বিভাগ: প্রবন্ধ

স্মৃতিময় আওয়ামী লীগ

PM1    আবুল মাল আবদুল মুহিত: ২০০৪ সালে জুন মাসে আওয়ামী লীগের জন্মের ৫৫ বছর হয়, সেই উপলক্ষে একটি স্মারক গ্রন্থ ‘গৌরবের ৫৫ বছর’ প্রকাশিত হয়। এই বইটি প্রকাশ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিভাগ এবং সম্পাদনা পরিষদ ছিল পাঁচ সদস্যের, যার সচিব ছিলেন নূহ-উল-আলম লেনিন। তিনি এবার উদ্যোগ নিয়েছেন যে আওয়ামী লীগের ৭০ বছর উপলক্ষে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করবেন। এবারে হয়তো একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ না হয়ে আওয়ামী লীগের মাসিক পত্রিকা ‘উত্তরণ’-এর একটি বিশেষ সংখ্যা হবে। মনে হচ্ছে, লেনিনের সম্পাদনায় এইটিই হবে উত্তরণের শেষ সংস্করণ।
২০১৪ সালে প্রকাশিত গ্রন্থে ছিল ১৬টি প্রবন্ধ ও কিছু দলিলপত্র এবং তার ভূমিকা লিখেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। সেখানেও আমার একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তারই জের টেনে এবারে আমার লেখাটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের ৭০ বছর। স্বাভাবিকভাবে এতে হয়তো কিছু পুনরাবৃত্তি হবে।
বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য ছিল যে স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরে এদেশে কতিপয় দেশশত্রু পাকিস্তান ও লিবিয়ার সহায়তায় তাদের এজেন্ট হিসেবে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। সৌভাগ্যবশত; শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে-সময় বিদেশে থাকায় রক্ষা পান এবং বাংলাদেশের সাহসী নেতা জার্মানিতে নিছক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর প্রচেষ্টায় লন্ডনে আশ্রয় নেন। রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত নেতারা তখন এই রকম আশ্রয়ের জন্য জেনেভা ছাড়া লন্ডনকেই বেছে নিতেন। সেই ট্রাডিশন এখনও বর্তমান আছে। ব্রিটিশ সরকার এজন্য সকলের নমস্য। লেনিন, দগল এরা সবাই লন্ডনেই বিপদকালে আশ্রয় পান ও তাদের বিপ্লব চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। শেখ হাসিনার চূড়ান্ত আশ্রয় হয় ভারতের দিল্লিতে যেখানে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মহীয়সী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তাকে আশ্রয় দেন এবং তার বিশ^স্ত সহকারী পরবর্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি মহামান্য শ্রী প্রণব মুখার্জী একজন অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। শেখ হাসিনা সেখানে কয়েক বছর অবস্থানের পর ঠিক করলেন যে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করবেন এবং দেশকে হন্তাগোষ্ঠীর দখল থেকে মুক্ত করবেন।
এই দুঃসাহসী পদক্ষেপ নানা আপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করা সম্ভব হয় ১৯৮১ সালের ১৭ মে’তে। আওয়ামী লীগই তাকে সেই সুযোগ করে দেয় ১৯৮১ সালে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচত করে। তিনি এই পদে বারবার নির্বাচিত হয়ে আজও মোট ৩৯ বছর ধরে বহাল আছেন। দায়িত্বটি তিনি গ্রহণ করেন ৩৩ বছরের যুবতী হিসেবে এবং এখন ৭২ বছরেও এই পদটি অলঙ্কৃত করছেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ খুব পুরনো নয়, আমি বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ছিলাম, তবে আমার ছাত্রাবস্থায় তার সঙ্গে পরিচয়ের কোনো সুযোগ হয়নি। কারণ আমার ছাত্র-জীবনের অবসানকালে PM2১৯৫৫ সালে তিনি ছিলেন একজন বালিকা। আমার চাকরি-জীবনের সূচনা হয় দেশে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তখন, ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে। ১৯৫৮ সালে যখন আমার শিক্ষানবিসকাল শেষ হলো তখনই দেশে এলো আইয়ুবের সামরিক শাসন, যা কোনো-না-কোনো উপায়ে বহাল থাকে পরবর্তী ১০ বছর। বঙ্গবন্ধু এ-সময়ে প্রায়ই কারাবন্দি থাকতেন অথবা মামলার চাপে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় হাজিরা দিতে ব্যস্ত থাকতেন। তবে সুযোগ পেলেই তিনি ফুটবল মাঠে আউটার স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যেতেন। ওখানেই মাঝে মাঝে তার সাথে দেখা হতো। কারণ তখন আমি ছিলাম পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের মহাসচিব এবং প্রায় প্রতি অপরাহ্নেই আমি সেখানে দফতরে কাজ করতাম। অতঃপর ১৯৫৩ সালে আমি প্রশিক্ষণে যাই হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ে এবং সেখানে কেনেডি রাষ্ট্রবিজ্ঞান স্কুল থেকে এমপিও ডিগ্রি নিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করি। তবে চাকরিস্থল হয় করাচি এবং রাওয়ালপিন্ডি। সেখান থেকেই ১৯৬৯ সালে আমি ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে পদায়িত হই। যেখানে আমি অবস্থান করি স্বাধীনতা যুদ্ধকালে এর পরবর্তীতে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত। তবে ১৯৭২ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় সব সময়ই নানা কাজে যখন-তখন ঢাকা বা ঢাকার নির্দেশে অন্যান্য দেশে যেমনÑ ইউএই, ইরাক, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় কার্যোপলক্ষে গমন করি। ১৯৭৪ সালে আমি ম্যানিলায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে হই বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে নির্বাহী পরিচালক এবং সেখানে থাকি আড়াই বছর। এই সময়েও দেশে ও দেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমি নানা উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট থাকি।
বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের মাত্র কয়েকদিন আগে আমি ঢাকা হয়ে সৌদি আরবে যাই এবং প্রত্যাবর্তন করে আবার ম্যানিলা চলে যাই। সেখানেই বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের খবর পাই এবং তার পরে আরও প্রায় দুবছর ম্যানিলায় থাকি। তাই ঢাকায় আমার এক নাগাড়ে অনুপস্থিতি ছিল ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭৭, প্রায় ১৩ বছর। ১৯৭৭ সালে দেশে ফিরে সাড়ে চার বছর পরে ১৯৮১ সালের শেষ দিনে সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসরে চলে যাই। তারপর ২০০১ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ছিলাম সুশীল গোষ্ঠীর একজন। অর্থাৎ সেমিনার প্রিয় বাংলাদেশে ব্যস্ত থাকি সেমিনারে এবং সুশীল সমাজের আরও নানা কর্মকা-ে। অতঃপর আমার এক নতুন জীবন শুরু হয় ২০০১ সালে, যখন আমি চিন্তা করছিলাম যে আমার ব্যর্থ জীবনে অবসর নেব।
PMআওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ইচ্ছায় এবং শেখ রেহানার উদ্যোগে আমি সরাসরি রাজনৈতিক অঙ্গনে যোগ দেই। মাননীয় স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর অনাকাক্সিক্ষত তিরোধানে সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণের জন্য আমাকে আহ্বান জানায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আমি তখন বেশি সময়ই কাটাই বিদেশে। নানা দেশে পরামর্শকের কাজ করে আমার জীবন চলে। আওয়ামী লীগের লোভনীয় আহ্বানে আমাকে আমার জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে হলো। আমি ২০০১ সালেই সিলেটে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রথমে নিয়মিতভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করলাম এবং নির্বাচনে প্রার্থী হলাম, আমার নির্বাচনী অভিযান ও প্রচারণা হলো মাত্র ৩৫ দিনের। এই অল্প সময়ে আমার পরিচিতই হলোÑ বড় সমস্যা। ভোটার চায় প্রার্থীকে দেখতে, প্রার্থীর সঙ্গে পরিচয় করতে। অথচ আমার সেজন্য সময় একেবারেই নেই, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন বিএনপির অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ সাইফুর রহমান। আমি ৩৩ হাজার ভোটে হারলাম। ভোটারদের ৭৫ শতাংশ তাতে ভোট দেন, অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ ভোটার ভোট প্রদান করে। ভোট দিতে গিয়ে দেখলাম যে জালিয়াতির ভোট দেবার জন্যই যেন ভোট প্রদান নীতিমালা খুবই উদার এবং আরও দেখলাম যে ভোট প্রদানে জালিয়াতি, ভোটকেন্দ্র সাময়িকভাবে দখল করে ঢালাওভাবে ভোট বাক্স ভর্তি করে দেওয়া একটি কৌশল হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। আমার বক্তব্য তাই হলো, যা ভোট চুরি বা ভোট জালিয়াতি ভোট ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই ভোট চুরি বা ভোট জালিয়াতি বন্ধ করার ব্যবস্থা না নিলে ভোট প্রদানের কোনো মানেই হয় না। আমি ভোট চুরির ব্যাপারেই হলাম সবচেয়ে বেশি সোচ্চার।
আমার নির্বাচনে আমার ব্যক্তিগত খরচ ছিল যৎসামান্য। আমার আত্মীয়স্বজন-আপনজন সবাই দরাজহস্তে আমাকে সহায়তা করলেন। আমার চিকিৎসক বোন প্রচুর খরচ করল। শেখ হাসিনা মোটামুটিভাবে নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহ করলেন। তিনি আবার অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা আমার ভাই মোমেনের হাতে গুজে দিলেন। আমি দেখলাম ভোট খরিদের বিয়ষটি একটি ধোঁকাবাজি। স্থানীয় নেতারা এই টাকা নেন, ভোটাররা এর কিছুই পায় না। ভোটকেন্দ্রের জন্য খরচ দলীয়ভাবে নির্বাচন কমিটি নির্বাহ করে, সেজন্য তারা কেন্দ্রীয়ভাবে সাহায্য পায়। আমার ভাই তার হাতের ৫ হাজার টাকা খরচই করতে পারল না। আমার মনে হয়, প্রতিকেন্দ্রে ভোটক্যাম্প স্থাপন এবং অন্যান্য নির্বাচনী খরচ প্রচার ও প্রচারসামগ্রীসহ মোট খরচ হলো প্রায় ৪০ লাখ, যেখানে সরকারি হিসাবে খরচের সীমা ছিল মাত্র ১৫ লাখ। আমার ধারণা হলো যে প্রমাণ সাইজের নির্বাচনী আসনে এই খরচ হয়তো হবে ৩০ লাখ। ঢাকার বড় বড় নির্বাচনী কেন্দ্রে যা হওয়া উচিত ৪-৫ গুণ।
নির্বাচনে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে গেলাম দলনেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। তাকে বললাম যে, তার শত চেষ্টা ও সহায়তায়ও আমি নির্বাচনে জিততে পারলাম না বলে দুঃখিত। তার সহায়তা ও অর্থ সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম যে, আমার পক্ষে এখন আমার নিয়মিত জীবনে প্রত্যাবর্তন করা খুবই সহজ। আমি তাই করতে পারি। নেত্রী চটপট উত্তর দিলেন, তা বটে। তবে আপনি নির্বাচনী জালিয়াতি নিয়ে অনবরত বকে যাচ্ছেন। আমি চাই যে আপনি এ-বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করুন। সেজন্য আপনাকে আমি যা লাগে, তাই ব্যবস্থা করব। আপনি আপনার সহকর্মীদের নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করুন। আমি আমার প্রার্থীদের আপনাকে সাক্ষাৎ দিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করে তাদের কাহিনি দিতে পারে।
এই কাজটি হাতে নেওয়ার পর আমি আর রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারলাম না। ২০০১ সালেই শুরু হয় আমার রাজনীতিবিদ হিসেবে নতুন একটি অধ্যায়। অবশেষে মনে হলো কৈশোরের স্বপ্ন যেন সফল হতে চলেছে। ২০০১ সালে নির্বাচনে আমাদের ব্যর্থতার পরেই আমরা শুরু করি আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি। আমরা বলি যে নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে, তবে তা শুধরাতে হবে নিয়মনীতি ঠিক করে। নির্বাচনী আইন ও রীতিনীতি ঠিক না হলে নির্বাচন সঠিক হবে না। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না। জালিয়াতির নির্বাচন প্রতিবেদনে আমরা ১৭টি উপায়ে জালিয়াতি হয় বলেও আমাদের অভিমত ব্যক্ত করলাম এবং তার পুরো প্রমাণ দাখিল করলাম। আমি ১৭ ত্রুটির সংস্কারের প্রস্তাব দিলাম। নেত্রী বললেন যে সংস্কারের প্রস্তাব এবার দেবেন না। প্রথমে তো ঐক্যমত সৃষ্টি করেন যে, নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি হয়। তারপর আসবে সংস্কার। সংস্কারের জন্য জনমত গড়ে তুলতে হবে। আমার রাজনৈতিক শিক্ষার হলো একটি মূল্যবান অধ্যায়।
পরবর্তীতে বলতে গেলে আট বছর হলো নির্বাচনী পদ্ধতি ও আইনের সংস্কার নিয়ে আন্দোলন। এক বিচার বিভাগের অসম্মানের প্রতিভূ জনৈক আজিজ তখন নির্বাচন চিফ কমিশনার হিসেবে পদটিকেই কলঙ্কিত করল। তার মতো বেহায়া, অপদার্থ লোকটি যে কী করে বিচারক হতে পারলো আমার তা বোধগম্য কখনও হলো না। তবে বিএনপি এসব অদ্ভুত সৃষ্টির মেধাটিই শেষ পরিচয় ছিল না। তারপর পাওয়া গেল আর একটি রোবট, নেহায়েত খালেদা ভৃত্য, রাষ্ট্রপতি ইয়াজুদ্দিন। ঐ লোকটিকে ছাত্র-জীবনে চিনতাম, আমার বন্ধু আমিনুলের টেন্ডল হিসেবে ভাবতাম মৃত্তিকাবিজ্ঞানে আমারই সহপাঠী (এক ক্লাসের ছাত্র)। কিন্তু তখন ভাবলাম যে সে আমাদের এক বছর সহগামী। তাতে আমি অবশ্য কোনো বিশেষ নজর দেবার চেষ্টাও করলাম না। সে যেটা করে বসলো এক অসাধারণ দুর্ঘটনা। সে রাষ্ট্র হিসেবেই বনে গেল প্রধান উপদেষ্টাও অর্থাৎ সেদেশের প্রথম ও দ্বিতীয় দুই পদই দখল করে বসলো। তবে সে তো রোবট, তাই বাস্তবে দুই পদই দখল করে থাকল বেগম খালেদা জিয়া।
PM3যাই হোক, আমাদের নির্বাচনী সংস্কারের পালে জোর হাওয়া লাগল। আমার প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। প্রায় সক্রেটিসের মতো অসংখ্য সংবিধান দেখে পরীক্ষা করে আমি আমার সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন করি। এই প্রণয়ন কাজে আমি সহায়তা নিই ১৯ জন সহকর্মীর এবং আরও অনেক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শকের। বিশেষত নির্বাচনে আমি কোনো দলমতের পরিচয়ের কোনো হিসাবই নিলাম না। এই কাজে আমার সহায়ক হন নূহ-উল-আলম লেনিন ও জাহেদ। জাহেদ শুধু কেরানি ছিল না, সে ছিল শান্তশিষ্ট একজন ভালো অবজারভার। যার ফলে তার অবদান কখনও হতো একেবারেই মৌলিক। আমি ধান ভানতে শিবের গীত গেয়েছি বলে আসল বক্তব্যে এখন খুব সংক্ষিপ্ত হতে হবে। তবে মৌলিক বক্তব্য যথাযথ ও উত্তম হলে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যই শ্রেয় এবং যথেষ্ট।
অবশেষে সরকার একটি ভালো নির্বাচন কমিশন গঠন করল। শামসুল হুদা নামের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেন চিফ নির্বাচন কমিশনার। তার সদস্যরাও হলেন মোটামুটি ভালো, তার সঙ্গে নির্বাচনী আইনকানুন ও রীতিনীতির আলোচনা হয় অতি উত্তম। যে কোনো বিষয়ে গভীরে যেতে ও তার সারবস্তু বুঝতে ছিল খুবই পারঙ্গম। তার সঙ্গে আলোচনাটি হয় খুবই আনন্দের এবং শিক্ষণীয়ও বটে! তার স্টাইল অনেকটা ছিল ঝটপট কর্মপদ্ধতি। আলোচনা যখন আমাদের প্রায় শেষ পর্যায়ে তখন আওয়ামী লীগের অতি সচেতন নেতারা ঠিক করলেন যে ঐ আলোচনা করবেন নেতারা, সেখানে আমি যুক্ত হলে একজন উপদেষ্টা হতে পারি। নেত্রী সে-সময় দেশে নেই, প্রয়াত জিল্লুর রহমান সাহেব ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। জিল্লুর ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় বিশ^বিদ্যালয় জীবনের সূচনালগ্নে এবং তিনি ছিলেন আমার একজন গুরুজন এবং আমাকে শুধু স্নেহ করতেন না, আমাকে সর্বত্র প্রমোট করতেন। তিনি আমাকে বললেন যে প্রতিটি আলোচনার সূচনা করেন অন্যান্য নেতার হাতে বিষয়টি ছেড়ে দিয়ে তিনি আর আলোচনায় থাকবেন না। সুতরাং আমার যা কিছু বিশেষ বলার আছে আমি তাকে বললেই হবে। তিনি বললেন, আমি উপদেষ্টা হিসেবেই দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যেতে পারি। আমি তার সব নির্দেশই মানলাম, তবে বললাম যে আমি ঐ সমালোচনায় যেতে চাই না, তবে তার বক্তব্যটি হবে লিখিত এবং তার খসড়া প্রণয়নে চূড়ান্ত পর্বে আপনাকে থাকতে হবে। এই ব্যবস্থাটি ছিল খুব ভালো। মূল নেতার বক্তব্য লিখিত হওয়ার ফলে যে কোনো নতুন চাল কখনও গৃহীত হতো না। যেমনÑ উপজেলা নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার করবেন বলে খুব জোরাজুরি চলল। আমরা সেটা চাই না। সর্বশেষে আমাদের ভারসা হলো জিল্লুর ভাইয়ের লিখিত বক্তব্য, সেখানে এক ফাঁকে আমি লিখেই দিয়েছিলাম যে উপজেলা নির্বাচন নির্বাচিত সরকারের অধীনে হবে।
আমার মনে হয়, নির্বাচনী আইনকানুন ও পদ্ধতি নির্ধারণ এবং প্রণয়ন করেই আমরা নির্বাচনের গতিও বদলে দিলাম। সেই আমাদের সহায়ক হলো আর একটি কার্যক্রম। সম্ভবত কানাডার সহায়তায় আমাদের সেনাবাহিনী জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত হলো। এই পরিচয়পত্রটি ছিল ছবি সম্বলিত। সুতরাং সেটিই হয়ে গেলে পরিচয় নিতে কখনও কোনো প্রশ্ন উঠলে তার সমাধানের মোক্ষম মাপকাঠি। বস্তুতপক্ষে এখন আর কাউকে পরিচয়পত্র দেখাতে হয় না। পরিচয়পত্র যে আছে এবং তাতে অকাট্ট প্রমাণের সুযোগ আছে। তাতেই এ-ধরনের জালিয়াতি কেউ করতেই যায় না। নির্বাচনী পদ্ধতি ও কার্যক্রম চূড়ান্ত করতে আমাদের বেশ সময় লাগলো। কিন্তু তারও অতিরিক্ত সময় যেন অপরিহার্য হয়ে গেল, সন্দেহ জাগলো যে নির্বাচন দূরে ঠেলে আবার না সেনা বা সেনা সমর্থিত শাসন শুরু হয়ে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, অনেক সময় ভালো কাজ মন্দে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ইয়াজুদ্দিন রোবটের অত্যাচারে তখন আমরা অতিষ্ঠ। অর্থাৎ বেগম খালেদা যখন তা কুমতলব হাসিলের উপায়ে প্রতিষ্ঠিত, তখন তারই প্রিয় এক জেনারেল মঈন ইয়াজুদ্দিনের কর্মকা- আর জালিয়াতি থেকে জাতিকে দিলেন মুক্তি। কেমন করে জানি একজন উপযুক্ত প্রশাসক তিনি বিশ^ব্যাংকে চাকরি করছিলেন ড. ফখরুদ্দিন আহমদকে তিনি আবিষ্কার করে তাকে সরকারপ্রধান নিযুক্ত করলেন। ড. ফখরুদ্দিন অবশ্য দুই নেত্রীর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা যেভাবেই হোক বিলম্বিত করে দায়িত্ব নিলেন। ড. ফখরুদ্দিন বাংলাদেশে যখন চাকরি করতেন তখন একজন সুশাসকের খ্যাতি আহরণ করেন। তাই তার সরকার আমলে তার সুশাসনের জন্য ব্যাপক কর্মকা- শুরু হয়ে গেল। আর নির্বাচনী ডামাডোল যেন গৌন হয়ে গেল। প্রশ্ন উঠল এটা কী গণতন্ত্র প্রবর্তনের নীলনকশাকে বানচালের একটি ষড়যন্ত্র। যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধ বয়স তিন মাস বেঁধে দেওয়া ছিল, তা হয়ে গেল বছরের বেশি। তার এই প্রশ্নের সমাধান পাওয়া গেল ড. ফখরুদ্দিনের পক্ষ থেকে। তিনি জানিয়ে দিলেন যে ২০০৮ সালের অতিরিক্ত একদিনও ক্ষমতায় থাকবেন না। অবশেষে ২০০৮ সালেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলো। ভোটার তালিকা হলো ফটো সম্বলিত। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দুদিনে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা হলো। ভোটের বাক্সের যথেষ্ট দূরত্বে হলো দলীয় ভোট দফতর। সেনাবাহিনী থাকল প্রায় সর্বত্র। তবে কিছু কিছু নির্দিষ্ট কেন্দ্রে তাদের হাজিরা ছিল বেশি। তারা ভোটকেন্দ্রে মোটেই যায়নি, তার এলাকায় টহল দিয়ে বেড়ায় এবং সেটাই ছিল যথেষ্ট ও যথোপযুক্ত। অবশেষে সত্তরের নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের ৩৮ বছর বয়সে হলো একটি চমৎকার, অবাধ, নিরপেক্ষ ও ৭৫ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণে জননন্দিত একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে তারপরে দুটো নির্বাচন সম্পাদিত হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন যেখানে নির্বোধ বেগম খালেদা খামাকা একটি সময়ে বয়কট পালন করলেন, সেটা সুসম্পন্ন হয়েছে। আবার সেদিন ২০১৯ সালে হয়েছে দ্বিতীয় সুসম্পাদিত নির্বাচন। অবশ্য এর মধ্যে আমাদের দুষ্টু বুদ্ধি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অতিভক্তি ও অত্যুৎসাহের কারণে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
PsM4আমার কথকতা একটি সুন্দর কাহিনি এখানে উপস্থাপন করল। এই কাহিনি বলতে আমি খুবই খুশি এবং বাস্তবেই খুব গর্ববোধ করি। তবে যে অশনি সংকেত এবারের নির্বাচনে পাওয়া গেছে যেখানে বিরোধী দল মাত্র কয়েকটি আসন জিতেছে সেটি কোনোমতেই শুভ নয়। অত্যুৎসাহী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অতিভক্তি ও গভীর ভালোবাসাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। এর উপশম একান্তই কাম্য। কারণ এর বিকল্প হচ্ছে একদলীয় শাসন অথোরোপেরিয়ান সরকার, যার প্রতিফল হলো মহাপ্রলয়। মহাপ্রলয় আমরা কোনোমতেই চাই না। আমরা বেশ কম সময়ে স্বল্পোন্নত আয়ের দেশ থেকে উত্তরণে সক্ষম হয়েছি। আমাদের নেত্রী আমাদের জন্য নতুন লক্ষমাত্রা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন। আমরা আগামী ২০ বছরে ২০৪১ সালে হব একটি সুখী শান্তিপ্রিয় সমৃদ্ধ দেশÑ যেখানে কোনো দারিদ্র্য থাকবে না। হ্যাঁ, ৭-৮ শতাংশ লোক অবশ্যই রাষ্ট্রীয় সহায়তায় খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারবে। এমন সুন্দর ভবিষ্যৎ আমি বাস্তবে হয়তো দেখতে পাব না। কারণ ইতোমধ্যেই তো আমি ৮৫ অতিক্রম করেছি। তবে এটা হবে, এটা একেবারেই সম্ভব ও নিশ্চিত সে-ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। জয় হোক বাংলাদেশের, জয় হোক শেখ হাসিনা।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*