বিভাগ: অন্যান্য

হাইড্রোজেন বোমায় ধ্বংস হতে পারে সারাবিশ্ব!

পৃথিবীর ৩টি শক্তিশালী বোমার মধ্যে হাইড্রোজেন বোমা সর্বাধিক ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি নিউট্রন ও পারমাণবিক বোমার চাইতে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী। সাধারণভাবে একেকটি পারমাণবিক বোমার একেক ধরনের ধ্বংসের ক্ষমতা রয়েছে। কোনোটি গাছপালার কোনো ক্ষতি করে না, শুধু প্রাণী ধ্বংস করে।

10-9-2017 8-28-12 PM অনিরুদ্ধ অনিন্দ্য: ঘটনা উত্তর কোরিয়ায়। ঘটেছে ৩ সেপ্টেম্বর। উত্তর কোরিয়া ‘হাইড্রোজেন বোমা’ ফাটিয়েছে। তাই নিয়ে সারাবিশ্বের পরাশক্তির দেশগুলো নড়েচড়ে বসেছে। ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-যুক্তরাজ্যের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বিশ্ববাসীর জন্যও তা যথেষ্ট উদ্বেগের।
উত্তর কোরিয়ার জন্য এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও ৬টি পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করেছে। তবে এবারের ঘটনা প্রবাহিত হচ্ছে সভ্যতা ধ্বংসের চোরাবালিতে। কারণ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ওই দিন পারমাণবিক যে পরীক্ষাটি তারা চালিয়েছেÑ তা ছিল সবচেয়ে সফল পরীক্ষা। ওই পরীক্ষায় উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন চীনের কিছু এলাকাতেও ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছিল। জরিপ অনুযায়ী রিক্টার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল প্রায় ৬.৩ এবং তা আঘাত করেছে ভূগর্ভের ১০ কিলোমিটার নীচ পর্যন্ত। এই মাত্রার ভূকম্পনে পরিষ্কার যে উত্তর কোরিয়া যে পরীক্ষাটি কিলজু এলাকায় করেছে; তা ছিল একটি হাইড্রোজেন বোমা। পারমাণবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা যদিও তা নিশ্চিত করে বলেন নি। তবে ভূগর্ভে যে ধরনের কম্পন সৃষ্টি হয়েছে তাতে মনে হয় আগের যে কোনো পরীক্ষার চেয়ে বস্তুটি অনেক শক্তিশালী ছিল।
10-9-2017 8-26-00 PMউত্তর কোরিয়ার দাবিÑ তারা হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা করেছে। আরও জানিয়েছে এটি কোনো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও বহন করা যাবে। এই ঘটনা সত্যি হলে; তা যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া এবং তার মিত্রদের জন্য বিষয়টি বড়ই উদ্বেগের। প্রকারান্তরে এই পরীক্ষাটি চালিয়ে উত্তর কোরিয়া জানিয়ে দিয়েছে আমেরিকার হুমকি-ধমকি এবং নিষেধাজ্ঞায় দেশ সংকটে পড়লে; তারা চুপ করে বসে থাকবে না। কারণ নানামুখী প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া বিস্ময়করভাবে দ্রুতগতিতে পারমাণবিক অস্ত্র আবিষ্কারে এগিয়ে যাচ্ছে। যা সারাবিশ্বের জন্যই এক অশনিসংকেত। এই নিয়ে এখন সারাবিশ্বে চলছে তোলপাড়।
পৃথিবীর ৩টি শক্তিশালী বোমার মধ্যে হাইড্রোজেন বোমা সর্বাধিক ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি নিউট্রন ও পারমাণবিক বোমার চাইতে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী। সাধারণভাবে একেকটি পারমাণবিক বোমার একেক ধরনের ধ্বংসের ক্ষমতা রয়েছে। কোনোটি গাছপালার কোনো ক্ষতি করে না, শুধু প্রাণী ধ্বংস করে। আবার কোনোটি প্রাণী-গাছপালা সব কিছুই ধ্বংস করে দেয়। এ ধরনের বোমা বিস্ফোরণের ফলে নির্দিষ্ট অঞ্চল তো বটেইÑ এমন কি আশপাশের বহু এলাকাও হয়ে ওঠে বসবাসের অযোগ্য।
১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় প্রশান্ত মহাসাগরের এনিউইটা দ্বীপে। এরপর ১৯৫৩ সালে এই বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন)। তাদের দেখাদেখি ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চীনও হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। সেখানে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার নামও। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও চীনের কাছে হাইড্রোজেন বোমা আছে। সেখানে এখন নতুন করে যুক্ত হতে পারে উত্তর কোরিয়ার নামও। উপমহাদেশের শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকলেও তাদের থার্ম-নিউক্লিয়ার অর্থাৎ হাইড্রোজেন বোমা নেই বলেই ধারণা করা হয়। এসব দেশের বাইরে ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। থাকতে পারে হাইড্রোজেন বোমাও। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল তা কখনও স্বীকার করেনি। পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮টি দেশ প্রায় ২ হাজার বার পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে।
১৯৬২ সালে সাবেক সেভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইলে হাইড্রোজেন বোমা ব্যবহারে সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়েই ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু বিশ্ব রক্ষায় অন্যান্য দেশ এগিয়ে আসায় তা থেমেছিল। বরং বিশ্ব শান্তিচুক্তির সম্পাদনের বিষয়টি সামনে চলে আসে। ফলে ১৯৬৩ সালে বিশ্ব শান্তি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য ভূমিতে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা নিষিদ্ধের ব্যাপারে একটি চুক্তি সম্পাদন করে। পরবর্তীতে সেখানে অন্যান্য পরাশক্তির দেশও শামিল হয়েছে। সর্বশেষ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯০ সালে ভূগর্ভে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালায়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া হওয়ার পর আর কখনও তারা পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালায় নি। তবে ১৯৯১ সালে যুক্তরাজ্য, ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ১৯৯৬ সালে চীন এবং ফ্রান্স শেষবারের মতো পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালিয়েছিল। তবে দুঃখের বিষয় গেল দশকে কোল্ড ওয়ারের সময় পরাশক্তির রাষ্ট্রগুলো তাদের অস্ত্র ভা-ারে আরও পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাইড্রোজেন বোমাটি আছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, যার ওজন ১ দশমিক ২ মেগাটন বা ১২ লাখ টন। তবে অনেক ছোট আকৃতির হাইড্রোজেন বোমাও বিধ্বংসী হতে পারে। আর ছোট আকৃতির হাইড্রোজেন বোমা সহজেই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার করা যায়। এখানেই সবচেয়ে ভয়ের কথা। ধারণা করা হয়, ৬ হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে এমন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর কোরিয়ার কাছে আছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কোরিয়ানদের পক্ষে সহজেই চীন, রাশিয়া ও আলাস্কায় আঘাত হানা সম্ভব।
হাইড্রোজেন বোমা আসলে থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা নামেও পরিচিত। নক্ষত্রের যে প্রক্রিয়ায় আলো তৈরি হয়, হাইড্রোজেন বোমা ঠিক সেই প্রক্রিয়ায় কাজ করে। হাইড্রোজেন বোমায় নিউক্লিয়াস একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় ৪টি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসকে সংযুক্ত করে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস গঠন করে। এই একীভূতকরণের সময় প্রচ- তাপ সৃষ্টি হয়। এর ভেতরে একটি এটমবোমাও থাকে। বিস্ফোরণের আগে বোমার ভেতরে ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্যই একে ধরে রাখে। মূল বোমাটি বিস্ফোরণের আগেই ভেতরে থাকা এটম বিস্ফোরিত হয়। ফলে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এই তাপমাত্রাতেই ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম মিলে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। তাতে তাপমাত্রা হাজার গুণ বেড়ে যায়। এই বিস্ফোরণে শুধু হিলিয়ামই উৎপন্ন হয় না, সাথে সাথে নিউট্রনও উৎপাদিত হয়। হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণে লাখ লাখ ডিগ্রি তাপমাত্রার সৃষ্টি হয়। কারণ দুটি বিস্ফোরণই প্রায় একই সময়ে ঘটে।
পরমাণু বিজ্ঞানীরা হাইড্রোজেন বোমার অন্য নাম ‘থার্মোনিউক্লিয়ার ডিভাইস’। এটি দ্বিতীয় প্রজন্মের আণবিক বোমা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত আণবিক বোমাগুলোকে বলা হয় প্রথম প্রজন্মের, যেখানে ছিল একটিমাত্র বিস্ফোরণ ব্যবস্থা। আর দ্বিতীয় প্রজন্মের হাইড্রোজেন বোমায় থাকে দুটি বিস্ফোরণ ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত আণবিক বোমাটি ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শক্তি নির্গত করেছিল। অন্যদিকে হাইড্রোজেন বোমায় দুটি বিস্ফোরণ ব্যবস্থা থাকায় আরও বেশি এলাকাজুড়ে এর ধ্বংসলীলা ছড়িয়ে দিতে পারে। মূলত ফিউশন ব্যবহার করে হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করা হয়ে থাকে। প্রচ- তাপ উৎপাদনের কারণে হাইড্রোজেন বোমা পরমাণু পেতে নিউক্লিয়ার চেইন তৈরি করে। এই কারণে একে তাপ প্রয়োগিক পারমাণবিক অস্ত্রও বলা হয়ে থাকে। হাইড্রোজেন বোমা কখনও কখনও হাজার গুণ শক্তিশালী হয়ে থাকে। একবার বিস্ফোরণের পর তাপ বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে পারমাণবিক বিচ্ছুরণ বেড়ে যায়। সেই সাথে এর শক্তি এবং ধ্বংস ক্ষমতাও বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পায়।
ইতিহাসে মাত্র দুবার পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফাটানো হয়েছিল। ১৯৪৫ সালের ৬ এবং ৯ আগস্টে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ‘লিটল বয়’ আর ‘ফ্যাট ম্যান’ নামে দুটি পরমাণু বোমা ফেলেছিল আমেরিকা। ওই পরমাণু হামলায় প্রায় ২ লাখ লোক মারা যায়। আহত হয়েছেন প্রায় ৭ লাখ মানুষ। এখনও এই দুই অঞ্চলে বংশানুক্রমে অন্ধত্ব, বধিরতা ও পঙ্গুত্বের মতো নানা ধরনের জটিল অসুখ দেখা দেয়। অর্থাৎ, ৭২ বছর পরও পারমাণবিক বোমার রেশ কাটেনি। সেই তুলনায় হাইড্রোজেন বোমা পারমাণবিক বোমার চেয়ে কমপক্ষে ১০ গুণ ভয়ঙ্কর। কখনও কখনও এটি ১ হাজার গুণ পর্যন্ত হতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার পরীক্ষা করা হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণ-পরবর্তী ভূমিকম্পের তীব্রতা অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের নাগাসাকি শহরে ফেলা যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার চেয়ে ৫ গুণ বেশি শক্তিশালী। উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’Ñ সারাবিশ্বে এই স্লোগান ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকলেও পৃথিবীতে অনেক দেশই নানাভাবে যুদ্ধ বাধিয়ে রাখছে। আর যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রমত্ত হয়েই অমানবিক কাজ করেছে। যেমনÑ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা দিয়ে আঘাত হেনেছিল। যা মানব সভ্যতার জন্য ‘কালিমা’ হয়ে রয়েছে। একটি সুসংবাদ তারপরও থাকলে বিশ্বে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করা হলেও এখন পর্যন্ত হাইড্রোজেন বোমার ব্যবহার হয়নি। আর ভয়াবহ সংবাদÑ হাইড্রোজেন বোমা পৃথিবীকে নিয়ে যাবে ধ্বংসের কাছাকাছি।

লেখক : বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষক ও প্রাবন্ধিক

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*