Ñ এক কঠিন লড়াই। তাই জেমি ডেÑ দল নির্বাচনে তারুণ্যের জয়গান গাইলেও অভিজ্ঞদের রেখেছেন ‘ভারে কাটার জন্য’। একটি হিসাব তাকে বেশ পোড়াচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন জাতীয় ফুটবল দলের কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল না। ২০১৭ সালে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে একটি ম্যাচও খেলেন নি সিনিয়ররা। তারা সময় পার করেছেন ক্লাবের হয়ে খেলেই। ম্যাচ না খেলায় র‌্যাংকিংয়েও অবনমন হয়েছে বাংলাদেশের। তবে ব্যস্ত ছিল বয়সভিত্তিক দল। বড় কোনো ট্রফি না জিতলেও বয়সভিত্তিক বাংলাদেশের হয়ে তারুণ্যের পতাকাবাহীরা মাঠে সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। যার শেষ প্লট এশিয়ান গেমসে রূপায়িত করেছেন জুনিয়ররা।
প্রস্তুতি শেষ। চলছে আসর আয়োজনের ব্যাপক তোড়জোড়। ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে সেই কাক্সিক্ষত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ৪-১৫ সেপ্টেম্বর এই আসর অনুষ্ঠিত হবে জাতির পিতার নামাঙ্কিত বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। সাত জাতির এই আসরে বাংলাদেশ খেলছে ‘এ’ গ্রুপে। প্রতিপক্ষ ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তান। ‘বি’ গ্রুপে ভারত, মালদ্বীপ ও শ্রীলংকা। উদ্বোধনী দিনের দ্বিতীয় ম্যাচেই স্বাগতিক বাংলাদেশ মাঠে নামছে। প্রতিপক্ষ ভুটান। এর আগে ১২তম এই আসরের পর্দা উঠছে নেপাল-পাকিস্তানের ম্যাচ দিয়ে। এই আসরের আগে বাংলাদেশ আরও দুবার সাফ আয়োজন করেছে। এর মধ্যে ২০০৩ চ্যাম্পিয়ন, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সেমিফাইলে হেরেছে ভারতের কাছে। এবার তৃতীয়বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করছে বাংলাদেশ। পরিসংখ্যান থাকছে বাংলাদেশের পক্ষেই। দেশের মাটিতে বাংলাদেশ এগিয়েই থাকে।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল আসরকে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ। সার্ক গোল্ডকাপ নামে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল টুর্নামেন্ট যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের লাহোর থেকে। চার দল নিয়ে হয়েছিল ওই টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশ প্রথম আসরে অংশ নেয়নি। দুই বছর পর শ্রীলংকায় এই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় আসরে সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল বাংলাদেশ। পরের দুই আসরে বেহাল বাংলাদেশ। তবে ১৯৯৯ সালে ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম আসরে বাংলাদেশ রানার্স আপ হয়েছে। ফাইনালে হেরে যায় সেই ভারতের কাছেই। আর ২০০৩ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আসরে স্বপ্নপূরণ হয় বাংলাদেশের। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই আসরে বাংলাদেশ অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। ফাইনালে টাইব্রেকারে মালদ্বীপকে হারিয়ে রজনী-মামুন-কাঞ্চনরা উড়িয়েছেন লাল-সবুজের পতাকা। এরপর থেকেই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ পরিণত হয় আন্ডারডগে। ২০০৫ সালে পাকিস্তানের করাচিতে বাংলাদেশ ফাইনালে উঠলেও পরের আসরগুলোতে বাংলাদেশ চরমভাবে ব্যর্থ। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আসরে সেমিফাইনালে ওঠাটাই ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় কিছু।
এ মুহূর্তে ফুটবলের র‌্যাংকিংয়ের চরম তলানীতে বাংলাদেশ। কিন্তু সবুজ-শ্যামলা বাংলাদেশে এখনও তা মরে যায়নি। ২৮ আগস্ট নীলফামারীতে বাংলাদেশ-শ্রীলংকা সাফের প্রস্তুতি ম্যাচে তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ ‘শেখ কামালের’ নামাঙ্কিত স্টেডিয়ামে রোদ মাথায় উপচেপড়া ভিড়, সত্যিই ধাঁধিয়ে দিয়েছে ফুটবল যাত্রাপথকে। নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে ফুটবলের উৎসব-গল্প। বাঙালি হৃদয়ে এখনও ফুটবল প্রেম-ভালোবাসা জাগরূক মহীরুহের মতোই। এখনও উচ্ছ্বাস-আনন্দ-উদযাপনে ফুটবলের জয়-জয়কার। নীলফামারীতে ৪টা ম্যাচ; অথচ দুটায়ই তিল ধারণের ঠাঁই ছিল নাÑ তাতে সেই সত্যই ভেসে উঠেছে মাঠের ক্যানভাসে।
এশিয়াডে খেলা নিয়মিত একাদশের ১০ জনকে বাইরে রেখে অভিজ্ঞদের নিয়ে নবীন শ্রীলংকার বিপক্ষে বাংলাদেশকে এই ম্যাচে একটু হসপচ মনে হয়েছে। দল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে র‌্যাংকিংয়ের নিচের দল শ্রীলংকার কাছে হেরেও গেছে। তারপরও এখানে বিপুল দর্শকের উপস্থিতি প্রমাণ করেÑ এখানে হার বড় কথা নয়, জয় হয়েছে ফুটবলেরই।
বাংলাদেশের ফুটবলে হঠাৎ করেই বর্ণিল রং লেগেছে। এশিয়ান গেমসে দুর্দান্ত পারফরমেন্সের পর ফুটবল নিয়ে নতুন আশা জেগেছে। ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ শুধু ফেভারিটই নয়, হট ফেভারিট হয়েই শুরু করবেÑ এমন স্বপ্ন-প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছেন বাঙালিরা।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*