বিভাগ: সম্পাদকীয়

স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর : “জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার”-এ বছর বিশ্বের দ্রুতবর্ধনশীল প্রথম ৫টি দেশের অন্যতম হবে বাংলাদেশ। এ বছর দেশজ উৎপাদন ৭.৩ শতাংশ হবে বলে অভিমত দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়াবে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। আমাদের দেশের ‘খুৎ’ সন্ধানী এবং ‘সংশয়বাদী’ বিশেষজ্ঞগণ অবশ্য এ ব্যাপারে এখনও মুখ খুলেন নি। ধারণা করি তারা বসে নেই। প্রবৃদ্ধির হার-এর এই ভবিষ্যদ্বাণীটি যে ‘কল্পনাপ্রসূত’ অথবা ‘ভুল তথ্যের’ ওপর করা এটি যদি তারা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে তারা যেমন মহলবিশেষের বাহবা পাবেন, তেমনি বাংলাদেশের প্রতিপক্ষের হাতে অপপ্রচারের একটা মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিতে পারবেন।
কিন্তু না, তাদের এই দুরাশা পূরণ হবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল তাদের মতে বাংলাদেশ তার সমস্ত প্রতিকূলতা এবং বৈরী পরিবেশ সত্ত্বেও উন্নয়নের বৈতরণী পার হতে চলেছে। সত্তরের দশকে, বঙ্গবন্ধুর আমলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ দুজন প্রতিনিধি, জাস্ট ফা’ল্যান্ড ও পারকিনসন্স রীতিমতো তাদের গবেষণা গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি টেস্ট কেস।’ তারা আরও বলেন, ‘যদি বাংলাদেশ উন্নয়নের বৈতরণী পার হতে পারে, তাহলে তৃতীয় বিশ্বের সকল দেশের পক্ষেই তা সম্ভব হবে।’ কথাটির কেবল ব্যঙ্গ বিদ্রƒপই ছিল না, তারা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন অপ্রতুল সম্পদ ও বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে উন্নয়নের বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ দারিদ্র্যের অভিশাপ নিয়ে বিশ্বের দরবারে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে জাতিসমূহের করুণা যাচ্ঞা করবে।
স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর এবং তাদের এই মন্তব্যের ৪৪ বছর পর বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে জাস্ট ফা’ল্যান্ড ও পারকিনসন্সের আশঙ্কা বা ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এখন খোদ মার্কিন মুল্লুকের কর্তৃত্বাধীন বিশ্বব্যাংকই বলছে বাংলাদেশ এখন আর দরিদ্র দেশ নয়, উন্নয়নশীল দেশ। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে যে আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছিল, ইতোমধ্যেই তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের মাথাপ্রতি আয় প্রায় ২ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
কেবল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সূচকেই নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গড় আয়ুষ্কাল, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য দূরীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎপ্রাপ্তিসহ অন্যান্য সামাজিক সূচকেও বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। বলা হয়ে থাকে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন পাকিস্তান ও ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. নুরুল ইসলাম বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ‘মিরাক্যাল ইকোনমি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ, অর্থনীতি ও সামাজিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেছেন।
বাংলাদেশে এই মিরাক্যাল সম্ভব হয়েছে প্রধানত ৩টি কারণে। প্রথম কারণ; পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ হিসেবে আমাদের আত্মপ্রকাশ। দ্বিতীয়ত; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী এবং সাহসী নেতৃত্ব এবং তৃতীয়ত; বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ়চিত্ত ডায়নামিক নেতৃত্ব।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে যদি নৃশংসভাবে হত্যা করা না হতো, তাহলে উন্নয়ন দৌড়ে বাংলাদেশ দুই দশক আগেই মালয়েশিয়াকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেত।
বঙ্গবন্ধু হত্যা কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়; এই হত্যাকা-ের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ-বিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে। তারা হত্যা করেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় অর্জন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধান, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বাঙালি জাতির উন্নয়নের স্বপ্ন-সাধনাকে। আমাদের জাতীয় জীবন থেকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর ২১টি বছর এবং ২০০১-০৮ পর্যন্ত আরও ৮টি অর্থাৎ, ২৯টি বছর অপচয় হয়ে গেছে। হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি ২০০৪ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড বৃষ্টিবর্ষণ করলেও, অলৌকিকভাবে সেদিন তিনি বেঁচে যান। ২৪ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী আত্মাহুতি দেন।
২০০৯ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুফল কাজে লাগাচ্ছে। স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একটি অভিন্ন প্রক্রিয়া। বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন এই অবিভাজ্য প্রক্রিয়ায় প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে নতুন এক পর্যায়ে উন্নীত করেছে। বাংলাদেশ এখন এক উত্তরণকালীনÑ দারিদ্র্য থেকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছে। এই পথে বিজয় আমাদের অনিবার্য।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*