বিভাগ: ক্রীড়া

হেরেও শ্রীলংকা জয় বাংলাদেশের

4-5-2018 7-25-46 PMআরিফ সোহেল: এমন হার অবশ্যই গৌরবেরÑ এমন বাক্যে কেউ আহত হবেন না। কারণ ফাইনালে ১৬৬ রানের পর ভারতের মতো দলকে জিততে বিশ্ব রেকর্ড করতে হয়েছে। শেষ বলে ছক্কায় বাংলাদেশের নিশ্চিত জয় নিশ্চিত ছিনিয়ে নিয়েছে।
নিদাহাস ট্রফির চকচকে ট্রফিটা নাইবা ছুঁয়ে দেখতে পেরেছেন সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা। কিন্তু তারপরও বলতে দ্বিধা নেই বাঙালির জাতীয় জীবনের গৌরবের স্বাধীনতার মাস মার্চে দুর্দান্ত লড়াইয়ে বিশ্ব ক্রিকেটপ্রেমীদের মন ছুঁয়ে দেখেছেন।
বাংলাদেশের ঘরের মাঠে ত্রিদেশীয় সিরিজের ব্যর্থতার সঙ্গে যোগ হয়েছিল শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি সিরিজের হার। ক্রিকেট যেভাবে চলছিলÑ তাতে দলের তথা ক্রিকেটপ্রেমী বাঙালির মানসিক অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত। নিদাহাস ট্রফিতে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল বেজায় শঙ্কার। বাড়তি দুর্ভাগ্য যোগ হয়েছিল অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের চোট; অনুপস্থিতি। সেই অবস্থা থেকে স্বাগতিক শ্রীলংকার বিপক্ষে দুটি দুর্দান্ত জয়; ফাইনালে ওঠাÑ রীতিমতো ভীতি ছড়িয়েছিল টপ-টু-বটম ব্যাটিং শক্তির ভারতীয় শিবিরে। ফাইনালে বাংলাদেশের মোটামুটি ব্যাটিংয়ের পর হাওয়া উড়তে থাকা ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন মুস্তাফিজ-রুবেল-সাকিবরা। এমন হারে মান যায়নি। ক্রিকেটপ্রেমীরা গর্বই করছেন বীর বাঙালিদের নিয়ে। পরাক্রমশালী ভারত সঙ্গে কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের গ্যালারি-ভর্তি দর্শকের বিপক্ষেও লড়াই করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। কারণ ফাইনালে না উঠতে পারার বেদনা।
আন অফিসিয়াল সেমিফাইনালে ২১৫ প্লাস রান করেও শেষ পর্যন্ত মাহমুদউল্লাহর বিস্ময়কর বীরত্বের কাছে শ্রীলংকা হেরেছিল। মাহমুদউল্লাহ ছক্কা মেরে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেছিলেন। ঠিক সেভাবেই ভারতে দিনেশ কার্তিক বাংলাদেশকে কাঁদিয়েছে ওভার বাউন্ডারিতে। ভারতীয় দলের ড্রেসিংরুমকে শেষ বল পর্যন্ত উৎকণ্ঠায় রেখেছিল বাংলাদেশ। সত্যিকার অর্থেই ১৮ মার্চ দিন শেষে জিতেছে ক্রিকেটই। এ নিয়ে ৫টি ফাইনালের ট্রফি হাতছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের।
ফাইনাল ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রোমাঞ্চকর। এক মুহূর্তে মনে হয়েছে ভারতই জিতবে, পরের মুহূর্তেই বাংলাদেশ। সেটি বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন মোস্তাফিজ। শেষ ৩ ওভারে ৩৫ রান দরকার ছিল ভারতের। মোস্তাফিজের প্রথম ৪ বলই ডট, পরের বলে ১ রান। শেষ বলে আউট মনীষ পান্ডে। কিন্তু রুবেলের ৩ বলেই আবারও ভারত ফেভারিট! প্রথম বলেই ছক্কা, পরের বলে চার, আবার ছক্কা! ১২ বলে ৩৪ রান থেকে ৯ বলে ১৮ রানের দূরত্বে ভারত। রুবেলের করা ১৯তম ওভারে ভারত তুলে নিয়েছিল ২২ রান। শেষ ওভারে মাত্র ১২ রান লাগবে ভারতের। শ্রীলংকার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঠিক ১২ রানই দরকার ছিল। শেষ ওভারে সৌমের প্রথম বলটা ওয়াইড। ৬ বলে ১১ রান। ডট, ১। ৪ বলে ১০ রান! আবারও ১, ৩ বলে ৯ রান। চতুর্থ বলে দুর্ভাগ্যক্রমে ৪, ২ বলে ৫ রান। পরের বলে আউট। আর শেষ বলে ৫ রান দরকার ভারতের। কার্তিকের এক ছক্কায় শেষ হয়ে গেল! ৮ বলে ২৯ রানের এক ইনিংসে বাংলাদেশের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।
ব্যাটিংয়ে সুবিধে হয়নি বাংলাদেশের। সেখানে আলাদা ছিলেন সাব্বির রহমান। তার ওপর মাহমুদউল্লাহর ২১। পাওয়ার প্লেতে মাত্র ১১ বল আর ৬ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলার ধাক্কাটা যে বাংলাদেশকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছিল। ৩৩ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর মুশফিক-সাব্বিরের ৩৫ রানের জুটিটা ধাক্কা সামলেছিল। কিন্তু এই ৩৫ রান তুলতে ৩১ বল লাগিয়ে ফেলায় ১০ ওভারে মাত্র ৬৮ রান তুলতে পেরেছিল বাংলাদেশ। আউট হওয়ার আগে সাব্বির ৭ চার ও ৪ ছক্কার ৫০ বলে করেছেন ৭৭ রানে। তবে শেষ ওভারে মিরাজের (১৯) কল্যাণে বাংলাদেশ স্পর্শ করেছিল ১৬৬ রান।
২০১২ সালে এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠে শেষ পর্যন্ত ২ রানের দুঃখজনক হার সঙ্গী হয় বাংলাদেশের। এর আগে ২০০৯ সালে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে জয়ের সুবাস পেয়েও শ্রীলংকার কাছে হেরে গিয়েছিল তারা। ২০১৬ এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি ও সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে হেরেছে বাংলাদেশ।

বর্ণিল আয়োজনে শেষ হলো প্রথম যুব গেমস
বর্ণিল আয়োজন আনন্দ-উৎসবের মাঝে শেষ হয়েছে প্রথম জাতীয় যুব গেমস। অনূর্ধ্ব-১৭ বছর বয়সী প্রতিযোগীদের নিয়ে আয়োজিত জাতীয় যুব গেমস ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল সারাদেশে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের লড়াই শেষে গেমসের চূড়ান্ত পর্ব হয়েছে রাজধানী ঢাকায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। আগামী দিনের প্রতিভাময়ী ক্রীড়াবিদ খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের এই বৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞে প্রায় অর্ধ লক্ষ ক্রীড়াবিদ, প্রশিক্ষক এবং সংগঠকের অংশগ্রহণে সারাদেশে যুব জাগরণের বার্তা দিয়েছে। চার মাসব্যাপী এই আসরের ৩টি পর্বে মেতেছিল পুরো দেশ। জেলা এবং বিভাগীয় পর্বের সফল আয়োজন শেষে রাজধানী ঢাকাতে শেষ হলো আসরটি। আট বিভাগের অংশগ্রহণে চূড়ান্ত পর্বে পদকের লড়াইয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে রাজশাহী। খুলনা হয়েছে রানার্সআপ। চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্সআপ দল পেয়েছে বিশেষ ট্রফি।
দেশের খেলাধুলায় নতুন সংযোজন যুব গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১০ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে তার আসন গ্রহণের পর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল আনুষ্ঠানিকতা। ডিজে শো, ডিসিপ্লিনের ক্রীড়াবিদের মার্চপাস্ট, ডিসপ্লে বোর্ডে প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশের খেলাধুলার বিভিন্ন সাফল্য নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র, লেজার শো, গীতি নৃত্যানুষ্ঠান, বর্ণিল আতশবাজি ভিন্ন আমেজ সৃষ্টি করে।
প্রথম যুব গেমস আয়োজনের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এখানে অনেকেই হয়তো প্রথম রাজধানীতে এসেছে। খেলাধুলার মাধ্যমে একদিন অলিম্পিকে খেলার সুযোগ পাবে। খেলাধুলায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। খেলাধুলা শৃঙ্খলাবোধ শেখায়, অধ্যবসায় শেখায়, দায়িত্ববোধ তৈরি করে, কর্তব্যপরায়ণতা শেখায়। পড়ার সঙ্গে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা একান্ত প্রয়োজন। ক্রীড়াপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ক্রিকেটে একদিন বিশ্বকাপ জিতবে বাংলাদেশ। খেলাধুলায় নারীরাও পিছিয়ে নেই। বয়সভিত্তিক নারী ফুটবলের সাফল্য, বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে খেলা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার খেলাধুলার প্রসারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দেশীয় খেলার চর্চার জন্যও নজর দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, তার পরিবার খেলাধুলার সঙ্গে সব সময় সম্পৃক্ত ছিল।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রেখেছেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। বক্তব্য  রেখেছেন গেমসের সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী শ্রী বীরেন শিকদার এমপি। উপস্থিত ছিলেন বিওএ-র মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা, সহ-সভাপতি বশির আহমেদ মামুন, উপ-মহাসচিব আসাদুজ্জামান কোহিনুর ও কোষাধ্যক্ষ কাজী রাজিবউদ্দিন আহমেদ চপল।
আসরের শুরু হয়েছিল গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ভবিষ্যতের ক্রীড়াবিদ খুঁজে বের করার মিশন সামনে রেখে। ২৩ হাজার ২১০ জন অংশ নিয়েছেন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে। ২ হাজার ৬৬০ জন ক্রীড়াবিদ উঠে এসেছিলেন চূড়ান্ত পর্বে। শেষ পর্বে ১৫৯টি ইভেন্টে ১ হাজার ১১২টি পদকের জন্য লড়াই করেছেন তারা। অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, ফুটবল, কাবাডি, বাস্কেটবল, ভলিবল, হ্যান্ডবল, হকি, টেবিল টেনিস, ভারোত্তোলন, কুস্তি, উশু, শুটিং, আরচারি, ব্যাডমিন্টন, বক্সিং, দাবা, জুডো, কারাতে, তায়কোয়ান্দো ও স্কোয়াশে ৩৪০টি স্বর্ণ, ৩৪০টি রৌপ্য এবং ৪৩২টি ব্রোঞ্জ পদকের জন্য লড়েছেন তারা।
সমাপনী অনুষ্ঠানেও ছিল নানা আয়োজন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ১৬ মার্চ যুব গেমসের সমাপনী ঘোষণা করেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিওএ-র সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার এমপি। এ সময় বিওএ-র মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা উপস্থিত ছিলেন।
যুব গেমস আয়োজনের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। এই গেমস থেকে আমরা পেয়েছি এমন কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড়, যারা ভবিষ্যতে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*