ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে অপুষ্টির হার কম

11-6-2018 5-44-26 PM

11-6-2018 5-44-26 PMউত্তরণ ডেস্ক: বিশ্বের উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সুষম উন্নয়ন সূচকে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মানবসম্পদ উন্নয়নে এগিয়ে থাকার পর এবার ক্ষুধা দূর করার ক্ষেত্রেও ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশ। ক্ষুধা দূরীকরণে গত বছরের তুলনায় দুই ধাপ অগ্রগতি হয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বের ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবার ৮৬তম, যা গত বছর ছিল ৮৮তম। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০১৮-তে এই তথ্য মিলেছে। যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ও জার্মানভিত্তিক সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড। সম্প্রতি প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে ক্ষুধার সংজ্ঞা নির্ধারণে ৪টি সূচককে আমলে নেওয়া হয়েছে। অপুষ্টি, খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা, কৃশকায় বা শীর্ণকায় শিশু ও শিশুমৃত্যুর হার। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়েছে ভারত; গত বছর ভারতের অবস্থান ছিল ১০০ নম্বরে, এবার ১০৩ নম্বরে। ভারতের চেয়েও তিন ধাপ পেছনে ১০৬ নম্বরে রয়েছে পাকিস্তান। দেশটি গত তিন বছর ধরে একই অবস্থানে রয়েছে। তবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে নেপাল (৭২), মিয়ানমার (৬৮) ও শ্রীলংকা (৬৭)। এবার সূচকে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা তিন দেশ হলোÑ বেলারুশ, বসনিয়া ও চিলি। সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকা ও ইয়েমেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ুও এ দুটি দেশের চেয়ে বেশি। মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, স্কুলে পাঠ গ্রহণ এসব খাতে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে গেছে। তবে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে মাথাপিছু গড় আয় বাংলাদেশের অনেক কম। বাংলাদেশের মানুষ ভারত ও পাকিস্তানের মানুষের চেয়ে গড়ে বেশি দিন বাঁচে। মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ দশমিক ৮ বছর। গড় আয়ু ভারতে ৬৮ দশমিক ৮ বছর ও পাকিস্তানে ৬৬ দশমিক ৬ বছর। নবজাতক-মৃত্যু ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসেও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ১ হাজার জীবিত শিশু জন্মগ্রহণ করলে বাংলাদেশে ২৮ দশমিক ২ জন নবজাতক মারা যায়। ভারত ও পাকিস্তানে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৩৪ দশমিক ৬ এবং ৬৪ দশমিক ২। একইভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে ও বাংলাদেশ ভালো করেছে। বাংলাদেশে ১ হাজার জীবিত শিশুর মধ্যে পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগেই ৩৪ দশমিক ২ জন মারা যায়। পাকিস্তানে তা দ্বিগুণের বেশি, ৭৮ দশমিক ৮ জন। আর ভারতে ৪৩ জন। সন্তান প্রসবজনিত মাতৃমৃত্যু হারে অবশ্য তিন দেশই কাছাকাছি অবস্থানে। বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে পিছিয়ে, পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ গর্ভবতী মায়ের মধ্যে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে গড়ে ১৭৬ জন মারা যান। ভারত ও পাকিস্তানে এই সংখ্যা যথাক্রমে ১৭৪ ও ১৭৮। বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার অবশ্য এখন ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ। ভারতে তা ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশ ও পাকিস্তানে ৫৭ শতাংশ। অথচ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে ওই দুটি দেশের চেয়ে কম খরচ করে। নারীর ক্ষমতায়নেও এগিয়ে বাংলাদেশ।
ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বেশি। বাংলাদেশে সংসদে যত আসন আছে, এর মধ্যে ২০ দশমিক ৩ শতাংশই নারী প্রতিনিধি। পাকিস্তানে তা ২০ শতাংশ এবং ভারতে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। তাছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান মান বিবেচনা করলে বাংলাদেশের শিশুরা ভারত ও পাকিস্তানের শিশুদের চেয়ে বেশি উৎপাদনশীল হবে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের মানবসম্পদ সূচকে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এই সূচক অনুযায়ী, ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৬তম। ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ১১৫ ও ১৩৪তম। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে চলমান বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) যৌথ বার্ষিক সভায় বিশ্বব্যাংক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ ভালো করেছে। আরও ভালো করার সুযোগ আছে। কেননা, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে থাকলেও অন্যদেশগুলো আরও অনেক ভালো করছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার, শিশুদের স্কুলে পাঠ গ্রহণের সময়কাল, শিক্ষারমান, প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তত ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা এবং শিশুদের সঠিক আকারে বেড়ে ওঠাসহ বেশ কয়েকটি সূচক দিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আদর্শ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা পেলে একটি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে শতভাগ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারে। কিন্তু নিজ নিজ দেশে ভিন্ন ভিন্ন মানের সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী বেড়ে ওঠে শিশুরা। তাই সবাই সমানভাবে শত ভাগ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন শিশু বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গড়ে ৪৮ শতাংশ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারবে। আদর্শ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা পেলে তারা শতভাগ কর্মদক্ষতা দেখাতে পারত, সেখানে তারা অর্ধেকের কম দেখাতে পারবে। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তান এক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে। ভারতের শিশুরা ৪৪ শতাংশ ও পাকিস্তানের শিশুরা ৩৯ শতাংশ কর্মদক্ষতা দেখাতে পারবে।

শ্রেণী:

জেলহত্যার বেদনাবিধুর স্মৃতি

PM

শেষ পর্যন্ত একজন জেল বাসিন্দা জনাব তাজউদ্দীনকে জানালেন যে, জেলের বাইরে খুব গুজব, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে পাঠিয়েছেন যে, বিশিষ্ট নেতাদের জীবিত রেখে ক্যু-গ্রুপের লোকেরা ভুল করেছে এবং যত শীঘ্র সম্ভব তাদেরকে শেষ করে দেয়া উচিত।

PMবি. বি. বিশ্বাস: মাঝে মাঝে গুজব শোনা যেত যে, নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে বিশেষ করে জনাব তাজউদ্দীনকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চলছে। জনাব তাজউদ্দীনের কানেও সে কথা পৌঁছেছিল। কিন্তু তবুও তাকে নির্বিকার দেখা গেল। নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মাঠে প্রত্যহ তিন ঘণ্টা করে কাজ করেই চলেছেন।
শেষ পর্যন্ত একজন জেল বাসিন্দা জনাব তাজউদ্দীনকে জানালেন যে, জেলের বাইরে খুব গুজব, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে পাঠিয়েছেন যে, বিশিষ্ট নেতাদের জীবিত রেখে ক্যু-গ্রুপের লোকেরা ভুল করেছে এবং যত শীঘ্র সম্ভব তাদেরকে শেষ করে দেয়া উচিত। পাছে যিনি এ খবর তাকে দিয়েছেন তিনি চিহ্নিত হয়ে যান। এজন্য বেগম তাজউদ্দীন দেখা করে যাওয়ার পরই তিনি ব্যাপারটি প্রকাশ করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সবাই মনে করলেন যে, বেগম তাজউদ্দীন এ খবর দিয়ে গেছেন। এতখানি সুবিবেচনা তার ছিল।
১ নম্বর কামরার লোকদের কাছে পরে শুনেছি যে, এ খবর শোনার পর তিনি কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তার ব্যবহারে বা কথাবার্তায় অবশ্য আমরা তা বুঝতে পারিনি। নিয়মিত দাবা খেলা চলছিল। জোর আত্মবিশ্বাস তার ছিল যে, এভাবে বন্দিজীবন বেশিদিন তাকে কাটাতে হবে না। সবসময় আমাদেরকে অনুরূপ আশ্বাসও তিনি দিতেন।
মাঠ পরিষ্কার করার কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। অজস্র ইটের টুকরা মাটির সঙ্গে মিশে ছিল। নিজের হাতে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে কাঁচি দিয়ে সেগুলি প্রায় সব পরিষ্কার করে ফেলেছেন। তিন-চারবার করে একেক জায়গা থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন ঘাস লাগানোর পালা।
২ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে আমার জন্য অফিস কল এলো। ওইদিন ছিল রোববার। অফিস কলের কী কারণ থাকতে পারে চিন্তা করতে করতে পাহারাদারের সঙ্গে জেল অফিসে ঢুকলাম, শুনলাম জেলার ডেকেছেন।
জেলারের কামরায় ঢুকে দেখলাম, আরও চারজন লোক সেখানে বসা। তাদের কাউকেই আমি চিনি না। আমাকে কেন ডেকেছেন জিজ্ঞাসা করায় জেলার বললেন যে, তিনি দুঃখিত, আমাকে ঠিক ডাকেন নি। ডেকেছেন সিভিল সার্জন মি. সাহাকে। কিন্তু সাথে সাথে তিনি উপস্থিত অপরিচিত লোকদের কাছে আমার পরিচয় জানিয়ে দিলেন। ওই লোকগুলি খুব তীক্ষè দৃষ্টিতে আমাকে দেখলেন। সাথে সাথে ফিরে আসলাম।
একটু দুশ্চিন্তায় পড়লাম। যে কাগজের টুকরা পাহারাদার নিয়ে এসেছিল তাতে আমার নাম পরিষ্কারভাবে লেখা। আমাকে না ডাকলে আমার পরিচয়ই বা ওই লোকগুলির কাছে দেয়ার কি আবশ্যকতা! ওই লোকগুলিই বা তীক্ষèভাবে আমাকে দেখল কেন! সবই আমার কাছে হেঁয়ালির মতো মনে হলো। নতুন জেলে ফিরে এসে দেখি জনাব তাজউদ্দীন বাইরে একটু ফাঁকা জায়গায় চেয়ারে বসে আছেন। খুব গরম। তদুপরি তিনি প্রায় ঘণ্টা তিনেক কঠোর পরিশ্রম করেছেন বলে সম্ভবত বাইরের হাওয়ায় বিশ্রাম করছেন। জেলগেটের ঘটনার কথা বললাম। তিনি হেসে উঁড়িয়ে দিলেন। বললেন, ও কিছুই নয়।
তখন আমাদের পুরনো রান্নাঘরটির টিনের চালে নতুন টিন দেয়ার তোড়জোড় চলছে। বাইরে রান্নার চুলো বানানো হবে। বাবুর্চিরা তাই মাঠ থেকে মাটি নিয়ে চুল্লি বানানো শুরু করেছে। জনাব তাজউদ্দীন ক্ষেপে উঠলেন। বাবুর্চিদের খুব গালিগালাজ করলেন। তিনি এত পরিশ্রম করে ইটের টুকরা ফেলে দিয়ে সুন্দর মাটি বের করেছেন, তা কি বাবুর্চিদের সুবিধার জন্য? তিনি কি তাদের বাপের চাকর ইত্যাদি। বস্তুত আমাদের ঘরের পশ্চিম দিকে আরও একটা মাঠ আছে। বাবুর্চিরা ইচ্ছা                   করলে সেখান থেকে অনায়াসে মাটি আনতে পারত। কিন্তু পরিশ্রম না করে একদম কাছের মাঠ থেকে মাটি নেয়াকেই     তারা বেশি পছন্দ করেছিল।
দুপুরে কিছুক্ষণ জনাব তাজউদ্দীনের সঙ্গে দাবাও খেললাম। তাকে যেন সামান্য অন্যমনস্ক মনে হলো। দুপুরে খাওয়ার পর ব্রিজ খেলতে বসলে জনাব কামারুজ্জামান আমাদের কাছে এসে কিছুক্ষণ বসলেন। তাস খেলতে আহ্বান জানালাম। কিন্তু না খেলে কিছুক্ষণ শুধু দেখবার কথাই বললেন। কিছুক্ষণ পর চলে গেলেন তিনি। জেলখানায় আসার পর থেকেই রাতে ভালো ঘুম হচ্ছিল না। প্রথমত এখানে অত্যধিক গরম। এক কামরায় প্রায় ২০ জন লোক থাকি। দক্ষিণ দিকে বড় বড় লাগানো দরজা ঠিকই; কিন্তু উত্তর দিকে ছোট একটা ভেন্টিলেটর ছাড়া আর কিছুই নেই। হাওয়া তাই ভেতরে ঢোকে না। তদুপরি আমাদের কামরার সামনেই সমান্তরালভাবে একটা সেলের দালান। দ্বিতীয়ত পারিপার্শ্বিকতায় সম্পূর্ণ পরিবর্তন। এ মানসিক দুশ্চিন্তাও অন্য এক কারণ। এ ত্রিবিধ কারণে স্বভাবত ঘুম না হওয়ারই কথা।
বিশেষ করে প্রথম বেশ কিছুদিন গরমে অসহ্য কষ্ট পেয়েছি। দীর্ঘ ১৮ বছরের অভ্যাস পায়জামা পরে শোয়া। পায়জামা পরার জন্য গরম আরও বেশি লাগত। তাই বাসা থেকে লুঙ্গি আনিয়েছি। দীর্ঘদিন পর লুঙ্গি পরে অনেকটা আরাম পেলাম। তুলনামূলকভাবে গরমও কম লাগল।
ঘুম কম হয় বলে মাঝে মাঝে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতাম। ভেলিয়াম-৫ আমার পক্ষে খুব সুবিধাজনক ছিল। ২ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে একটা ভেলিয়াম খেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
হঠাৎ পাগলা ঘণ্টির আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। জেলখানায় কোনোরকম গোলযোগ বাধলেই জেল কর্তৃপক্ষ পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে দেয়। জেলে কোনো লোক হয় পালিয়ে গেছে অথবা কোথাও জেলবাসীদের মধ্যে মারামারি লেগেছেÑ এ ধরনের অস্বাভাবিক কিছু ঘটলেই পাগলা ঘণ্টি বাজানো হয়। কিছুক্ষণ পরই প্রজ্বলিত মশাল নিয়ে জেল পুলিশ দৌড়াদৌড়ি করে ঘুরে বেড়ায়। তারপর আসে লাঠি নিয়ে দল বেঁধে। দরকার হলে লাঠিপেটাও করা হয়। পাগলা ঘণ্টার পর সবসময়ই হুইসেল বাজতে থাকে। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে আবার সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ওইদিন রাত প্রায় ৩.৩০ মিনিটের সময় পাগলা ঘণ্টি বাজল। সাথে সাথে হুইসেলও বাজা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু ৪.১৫ মিনিটের মধ্যেও মশাল নিয়ে কোনো লোক এলো না। বাঁশি সমানে বেজেই চলল। আমরা খুব আতঙ্কিত হলাম। ঘরের সামনে দিয়ে যেসব জেল পুলিশ যাতায়াত করছিল, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও বিশেষ কিছু বোঝা গেল না।
একজন জেল পুলিশ বলল যে, সে জেলগেট দিয়ে ঢোকার সময় ডিআইজির গাড়ি গেটে দেখে এসেছে। তার অনুমান, অতর্কিত পরিদর্শনে আসার জন্যই পাগলা ঘণ্টি বেজেছে। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ঘুমের ওষুধের ক্রিয়া তখনও আছে। একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। হুড়মুড় করে কতকগুলো লোক আমাদের কামরায় ঢোকার শব্দে তন্দ্রা টুটে গেল। দেখি ১ নম্বর কামরার সকলেই আমাদের কামরায় ঢুকেছেন। কেবল নেই জনাব তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সকলেই দেখলাম ভয়ে কাঁপছেন।
কে একজন বাইরে থেকে বললেন, মনসুর আলী সাহেব আসুন, মনসুর আলী সাহেব!
ততক্ষণে বিছানার ওপরে উঠে বসেছি। দেখি, জনাব মনসুর আলী তাড়াতাড়ি একটা পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে ফালতু মোতালিবকে বলে একটা তসবি হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ক্ষীণ আলোয় তার চেহারা মলিনই দেখলাম। তাকে দেখার ভাগ্য আর কখনও হয়নি আমার। আমি মনে করলাম হয়তো বা রাজনৈতিক সমাধানকল্পে আলোচনা করার জন্য জনাব মনসুর আলীকে ১ নম্বর কামরায় নিয়ে গেছে। আমি আমার অভিমত ব্যক্তও করলাম। জনাব শেখ আব্দুল আজিজ রাগতভাবে বললেন যে, ঘটনা অন্যরূপ। আমি চুপ করে গেলাম।
আমরা রুদ্ধশ্বাসে পরবর্তী ভবিতব্যের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সমস্ত কামরা নিস্তব্ধ, নিথর। প্রত্যেকের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। জনাব মনসুর আলীকে আমাদের কামরা থেকে নিয়ে যাওয়ার পর দু’মিনিট কালও অতিক্রান্ত হয়নি, হঠাৎ সমস্ত ঘর ঝনঝন শব্দে কেঁপে উঠল। এত কাছে থেকে আগে কখনও এমন আধুনিক সমর-অস্ত্রের গুলির আওয়াজ শুনিনি। কে যেন বলে ফেলল, ‘সব শেষ হয়ে গেল। সবাইকে মেরে ফেলেছে।’ দিশেহারার মতো আমরা দৌড়ে উত্তর পাশের বারান্দায় চলে গেলাম। বাইরে থেকে গুলি করলে এখানে অনেকটা নিরাপদ।
জনাব আজাহারউদ্দিন আহমদ প্রাক্তন এমপিএ এমন বেখেয়ালভাবে বিছানা ছেড়ে দৌড় দিয়েছিলেন যে, মশারিসহ তিনি দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে কাঁধের মাংস খানিকটা ছিঁড়ে ফেললেন। জনাব ফরিদ উদ্দিন আহমদ খাবার রাখার জন্য কোণের দিকে যে চৌকিটি ছিল তার নিচে ঢুকে গেলেন। সামনের দিকে মুড়ির টিন ও বাক্স এমনভাবে রাখা যে, বাইরে থেকে বোঝাই যাবে না যে, এর পেছনে কোনো লোক থাকতে পারে। আমি স্রেফ মাটিতে বসে ভগবানকে ডাকা আরম্ভ করলাম। সবাই যার যার নিজস্বভাবে ভগবানকে ডাকা আরম্ভ করলাম। আমরা সবাই ধরে নিলাম যে, জীবন আমাদেরও             শেষ হয়ে যাবে।
এসব অস্ত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞ জনাব সাইদুর রহমান প্যাটেল বললেন যে, শব্দটা স্টেনগানের এবং একসঙ্গে অন্তত দুটো স্টেনগান দুটো চেম্বার খালি করেছে। অনেক দিন পরে ওই ঘরে ঢুকে ঘরের দেয়ালের গায়ে প্রায় ৫০টা বুলেটের দাগ দেখেছি।
১ নম্বর কামরার জনাব দেলওয়ার হোসেনের কাছে শুনলাম, অনেকক্ষণ একটানা বাঁশি বাজার পর হঠাৎ ওই কামরার বারান্দার তালা খোলার শব্দ শুনে সবাই আতঙ্কিত হলেন। ২ নম্বর তালা খুলে ঘরের দরজাও খোলা হলো। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। হঠাৎই একজন সুবেদার বলে উঠলেনÑ ‘আপনারা সকলে বেরিয়ে যান রুম থেকে। রুমে শুধু সৈয়দ সাহেব ও তাজউদ্দীন সাহেব থাকবেন।’ সকলে বেরিয়ে আসলেন। ছাত্রনেতা জনাব আব্দুল কুদ্দুস মাখনের শরীরে জ্বর ছিল। তাই তিনি গায়ে দেবার জন্য একটা চাদর খুঁজছিলেন এবং সে কারণে একটু দেরিও হচ্ছিল। কে একজন বলে উঠলেন, ‘ভেতরে কে আছে ধরে নিয়ে আয়।’
সবার অলক্ষ্যে জনাব তাজউদ্দীনও বেরিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তিন নম্বর কামরার সামনে থেকে তাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়। সম্ভবত তিনি বুঝে ছিলেন, যে খবর তিনি পেয়েছিলেন, তা সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাই একবার শেষ চেষ্টা করছিলেন। যদি ভিড়ের মধ্যে ৩ নম্বর কামরায় ঢুকে পড়া যায়। বিধি বাম। তা আর হলো না। তাকে ফিরে যেতে হলো সেই ১ নম্বর কামরায় যেখানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম একা বসে ছিলেন। ২ নম্বর কামরার একজন বললেন যে, জনাব মনসুর আলীকে নিয়ে যাওয়ার সময় সেখান থেকে জনাব কামারুজ্জামানকে নিয়ে যাওয়া হয় ১ নম্বর কামরায়। দরজার বাহির থেকে কে নাকি বলছিলেন, ‘কামারুজ্জামান, কামারুজ্জামানকে নিয়ে আস।’
কে একজন বললেন যে, তিনি শুনছিলেন, জনাব মনসুর আলীকে যখন ১ নম্বর কামরার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে মারার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। আমি তো সেদিনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলাম।’ জনাব কামারুজ্জামানকে যখন কামরা থেকে বেরিয়ে আসতে বলা হয়, তখন তিনি জায়নামাজের ওপর নামাজ পড়ছিলেন। পাগলা ঘণ্টা পড়ার পর প্রায় সকলেই যে যার নিজস্বভাবে ভগবানকে ডাকছিলেন।  ২ নম্বর কামরার কে যেন বলছিলেন যে, গুলি হওয়ার পর দুজনের মুখ থেকে কাতর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। একজন ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলছিলেন আরেকজন ‘মা মা’ বলছিলেন।
সামনে সেলের মধ্যে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে যিনি ১ নম্বর কামরার বরাবর সামনে থাকতেন, সম্ভবত তিনি বলেছিলেন যে, গুলিতে জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং জনাব কামারুজ্জামান সাথে সাথে মারা যান। তবে জনাব তাজউদ্দীন এবং জনাব মনসুর আলী বেঁচে ছিলেন। গুলির আওয়াজ আমরা শুনি প্রায় ৪.২০ মিনিটের সময়। তার পরপরই ফজরের নামাজের জন্য আজান পড়ে। সেলের লোকেরা বলছিলেন, কালো কালো পোশাক পরা লোকগুলি গুলি করে চলে যাওয়ার প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর অর্থাৎ ফজরের নামাজের পর আর একদল এসে বেয়োনেটে চার্জ করে সবাইকে। বেয়োনেট চার্জ করার পর অবশ্য আর কেউ বেঁচেছিলেন না। অনেকদিন পরে ওই ঘরের মেঝে এবং দেয়ালে বেয়োনেট চার্জের অনেক দাগ দেখেছি। ৩ নভেম্বর ভোরের দিকে একজন পাহারাদার এসে সংক্ষেপে জানিয়ে দিয়ে গেল, চারজনের মৃতদেহ ঘরের মধ্যে রয়েছে এবং রক্ত বারান্দা হয়ে সামনের ড্রেনে গড়িয়ে পড়ছে।
বেগম তাজউদ্দীন শনিবার দেখা করে গিয়েছিলেন। অসময়ের একটা কাঁঠালও দিয়ে গিয়েছিলেন। ডায়াবেটিসের রোগী হওয়া সত্ত্বেও জনাব তাজউদ্দীন রোববার সন্ধ্যার পর কাঁঠাল খেয়েছিলেন এবং কামরার সকলকেই খাইয়েছিলেন। যা কিছু বাড়ি থেকে আনত তিনি সবাইকে খাইয়ে তবে নিজে খেতেন। ওই দিন রাতে তিনি বেশ কিছুক্ষণ কোরআন শরিফ পড়েছিলেন।
২ নম্বর কামরার একজনের নিকট শুনলাম, জনাব কামারুজ্জামান ওই দিন মানসিক চঞ্চলতায় ভুগছিলেন। বেশ কয়েকবার বলেছেন, তাকে বোধহয় হত্যা করা হবে। জনাব তাজউদ্দীনের নিকট হত্যার কথা শোনার পর তিনি ওই গুজবে সত্যই বিশ্বাস করেছিলেন। চেয়ারম্যান জিম্মৎ আলীর গায়ের রং ছিল মিশমিশে কালো। ওই রাতে জনাব কামারুজ্জামান পাউডার দিয়ে চেয়ারম্যানকে সাজিয়ে অনেকক্ষণ আমোদ-ফুর্তি করেছিলেন।
২ নম্বর কামরার আরেকজনের কাছে শুনলাম, কালো পোশাক পরিহিত লোকেরা স্টেনগান প্রস্তুত করে ১ নম্বর কামরায় ঢুকলে জনাব তাজউদ্দীন বলে উঠেছিলেন, ‘একি করছেন! একি করছেন!’ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী জনাব তাজউদ্দীন ভাবতে পারেন নি ঘাতকের অস্ত্রে কারাগারে অসহায় অবস্থায় তার জীবনাবসান হবে। একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। স্বাধীনতা সংগ্রামে বৃহত্তম অবদান যাদের ছিল সেই চারজন নেতাকে আজ জীবন দিতে হলো কয়েকজন অপরিণামদর্শী সুযোগ সন্ধানী ঘাতকের হাতে। বাংলাদেশের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল কেউ বুঝল না। দেশবাসীকে তিলে তিলে মর্মে মর্মে অনুভব করতে হবে এ ক্ষতি। গোটা জাতিকে এর মাসুল দিতে হবে। বাঙালিকে কাঁদতে হবে। স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছিল মোহাম্মদী বেগ। এই মোহাম্মদী বেগই ছোটবেলায় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে একই মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছিলেন।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মৃত্যুর পূর্বে শুধু বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদী বেগ, তুমি!’ জুলিয়াস সিজারকে শেষ পর্যন্ত বন্ধু সহকর্মী ব্রুটাস অসি দিয়ে যখন আঘাত করেছিল, তখন তিনিও বলেছিলেন, ‘ণড়ঁ ঃড়ড় ইৎঁঃঁং!’ জানি না, নিহত চার নেতার মধ্যে অনুরূপ কেউ বলেছিলেন কি না তাদের ঘাতকদের সম্বন্ধে। নিষ্ঠুর গুপ্তহত্যার তদন্ত একদিন নিশ্চয়ই হবে। বিচারও হয়তো বা হবে। কিন্তু ফিরে আসবে না অমূল্য ৪টি প্রাণ আর কোনোদিন। এ ক্ষতি কত বড় বাঙালি একদিন বুঝবে। এ ক্ষতি অপূরণীয়। ৩ এবং ৪ নভেম্বর সারাক্ষণ আমাদের কামরার মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখা হলো। সমস্ত নতুন জেল নিশ্চুপ, নিথর। শুধু মাঝে মাঝে তালা খুলে আমাদের খাবার দিয়ে যায়।
৪ তারিখে সকালের দিকে খবর পেলাম, মৃতদেহগুলি একটু ধোয়া-মোছা করে বাইরের বারান্দায় রাখা হয়েছে। ঘরটা পরিষ্কার করারও শব্দ পেলাম। আমাদের কামরার জানালা দিয়ে ১ নম্বর কামরার সামনের রক্ত মাখা কাপড়-চোপড়ও দেখা গেল। শুনলাম, এডিসি এবং এসপি এসে দেখে গেছেন। ঘরের এবং মৃতদেহগুলির ফটোও নিয়েছেন। ময়নাতদন্ত হয়ে গেল। ৪ তারিখে সন্ধ্যার দিকে বরফ ভাঙার আওয়াজ এবং বাক্স তৈরির শব্দও পেলাম। বাকি থাকল শুধু কবর দেয়া।
জেল কর্তৃপক্ষকে আবেদন জানালাম মৃতদেহগুলি দেখার এবং শ্রদ্ধা জানানোর অনুমতি চেয়ে। একবার মনে হলো হয়তো বা অনুমতি পাওয়া যাবে। কিন্তু হলো না। রাত ১১টার দিকে মৃতদেহগুলি বাক্সবন্দি করে জেলগেটের দিকে নিয়ে গেল।
মুজিবনগরে একসঙ্গে কাজ করেছি দীর্ঘ ছয় মাস। জেলখানায়ও অনেকদিন একসঙ্গে কাটিয়েছে। সুখ-দুঃখ সমানভাবে ভোগ করেছি। সকলে যেন এক পরিবারভুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। একের দুঃখে অন্যজন শুনিয়েছেন সান্ত¦নার বাণী। মাত্র ২০ হাত দূরে থাকা সত্ত্বেও আজ শোনাতে পারলাম না বিদায়ের বাণী, জানাতে পারলাম না শ্রদ্ধার্ঘ। এ যে কত বড় মর্মান্তিক, ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রাণস্পন্দন যেন থেমে গেছে আমাদের। গুমরে ফিরছে বোবা কান্না। ৩ নভেম্বর অনেকবার খবর দিয়েও জেল প্রশাসনের কোনো অফিসারকে আমরা পেলাম না। এতগুলি লোক অসহায়ের মতো নতুন জেলের মধ্যে কি অপরিসীম মর্মযাতনা ভোগ করেছি, একবার কেউ খোঁজ নিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন নি। অথচ আমাদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই এদের চাকরি।
রাত ৩টার দিকে হঠাৎ আমাদের কামরার দরজা খোলার শব্দ পেলাম। সারারাত কেউ ঘুমাই নি। আলো নিভিয়ে সকলেই চুপচাপ জানালার কাছে বসাÑ মৃত্যুডাক কখন আসে। জেল পুলিশের একজন একবার ঘরের বাতি জ্বালাতেও বললেন। কিন্তু কারও উঠবার ক্ষমতা ছিল না। বাতিও জ্বালানো হলো না, দরজা খোলার শব্দে সকলেই সচকিত হয়ে উঠলেনÑ আবার কোন যমদূতের আবির্ভাব! না, ঘাতক নয়। জেলার নিজে তার অধঃস্তন কয়েকজন কর্মচারী নিয়ে হাজির। দুরু দুরু বক্ষে সকলেই অপেক্ষা করছি। কিন্তু ২ নম্বর তালা খোলা হলো না। আমরাও একটু আশ্বস্ত হলাম। হঠাৎ ‘সামাদ সাহেব’ ‘সামাদ সাহেব’ বলে একটা আওয়াজ পেলাম। আবার সকলের হৃদকম্পন শুরু হলো। কিন্তু না। জেলার সামাদ সাহেবের সঙ্গে বিশেষ করে একটু কথা বলতে চান।
আমরা কেমন আছি জানতে চাওয়ায় সকলেই হতবাক হয়ে গেলাম। এত খবর দেয়ার পরও প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাকে পাওয়া যায়নি, তিনি রাত ৩টায় আমাদের খোঁজখবর নিতে আসবেনÑ এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। তিনি জানালেন যে, ২ নম্বর ক্যু ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক হয়েছেন। নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীতও করেছেন। ১৫ আগস্ট তারিখের ক্যু-দলের সকলেই বাংলাদেশ ত্যাগ করে হংকংয়ের দিকে চলে গেছেন। একটা কিছু হয়েছে, আমরা ওইদিন ভোরের দিকেই অনুমান করেছি। প্রায় এক ঘণ্টার মতো সারাক্ষণ মিগ উড়েছে। কেউ কেউ মিগকে সোজা ডাইভ দিতেও দেখেছেন। বুঝলাম, চূড়ান্ত খেলা তখনই হয়েছে।
পরবর্তীকালে বিমানবাহিনীর কয়েকজন অফিসারের কাছে শুনেছি ওই দিনের ঘটনার কথা। তারা সেদিন অংশগ্রহণ করেছিলেন বলেই কোর্ট মার্শাল করে তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। ২ নভেম্বর রাত ১২টার পরই ‘ক্যু’ দলটাকে জেনারেল খালেদ মোশাররফের দলের লোকেরা ঘিরে ফেলে। কিন্তু ট্যাঙ্ক তাদের দখলে থাকার দরুন কব্জার মধ্যে আনা যায় না। শেষ পর্যন্ত ৩ নভেম্বর ভোরে মিগ-এর সাহায্যে বোম্বিং করার ভয় দেখালে তারা আত্মসমর্পণ করে। তবে একটা শর্তে, তাদের সকলকেই সপরিবারে নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। শর্ত মোতাবেক ৩ তারিখ রাত ১০-১১টার দিকে তাদের দেশ ত্যাগ করার সুযোগ করে দেয়া হয়।
কেউ কেউ মনে করলেন, আমাদের মুক্তির লগ্ন সমাগত। জেল কর্তৃপক্ষের দেখা মেলাও ওই মতের সমর্থন করে। ইতোমধ্যেই আমরা বুঝে ফেলেছি, জেল কর্তৃপক্ষের আচরণ আমাদের ভবিষ্যতের মানযন্ত্র। যখন জেল কর্তৃপক্ষকে স্বাভাবিক সহানুভূতিসম্পন্ন দেখেছি তখনই বুঝেছি জেলের বাইরে এমন কিছু চলছে যা আমাদের পক্ষে শুভ। জেল কর্তৃপক্ষকে অহেতুক নির্দয় দেখলে এর উল্টোটাই আমরা ধরে নেই। জেল প্রশাসন যেন স্রোতের শেওলা। জল যেদিকে চলে শেওলাও সেদিকেই চলে। হাওয়ার সাথে চলে বলেই এর একটা নাম আমরা জেল বাসিন্দারা দিয়েছি ‘বাতাসী’। ৪ নভেম্বর রাত ১১টায় মৃতদেহগুলি জেলগেটে নিয়ে গেলে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। এত কাছে থেকেও শেষবারের মতো একবার দেখতে পারলাম না। ওই রাতেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন সাহেবের মৃতদেহ তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বাসায় নিয়ে গেল। মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামান সাহেবের মৃতদেহ পরের দিন সকালে তাদের দেশের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার হয়েছে বলে খবর পেলাম। আরও খবর পাওয়া গেল, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন সাহেবের জন্য বায়তুল মোকাররমে গায়েবি জানাজা হওয়ার সর্ববিধ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। অজস্র লোকও সেখানে জমা হয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহ আসলো না, আসলো সামরিক বাহিনীর হুমকি। সবাইকে ভয় দেখানো হলো যে, স্থান ত্যাগ না করলে গুলি করা হবে। ভগ্নমনে একে একে সবাই চলে গেলেন। সামরিক বাহিনীর লোকেরাই ওই দুজনের লাশ বনানীতে কবর দিলেন।
৫ নভেম্বর ভোর থেকে তাজউদ্দীন সাহেবের বাড়িতে হাজার হাজার লোকের ভিড় হয় তাদের প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো একপলক দেখার জন্য। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা বিমানবন্দরে অনুরূপ ভিড় হয়েছিল যখন মুজিবনগর হতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসে। সেদিন তিনি এসেছিলেন বিজয়ীর বেশে আপন দেশে। আজ তিনি চলে গেলেন বিজয়ীর বেশে অজানা গন্তব্যে। আর তাকে দেখা যাবে না কোনোখানে।
[সংকলিত]

শ্রেণী:

চাইল্ড পার্লামেন্টের অভিমত

শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

উত্তরণ ডেস্ক: বাংলাদেশে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় পর্যায়ে শিশুদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ন্যাশনাল চিলড্রেন’স টাস্কফোর্স বা এনসিটিএফ’র অ্যাডভোকেসি উইং হলো চাইল্ড পার্লামেন্ট। ২০০৩ সাল থেকে এটি নিয়মিত কাজ করছে।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সহযোগিতায় সারাদেশের ৬৪ জেলায় এনসিটিএফ’র কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণে এনসিটিএফ জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে। চাইল্ড পার্লামেন্ট আয়োজনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, পুষ্টি ইত্যাদি বিষয়ে এ পর্যন্ত চাইল্ড পার্লামেন্টের মোট ১৭টি অধিবেশন হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর ১৭তম অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হলো ঢাকায় গুলশানের একটি হোটেলে। এবারের মূল বিষয় ছিল ‘শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার’। এই আয়োজনে অংশ নেয় দেশের ৬৪ জেলার চাইল্ড পার্লামেন্ট সদস্য এবং ১৬টি সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিশুসহ মোট ৮৭ শিশু প্রতিনিধি।
এবারের অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এসএম কামাল হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যুগ্ম মহাসচিব মুয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং জাতীয় পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য ব্যারিস্টার শামিম হায়দার পাটোয়ারী।
আরও উপস্থিত ছিলেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ওরলা এ মারফী এবং চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড প্রোটেকশন বিভাগের প্রধান তানিয়া নুসরাত জামান, সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্ক পিয়ার্স ও ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. শামীম জাহান।
শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার চাই
* শিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ রেখেই, শিশু অধিকার ও শিশু সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান।
* জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করে শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ।
* শিশু আইন ২০১৩, যা পরবর্তীতে সংশোধিত শিশু আইন ২০১৮ প্রণয়ন করে এই আইনে শিশুদের জন্য সর্বোচ্চ সুরক্ষা সুনিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আইন ও বাস্তবতার মধ্যে দেখা যাচ্ছে বিস্তর ফারাক। আইনের খাতায় শিশুরা সুরক্ষিত হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা বাস করছে নানাবিধ ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতায়।
সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে চাইল্ড পার্লামেন্টের সদস্যরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। শিশু হত্যা, ধর্ষণ, সকল প্রকার যৌন নিপীড়ন, গণপরিবহনে হয়রানি, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, রাজনৈতিক কর্মকা-ে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারের বিরুদ্ধ সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে তাগিদ দিচ্ছে চাইল্ড পার্লামেন্ট। আর এ লক্ষ্যেই চাইল্ড পার্লামেন্টের এবারের অধিবেশনে উঠে এসেছে সুস্পষ্ট কিছু সুপারিশ। যথাÑ
* শিশু হত্যার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
* গণপরিবহনে শিশুদের ভোগান্তি কমাতে এবং রাস্তাঘাটে তাদের যৌন নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য পৃথক পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে।
* শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে শিশু হেল্পলাইন ১০৯ কার্যকর করতে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
* শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে আইনের বাস্তবায়ন ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে।
* সুরক্ষার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা। যারা পাহাড় অঞ্চলে, যৌন পল্লীতে, চরে, হাওরে এবং পথে বাস করে তাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তাদের সুরক্ষার আওতায় তো আসছেই না; বরং প্রতিনিয়তই লঙ্ঘিত হচ্ছে তাদের মানবাধিকার। তাই সুরক্ষার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
* প্রতিবন্ধী শিশুরাও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে একটি বিশেষ অংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো না থাকার ফলে তাদের সুরক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। তাই প্রতিবন্ধী শিশু, পার্বত্য এলাকার শিশু, পথশিশু, যৌনপল্লীর শিশু এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে।
* শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকা-ে ব্যবহার না করার প্রসঙ্গে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে।
* জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার জন্য দায়িত্ববাহকদের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রগুলোকে কার্যকর করতে হবে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।
* শিশু আইন বাস্তবায়নের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

শিশুর সুরক্ষা, বিকাশ, স্বাধীনতা ও অংশীদারিত্বকে নিশ্চিত করতে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেখার দাবি জানাচ্ছে চাইল্ড পার্লামেন্ট।

শ্রেণী:

পরিপূর্ণ বাংলাদেশ : ব-দ্বীপ পরিকল্পনা

Posted on by 0 comment
PM

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় হটস্পটগুলোর এসব চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
PMউত্তরণ প্রতিবেদন: ব-দ্বীপ হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা পরিপূর্ণরূপে কাজে লাগাতে পরিকল্পনা নিল সরকার। অনুমোদন পেল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেল্টা প্ল্যান’। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা, নদীভাঙন, নদীশাসন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন শুরু হলে প্রথম পর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এ অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সামনে পরিকল্পনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন, পরিকল্পনা কমিশন ও সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। পরে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি, পরিকল্পনা সচিব জিয়াউল ইসলাম, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম এবং আইএমইডির সচিব মফিজুল ইসলাম।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক পরিকল্পনা। পৃথিবীর কোথাও এত দীর্ঘ পরিকল্পনা হয়নি। বাংলাদেশে এটিই প্রথম। পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ পানিসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করা হবে। তাছাড়া হট স্পটে যেসব ঝুঁকি রয়েছে সেগুলো মোকাবিলা করা হবে। তখন আর ঝুঁকি থাকবে না। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কন্যা ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, সুযোগ পেলে নেদারল্যান্ডস ঘুরে এসো। পরবর্তীতে তিনি অনেকবার নেদারল্যান্ডস ঘুরেছেন। তারই নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় এই দীর্ঘ পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনায় নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং এবং পরবর্তীতে মেইটেন্যান্স ড্রেজিং করা হবে। ফলে নতুন ভূমি পাওয়া যাবে। নদীপথের ব্যবহার বাড়ানো হবে। সেই সঙ্গে নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা হবে।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ২০১৮-২০৩০ সাল পর্যন্ত মোট ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এই টাকা আসবে সরকারি, বেসরকারি, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এবং জলবায়ু তহবিলসহ বিভিন্নভাবে। এজন্য গঠন করা হবে একটি ডেল্টা তহবিল। তাছাড়া ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ডেল্টা নলেজ ব্যাংক। এতে আরও জানানো হয়, দেশের পানিসম্পদ নিয়ে ১০০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতে সহায়তা দিয়েছে নেদারল্যান্ডস। পরিকল্পনা তৈরির জন্য ৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে দেশটি। ২০১৪ সালে প্রকল্পটি সাজানোর কাজ শুরু হয়। প্রায় সাড়ে তিন বছরে পরিকল্পনাটির অনুমোদন পেল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা। নেদারল্যান্ডসের বাইরে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় পানিসম্পদ, ভূমি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভূ-প্রতিবেশ খাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ব-দ্বীপ ভূমিতে প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রশাসন সম্পর্কে একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার প্রচেষ্টা রয়েছে পরিকল্পনায়। সমন্বিত নীতি উন্নয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের সম্ভাব্য বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপর করণীয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে রোডম্যাপ তৈরি এবং সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। ডেল্টা তহবিল গঠনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ বাস্তবায়নের জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ প্রয়োজন হবে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এজন্য জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থায়ন সম্বলিত বাংলাদেশ ডেল্টা তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যার মধ্যে ২ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে। জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ৮০ শতাংশ সরকারি তহবিল হতে এবং ২০ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে আসবে।
ড. শামসুল আলম বলেন, ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় ২০১৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে পরিকল্পনায়। এগুলো হচ্ছেÑ উপকূলীয় অঞ্চলে ২৩টি প্রকল্পের জন্য ৮৮ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। বরেন্দ্র এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ৯টি প্রকল্পের আওতায় ১৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। হাওড় এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ৬টি প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য ৮ প্রকল্পের অনুকূলে ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা। নদী এবং মোহনা অঞ্চলে ৭টি প্রকল্পের অনুকূলে ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা এবং নগরাঞ্চলের জন্য ১২টি প্রকল্পের অনুকূলে ৬৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রাক্কলন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঝুঁকি বিবেচনায় ৬টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। সেসঙ্গে এসব হটস্পটে ৩৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হটস্পটগুলো হচ্ছেÑ উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওড় ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী ও মোহনা অঞ্চল এবং নগরাঞ্চল। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সে অঞ্চলের পানিবিজ্ঞান ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এক্ষেত্রে দেশের ৮টি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মাত্রার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন জেলাগুলোকে একেকটি গ্রুপের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। পানি ও জলবায়ুজনিত অভিন্ন সমস্যায় কবলিত এই অঞ্চলগুলোকে হটস্পট হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় হটস্পটগুলোর এসব চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও পানিপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা; পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীগুলোকে স্থিতিশীল রাখা; পর্যাপ্ত পরিমাণে ও মানসম্মত স্বাদু পানি সরবরাহ করা; নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা; নদীগুলোতে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা; যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা; টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা; বন্যা ও জলাবদ্ধতাজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানো; পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করা; হাওড় ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় জলের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা; বন্যা থেকে কৃষি ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা; সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; সঠিক নদী ব্যবস্থাপনা; টেকসই হাওড় প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা; সমন্বিত পানি ও ভূমিসম্পদ ব্যবস্থাপনা; বন্যা ও ঝড় বৃষ্টি থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শহর রক্ষা; সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা; টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বহুমুখী সম্পদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বিকাশ; নগর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়ানো ও নগর এলাকায় বন্যার ঝুঁকি কমানো; পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো; নগরে কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন গড়ে তোলা; নতুনভাবে জেগে ওঠা চর এলাকায় নদী ও মোহনা ব্যবস্থাপনা জোরদার করা; জলাভূমি ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ, অক্ষুণœ রাখা ও তাদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা; বিদ্যমান পোল্ডারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঝড়-বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা অনুপ্রবেশের মোকাবিলা করা; পানির জোগান ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা; উপকূলীয় অঞ্চলে জেগে ওঠা নতুন জমি উদ্ধার এবং সুন্দরবন সংরক্ষণ করা।

শ্রেণী:

ইলিশের জীবনরহস্য আবিষ্কার : বাড়বে উৎপাদন

Posted on by 0 comment
PM

PMরাজিয়া সুলতানা: সুস্বাদু রুপালি ইলিশ বাংলাদেশের জিআই বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য। ইলিশ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গৌরবের অংশীদার। অথচ এতদিন অজানাই ছিল ইলিশের জীবনরহস্য। ইলিশ নিয়ে; ইলিশের জীবনরহস্য নিয়ে এন্তার গবেষণা চলছে দীর্ঘদিন। অবশেষে সুপার মুন খ্যাত সেই ইলিশ মাছের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য বা জেনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কৃত হয়েছে। বাকৃবি’র ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম ও তার সহযোগী গবেষকরা উন্মোচন করেছেন ইলিশের জীবনরহস্য। এরই মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের মৎস্য সেক্টর প্রবেশ করল গবেষণার এক নতুন যুগে।
ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। এরা ডিম ছাড়ার জন্য সাগর থেকে নদীতে আসে। বিচরণ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মোহনায়। মৎস্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে হয়। তাই এর উৎপাদন আরও বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী এবং লাভবান হবে দেশ। জিনোমই জীবের সব জৈবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। আর এ কারণেই বাংলাদেশে ২০১৫ সাল থেকে এই জিনোম সংক্রান্ত গবেষণা শুরু হয়। দুই বছর গবেষণাকালে তারা দেশের বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা থেকে পূর্ণবয়স্ক ইলিশ সংগ্রহ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিস জেনেটিক্স অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি এবং পোল্ট্রি বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জিনোমি ল্যাবরেটরি থেকে সংগৃহীত ইলিশের উচ্চ গুণগত মানের জিনোমিক ডিএনএ প্রস্তুত করেন। প্রসংগত, ডিএনএ প্রধানত দুই প্রকার। প্লাজমিড ডিএনএ ও জিনোমিক ডিএনএ। পরে যুক্তরাষ্ট্রের জিনউইজ নামের জিনোম সিকুয়েন্সিং সেন্টার থেকে সংগৃহীত ইলিশের পৃথক প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটারে বিভিন্ন বায়োইনফরম্যাটিক্স প্রোগ্রাম ব্যবহার করে সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্য থেকে ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য এবং ডি নোভো অ্যাসেম্বলি সম্পন্ন করেন। ইলিশের জিনোমে ৭৬ লাখ ৮০ হাজার নিউক্লিওটাইড রয়েছে, যা মানুষের জিনোমের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এছাড়াও ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ২১ হাজার ৩২৫টি মাইক্রোস্যাটেলাইট (সিম্পল সিকুয়েন্স রিপিট সংক্ষেপে এসএসআর) ও ১২ লাখ ৩ হাজার ৪০০টি সিঙ্গেল নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম (এসএনপি) পাওয়া  গেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ইলিশ জিনোমে জিনের সংখ্যা জানা যায়নি। প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রয়েছে। গবেষণা চলাকালে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যভা-ার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের (এনসিবিআই) স্বীকৃতি পায়। ২০১৭ সালের ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এবং ২০১৮ সালের ১৩-১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দুটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে ড. মো. সামছুল আলম এবং তার সহযোগীরা গবেষণার বিষয় উপস্থাপন করেন।
জেনোম সিকুয়েন্স একটি বৈজ্ঞানিক পরিভাষা। জীবের জিনোম (Genome) অর্থাৎ, জীবের জীবন রহস্য হলো এর সমস্ত বংশগতিক তথ্যের সামষ্টিক রূপÑ যা ডিএনএ (কোনো কোনো ভাইরাসের ক্ষেত্রে আরএনএ) দ্বারা সংকেতাবদ্ধ। সাধারণভাবে কোনো জীবের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত বৈশিষ্ট্যগুলো জিনোমে লুকায়িত থাকে। জিন হলো জীবের ক্রোমোসোমের অন্তর্গত একক, যা ব্যক্তির কোনো নির্দিষ্ট বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।
জিনের রহস্য নিয়ে গবেষণার সূত্রপাত ১৮০০ সাল থেকেই। কিন্তু তখন এটা গবেষণার ধরন ছিল ভিন্ন। তবে ১৯২০ সালে জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক হান্স ভিংক্লার জিন ও ক্রোমোজোম শব্দ দুটির অংশবিশেষ জুড়ে দিয়ে জিনোম শব্দটি উদ্ভাবন করেন। আর জেনোম সিকুয়েন্স হলো কোষের সম্পূর্ণ ডিএনএ বিন্যাসের ক্রম, যার মাধ্যমে জিনোমের সম্পূর্ণ তথ্য জানা যায়। জীবদেহে বহুসংখ্যক কোষ থাকে। প্রতিটি কোষে থাকে ক্রোমোজোম। যাতে থাকে সুসজ্জিত ডিএনএ। ডিএনএ হচ্ছে ডি-অক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড। এটি বংশগতির ধারক ও বাহক। অর্থাৎ পিতামাতা থেকে বৈশিষ্ট্য ডিএনএ ধারণ ও বহন করে। একইভাবে, পিতামাতাও তাদের ডিএনএ-তে তাদের পিতামাতার বৈশিষ্ট্য ধারণ ও বহন করে। এক কথায় ডিএনএ, যা বংশগতির মৌলিক তথ্য বহন করে। যা কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায়। বংশগতির একক হলো জিনÑ যা  ডিএনএ দিয়ে তৈরি। ডিএনএ প্রতিটি জীবের জন্য স্বতন্ত্র আর জিন হচ্ছে বৈশিষ্ট্য, যা বংশানুক্রমে স্থানান্তরিত হয়। ডিএনএ নিউক্লিওটাইড দিয়ে তৈরি। এই নিউক্লিওটাইড আবার ক্ষার দিয়ে তৈরি। ক্ষারগুলো হলো- এডেনিন (A), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C) ও থাইমিন (T)। ডিএনএ-এর আকার হলো দ্বৈত-সর্পিলাকার (ডাবল-হেলিক্স)। আসলে জীবের ক্রোমোজোমে এই ৪টি ক্ষার ঘুরে-ফিরে সাজানো থাকে। এদের কম্বিনেশন ও বিন্যাসের ওপরেই নির্ভর করে জীবের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। তাই কোনো জীবের এই জিনোম ডিকোড অথবা উন্মোচন বলতে এই ATGC-এর পারস্পরিক বিন্যাসটা আবিষ্কার করাকেই বোঝায়। আর এর মাধ্যমে সেই জীবের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী জিনগুলোর অবস্থান ও কার্যক্রম সম্বন্ধে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
জিনোম সিকুয়েন্স সাধারণভাবে একটি জীবের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে। জীবের বিন্যাস ও যাবতীয় তথ্য জানা যায় জিনোম সিকুয়েন্সিং করে। ফলে ভবিষ্যতে জিন সংযোজন-বিয়োজন বা বিন্যাস পরিবর্তন করে আরও উন্নত প্রজাতির জীব উৎপাদন করা সম্ভব। যা হবে রোগবালাই মুক্ত ও প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাওয়াতে সক্ষম। এভাবে যদি ধীরে ধীরে সকল জীব তথা উদ্ভিদ, প্রাণী, রোগ জীবাণুর জিনের বৈশিষ্ট্যগুলো জেনে নেওয়া যায়। তবে এর মাধ্যমে উন্নত প্রজাতি উদ্ভাবন করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা ডিএনএ বিন্যাস বা জিনোম সিকুয়েসিং বের করে এবং কম্পিউটারের বিশেষ সফটওয়্যার তাদের মিল বের করে। পরবর্তীতে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
জীবনরহস্য আবিষ্কারের ফলে জাতীয় মাছ ইলিশের ক্ষেত্রে যা পাবে বলে আশা করছেন গবেষকরা; তা হলোÑ
*    বিস্তারিতভাবে জানা যাবে ইলিশের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজননসহ বিভিন্ন বিষয়;
*    জানা যাবে ইলিশ মাছ কখন ও কোথায় ডিম দেবে;
*    বছরে দুবার ইলিশ প্রজনন করে থাকে। এই দুই সময়ের ইলিশ জিনগতভাবে পৃথক কি না;
*    কোনো নির্দিষ্ট নদীতে জন্ম নেওয়া পোনা সাগরে যাওয়ার পর বড় হয়ে প্রজননের জন্য আবার একই নদীতেই ফিরে আসে কি না;
*    ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই রাখার জন্য গৃহীত কর্মসূচি ফলপ্রসূ করতে মাছের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনা কার্যকলাপের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে;
*   বাংলাদেশের জলসীমার মধ্যে ইলিশের মোট সংখ্যা-পরিমাণ;
*    বিভিন্ন মোহনায় প্রজননকারী ইলিশ কি ভিন্ন ভিন্ন; না-কি মোট ইলিশের একটি অংশ;
*    বাংলাদেশের ইলিশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের (ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য) ইলিশ থেকে জেনেটিক্যালি স্বতন্ত্র কি না অর্থাৎ স্টক একই কি না;
*   অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা ইত্যাদি সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে হচ্ছে কি না;
*    ইলিশ সাগর থেকে নদীতে কেন আসে, আবার প্রজননের পর আদৌ সাগরে ফিরে যায় কি না;
*    বাংলাদেশের ইলিশের একটি রেফারেন্স জিনোম প্রস্তুত করা এবং
*    ইলিশের জিনোমিক ডাটাবেস স্থাপন করা।

এমন অনেক তথ্যই আমরা আবিষ্কৃত জিনোম সিকুয়েন্স থেকে জানতে পারব, যা ইলিশের টেকসই আহরণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে। সার্বিক অর্থে ইলিশ অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি মাছ। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই সরকারের পাশাপাশি দেশের গবেষকরাও ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছেন, এগিয়ে এসেছেন। দেশের বাইরেও ইলিশ নিয়ে কাজ করছে আর একটি টিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খানের নেতৃত্বে এ দলে রয়েছেন কয়েকজন গবেষক। এর মধ্যে দুজন প্রবাসে রয়েছেন। যদিও জীবনরহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে ইলিশ গবেষণার একটি প্রশস্ত দরজা খুলে গেছে। তবে এটি জানতে ও বুঝতে আমাদের আরও সময় লাগবে। এ থেকে সুফল পেতে আরও ধারাবাহিক গবেষণা প্রয়োজন।
লেখক : পিএইচডি গবেষক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিদ্যা
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
raziasultana.sau52@gmail.com

শ্রেণী:

সরকারি হলো আরও ২৭৯ বেসরকারি কলেজ

উত্তরণ ডেস্ক: দেশের ২৭১ বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের সরকারি আদেশ জারি হয়েছে। গত ১২ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব নাসিমা খানমের স্বাক্ষরে এ আদেশ জারি করা হয়। গত ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ১২ আগস্ট এ আদেশ জারি করা হলো। এ নিয়ে এখন দেশে সরকারি কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৯৮।
এতদিন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ সরকারি কলেজের সংখ্যা ছিল ৩২৭। জাতীয়করণ হওয়া কলেজের শিক্ষকদের মর্যাদা কি হবে তা নিয়ে গত ৩১ জুলাই একটি নতুন বিধিমালাও জারি করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এখন সরকারি হওয়া শিক্ষকদের অবস্থান, বদলি ও পদোন্নতির বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে নতুন বিধিমালা অনুযায়ী।
সরকারি হওয়া কলেজগুলোর মধ্যে ঢাকা জেলার ৪, মানিকগঞ্জের ৪, নারয়ণগঞ্জের ৩, মুন্সিগঞ্জের ৩, গাজীপুরের ৩, নরসিংদীর ৪, রাজবাড়ির ২, শরীয়তপুরের ৪, ময়মনসিংহের ৮, কিশোরগঞ্জে ১০, নেত্রকোনার ৫, টাঙ্গাইলে ৮, জামালপুরে ৩, শেরপুরে ৩, চট্টগ্রামে ১০, কক্সবাজারে ৫, রাঙ্গামাটি ৪, খাগড়াছড়িতে ৬, বান্দরবানে ৩, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ফেনীতে ১টি করে, কুমিল্লায় ১০, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৬, চাঁদপুরে ৭, সিলেটে ৯, হবিগঞ্জে ৫, মৌলভীবাজারের ৫, সুনামগঞ্জে ৮, রাজশাহীতে ৭, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২, নাটোরে ৩, পাবনায় ৭, সিরাজগঞ্জে ৩, নওগাঁ জেলায় ৬, বগুড়ায় ৬, জয়পুরেহাটে ১, রংপুরে ৭, নীলফামারীতে ৪, গাইবান্ধায় ৪, কুড়িগ্রামে ৭, দিনাজপুরে ৯, লালমনিরহাটে ৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ১, পঞ্চগড়ে ৪, খুলনায় ৫, যশোরে ৫, বাগেরহাটে ৬, ঝিনাইদহে ১, কুষ্টিয়ায় ২, চুয়াডাঙ্গায় ২, সাতক্ষীরায় ২, মাগুরায় ৩, নড়াইলে ১, বরিশালে ৬, ভোলায় ৪, ঝালকাঠিতে ৩, পিরোজপুরে ২, পটুয়াখালীতে ৬ ও বরগুনায় ৩টি করে কলেজ রয়েছে।
এই ২৭১ বেসরকারি কলেজ সরকারি হওয়ার পর দেশে মোট সরকারি কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াল ৫৯৮। এই ২৭১ কলেজে রয়েছেন অন্তত ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। ১২ আগস্ট থেকেই তারা সরকারি বেতন-ভাতাসহ সব সুবিধা পাবেন। পরে আরও ৮টি কলেজকে সরকারিকরণ করা হয়।

শ্রেণী:

দেশি ফলের পুষ্টিগুণ ও ঔষধিগুণ

utta

uttaআলমগীর আলম: এই বাংলায় বারো মাস বিভিন্ন রকম ফল হয়, আমাদের দেশে ঋতু ভিন্নতায় ফল জন্মায়, স্থান ভেদে বিভিন্ন রকমের ফল আমরা খেয়ে থাকি। প্রত্যেক ফলের মধ্যেই রয়েছে যথেষ্ট পুষ্টিগুণ এবং ঔষধিগুণ। আমরা বাংলাদেশে প্রাপ্ত ফলসমূহের পুষ্টিগুণ, ঔষধিগুণ এবং অন্যান্য ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করার চেষ্টা করব।

আম
পুষ্টিগুণ : প্রচুর ক্যারোটিন, ভিটামিন সি ও ক্যালোরি আছে।
ঔষধিগুণ : আয়ুর্বেদীয় ও ইউনানী পদ্ধতির চিকিৎসায় পাকা ফল ল্যাকজেটিভ, রোচক ও টনিক বা শক্তি বৃদ্ধির জন্য খেয়ে থাকি। লিভার বা যকৃতের জন্য উপকারী। এককাপ পাকা আমে ১০০ ক্যালরি, ১ গ্রাম প্রোটিন, দৈনন্দিন প্রয়োজনের ভিটামিন এ ৩৫ শতাংশ, ভিটামিন বি ৬ শতাংশ। ফাইবার সমৃদ্ধ ফল বলে এটি কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য পথ্য স্বরূপ। আমে বিদ্যমান ভিটামিন এ ত্বক ও চুলের টিস্যু বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। বিটা ক্যারোটিনয়েড ও অ্যান্টি অক্সিডেন্টের উৎস আম। গবেষণায় দেখা গেছে, বিটাক্যারোটিনয়েড-সমৃদ্ধ ফল খেলে স্বাভাবিকভাবে ত্বকের রং উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়। নিয়মিত আম খেলে শরীরের আয়রন ঘাটতি পূরণ হবে এবং হিমোগ্লোবিন থাকবে নিয়ন্ত্রণে। হিমোগ্লোবিনের অভাবে ডার্ক সার্কেল, চুল পড়া, ঠোঁট কালো হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পানিসমৃদ্ধ ফল হিসেবে হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। শুধু ত্বকের যতেœই নয়; হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রোক প্রতিরোধ এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও কমায় আম। এসব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কারণে আমের আধিপত্য অন্যান্য ফলের তুলনায় অনেক বেশি।
যারা পেটের কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগছেন, আম তাদের জন্য ঔষধ। তাছাড়া পুষ্টিহীনতা, গায়ের রং মলিন হয়ে যাচ্ছে, ফ্যাটি লিভার ও ঘুমজনিত সমস্যা, রাতকানা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে পাকা এবং কাঁচা, উভয় প্রকার আমই মহৌষধ। শুধু ফল নয়, এর পাতা ও গাছের ছালও বেশ উপকারী। যেমনÑ রক্ত পড়া বন্ধকরণে আমগাছের ছালের রস উপকারী। কচি পাতার রস দাঁতের ব্যথা উপশমকারী। আমের শুকনো মুকুল পাতলা পায়খানা, পুরাতন আমাশয় এবং প্রস্রাবের জ্বালাযন্ত্রণা উপশম করে। গাছের আঠা পায়ের ফাটা ও চর্মরোগে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়। জ্বর, বুকের ব্যথা, বহুমূত্র রোগের জন্য আমের পাতার চূর্ণ ব্যবহৃত হয়। আম খালি পেটে সাধারণ খাওয়ার পরিবর্তে খেলে উপকার হয়। অনেকে ডায়াবেটিসের জন্য আম খাওয়া থেকে বিরত থাকেন, তাদের জন্য পরামর্শ ডায়াবেটিসের জন্য আম কোনো ক্ষতির কারণ নয়। খালি পেটে এক কেজি আম খেলেও কোনো ক্ষতি হবে না।
আম খেলে ঘুম ভালো হয়, আবার অনেকের পেট পাতলা হয়ে যায়, তাদের জন্য আম খাওয়ার উপযুক্ত সময় হচ্ছে সকালে নাস্তার পরিবর্তে। আবার যারা রাতে খাওয়ার পরে আম খেয়ে থাকেন তারা এ কাজটি ভুল করেন। আম দুপুরের মধ্যেই খাওয়ার উত্তম সময়।

কাঁঠাল
পুষ্টিগুণ : প্রচুর শর্করা, আমিষ ও ক্যারোটিন আছে।
ঔষধিগুণ : কাঁঠালের শাঁস ও বীজকে চীন দেশে শক্তির টনিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের গ্রামগঞ্জে এখনও মানুষ সকালে নাস্তা ও দুপুরের ভাত খাওয়ার পরিবর্তে শুধু কাঁঠাল খেয়ে থাকেন। এটা অতি উত্তম। কাঁঠালের পুষ্টিগুণ পেতে হলে কাঁঠাল একক ফল হিসেবে খেতে হবে। কাঁঠালে রয়েছে এমন কিছু খাদ্যগুণ, যা সারাবছর মানুষ তার ফল উপভোগ করতে পারে। ১০০ গ্রাম কাঁঠালের কোয়া ৯৫ ক্যালরি শক্তি, ২৩ শতাংশ ভিটামিন সি, ১০ শতাংশ ভিটামিন এ প্রদান করে। এছাড়া আছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। সুক্রোজ ও ফুট্রোজে ভরপুর কাঁঠালকে শক্তি উৎপাদিত ফল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ফাইবার হজম শক্তি বাড়িয়ে পরিপাকে সহায়তা করে দূষিত পদার্থ অপসারণ করে ত্বককে রাখে সুস্থ। প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় কাঁঠাল আপনার ইমিউনিটি সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তুলবে। শরীরের ইমিউন সিস্টেম ঠিক করে দেয়, শরীরে শক্তি দেওয়ার সাথে প্রচুর আঁশ থাকায় পেট পরিষ্কার হয়ে যায়, সেসঙ্গে ত্বক, হাড়ের মধ্যে জড়তা দূর করে ত্বককে উজ্জ্বল করে দেয়, অস্ট্রোপ্রোসিস রোগীদের জন্য বিশেষ উপকারী। মৌসুমি এই ফল খালি পেটে খাওয়া উত্তম, ভরা পেটে খেলে অনেকের পেটের সমস্যা হয়। তাই সকালে অন্য কোনো নাস্তা না করে শুধু কাঁঠাল খেয়ে নাস্তা করলে তা হবে ঔষধিগুণে ভরা একটি আহার। কাঁচা কাঁঠালের তরকারি আর কাঁঠালের বিচিতে রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। তাই কাঁঠাল শুধু ফলের রাজাই নয়, পুষ্টির আঁধারও।

পেয়ারা
পুষ্টিগুণ : প্রচুর ভিটামিন সি আছে। ১০০ গ্রাম তাজা পেয়ারায় ২২৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে, তাই একে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল বলা হয়। ভিটামিন সি’র গুণাগুণ নতুন করে বলার কিছু নেই। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে ত্বকের সৌন্দর্যে ভিটামিন সি’র ভূমিকা অনস্বীকার্য। যারা কোলেস্টেরল কমাতে চান তারা মৌসুমি ফল পেয়ারার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। প্রতিদিন সকালে নাস্তা পেয়ারা খান, পেয়ারা রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে উচ্চ রক্তচাপ হ্রাস করে। আর যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন তারা নিশ্চিন্তে পেয়ারাকে বেছে নিতে পারেন, পেয়ারা লো জিআই ফল, তাই ধীরে ধীরে হজম হয়। সেজন্য ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আদর্শ ফল। যারা কঠিন কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগছেন তারা নিয়ম করে এক মাস পেয়ারা খান। সেক্ষেত্রে পাকা পেয়ারা বেশি উপকারী। কোষ্ঠবদ্ধতা এক মাসে দূর হয়ে যাবে। অনেকে পেয়ারা শুকনো মরিচ ও লবণ দিয়ে খেয়ে থাকেন। সেটি ভুল করে থাকেন। পেয়ারার সাথে লবণ মিশালে পেয়ারার সাধারণ খাদ্যগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই পেয়ারা ফল খালি খান, কোনো কিছু না মিশিয়ে যদি ঔষধিগুণ পেতে চান।
ঔষধিগুণ : পেয়ারা শিকড়, গাছের বাকল, পাতা এবং অপরিপক্ব ফল কলেরা, আমাশয় ও অন্যান্য পেটের পীড়া নিরাময়ে ভালো কাজ করে। ক্ষত বা ঘা-এ থেঁতলানো পাতার প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। পেয়ারার কচি পাতা চিবালে দাঁতের ব্যথা উপশম হয়।

জাম
পুষ্টিগুণ : ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, লৌহ ও ক্যালসিয়াম-সমৃদ্ধ। মিষ্টি, সরস ও রঙিন ফলটি শিশুদের ভীষণ প্রিয়। ত্বক, চুল ও নখের সুস্বাস্থ্যের জন্য এর ভূমিকা অপরিসীম। প্রথমত; এই ফলের ৮৫ শতাংশই পানি, যা সুস্থ ও প্রাণবন্ত ত্বকের জন্য অপরিহার্য। অলিফেনল ও অ্যালথোসায়ানাইড এ দুই অ্যান্টি অক্সিডেন্ট কোলাজেন বৃদ্ধিতে যৌথ ভূমিকা পালন করে ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করার কারণে জামকে ন্যাচারাল সানস্ক্রিন বলা হয়। স্বল্প ক্যালরি ও অধিক ফাইবারÑ এ দুটো গুণের সংযোজনে ওজন কমানোর ডায়েট চার্টে জামের গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। ভিটামিন এ, বি কমপ্লেক্স, ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম-সমৃদ্ধ জাম প্রেগনেন্সিতে আদর্শ ফল হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঔষধিগুণ : জামের কচি পাতা পেটের পীড়া নিরাময়ে সাহায্য করে। জামের বীজ থেকে প্রাপ্ত পাউডার বহুমূত্র রোগের ঔষধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। পাকা জাম সৈন্ধব লবণ মাখিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা রেখে চটকিয়ে ন্যাকড়ার পুঁটলি বেঁধে টানিয়ে রাখলে যে রস বের হয়, তা পাতলা পায়খানা, অরুচি, বমিভাব দূর করে। জাম ও আমের রস একত্রে পান করলে ডায়াবেটিস রোগীর তৃষ্ণা প্রশমিত হয়।

বরই বা কুল
পুষ্টিগুণ : বরই অ্যান্টি অ্যাজিং খাদ্য। বরই-এ আছে হরেক রকমভেদ। তবে সব কুলেই ভিটামিন সি আছে। কোনোটা মিষ্টি আবার কোনোটা টক। ওজন কমানো, রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ অনেক গুণাগুণ রয়েছে বরই-এ। ফাইবারে পরিপূর্ণ বরই কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি নখ ও চুলের জন্য বিশেষ কার্যকর। অ্যান্টি অ্যাক্সিডেন্ট ত্বকের কালো দাগ ও বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে, তাই তো একে অ্যান্টি অ্যাজিং খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ঔষধিগুণ : কুল ও কুলের পাতা বাটা বাতের জন্য উপকারী। ফল রক্ত পরিষ্কার এবং হজম সহায়ক। পেটে বায়ু ও অরুচি রোধে ফুল থেকে তৈরি ঔষধ ব্যবহার করা হয়। শুকনো কুলের গুঁড়া ও আখের গুড় মিশিয়ে চেটে খেলে মেয়েদের সাদাস্রাবের কিছুটা উপকার হয়।

কলা
পুষ্টিগুণ : কলায় ক্যালরি, শর্করা, ক্যালসিয়াম, লৌহ ও ভিটামিন সি আছে। কলা ঘুমের প্রাকৃতিক ওষুধ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর কলা সারাবছরই সহজেই পাওয়া যায়। এই জনপ্রিয় ফলটি সুষম খাদ্য তালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কলার হরেকরকম শ্রেণিভেদ থাকলেও সাগর, শরবি, চিনিচাম্পা বেশি সমাদৃত। কলা একটি ভালো প্রবায়োটিক হিসেবে কাজ করে। এর এই যাদুকরি ক্ষমতা পরিপাকে ক্রিয়া বৃদ্ধি ও শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অতুলনীয় ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন একটি কলা খেলে হিমোগ্লোবিন ঘাটতি হবে না। এছাড়া অ্যানিমিয়া রোগীর জন্য আদর্শ খাদ্য কলা। যারা অনিদ্রা ও বিষণœতায় ভুগছেন, সকালে ও দুপুরে অবশ্যই দুটি কলা খাবেন। কারণ, এর ট্রিপটোফ্যান ঘুমের প্রাকৃতিক ওষুধ। পর্যাপ্ত ঘুম দূর করবে চেহারার ডার্ক সার্কেল ও অবসন্নতা। কলার ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, খাদ্যে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর অভাবে চুল পড়া, আগা ফাটাসহ নানারকম সমস্যা দেখা দেয়।
ঔষধিগুণ : পাকা কলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে ব্যবহার করা হয়। কলার থোড় বা মোচা এবং শিকড় ডায়াবেটিস, আমাশয়, আলসার, পেটের পীড়া নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। আনাজি কলা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাকা বীচিকলার বীজ কৃমিনাশক।

আমড়া
পুষ্টিগুণ : ভিটামিন সি, ক্যারোটিন ও শর্করা আছে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া যায়, তাই এর ফল পেতে হলে নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন একটি করে আমড়া খাওয়া উচিত। বিশেষ করে শরীরে যাদের এসিডিটি আছে তাদের জন্য এটা ফল আদর্শ, অনেকে অভিযোগ করেন যে টক খেলে পেটে গ্যাস হয়। কথাটি আংশিক সত্য, টক ফল ভরাপেটে খেলে গ্যাস হতে পারে; কিন্তু খালি পেটে খেলে তা হবে গ্যাস নিরাময়ের ঔষধ।
ঔষধিগুণ : কফ নিবারণ করে, আমনাশক ও কণ্ঠস্বর পরিষ্কার করে। অরুচিতে, দাঁতের যতেœ আমড়া অনেক কার্যকর ফল। এক মাস খেলে দাঁতের বহু সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে।

পেঁপে
পুষ্টিগুণ : ক্যারোটিন ও ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ। পেঁপে এমন একটি ফল যা পুরোটাই ঔষধের গুণে ভরা। এর পুষ্টিগুণ বর্ণনায় শত পাতার বইও কম পড়বে। পেটের অজীর্ণ, কৃমি সংক্রমণ, আলসার, ত্বকে ঘা, একজিমা, কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা, ডিপথেরিয়া, আন্ত্রিক ও পাকস্থলির ক্যানসার প্রভৃতি রোগ নিরাময়ে পেঁপে বিশেষ উপকারী। কাঁচা পেঁপের পেপেইন ব্যবহার করা হয়। পেঁপের আঠা ও বীজ ক্রিমিনাশক ও প্লীহা, যকৃতের জন্য উপকারী।
পেঁপে মহৌষধ মাখনের মতো তুলতুলে নরম পাকা পেঁপেকে রোগের পথ্য বলা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও আফ্রিকা, পর্তুগাল, স্পেন, ভারত, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডে সারাবছরই পেঁপের চাষ হয়।
ঔষধিগুণ : পেঁপের গুণাগুণগুলোর সাথে একে একে পরিচিত হই। প্রথমত; পেঁপেতে প্রচুর জলীয় অংশ থাকায় এটি ত্বককে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে। শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের উৎস পেঁপে। বিটা ক্যারোটিন ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ত্বকের মৃত কোষ সারিয়ে তুলে ত্বককে রাখে দাগ ও বলিরেখামুক্ত। ফাইবারযুক্ত পেঁপে এমনই একটি ফল, যা সহজেই শরীরের ওজন কমিয়ে ওজনকে রাখে নিয়ন্ত্রণে। হজম প্রক্রিয়াকে বাড়িয়ে শরীরের টক্সিন বের করে দেয়। তাই ডায়েট চার্টে সকালের দিকে খেতে পারেন। ফলে সারাদিনের কাজের শক্তি জোগাবে। ইনটেস্টাইনে কৃমি থাকলে দেখা দেয় এলার্জি, চুলকানি ও ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা। কিন্তু আপনি জানেন কি পেঁপেতে বিদ্যমান এনজাইম কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে। নিজেকে রোগমুক্ত ও সুন্দর রাখার জন্য প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় চাই মহৌষধ পেঁপে।

আনারস
পুষ্টিগুণ : ক্যারোটিন, ভিটামিন সি ও ক্যালসিয়াম আছে।
ঔষধিগুণ : আনারসে পাকা ফলের সদ্য রসে ব্রোমিলিন নামক এক জাতীয় জারক রস থাকে বলে এটি পরিপাক ক্রিয়ার সহায়ক হয় এবং এর রস জন্ডিস রোগে প্রতিকার রয়েছে, জ্বর বা ফ্লুতে সারাদিন আনারস খেলে জ্বর ফ্লু থাকবে না। আধুনিক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, আনারসে এমন কিছু ঔষধিগুণ রয়েছে যা চিকনগুনিয়া, ডেঙ্গু, নিপাহ ভাইরাসজনিত রোগে কোনো সাধারণ আহার গ্রহণ না করে শুধু আনারসের জুস খেয়ে তিন দিন থাকলে কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই এই ভাইরাস দমন হয়ে যায়। আনারস খেলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম ঠিক হয়ে যায়, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পেটের বিভিন্ন সমস্যা দূর করার জন্য আনারসে রয়েছে প্রচুর ফাইবার।
কচি ফলের শাঁস ও পাতার রস মধুর সাথে মিশিয়ে সেবন করলে ক্রিমির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

বাতাবি লেবু বা জাম্বুরা
পুষ্টিগুণ : ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ একটি পুষ্টিকর ফল। প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক শুধু রুচিবর্ধকই নয়, লেবু বা জাম্বুরাকে প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক বলা হয়। ভিটামিন সি ও অ্যান্টি অক্সিডেন্টের মহান উৎস এই ফলগুলো ত্বক, নখ ও চুলের সৌন্দর্য বাড়াতে বিশেষ কার্যকর। নিয়মিত জাম্বুরা খেলে ত্বকের রুক্ষতা দূর হয়ে ত্বক হয়ে ওঠে মসৃণ। জাম্বুরা শরবত শুধু রিফ্রেশিং পানীয়ই নয়, উষ্ণ পানি ও জাম্বুরা মিশ্রণ ওজন কমানোর জন্য আদর্শ টনিক। ডায়েটেশিয়ানরা ডায়েট চার্টে জাম্বুরাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। ভিটামিন ই, ফোলেট, কপার, জিংক, ফসফরাস, পটাসিয়াম-সমৃদ্ধ লেবু ও জাম্বুরা ডায়াবেটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজমসহ অনেক সমস্যার মহৌষধ। খাবারের পর এক টুকরো জাম্বুরা চুষে খেলে মুখগহ্বরে জীবাণুর সংক্রমণ হয় না। নিজেকে সুস্থ ও তারুণ্যকে ধরে রাখতে প্রতিদিন বেশি বেশি জাম্বুরা খাবেন।
ঔষধিগুণ : পাতা, ফুল ও ফলের খোসা গরম পানিতে সেদ্ধ করে পান করলে মৃগী, হাত-পা কাঁপা ও প্রচ- কাশি রোগীর প্রশান্তি আনয়ন করে এবং সর্দি-জ্বর উপশম হয়।
আমাদের দেশে আরও অনেক ফল আছে যা ঔষধিগুণে ভরা, নিয়মিত এবং মৌসুমের সাথে ফল খাওয়ার অভ্যাস করলে কোনো রোগই কাছে আসবে না। আর যদি রোগ থেকে থাকে তাহলে তাও দূর হবে। মৌসুমি ফল খাওয়ার সঠিক নিয়ম হচ্ছেÑ সকালে নাস্তার পরিবর্তে মিক্সড ফল দুপুর পর্যন্ত খাওয়ার অভ্যাস করলে ৯০ দিনের মধ্যে জটিল এবং কঠিন রোগও নির্মূল হয়ে যাবে। অনেকে ভাবেন খালিপেটে ফল খেলে গ্যাস হয়! কথাটি ভুল। খালিপেটে কোনো ফল খেলে গ্যাস করে না, ভরাপেটে ফল খেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্যাস তৈরি হয়। আবার অনেকে ভাবেন ডায়াবেটিস রোগী বেশি ফল খেলে সমস্যা হয়, এ কথাটাও ঠিক না। নিয়ম মেনে ফল খেলে ডায়াবেটিসও ভালো হয়Ñ এ সম্বন্ধে চায়না স্ট্যাডি বলে একটি ফর্মুলা রয়েছে।
দেশি ফল নির্দিষ্ট মৌসুমেই খেতে পারলে ভালো, অসময়ে ফল খেলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লেখক : ন্যাচারোপ্যাথি বিশেষজ্ঞ

শ্রেণী:

রংপুর ও রাজশাহীতে ‘উন্নয়ন রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনার

uttaran

uttaranমো. রাজীব পারভেজ: ভিশন ২০২১ ও ভিশন ২০৪১-এর আলোকে উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশে পরিণত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে মনে করে উন্নয়ন রোডম্যাপ বাস্তবসম্মত, স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদা ও জনগণের আকাক্সক্ষা অনুসারে হওয়া উচিত। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা ও উন্নয়ন চাহিদা নিরূপণ করে কার্যকর উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রস্তুতে পরামর্শপত্র প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রতিটি বিভাগের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের নিয়ে অলোচনার মাধ্যমে সরাসরি এলাকার সমস্যা ও উন্নয়ন সম্ভাবনা বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সারাদেশের বিভাগভিত্তিক মতামত গ্রহণ শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ‘উন্নয়ন রোডম্যাপ’ পরামর্শপত্র তৈরি করা হবে। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ৭ আগস্ট রংপুর এবং ৯ আগস্ট রাজশাহী বিভাগে দুই ধাপে দিনব্যাপী ‘উন্নয়ন রোডম্যাপ’ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

রংপুর বিভাগ
রংপুর অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সম্ভাবনা এবং চাহিদা নিয়ে দিনব্যাপী ‘উন্নয়ন রোডম্যাপ-রংপুর বিভাগ’ শীর্ষক সেমিনার গত ৭ আগস্ট রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক, অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি সদস্য সচিব টিপু মুনশি এমপির সঞ্চালনায় সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটির চেয়ারম্যান ড. মসিউর রহমান। বিভাগীয় সেমিনারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য রাখেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটির  মো. রাজীব পারভেজ। ‘উন্নয়ন রোডম্যাপ-রংপুর বিভাগ’ শীর্ষক সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটির সদস্য ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ ও পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া রংপুর বিভাগের সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটির সদস্য ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোরশেদ হোসেন।
সেমিনারে রংপুর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ, দ্রুত গ্যাস সংযোগ, স্বল্প মূল্যে বিদ্যুৎ, ফার্নেস অয়েলে ভর্তুকি, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, রংপুর বিভাগে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আলাদা শিল্প, কর, ভ্যাট, শুল্ক ও ঋণনীতি ঘোষণা, ট্যাক্স হলিডের মেয়াদ বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকাশে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান, বিনিয়োগ সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য রিসার্চ সেন্টার স্থাপন, সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া-রংপুর হাইওয়ের পাশ দিয়ে রেললাইন নির্মাণ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো সুবিধাসহ ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন, জ্ঞানভিত্তিক শিল্প প্রসারের উদ্যোগ, কুড়িগ্রাম-ফুলছড়ি-জামালপুর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর ব্রিজ নির্মাণ, আন্তঃনগর রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষিভিত্তিক রংপুর অঞ্চলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, অঞ্চলভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার প্রচলন, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিশেষ নীতি সহায়তা প্রদান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে পিছিয়ে পড়া রংপুর বিভাগে জনসংখ্যার অনুপাতে মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত স্থাপন, রংপুর বিভাগ থেকে দ্রুতগতির ইলেক্ট্রনিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুকরণ, রংপুর বিভাগের উন্নয়নের স্বার্থে নর্থবেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট মিনিস্ট্রি গঠন, লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুকরণ, বেনাপোল স্থলবন্দরের ন্যায় রংপুর বিভাগে অবস্থিত সকল স্থলবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রংপুর অঞ্চলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট পলিসি গ্রহণ, প্রতি জেলায় স্পেশাল ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের জন্য বিশেষ স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ প্রদান এবং পণ্যভিত্তিক শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি তুলে ধরেন রংপুর অঞ্চলের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাবৃন্দ।
রংপুর বিভাগের উন্নয়ন, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ও রংপুর চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু এবং নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরশাদ জামাল দিপু, রংপুর চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. আবুল কাশেম, এফবিসিসিআই’র পরিচালক ও রংপুর চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. মোছাদ্দেক হোসেন বাবলু, ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা, হারাগাছ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও রংপুর চেম্বারের পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ মামুন, রংপুর চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোজতোবা হোসেন রিপন, অ্যাডভোকেট ইন্দ্র নাথ রায়, রংপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রশিদ বাবু, সাংবাদিক রফিক সরকার, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি ম-ল প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, পিছিয়ে পড়া রংপুর অঞ্চলের উদ্যোক্তা ও শিল্পপতিবৃন্দকে সম্পৃক্ত করে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার লক্ষ্যে আজকের এই সেমিনারের আয়োজন। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নের মূল স্রোতে রংপুর অঞ্চলকে সম্পৃক্ত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধ পরিকর। কেননা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসন একান্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, সেমিনারের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কাছ থেকে যেসব সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে তা নিরসনের ব্যাপারে তিনি সরকারের নীতি-নির্ধারণী মহলে তুলে ধরবেন।
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ, রংপুর বিভাগের আট জেলার ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাবৃন্দ, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, রংপুর চেম্বার পরিচালনা পর্ষদের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-পরিচালকবৃন্দ, সুধীজন, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।

রাজশাহী বিভাগ
অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও চাহিদা নিয়ে রাজশাহীতে ‘উন্নয়ন রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত গত হয় ৯ আগস্ট। দিনব্যাপী রাজশাহী চেম্বার ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত এই সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, রাজশাহীর উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা প্রয়োজন। এটি ছাড়া রাজশাহীর উন্নয়ন হবে না। তাই এ ব্যাপারে সরকারকেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। উত্তরাঞ্চল বরাবরই বঞ্চনার শিকার। রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার অভাবে এ অঞ্চল পিছিয়ে গেছে। নানা দাবি নিয়ে বিভিন্ন সময় আন্দোলন হলেও কোনো সরকারের পক্ষ থেকেই এসবের প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশও এখন হুমকির মুখে। গড়ে ওঠেনি শিল্প-কারখানা। সৃষ্টি হয়নি কর্মসংস্থান। অথচ ভিন্ন চিত্র দক্ষিণাঞ্চলে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বক্তারা আরও বলেন, দেশের বিভাগগুলোতে উন্নয়নের এমন তফাৎ থাকলে সেটাকে উন্নয়ন বলা যাবে না। সুষমভাবে সব বিভাগের উন্নয়ন হলেই দেশের উন্নয়ন হবে। শরীরের একটা অঙ্গ রোগাক্রান্ত থাকলে যেমন সুস্থ থাকা যায় না, তেমনি দেশের একটা অংশকে পেছনে ফেলে দিয়ে ভিশন-২০২১ এবং ২০৪১ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তাই রাজশাহীকেও উন্নয়নের ধারায় যুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা।
সেমিনারের সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, সরকার সুষমভাবে দেশের সব স্থানের উন্নয়ন করতে চায়। রাজশাহীর ব্যাপারেও সরকার খুব আন্তরিক। এই সেমিনার থেকে উঠে আসা এ অঞ্চলের নানা সমস্যা ও দাবির কথা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। রাজশাহীর উন্নয়নের স্বার্থে বিষয়গুলো নিয়ে সরকার কাজ করবে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেশের কোনো অঞ্চলই পিছিয়ে থাকবে না বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। যে সম্ভাবনা রয়েছে তা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন সাধিত করা সম্ভব। ভিশন ২০২১ এবং ভিশন ২০৪১ লক্ষ্য রেখে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করে তা কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের রোডম্যাপে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
বিভাগীয় সেমিনারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য রাখেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটির সাইফুল্লাহ আল মামুন ও মো. রাজীব পারভেজ। ‘উন্নয়ন রোডম্যাপ-রাজশাহী বিভাগ’ শীর্ষক সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদ কবীর লিখন।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক টিপু মুনশি এমপির সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী এমপি, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার, রাজশাহী চেম্বারের সভাপতি মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মর্জিনা পারভীন, কবিকুঞ্জের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল হক কুমার প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, অপার সম্ভাবনার এলাকা রাজশাহী অঞ্চল। দেশের খাদ্য চাহিদার বড় একটি অংশ জোগান দেয় এই অঞ্চল। এ অঞ্চলের কৃষজ পণ্যের পেছনে আমাদের এলাকার নারীদের যে অবদান তা খাটো করে দেখার অবকাশ নাই। তারপরও এই নারীরাই কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবের কারণে কর্মতৎপরতা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। আমাদের এলাকায় কৃষিপণ্য মজুদের কোনো পর্যাপ্ত ও আধুনিক ব্যবস্থা নেই। কৃষিভিত্তিক শিল্প নেই। নেই গার্মেন্ট শিল্প। ঈশ্বরদীতে একটি মাত্র ইপিজেড রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। একসময় রেশম শিল্প ছিল জগৎ বিখ্যাত। সেই রেশম কারখানা আজ বন্ধ, সরকারের উদ্যোগে মাত্র কয়েকদিন আগে তা আংশিক চালু হয়েছে। সরকার আম রপ্তানিতে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি আর এই অঞ্চলে ক্রেতার অভাবে আম নষ্ট হয়েছে। কৃষক এবার আম রাস্তায় ফেলে গেছে। আমাদের এখনই প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগে এ ধরনের কৃষজ পণ্য প্রসেসিং জোন করে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যাতে কর্মসংস্থানের অভাব মেটে। একসময় কৃষক লাক্ষা চাষে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিল, এই অঞ্চলেই খয়ের উৎপাদনে এগিয়ে থাকলেও পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তার মৃত্যু ঘটেছে। প্রতিবছর কাজের সন্ধানে নারী-পুরুষ সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে। এর মধ্যে কেউ নিরাপদভাবে কেউবা আবার অনিরাপদ প্রক্রিয়ায়। অঞ্চলভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে এ প্রবণতা হ্রাস পাবে। কৃষি পণ্য সংরক্ষণাগার, কৃষজ পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা যেমন নিতে হবে তেমনি এই এলাকায় চামড়া, মৎস্যভিত্তিক ইত্যাদি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বোপরি জেলাভিত্তিক মাঝারি শিল্পের পাশাপাশি এ অঞ্চলে বৃহৎ শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। রাজশাহী থেকে আবদুলপুর ডুয়েল রেললাইন, নদী ড্রেজিং করে খুলনার সাথে নৌপথ চালু, বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করে কার্গো বিমানের ব্যবস্থা করা, ভারতের মালদার সাথে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করে রপ্তানি বাড়ানো, সার কারখানা স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন বক্তারা।

শ্রেণী:

সড়ক দুর্ঘটনা আইন ২০১৮: হত্যা প্রমাণে ফাঁসি

uttaran

বেপরোয়া গাড়ি চালনার কারণে প্রাণহানির ক্ষেত্রে তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় ইন্টেনশন (ইচ্ছেকৃত) ছিল তবে এর শাস্তি ৩০২ ধারা অনুযায়ী হবে। এর শাস্তি মৃত্যুদ-। ৩০৪(বি)-এর শাস্তি বাড়িয়ে তিন বছর থেকে পাঁচ বছর করা হয়েছে।

uttaran

উত্তরণ ডেস্ক: দুর্ঘটনার কারণ ইচ্ছেকৃত ছিল তা তদন্তে প্রমাণিত হলে ফৌজদারি দ-বিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদ-। এ বিধান রেখে মন্ত্রিসভা সড়ক পরিবহন আইন চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। দুর্ঘটনার মাধ্যমে গুরুতর আহত করলে বা প্রাণহানি ঘটালে চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদ- ও অর্থদ-ের বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
এই আইনের অধীনে মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা যাবে। গত ৬ আগস্ট সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম এই অনুমোদনের কথা জানান। বৈঠক শেষে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানিটি তদন্তে হত্যা প্রমাণিত হলে চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- হবে।
গত বছরের ২৭ মার্চ খসড়াটি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর আইন মন্ত্রণালয় খসড়া আইনটি দ্রুত ভেটিং (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ‘দি মোটর ভেহিক্যাল অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩’ যুগোপযোগী করে নতুন আইনটি করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এই আইনের মূল ফোকাস হচ্ছেÑ সড়ক ব্যবস্থাপনা, সড়কে যানবাহনগুলো কীভাবে চলবে সেই বিষয়ে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়ে খসড়া আইনের ১০৩ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে এ সংক্রান্ত অপরাধ দ-বিধি-১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে। ৩০২, ৩০৪ যেগুলো আছে। এটা অবস্থার গুরুত্ব অনুসারে আলামত এভিডেন্স অনুযায়ী হবে। বোঝা যায় যদি সে স্বেচ্ছায় (দুর্ঘটনার মাধ্যমে প্রাণহানি) কাজটা করেছে, ভলান্টারিলি (স্বেচ্ছায়) কাউকে সে পিষে দিল এরকম ঘটনা, এটা দ-বিধি বা সংশ্লিষ্ট ধারায় এর শাস্তি হবে। তদন্তে সিদ্ধান্ত হবে এটা কোন লাইনে যাবে, (দ-বিধির) ৩০২ হবে না-কি ৩০৪ হবে।
খসড়ায় রয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে পেনাল কোডে সংশ্লিষ্ট সেকশন ৩০৪(বি)-এ যা কিছু থাকুক না কেন ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কারণে মোটরযান চালানোর কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে ওই ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদ- বা অর্থদ-ে বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। তিনি বলেন, আগে ছিল সাত বছর, পরে সংশোধন করে এটাতে তিন বছর করা হয়। এখন পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও যাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করে সব শ্রেণির সর্বসম্মত মত হলো পাঁচ বছর। এখানে অর্থদ-টা অসীম (আনলিমিটেড), কোনো লিমিট করা হয়নি। অবস্থার ওপর নির্ভর করে অর্থদ-ের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধের ১০৩ ধারা তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, বেপরোয়া গাড়ি চালনার কারণে প্রাণহানির ক্ষেত্রে তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় ইন্টেনশন (ইচ্ছেকৃত) ছিল তবে এর শাস্তি ৩০২ ধারা অনুযায়ী হবে। এর শাস্তি মৃত্যুদ-। ৩০৪(বি)-এর শাস্তি বাড়িয়ে তিন বছর থেকে পাঁচ বছর করা হয়েছে। এবং অজামিনযোগ্য করা হয়েছে, আগে জামিনযোগ্য ছিল। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক নিরাপত্তার জন্য মৃত্যুদ-ের বিধান নেই। সড়ক দুর্ঘটনার মাধ্যমে প্রাণহানি হত্যার পর্যায়ে গেলেই কেবল দ-বিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী শাস্তি হবে।
যে অপরাধে যে শাস্তি : ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশের সঙ্গে নতুন আইনে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে জানিয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর শাস্তি সর্বোচ্চ চার মাসের জেল বা ৫০০ টাকা অর্থদ-। নতুন আইনে বলা হচ্ছে ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদ-। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালানোর শাস্তি এখন তিন মাসের জেল বা ২ হাজার টাকা জরিমানা। নতুন আইনে এই শাস্তি ছয় মাসের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর জরিমানাও বর্তমানে সর্বোচ্চ তিন মাসের জেল বা জরিমানা ২ হাজার টাকা জানিয়ে সড়ক সচিব বলেন, নতুন আইনে এই অপরাধের শাস্তি ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-। গাড়ির চেসিস পরিবর্তন, জোড়া দেওয়া, বডি পরিবর্তন করার বর্তমান শাস্তি দুই বছরের কারাদ- বা ৫ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-। সেখানে নতুন আইনে শাস্তি এক থেকে তিন বছরের কারাদ- বা ৩ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-।
সড়কের ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দায়ী হবে কি নাÑ জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, ওদের দায়ী করা হবে, সেটা আইনে আছে। ধারা ৫০-এ বলা আছে তারা দায়ী হবেন। এই ধারায় বলা হয়েছে, এই আইন বা অন্য কোনো আইনের অধীন কোনো সরকারি কর্মচারী তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অবহেলা বা ত্রুটিপূর্ণভাবে পালন করার কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে ওই কর্মচারীকে দায়ী করে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। অদক্ষ চালক নিয়োগের ক্ষেত্রে মালিকদের সাজার বিষয়টি খসড়া আইনে আছে কি নাÑ এ বিষয়ে সড়ক সচিব বলেন, খসড়া আইনে বলা আছে, চালকের সঙ্গে চুক্তিপত্র ছাড়া নিয়োগ দিতে পারবে না। চুক্তি করতে হলে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগবে। শ্রম আইন অনুযায়ী চুক্তিপত্র থাকতে হবে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে : ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। পেশাদার ডাইভিং লাইসেন্স পেতে চাইলে বয়স ২১ বছর হতে হবে। কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী ড্রাইভারের লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকবে। অপরাধ করলে পয়েন্ট কাটা যাবে, পয়েন্ট শূন্য হয়ে গেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। লাল বাতি অমান্য করে যানবাহন চালালে, পথচারী পারাপারের নির্দিষ্ট স্থানে ওভারটেক করলে একটি করে পয়েন্ট কাটা যাবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী ব্যক্তি অপ্রকৃতস্থ, অসুস্থ, শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম, মদ্যপ, অভ্যাসগত অপরাধী হলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা যাবে। যে যানবাহনগুলো ভাড়ায় খাটে না, যেমনÑ সরকারি যানবাহন, মৃত বহন ও সৎকারে নিয়োজিত পরিবহন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, রেকার; এগুলোকে রুট পারমিট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নতুন আইনানুযায়ী কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে সারা বাংলাদেশ বা যে কোনো এলাকার জন্য যে কোনো ধরনের মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারণ করে দিতে পারবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সিঙ্গাপুরে যে কেউ গাড়ি নামাতে পারে না, কারণ ওখানে সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। যে কোনো ধরনের গাড়ির জীবনকাল প্রজ্ঞাপন দিয়ে সরকার নির্ধারণ করে দিতে পারবে। চালক ও তার সহকারীদের যথাযথভাবে রেস্ট হয় না। তাদের সুবিধার জন্য সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শ্রম আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মঘণ্টা ও বিরতিকাল নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে। নিয়োগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আবশ্যিকভাবে সেই কর্মঘণ্টা বা বিরতিকাল মেনে চলতে হবে।
গতিসীমা, শব্দমাত্রা, পার্কিংয়ের বিষয় আইনে বলা আছে। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট চালক ও তার সহকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে কাছের থানা এবং ক্ষেত্রমতো ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতালকে অবহিত করবে। আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির জীবন রক্ষার্থে কাছের সেবাকেন্দ্র বা হাসপাতালে পাঠানো ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। পুলিশ দেশব্যাপী টোল ফি নম্বর প্রবর্তন করবে যার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত মোটরযানের চালক ও তার সহকারী, মালিক, পরিচালক বা তাদের প্রতিনিধি বা অন্য কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নম্বরে ফোন করে জানাতে পারবেন।
দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারকে সহায়তায় তহবিল : কোনো মোটরযান দুর্ঘটনায় কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে বা মারা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তার উত্তরাধিকারী আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসার খরচ পাবেন। এই সহায়তা তহবিল কীভাবে গঠন হবে আইনে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ওই তহবিল পরিচালনায় ট্রাস্টি বোর্ড করা হবে। সরকার অনুদান, মোটরযানের মালিকের কাছ থেকে আদায়কৃত চাঁদা, এই আইনের অধীন জরিমানার অর্থ, মালিক সমিতির অনুদান, মোটর শ্রমিক ফেডারেশন বা সংগঠনের অনুদান বা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে পাওয়া অর্থ নিয়ে এই তহবিল গঠন করা হবে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী মদ বা নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করে কেউ গাড়ি চালাতে পারবে না জানিয়ে তিনি বলেন, এসব সেবন করে চালকের সহকারী গাড়িতে অবস্থান করতে পারবে না। চালকের সহকারীদের যানবাহন চালানোর দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। সড়ক বা মহাসড়কে উল্টোপথে গাড়ি চালাতে পারবে না। মোটরযান চালানোর সময় চালক মোবাইল ফোন বা অনুরূপ কোনো কিছু ব্যবহার করতে পারবে না। সিটবেল্ট বাঁধতে হবে। কোনো যাত্রী যান চালাতে চালককে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় এমন কোনো আচরণ করতে পারবেন না। মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠ যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কেউ বসতে পারবে না। যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধার বিষয়ে নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করতে হবে। এসব বিধান না মানলে আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে।

শ্রেণী:

শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশন

uttaran

“আশ্বিনের এক সোনালি রোদ্দুর ছড়ানো দুপুরে… টুঙ্গিপাড়ায় আমার জন্ম। গ্রামের ছায়ায় ঘেরা, মায়ায় ভরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ এবং সরল-সাধারণ জীবনের মাধুর্যের মধ্যদিয়ে আমি বড় হয়ে উঠি।… আমার শৈশবের স্বপ্ন-রঙিন দিনগুলো কেটেছে গ্রাম-বাংলার নরম পলিমাটিতে, বর্ষায় কাদা-পানিতে, শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে, ঘাসফুল আর পাতায় পাতায় শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে, জোনাকজ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক শুনে, তালতমালের ঝোপে বৈচি, দীঘির শাপলা আর শিউলি-বকুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে, ধুলোমাটি মেখে, বর্ষায় ভিজে খেলা করে।”
শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, প্রথম খ-, পৃ. ২৫-২৬

uttaranনূহ-উল-আলম লেনিন: জীবনের ৭১তম আশ্বিন পেরুবেন শেখ হাসিনা। ধুলোমাটি মাখা, বর্ষায় ভেজা এবং দেশবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত ৭১টি ফুল দিয়ে তার বর্ণাঢ্য জীবনের মালা গাঁথা। কিন্তু ৭১টি ফুলের বেশ কয়েকটি রক্তাক্ত, দলিত-মথিত। আবার অনেকগুলো ফুলের সৌন্দর্য-সুষমা এবং সুঘ্রাণ কেবল বাংলাদেশই নয়, দেশ-মহাদেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে সারাবিশ্বকে মুগ্ধ ও আমোদিত করেছে। বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রনায়কদের শিরোপা তার মাথায়। তার শিরোপার উষ্ণীষে লেখা রয়েছে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’।
বিবিসি’র জরিপে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যেমন আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে, তেমনি বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল, যোগ্য-দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার নামটিও বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি উচ্চারিত হবে। পিতা-পুত্রী এবং দুজন স্বতন্ত্র মানুষ হলেও, বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য এবং অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন। আমার কথাকে কেউ অতিশয়োক্তি মনে করতে পারেন। কিন্তু নির্মোহভাবে চিন্তা করলেই ইতিহাসের আর্শিতে আমার কথার সত্যতা ধরা পড়বে। এ-কথা তর্কাতীত যে বঙ্গবন্ধু একমেবাদ্বিতীয়ম। বঙ্গবন্ধুকে সবার ঊর্ধ্বেই ভাবতে হবে। রাষ্ট্রনায়ক, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী হবেন অনেকেই। কিন্তু জাতির পিতা তো একজনই। বাংলাদেশের স্থপতি একজনই। বঙ্গবন্ধু কারও সাথে তুলনীয় নন। তবে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা তিন-দফায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকে যে কাজগুলো করেছেন, জীবিত থাকলে বঙ্গবন্ধু সেই কাজগুলোই অনেক আগে করতেন। আর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন রূপায়ণে, তার প্রিয় দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তার আরাধ্য ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞ শেখ হাসিনা সম্পন্ন করে বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় রোলমডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন করেছেন বলেই বঙ্গবন্ধুর সাথে মিলিয়ে পরস্পরের পরিপূরক বলেছি। দেশবাসী এখন শেখ হাসিনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখতে পান। সেটি কেবল সন্তান হিসেবে নয়, সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।
একটি রাজনৈতিক পরিবারে শেখ হাসিনার জন্ম। ছাত্রজীবনে গভীরভাবে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে, যে পটভূমিতে তাকে আসতে হয়েছে, তা ছিল তার চিন্তার বাইরে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত না হলে, শেখ হাসিনাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ১৯৮১ সালে পুত্র-কন্যাদের ছেড়ে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং দলের দায়িত্বভার নিতে হতো না। শেখ হাসিনার জবানীতেই আমরা জানি, তিনি লিখেছেনÑ
“রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম। পিতা জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। একদিন যে আমাকেও তাঁর মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে ভাবিনি। সময়ের দাবি আমাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। পিতার স্বপ্ন ছিল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমি এই আদর্শ নিয়ে বিগত ২৮ বছর যাবত জনগণের সেবক হিসেবে রাজনীতি করে যাচ্ছি।”
Ñ শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খ-ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা, ৩০ নভেম্বর, ২০০৯

এই লেখার পর আরও ১০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। পিতার আদর্শের পথ ধরে তার রাজনৈতিক জীবনের ৩৮ বছর পূর্ণ হয়েছে।
এই ৩৮ বছরের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশন কী ছিল? অনেকেই সরলীকরণ করে বলেন, পিতার হত্যার বিচার, তার মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনাই ছিল শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশন। নিঃসন্দেহে তার রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও লক্ষ্যের মধ্যে এই অভীষ্টগুলো ছিল। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, অপরাধীদের কয়েকজনের মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অর্থাৎ জাতির পিতার মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালেই আওয়ামী লীগকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যদি এটুকুতেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভিশন সীমাবদ্ধ থাকত, তা হলে এই ভিশন বা লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর তার আর রাজনীতিতে থাকার প্রয়োজন ছিল না। বস্তুত কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই তিনি রাজনীতি করেন নি এবং করছেন না। রাজনীতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে :
“আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। ক্ষমতায় আরোহণের জন্য আমাদের দেশে সাধারণত রাজনৈতিক ইস্যুকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। সমাজ সংস্কার বা অর্থনৈতিক কর্মকা-কে ইস্যু করা হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিরোধী দল রাজনৈতিক ইস্যুর সন্ধানে অনেক সময় ব্যয় করেছে। অবশ্য এটা ঠিক যে, একটা পর্যায় পর্যন্ত এর প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল ততদিন পর্যন্ত যতদিন গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ছিল না।… আমি মনে করি, আমাদের রাজনীতির একটা পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা হতে হবে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি। আন্দোলন হবে সমাজ সংস্কারের জন্য। আর এ উন্নয়ন মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়। এ উন্নয়ন অবশ্যই হতে হবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য।”
Ñ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন, শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, ১ম খ-, পৃ. ২১১-২১৩

জননেত্রী শেখ হাসিনা তার বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতায় যে কথাগুলো বারবার উচ্চারণ করেছেন, তা হলোÑ (১) সকল মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূর্ণ করতে হবে; (২) প্রত্যেক কর্মক্ষম নাগরিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; (৩) প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা; (৪) শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা প্রভৃতি নিশ্চিত করাই হবে রাজনীতির মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ বঞ্চিত মানুষের ওপর। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের বঞ্চনার অবসান ঘটানোই হবে রাজনীতির লক্ষ্য। আর এজন্য, তার ভাষায় :
“… সম্পদের সুষম বণ্টন প্রয়োজন। কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে না। সকলের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
আমাদের দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কর্মসূচি প্রয়োজন। আর্থ-সামাজিক কর্মসূচিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের সুখ সুবিধা নিশ্চিত করা, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, সুস্থ সবল জাতি গঠন করা। রাজনীতি হতে হবে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে। দেশকে আমরা কী দিতে পারলাম সেটাই একজন রাজনীতিবিদের চিন্তা-ভাবনা হতে হবে।… দেশকে গড়ে তোলা, মানুষের সুখ সমৃদ্ধি নিয়ে আসা, মানুষের জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মিটানোÑ অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণ, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলবে, শান্তিতে ঘুমাবে।
আমাদের চিন্তা মানুষকে ঘিরে। দেশের মানুষের কল্যাণ সাধনেই আমরা নিবেদিত। মানুষের অসহায়ত্ত আমাদের পীড়া দেয়। তাই সামাজিক সমস্যা দূর করা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে এই ঘুণে ধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়াÑ এমন একটি সমাজ, যেখানে থাকবে না শোষণ বঞ্চনা। সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যেই নতুন সমাজ গড়তে হবে।”
Ñ শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, ১ম খ-, পৃ. ২১৩-২১৪

এ-কথাগুলো যে কেবল আপ্তবাক্য নয়, শেখ হাসিনা তিন-দফা রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থাৎ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে বাস্তব কাজ দিয়ে তা প্রমাণ করেছেন।
শেখ হাসিনা এ-কথা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন, কেবল চটকদার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা এবং বাগাড়ম্বর দিয়ে বেশিদিন জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়। যে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের কথা তিনি বলেছেন, তা করতে হলে সম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। সম্পদ না থাকলে সম্পদের সুষম বণ্টনের কথা অর্থহীন হয়ে পড়বে। খাদ্য ঘাটতি এবং খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশে সর্বাগ্রে প্রয়োজন খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত খাদ্য প্রয়োজন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, তার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেই (১৯৯৬-২০০১) বাংলাদেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। কিন্তু ২০০১ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসায় দেশ আবার খাদ্য উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ে। খাদ্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৯ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত, টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষের ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফলে ৪৪ শতাংশ থেকে চরম দারিদ্র্যসীমা ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের যে কথা শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক দর্শনে বারবার উল্লেখ করেছিলেন, সেই উন্নয়ন অভিযাত্রায় বাংলাদেশ এখন নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। স্বল্পোন্নত বা দরিদ্র দেশের লজ্জা ঘুচিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্বব্যাংক। ১০ বছর আগে যেখানে বাংলাদেশের মাথাপ্রতি আয় ছিল ৪৫০-৫০০ ডালারে সীমাবদ্ধ, সেই মাথাপ্রতি আয় বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ডলারের কোটা স্পর্শ করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য ঘোষিত আছে। কিন্তু ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৭ শতাংশ স্পর্শ করেছে। ১০ বছর আগের ২৮০০/৩০০০ মেগাওয়াট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৮০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কর্মযজ্ঞের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক ক্লাবে যুক্ত হতে চলেছে। রপ্তানি আয় বিপুলভাবে বেড়েছে। বেড়েছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের হার। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আর এসবের ফলেই সম্ভব হয়েছে বিশ্বব্যাংকের ও অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীর ঋণ সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব তহবিল থেকে দেশের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া। শেখ হাসিনার দূরদর্শী এবং আত্মমর্যাদাশীল নেতৃত্বের দৃঢ় প্রত্যয়ী ভূমিকার জন্যই এই অসম্ভবকে সম্ভব করা যাচ্ছে। এক পদ্মাসেতু নির্মাণের সাফল্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্ভ্রমপূর্ণ অবস্থান এনে দিয়েছে। এখন আর কেউ বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল দেশ অথবা হেনরি কিসিঞ্জারের মতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলার ঔদ্ধত্য দেখাতে পারবে না। তৈরি পোশাক শিল্প, সিমেন্ট শিল্প, জাহাজ শিল্প, ঔষধ শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন সেবা খাতে বাংলাদেশের চমকপ্রদ উন্নয়ন, আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন নতুন খাত সৃষ্টি করেছে। এটা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় যে বাংলাদেশ মাছ, সবজি প্রভৃতি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমরা গৌরবের সাথে বলতে পারছি, বাংলাদেশ মহাকাশ যুগে প্রবেশ করেছে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ মহাকাশ পরিবারের সদস্য হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব।
শেখ হাসিনার ভিশন, দেশের সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা। তিনি এই ‘ঘুণে ধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার’ প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন। এই প্রত্যয় বা ২০০৯ সালের ‘দিনবদলের ইশতেহারে’ ঘোষিত ‘ভিশন-২০২১’, এখন আর রূপকল্পেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের স্কুলে যাওয়ার বয়সী প্রতিটি শিশু এখন প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের হার ৫৫ শতাংশ এবং ছেলেদের ৪৫ শতাংশ। শতাব্দী প্রাচীন অজ্ঞানতার অন্ধকার ঘুচিয়ে এক নীরব সামাজিক পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে;Ñ যা নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত সৃষ্টি করছে। শিক্ষার হার দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বিপুলভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে/ওয়ার্ডে কমিউনিটি হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা লাভের সুযোগ বৃদ্ধি, নতুন নতুন হাসপাতাল নির্মাণ এবং মানসম্পন্ন ঔষধ উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আমাদের জনগোষ্ঠীর গড় আয়ুষ্কাল ৭১ বছরে উন্নীত হওয়া, দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুমৃত্যু এবং মাতৃমৃত্যুর হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। এসব পরিসংখ্যান ও সূচকই প্রমাণ করে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার উন্নয়ন-দর্শন কী বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অব্যাহত। তবে গরিব-মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ যত সহজে বাড়ানো যায়, উচ্চশিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ জ্যামিতিক হারে বাড়ানো যায় না। সেবা খাতে ঈর্ষণীয় উন্নতি, তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নতির ধারা বেগবান হলেও, শিল্পায়নের ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। শেখ হাসিনা বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছেন। শিল্পায়ন ছাড়া প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান হবে না। সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলে অচিরেই সেই লক্ষ্যও অর্জিত হবে। ছিন্নমূল গরিব মানুষের মাথা গুজবার ঠাঁই করে দেওয়ার জন্য গৃহীত প্রকল্পগুলো চলমান। সামগ্রিক মাথাপিছু আয়, সুষম বণ্টন এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করতে পারলে কোনো মানুষই গৃহহীন থাকবে না।
বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সম্মানজনক সমাধান করেছে। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির মাধ্যমে সমুদ্রবিজয় একদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সংহত করেছে, অন্যদিকে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে। আমাদের সাথে আর কোনো সীমানা বিরোধ নেই। আমাদের সীমান্তÑ শান্তির সীমান্ত।
বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা ১০ লক্ষাধিক মানুষের স্রোত আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রাকে ব্যাহত করছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ মানবিক দৃষ্টি নিয়ে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের এদেশে সাময়িকভাবে থাকার ব্যবস্থা করতে এগিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, আমরা আমাদের ‘খাদ্য ভাগ করে খাব’, তবুও এই মানুষগুলোকে জোর করে মৃত্যুপুরী মিয়ানমারে ঠেলে দেব না। শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি ও তার সরকার। তার এই ভূমিকা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। এজন্যই তাকে ‘মানবতার মা’ বলে পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমে উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি অনেক সমস্যার জট খুলেছেন। পিতার নেতৃত্বে গৃহীত ’৭২-এর যে সংবিধান সামরিক শাসকরা যথেচ্ছভাবে পরিবর্তন ও কাটছাঁট করেছিল। দেশের সর্বোচ্চ আদালত তা অবৈধ ঘোষণা করেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় সংসদ সংবিধান (ত্রয়োদশ-পঞ্চদশ) সংশোধন করে দেশে ’৭২-এর সংবিধান ফিরিয়ে এনেছেন। দেশ পরিচালিত হচ্ছে জাতীয় চার মূলনীতি তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শ এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে। তিনি আমাদের দেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেছেন। একইসঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন।
’৭১ পেরুলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু না চিন্তায় না শারীরিকভাবে কোনো বার্ধক্য বা জড়তা তাকে কাবু করতে পারেনি। বিপুল তার প্রাণশক্তি এবং কর্মক্ষমতা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছাড়াও বহুবার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এখনও তিনি প্রাণ হাতে নিয়ে মাতৃভূমির দেওয়া দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। রাজনীতির বাইরে তার কার্যত কোনো ‘ব্যক্তিগত জীবন নেই’। দেশের জনগণ এবং আওয়ামী লীগই তার আত্মার আত্মীয়, ধ্যান, জ্ঞান এবং সর্বক্ষণের সহযাত্রী।
নিজেকে তিনি ‘আলোর পথযাত্রী’ বলেছেন। যথার্থই তিনি আলো হাতে আঁধারের যাত্রী। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে অন্ধকারের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সেই অন্ধকারের রাজত্বের অবসান ঘটিয়েছেন। আমরা, বাঙালি জাতি তার নেতৃত্বেই আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ভিশন বা লক্ষ্য তিনি ঘোষণা করেছেন। ২০০৯ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার রূপকল্প (ভিশন) ঘোষণা করেছিলেন। তার সেই ভিশন বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তিনি বাস্তবায়িত করে চলেছেন। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার ভিশনও তিনি এবং নতুন প্রজন্ম নিঃসন্দেহে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন। ১৯৮১ সালে যে ভিশন ও মিশন নিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলেন, সে মিশন তার সফল হয়েছে। সময়ের সাথে ভিশন পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনের বিজ্ঞান বুঝেছেন বলেই শেখ হাসিনা সকল সংকট মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছেন।
তার এই ৩৮ বছরের চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আশির দশকে, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণের সময়, স্বাভাবিকভাবেই তার অভিজ্ঞতার ভা-ারটি সমৃদ্ধ ছিল না। তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ এবং বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে আস্থাভাজনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দল পরিচালনার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখনকার অনেক নেতা-ই ভেবেছিলেন, অনভিজ্ঞ এবং বয়োকনিষ্ঠ শেখ হাসিনাকে তারা হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু তারা ভুল ভেবেছিলেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার অভিজ্ঞতা কম থাকলেও তার ঋজু এবং আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তিত্বকে তারা খাটো করে দেখেছেন। যখন প্রয়োজন ছিল দলের মধ্যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য, তখন দলের নেতৃত্বের একটি অংশ ছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানামুখী চক্রান্তমূলক তৎপরতায় লিপ্ত। কৃত্রিমভাবে দলের মধ্যে ইস্যু সৃষ্টি করে দলে ভাঙন অনিবার্য করে তোলেন। প্রথমে মিজানুর রহমান চৌধুরী দল থেকে বেরিয়ে ‘মিজান আওয়ামী লীগ’ গঠন করেন, তারপর সিলেটের প্রবীণ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী এবং মোফাফ্ফর হোসেন পল্টু স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগ গঠন করেন। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে প্রয়াত আবদুর রাজ্জাকের দিক থেকে।
আশির দশকে দলের প্রভাবশালী সংগঠন ও নেতা দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। গড়ে তোলেন ‘বাকশাল’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল। ছাত্রলীগকে ভেঙে দু-টুকরো করেন। অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোতেও একই খেলা চলে। ফলে দলের ওপর বিরাট একটা ধাক্কা এসে পড়ে। এইসব ধাক্কা সামাল দিয়ে দলের ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনা পিতার মতোই চারণের বেশে দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলা-জেলা সফর করেন। ১৯৯১-এর নির্বাচনকালেই বাকশালের সংকট চূড়ান্ত রূপ নেয়। নির্বাচনের পর আবদুর রাজ্জাক ও মহিউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশটি বাকশাল বিলুপ্ত করে দলে ফিরে আসেন। ঐক্যের প্রতীক জননেত্রী শেখ হাসিনা উদার ও সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ফিরে আসা নেতা-কর্মীদের অ্যাকোমেডেট করেন।
এরপর নব্বইয়ের দশকে ড. কামাল হোসেন দল থেকে বেরিয়ে গণফোরাম করেন। কিছু নেতাকর্মী বিভ্রান্ত হয়ে ড. কামালের পথ ধরেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মোহাম্মদ সেলিমও গোস্বা করে দল থেকে বেরিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগ নামে স্বতন্ত্র দল করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন।
১৯৯৬ সালের ১৪ জুনের নির্বাচনে দলকে ২১ বছর পর ক্ষমতায় নেওয়ার পর, স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আর কেউ মাথা তুলে দাঁড়াবে না; আর কোনো ষড়যন্ত্র হবে না। কিন্তু ২০০৭ সালের ১/১১-এর পরিবর্তনের ফলে জরুরি অবস্থা জারি ও ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পরও আমরা নতুন ষড়যন্ত্রের খেলা দেখতে পেলাম। একদিকে মহলবিশেষের মাইনাস টু ফর্মুলার নামে কার্যত শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করা, অন্যদিকে আওয়ামী লীগকেও ভাঙার ষড়যন্ত্র চলে। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের আগেই ‘সংস্কারপন্থি’ বলে কথিত দলের চারজন সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পৃথক পৃথকভাবে কিন্তু অভিন্ন ভাষায় সংবাদ সম্মেলন করে দলের ‘সংস্কার’ দাবি করেন। এই নেতৃবৃন্দের অবিমৃশ্যকারী এই তৎপরতার সাথে উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তা ও সেনা গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশ ছিল বলে জানা যায়। যে কারণেই হোক, এই ঘটনা কার্যত শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি দলীয় ফোরামে সংস্কার প্রস্তাব না তুলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি তোলায় দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির প্রয়াস হিসেবেই কর্মীদের কাছে প্রতিভাত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা ও কর্মীরা ছিল জননেত্রী শেখ হাসিনার পেছনে প্রবলভাবে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত। ফলে দল ভাঙার সকল প্রয়াশ ব্যর্থ হয়।
এভাবেই ঘরে বাইরের বহুমুখী ষড়যন্ত্র এবং চাপ মোকাবিলা করেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে চোখের মণির মতো রক্ষা করে চলেছেন। কেবল রক্ষাই নয়, দলকে দেশের সবচেয়ে গণভিত্তিসম্পন্ন সর্ববৃহৎ অজেয় দলে পরিণত করেছেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো বর্তমানে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় পরিচালনার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো নেতা নেই। মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে শেখ হাসিনাই একমাত্র সরকারপ্রধান যিনি অকুতোভয়ে সেকুলার গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, জাতিগত বিদ্বেষ এবং শক্তি প্রদর্শনের হুমকিমুক্ত, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এক শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার প্রবক্তা হিসেবে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের জননন্দিত প্রধানমন্ত্রীর শান্তি ফর্মুলা মানব জাতির সামনে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। তিনি এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও আস্থাভাজন বিশ্বনেত্রী।
’৭২-এ পদার্পণ এবং বিগত ৩৮ বছরের পথচলার অক্লান্ত সারথি শেখ হাসিনা বারবার নিজেকে অতিক্রম করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যেমন তার সৃষ্টিকর্মে বারবার নিজেকে অতিক্রম করায় কখনোই পুরনো বা অচল হননি, তেমনি বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপকার, রাজনীতির কুশলী শিল্পী এবং চিন্তক শেখ হাসিনাও রাজনৈতিক সৃজনশীলতায় বারবার নিজেকে অতিক্রম করে চলেছেন। সেজন্যই তার নেতৃত্ব কখনও পুরনো হয় না, সেকেলে হয় না। প্রিয় নেত্রী, প্রিয় সতীর্থ শেখ হাসিনা, জন্মদিনে আপনাকে ফুলেল শুভেচ্ছাÑ নমিত শ্রদ্ধা।

শ্রেণী: