৭ মার্চের ভাষণ : বিশ্বের কণ্ঠস্বর

যে  ভাষণটি বদলে দিয়েছিল একটা গোটা জাতির স্মৃতিসত্তা ভবিষ্যৎ, যেটি ছিল একান্তই একটি ভূখ-ের মানুষের ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ের ভাগ্য নির্ধারণের ইতিকর্তব্যের নির্দেশিকা, ৪৬ বছর পর সেই ভাষণটি হয়ে গেল সমগ্র বিশ্বের অভিন্ন ঐতিহ্য। মানব জাতির অভিন্ন সম্পদ। বলছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের কথা। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো গত ৩১ অক্টোবর প্যারিসের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত সভায় আরও ৭৬টি বিষয়ের সাথে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকেও ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল হেরিটেজ রেজিস্টার’ ঘোষণা করেছে। এই বাক্যটির কেউ অনুবাদ করেছে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে, কেউ লিখেছে ‘বিশ্বের জাতিসমূহের স্মৃতিময় ঐতিহ্যের নিবন্ধন’। যে নামেই বলা হোক, ৭ মার্চের ভাষণ, এখন বিশ্ব ইতিহাসে মানব জাতির দালিলিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেল।
জাতির পিতার যে ভাষণটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিক-নির্দেশিকা হিসেবে একটা জাতি-রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মূল প্রেরণা হয়েছিল, তাকে এভাবে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি দান, বাঙালি জাতিকে, বাংলাদেশকে নবতর গৌরবের আসনেই কেবল অভিষিক্ত করেনি; এই ভাষণ এখন বিশ্ব ইতিহাসের অংশ হিসেবে অন্যান্য দেশ ও জাতির কাছে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণকে বিরল স্বীকৃতি ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইউনেস্কোকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমরাও প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দনের প্রতিধ্বনি করে ইউনেস্কোর সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
জাতি হিসেবে আমরা নিঃসন্দেহে গর্বিত যে, বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে ১৯৯৯ আমাদের ভাষা সংগ্রামের রক্ত¯œাত দিন ২১শে ফেব্রুয়ারি যেমন ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবসের গৌরব অর্জন করেছিল, তেমনি তার তৃতীয় মেয়াদের শাসনামলে, ২০১৭ সালে বাঙালির গর্বিত মস্তকে আরেকটি গৌরবের পালক যুক্ত হলো।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইতোমধ্যেই বিশ্ব ইতিহাসের ৫০টি সেরা ভাষণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু অন্য যেসব বিশ্বখ্যাত ভাষণের কথা বলা হয়, সেগুলো ছিল লিখিত ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এটি কোনো লিখিত ভাষণ নয়। মাত্র ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের এই ভাষণটিতে শব্দচয়নে, বাক্যবিন্যাসে যেমন কোনো পুনরুক্তি নেই, তেমনি রেসকোর্স ময়দানে ১০ লাখ লোকের উদ্বেলিত জনসমুদ্রে ভাষণদাতা বঙ্গবন্ধুর দেহের ভাষা বা বডি লেঙ্গুয়েজ ও উচ্চারণে, কণ্ঠস্বরের উঠানামায় সর্বোপরি ধ্বনিব্যঞ্জনাÑ সবটাই ছিল অনবদ্য এবং প্রেরণাদায়ক।
৭ মার্চের ভাষণের প্রকৃত তাৎপর্যটিই এটিকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দান করেছে। বস্তুত, এই ভাষণটিকে বলা যেতে পারে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ম্যাগনাকার্টা। অনন্য সাধারণ কুশলতার সঙ্গে এই ভাষণে যেমন বাংলাদেশের সংগ্রামমুখর জনগণের প্রকৃত আশা-আকাক্সক্ষাকে প্রতিধ্বনি করেন; তেমনি বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ এড়ানোর জন্য স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিয়েও, দেশবাসীকে এই সংগ্রামের প্রকৃত লক্ষ্য কী তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বঙ্গবন্ধুর এই অবিনাশী জলদগম্ভীর উচ্চারণই নির্ধারণ করে দিল ’৭১-এর গণসংগ্রামের চরিত্র ও লক্ষ্য। জনগণ এ কথা থেকেই বুঝে নিল এই সংগ্রামকে কোন পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। ভাষণের অন্য যে গুরুত্বপূর্ণ দিক তা হলো, ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশিকা। বঙ্গবন্ধু সংগ্রামের শান্তিপূর্ণ ও সশস্ত্র দুটি পন্থাই খোলা রেখে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর কাছে সুনির্দিষ্ট সমাধান সূত্র তুলে ধরেন।
বঙ্গবন্ধু ভাষণে শর্ত দিয়ে বলেন, সামরিক আইনÑ মার্শাল ল’ প্রত্যাহার করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। আর তা যদি করা হয় তাহলেই ভেবে দেখব গোলটেবিল বৈঠকে যাব কি যাব না। সমস্যার এই শান্তিপূর্ণ সমাধানের অর্থ হলো, সাময়িক শাসনের অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত কুশলী নেতার মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই বার্তাই দিতে চাইলেন যে বিচ্ছিন্নতা নয়, সংঘাত ও রক্তপাত নয় এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অখ-তা রাখতে হলে এই লেজেটিমেট গণতান্ত্রিক দাবি মানলেই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব। কিন্তু যেমন বঙ্গবন্ধু জানতেন, তেমনি ১৯৭১ সালে প্রতিটি বাঙালি জানতো পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পক্ষে এই দাবি মেনে নেওয়া অর্থাৎ আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
অতঃপর খোলা থাকে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ। বঙ্গবন্ধু এটা বুঝতে পেরেই একটা নিরস্ত্র জাতিকে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সামরিক জাতিতে পরিণত করার লক্ষ্য স্থিল করলেন। তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোলা রেখেও বাংলার জনগণকে সশস্ত্রযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার দিক-নির্দেশনা দিলেন। তার ভাষণে তিনি তার গ্রেফতার হওয়ার বা মৃত্যুর ঝুঁকির কথা মনে রেখেই বললেন, “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমাদের উপর/কাছে আমার নির্দেশ রইলো, তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। … ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।” ইত্যাদি…
বাঙালি জাতি বুঝে নিল তাদের কী করতে হবে। দেশবাসী ২৫ মার্চের হামলা বা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার অপেক্ষা না করেই প্রকাশ্যে/গোপনে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করল। বঙ্গবন্ধুর এই সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল বলেই, ১৯৭১ সালে তার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলে বাঙালি মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা। একটি ভাষণের কী যাদুকরি ক্ষমতা, মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে তা প্রমাণ হয়ে যায়।
জাতিসংঘ ও ইউনেস্কো তাই সঠিক কাজটিই করেছে। মনে রাখতে হবে এটা কেবল একটি ঐতিহাসিক ভাষণের দালিলিক স্বীকৃতিমাত্র নয়, জাতিসংঘের এই স্বীকৃতির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে চায়, যারা বঙ্গবন্ধুকে হেয় করে ইতিহাস বিকৃত করতে চায়, যারা ‘স্বাধীনতার’ কৃত্রিম ঘোষক বানাতে চায়, তাদের সকল অপচেষ্টা আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হলো; ইতিহাসের মুক্তি ঘটল। হাত দিয়ে যে সূর্যকে আড়াল করা যায় না, সেই সত্যই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো। বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতির মাথা শিখর স্পর্শ করল।

Category:

Leave a Reply